তারেক মাসুদ,
বাংলাদেশে অন্য অনেককিছুর মত সড়কগুলোও বেঈমান। তাই তারা আমাদের কাছ থেকে কেবলই কেড়ে নিয়ে যায় আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে।যেমন নিয়ে গেল আপনাকে, যেমন নিয়ে যাবে আরও অনেককে; আর আমরা সড়কগুলোকে নিরাপদ করার কোনো চেষ্টা করব না, শুধু সময় সময় শোক প্রকাশ করব, যেমন আমরা করে থাকি, সাধারণত।
আপনি পড়াশোনা শুরু করেছিলেন মাদ্রাসায়। তাই এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হত যদি আপনি আস্তে আস্তে হয়ে ঊঠতেন একজন সাধারণ ‘মৌলানা মাসুদুল্লাহ’ বা ‘মুফতি তারেকুল’। কিন্তু আপনি হয়ে উঠলেন একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা; এমন এক চলচ্চিত্রনির্মাতা, যাকে নিয়ে বাংলাদেশ অনন্তকাল অহংকার করতে পারবে, যার জীবন শেষ হয়েও শেষ হবে না কোনোদিন। কেন? কারণ আপনি মৌলানা সাহেব হওয়ার জন্য জন্মাননি তো! আপনার জন্ম হয়েছিল তারেক মাসুদ হওয়ার জন্য, হ্যাঁ, তারেক মাসুদ হওয়ার জন্যই…
শিল্পী এস এম সুলতান বিষয়ে করা আপনার আদম সুরত ডকুমেন্টারি-টিই সম্ভবত আপনাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল চলচ্চিত্রপাগল মানুষদের কাছে। বাংলা ডকুমেন্টারি ফিল্মের করিডোরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল একজন ম্যাজিসিয়ানের।
কিন্তু এটাও তো আমরা জানি যে এই অন্ধকারপ্রিয় অঞ্চলে আমরা স্বচ্ছ নির্মল ম্যাজিকের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিয়ে থাকি ঘোলা সন্দেহজনক জনপ্রিয়তাকে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আপনাকে জনপ্রিয়ও করেছিলেন। তবে সেই জনপ্রিয়তায় কোনো ‘কিন্তু’ ছিল না, আপনার প্রাপ্য ছিল সেই জনপ্রিয়তা।একাডেমি এওয়ার্ডসের জন্য নমিনেটেড হওয়া প্রথম বাংলা সিনেমা মাটির ময়না, ভবিষ্যতে আরও অনেক ছবি পাবে নমিনেশান, হয়তো পুরস্কার-ও, কিন্তু আপনার এচিভমেন্ট-টা প্রথম ও প্রধান থাকবে সবসময়, অন্তত আমি বিশ্বাস করি!
অতি-অল্পবয়সে প্রথমবারের মতো মুক্তির গান দেখেছিলাম, ভালো লাগেনি, ওই বয়সে ভালো লাগার কথাও না; তবে তখন ভালো লাগেনি বলে এখন লজ্জা লাগে। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান মূহুর্তটির কিছু অংশ আপনি আপনার মায়াবি ক্যামেরায় তুলে আনলেন আশ্চর্য প্রতিভায়; আর আমরা, বই পড়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা জেনারেশনটা প্রথমবারের মত অনুভব করলাম যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো নিষ্প্রাণ ডেটা-এনালিসিস-স্ট্যাটিসটিক্সের ব্যাপার নয়; এটা একটা অনুভূতির ব্যাপার, যা প্রাত্যহিক নিঃশ্বাসে ধারন করে এদেশের লাখ লাখ ‘সাধারণ’ মানুষ; যারা স্যাক্রিফাইস করেছে সবচেয়ে বেশি, এবং যারা পেয়েছে সবচেয়ে কম।
মাটির ময়না নিয়ে নতুন করে কি আর লেখার আছে? আমাদের প্রজন্মের প্রগতিশীল অংশটির মাইন্ডসেট তৈরিই তো করেছে এই ছবিটি। অপু দুর্গাকে যেন আপনি পুনর্নিমান করলেন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন সমাজে। আর ইসলামি মৌলবাদ নিয়ে এত সাহসী ছবি করার কথা কে কবে ভাবতে পেরেছিল এই অঞ্চলে? এখনো-এই যে টাইপ করছি, এই মুহূর্তেও-চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছি একদল মূর্খতাগর্বী মানুষ একটি শিশুকে শীতের সকালে রক্ত-ঠান্ডা-করা পানিতে জোর করে নামিয়ে তার চিকিৎসা করছে। আরও কত দৃশ্য; অন্তর্যাত্রা-র,নরসুন্দর-এর; কয়টার কথা লিখব?
আপনি কাজ করছিলেন একটি নতুন ছবি নিয়ে, নাম সম্ভবত কাগজের ফুল। বিষয় পার্টিশন। কিন্তু আরও কত কিছু করার বাকি ছিল আপনার। চলে গেলেন কেন? কেন?
আপনি নেই, ক্যাথরিন আছেন, আছে আপনার সেইসব আশ্চর্য সৃষ্টি যা আমাদের আলো দেবে আরো অনেকদিন, হোর্হে লুইস বোর্হেস বলেছিলেন লেখকেরা মরে গেলে বই হয়ে যায়, আর আপনি তো লেখকই, দৃশ্যকাব্যের লেখক…
কিংবা আপনি মরেননি, আমরা একটা ইল্যুশানের মধ্যে আছি, কারণ তারেক মাসুদ-রা কখনো মরে না, তারেক মাসুদ-দের মরতে নেই !!!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ ভোর ৪:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



