সম্পর্কের কুটিল মারপ্যাচ এবং মর্মার্থ অনুধাবন করার মত জটিল মস্তিষ্ক তার নেই।আর সেইহেতুই তার জীবনের মসৃ্নতাই সবার কাছে প্রধান দ্রষ্টব্য হয়ে ঊঠলেও বন্ধুরতা'ও অনেক বেশি স্থান দখল করে আছে।তার সবচেয়ে বড় সমস্যা বা গুন যাই বলা হোকনা কেন তা হচ্ছে তার অতীব সরল মন।সিনেমা দেখে কেঁদে ফেলা ছেলে সে।সুতরাং তার মনের সরলতা সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিনা।অত্যন্ত নরম মনের এই ছেলেটাও জীবনে একবার ছ্যাকা খেয়েছে, তাও কিনা আরেকটি ছেলের কাছ থেকেই।ছেলেটার বন্ধু, যে কিনা আমারও বন্ধু তার কাছ থেকে।এত সুন্দর সম্পর্ক বোধহয় আমি আর কখনোই দেখিনি, যেমনটা ওদের মধ্যে ছিল।সে সম্পর্কের ছেদ কার দোষে হয়েছিল তা না জানলেও ছেলেটার চোখের জল এবং বন্ধুত্ব হারানোর বেদনায় কাতরতা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।
ছেলেটির সবচেয়ে বড় গর্ব ছিল তার বড় ভাইকে নিয়ে।শুধু ওর কেন, আমারও মাঝে মাঝে মনে হত , ইশ্ যদি অমন একটি ভাই আমারও থাকত!এমন তুখোড়, চৌকষ, মেধাবী, বিনয়ী, ভদ্র ছেলে জীবনে আর একটি দেখিনি।অসাধারন ছাত্র, চ্যাম্পিয়ন খেলোয়ার।করত আবৃত্তি আর দূর্দান্ত অভিনয়।ছিল বইয়ের পোকা।রূপকথা থেকে শুরু করে জ্ঞানগর্ভ বিজ্ঞানের বই কী না পড়ত সে!আর যেমন ছিল হাতের লেখা তেমন ছিল লেখনীশক্তি।আর এত গুনের পরও এমন বিনয়ী, ভদ্র যে না দেখলে বিশ্বাস হতে চায়না।সত্যিই এত গুনের সমাহার একজন মানুষকে দিয়ে ঈশ্বর সমাজতন্ত্র লংঘন করেছেন এবং পুঁজিবাদকে আশ্রয় করেছেন(আমাদের তখনকার স্বল্পজ্ঞানে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যা জানতাম তার সর্বোচ্চ প্রয়োগই এই)এমন কথা আমরা ঝালমুড়ি খেতে খেতে বা ছাদে বসে গরম সিঙাড়া খেতে খেতে কতবার যে বলেছি আর আক্ষেপ করেছি তার হিসেব নেই।
তো এই ছেলেটিও যখন একদিন একদল কালো পোশাকধারী সরকারী সন্ত্রাসীর তথাকথিত ক্রসফায়ারে বা বলা ভাল ইচ্ছাকৃত গুলিবর্ষণে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরল, তখন আমাদের সহজ সরল ছেলেটার অবস্থা দেখে চোখের জল আটকিয়ে রাখতে পেরেছিল এমন মানুষ একটিও ছিলনা।যেসব মানুষদের আমরা একসময় পাথরের মত শক্ত মন বলে দুষ্টামি করে নানারকম নামকরন করেছিলাম, তাদের হুহু করে কান্না সেদিন আমাকে মানুষ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল।
ছেলেটা দেবতাতূল্য ভাই হারানোর শোকে পাগলপ্রায় হয়ে শয্যা নিলে আমরা আরো বেশি চিন্তিত না হয়ে পারিনি।কী যে হাল হয়েছিল ছেলেটার তা ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা আমার নেই।বিছানায় শুয়ে শুয়ে একদৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত।নিষ্প্রান চোখ দু'টিতে শুধু শূন্য দৃষ্টি ছাড়া আর কিছু ছিলনা।অথচ কয়েকদিন আগেও ঐ দু'টি চোখেই কত স্বপ্ন এবং অনুভূতির রঙিন প্রজাপতি পাখা মেলে উড়ত!কারো সাথে ছেলেটা কথা বলতনা।শুধু নিজে কী যেন চিন্তা করত।কী যে চিন্ত করত তা আমরা আজও জানিনা।আর কখনো বোধহয় জানতে পারবও না।আমরা শুধু কিচ্ছু করতে না পেরে একটি রঙিন জীবনের সাদাকালো'তে রূপান্তর হওয়া দেখছিলাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম।এর বেশি কিছু আমরা কীইবা করতে পারতাম!
অবশেষে এক বসন্তের দিনে ছেলেটা সুস্থ হল।গাছে গাছে নতুন পত্রপল্লব।প্রকৃ্তি সেজেছে নবযৌবনা প্রেমিকার সাজে।আর আমাদের মনে আরেক শিহরন।ছেলেটা সুস্থ হয়েছে।
ছেলেটা বিছানা ছেড়ে মুক্ত হাওয়ায় আসল।আস্তে আস্তে কয়েকদিনের মধ্যে ওর শরীরটা একটু ভালোও হল।সবার সাথে ও আবার কথাও বলছে।কিন্তু আগের সেই ছেলেটার সাথে এর যে বিস্তার ফারাক।কোথায় সেই সহজ সরল চোখ দু'টো, কোথায় সেই শিশুর মত উচ্ছলতা!কিচ্ছু নেই।চোখ দু'টি দেখলে মনে হয় পাথরের তৈ্রি।কেবল মনে হয় কোন এক অজানা ক্ষোভে ফুঁসে রয়েছে ছেলেটা।একটা গুমোট ভাব দখল করে আছে ওর মনোজগতের নির্মল বায়ূমন্ডল, ওর সমস্ত চেতনা।ও সবার সাথে কথা বলে ঠিকই।কিন্তু মনে হয় ও যেন চাকরী করছে।কথা বলাটা যেন ওর একটা চাকরী।কোথায় সেই আন্তরিকতা, কোথায় সেই বন্ধুতা, কোথায় সেই কাছে টেনে নেয়া হাসিটা।কোথাও নেই।কোথাও নেই।প্রাণরসে টইটুম্বুর ছেলেটাকে যন্ত্রমানব হয়ে যেতে দেখে আর কোন কিছুর উপরই আস্থা রাখার ভরসা পাইনা।কত চেষ্টা করেও যে ছেলেটাকে একটু শক্ত করতে পারিনি আজ তার এ কী হাল!সুতরাং যা কখনোই পরিবর্তন হবেনা বলে মনে করতাম তাও পরিবর্তন হয়।ভরসা পাই কীভাবে?
আমরা এক দেবতাতূল্য বড় ভাই হারানোর সাথে সাথে আমাদের ছেলেটাকেও হারালাম।শুধু পার্থক্য এই যে, বড় ভাইয়ের দেহটা পচে গেছে ,আর ছেলেটার দেহটা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার ভিতরের সেই ছেলেটা আজ উধাও।কোথায় গেছে কেউ জানেনা।কেউ না।
এটা একটা গল্প মাত্র।তবে এতে যদি কেউ অন্য কিছু খুঁজে পান তবে সেটা দোষের কিছুনা।আর আমি মনে করি লেখক কী লিখেছেন তার চেয়ে পাঠক কি বুঝেছেন সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তবে অনুরোধ থাকল ধনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে পড়ার।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০০৯ রাত ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


