ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় পর্বটা ছিলো বেশ মজার। নতুন এসেছি কানাডায়। বাংলায় কথা বলার মতো দুইজন মানুষ মানুষকে চিনি - প্রথম জন আমার গিন্নী আর দ্বিতীয় জন আমাদের দুর সম্পর্কের আত্নীয় যিনি আমাদের আগমনের তৃতীয় দিনেই একটা জম্পেশ ঝগড়ার মাধ্যমে সম্পর্কের ইতি ঘটিয়ে দিয়েছেন। তাই বাঙালী ধাঁচের চেহারা দেখলেই কথা বলতে মনটা উসখুস করে। সেই সময়টরন্টোর ঐতিহ্যবাহী ট্রামে (স্ট্রীট কার) একজন বাঙালী চেহারার লোক উঠলে আমার কথা বলার আগ্রহটা প্রবল হয়ে যায় - ভাল করে তাকিয়ে দেখি ভদ্রলোক হাতে একটা পোর্টফলিও ব্যাগ ঝুলিয়ে রেখেছেন - তার গায়ে সাদা রং এর বড় বড় হরফে বাংলায় লেখা "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়"। আগ্রহী হয়ে ভদ্রলোকের কাছাকাছি যেতে গিয়ে উপলদ্ধি করলাম - "রাশ আওয়ার" কাকে বলে। পরের স্টপেজে আরো একদল যাত্রী উঠলে ভদ্রলোক আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কি আর করা!
মানব সম্পদ উন্নয়ন দফতরে জীবিকার খোঁজে ডানডাস স্ট্রীট ইস্ট স্টপে নেমে সেইন্ট ক্লেয়ার যাওয়ার উদ্দেশ্যে সাবওয়ে ধরত এগিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক ভিন্ন এক বগীতে উঠে পড়লো। আফশোস, এবারও হাত ছাড়া হয়ে গেল আমার বাংলা কথা বলার সুযোগ। আসলে এই সুযোগ হারানো বোধ হয় আরো বড় সুযোগের জন্যেই হয়েছিলো।
যখন মানবসম্পদ অফিসের লিফটে উঠছি - দেখলাম ভদ্রলোক আমার পিছনে পিছনে লিফটে উঠলো। আমরা দুইজনই লিফটে যাত্রী। বাটন টেপার সময় খাঁটি বাংলায় বললাম - "কয় তলায় যাবেন?"
ভদ্রলোকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা দেখার মতো ছিলো বটে। উনি বললেন - "আপনি বাঙালী!"
- কেন রে ভাই, আমার বাংলা পরিষ্কার বুঝা যায় না?
ভদ্রলোকের মনে হয় ঘোর কাটে না। জানতে চাইলেন আমি কিভাবে বুঝলাম উনি বাঙালী। বললাম - "ভাইরে আপনে সাইবোর্ড লাগিয়ে ঘুরছেন!"
যাই হোক - পরে বিস্তারিত আলাপে জানলাম ভদ্রলোক সিডনী থেকে এমবিএ করে এসেছেন। উনার স্ত্রী বাংলাদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক - এখনও আসেননি - তবে কয়েক মাসের মধ্যে এসে পড়বেন।
গিন্নীকে পাবলিক ফোনে বিষয়টা জানালাম - গিন্নীর কোমল হৃদয়ে একজন অসহায় মানুষের একাকী থেকে খাওয়া দাওয়ার কষ্টের জন্যে দারুন কষ্ট হলো। অবধারিত ভাবে মধ্যাহ্ন ভোজে ভদ্রলোককে আপ্যায়িত করে গিন্নি মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব করলো আর উনাকে যতদিন ভাবী না আসে ততদিন আমাদের বাসায় খাবারের ফ্রী পাস দিয়ে দিলো।
(২)
কয়েক মাস বেশ গল্পগুজব করে দুপুরে বা রাতে খাবার টেবিল সরগরম করে রেখে ভদ্রলোক হঠাত করে চুপচাপ হয়ে গেল। ফোন করি ফোন ধরে না - ভদ্রলোক মেসেজের অপশন নেয়নি বলে মেসেজও দিতে পারছিনা। বিষয় মনে হয় খুবই জটিল। একদিন সাহস করে উনার এপার্টমেন্টে গিয়ে নক করলাম। দরজা খুলতেই দেখি বেশ কিছু দিন ক্ষৌরকর্ম না করা খোঁচাখোঁচা দাড়ি মুখে এক পাগল দাড়িয়ে আছে।
জানতে চাইলাম - "ভিতরে আসবো?"
মনে হলো অনিচ্ছাসহ অনুমতে পেলাম। ভিতরে গিয়ে বমি এসে যাওয়ার অবস্থা। বদ্ধ ঘরে সিগারেটের আটকানো দূর্গন্ধ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবার আর রান্না ঘরে ৩/৪ দিনের ষ্পর্শহীন বাসনকোশনের দূর্গন্ধ মিলে ঘরটাকে হোমলেস সেল্টারে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ভদ্রলোককে গোসলখানায় পাঠালাম। পরিচ্ছন্ন হয়ে বেড়িয়ে আসতেই নিয়ে গেলাম আমাদের বাসায়। সেখানে গিয়ে ভদ্রলোক কান্নায় ভেঙে পড়লো - জানলাম তার স্ত্রী জানিয়েছে উনি কানাডা আসবেন না - কারন রান্না করে খাওয়া উনার পোষাবে না। জানলাম উনি গত সপ্তাহে ফোনে কথা বলার পর আর ফোন করেননি। কারন - প্রতি মিনিটে কল চার্জ ২.৭৬ ডলার।
জিজ্ঞাসা করলাম - ভাই বৌ আসবে না আর টাকার চিন্তা করে কি করবেন?
উনি রেগে গেলেন - আপনি আমাকে বলছেন এতো ডলার পানিতে ফেলে বৌ এর ঝাগড়া শুনি।
যাই হোক - আমাদের বাসায় ফোন থেকে দীর্ঘক্ষন আলাপ করে একটা মিমাংসা হলে উনি বাসায় ফিরে গেলেন। এই মিমাংসা হতে ৩ দিন সময় লেগেছিলো।
(২)
কয়েক মাস পর উনি আবার লা-খবর হয়ে গেলেন। একদিন ফোন করতেই এক নারী কন্ঠ বলে উঠলো - হ্যালো।
আলাপে জানা গেল গেল উনার স্ত্রী গত ৬ দিন আগে টরন্টোতে এসেছে। আমি কিছুটা বিরক্ত হলে - গিন্নি বললো - "আরে তুমি বুঝবা কি? আমিতো আর তোমাকে ছেড়ে থাকিনি, ওরা বিরহে কাতর হয়ে এখন মিলন উপভোগ করছে।"
সামাজিকতার অংশ হিসাবে এই দম্পত্তিকে আগামী সপ্তাহে দাওয়াত দিতে হবে - গিন্নী ঘোষনা দিলো। আমি বললাম - তথাস্ত, কিন্তু তোমাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ফিরতি দাওয়াতটা না আসে। গিন্নী সেই সমযোতায় যেতে অস্বীকার করার পরও গৃহের শান্তি রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে বাজার করতে গেলাম।
সেই দাওয়াতের পরও আরো কয়েকদিন এই দম্পতি দুপুরে বা রাতের খাবারের আগে ফোন করে "ভাবীর হাতের ডাল বা করলা ভাজির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে গেলে অবধারিত ভাবেই গিন্নি বলতো - "এসে পড়ুন, এক সাথে খাওয়া যাবে।" আমার ভালই লাগতো গল্পগুজব করে খাবার টেবিলে বসে একটা দারুন পরিবেশে খেতে। হয়তো বিরাট পরিবারের থেকে আসার কারনেই এটা হয়ে থাকবে। তবে আশংখায় ভীত হয়ে থাকতাম - কোন একদিন এরা দাওয়াত দিয়ে বসবেই।
(৩)
অবশেষে আসলো সেই ভয়াল দিন। সকাল বেলা ফোন করে গৃহিনীমহল ঠিক করলো - বিকালে ঘরে বানানো পিজ্জা খেতে আমরা সেই বাসায় যাবে। হাতে বানানো বলে একশত ভাগ হালালের নিশ্চয়তার কারনেই হয়তো গিন্নী একবাক্যে রাজী হয়ে গিয়েছিলো। এই এক বাক্যে রাজী হওয়ার অবশ্যই একটু শানে নযুলও আছে।
আমাদের বাসার কাছেই ওন্টারিও সবচেয়ে বড় পিজ্জা চেইন স্টোর পিজ্জা পিজ্জার একটা আউটলেট আছে। যখনই বাসা থেকে বেড় হই - চোখ চলে যায় সেই স্টোরের দিকে। কারন স্টোরে চাকচক্য আর চিজের সুবাস সম্ভবত নেশা তৈরীতে কাজ করে। গিন্নীর সাথে বাইরে যাবার সময় বোধ হয় লোভী দৃস্টিতে দুই একবার তাকিয়েছিলাম - তাই গিন্নী জানতে চেয়েছিলো পিজ্জা খেতে চাই কিনা? কিছুটা স্মার্ট হয়ে বলেছি - ওদের পিজ্জা হালাল না। ভেজি পিজ্জা আছে তবে - একই হাতে বানায় বলে সেগুলোও সন্দেহজনক। তাই হয়তো গিন্নী বেশ কয়েকদিন হালাল পিজ্জা কোথায় পাওয়া যেতে পারে সেই বিষয়ে হালকা আলোচনার চেষ্টা করেছে। এই অবস্থায় হাতে বানানো হালাল পিজ্জার দাওয়াত নিতে কোন দ্বিধা করে নি।
আমিও কিছুটা আগ্রহী হয়েছিলাম বলাই বাহুল্য। এর মধ্যে কয়েকদিন কিনে ভেজি পিজ্জা খেলেও গিন্নির সাথে এর অমৃতসম স্বাদের বিষয়ে সঙ্গত কারনেই আলোচনা করিনি। এবার সুযোগ যখন পাওয়া গেলই - দেখিনা কেমন হয়।
বিকালে সেজেগুজে হালাল পিজ্জা খাবার জন্যে চলে গেলাম।
বাসার ভিতরে ঢুকেই তীব্র একটা পোড়া গন্ধ নাকে লাগলো। এই গন্ধেতো ফায়ার এলার্ম বেজে উঠার কথা। ফায়ার এরার্মের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ভদ্রলোক বিজ্ঞের হাসি দিয়ে বললো - "ব্যাটারী খুলে ফেলেছি।"
"সর্বনাশ!" - বললাম - "আপনাদেরতো ৫০০ ডলার জরিমানা হয়ে যাবে।"
ভদ্রলোক বেশ আত্নবিশ্বাসের সাথে বললো - "কে জানবে, রান্না শেষে লাগিয়ে দেব।"
গিন্নীর দিকে তাকাতেই গিন্নির একটা ভয়ার্ত চেহারা দেখতে পেলাম। বোধ হয় হালাল পিজ্জা রান্নার অংশ হিসাবে ফায়ার এলার্মের ব্যাটারী খুলে ফেলতে হয় ভেবে ভয় পাচ্ছিলো - কারন গিন্নী আবার আইন কানুন বিষয়ে খুবই সতর্ক মানুষ। বেচারা হালাল পিজ্জা রান্নার রেসিপি শিখতে এসে এলার্মের ব্যাটরী খোলার বিষয়টা মেনে নিতে পরছিলো না।
তবে কিছুটা আস্বস্থ হলো যখন শুনলো - প্রথম পিজ্জাটা পুড়ে গেছে বলে গারবেজ করা হয়েছে - এখন দ্বিতীয়টা ওভেনে।
অবশেষে ওভেন থেকে পিজ্জা এসে টেবিলে বসলো। গৃহকর্তা আমাদের দিকে প্লেট আর চামচ আগিয়ে দিচ্ছিলেন - আবারও ধাক্কা খেতে হরো - পিজ্জা খেতে চামচ লাগবে কেন!
দেখলাম বড় একটা অ্যলুমিনিয়ামের বাটিতে হালুয়া মতো কিছু বস্তু - তার উপরিভাগে টমেটো, ব্রকলি আর চিজ শোভা পাচ্ছে। ভদ্রলোক চামচ দিয়ে যখন প্লেটে হালুয়া মতো বস্তুটা পরিবেশন করলেন - তখন দেখা গেল সেই বস্তু থেকে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে - আর পাত্রটার তলানীতে পোড়া লেগে আছে।
আমি অসহায় দৃষ্টিতে গিন্নীর দিকে তাকালাম। গিন্নী এই সময় স্বার্থপরের মতো চোখ ঘুড়িয়ে নিলো। তাইলে কি এই বস্তু এখন আমাকে গলধরন করতে হবে! ভয়ে ভয়ে চামচ হাতে নিলাম - কারন আমার পথে গিন্নীর কাছে অঙ্গীকার করে এসেছি - সৌজন্যতা বজায় রাখবো।
এরই মধ্যে গৃহকর্তী রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন -দামী এপ্রোন গায়ে দেওয়া ভদ্রমহিলাকে দেখতে একজন পেশাধার শেফের মতোই লাগছিলো। তিনি এসেই ব্যাখ্যা দিলেন - "ভাবী, টমাটো থেকে বোধ হয় পানি ছেড়ে দিয়েছে, তাই একটু নরম হয়েছে। তবে খেতে ভাল লাগবে। খান ভাবী, পিজ্জা খান।"
এখানেও ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো - পরবর্তীতে সেই বাসা থেকে আমরা আর কোন দিন দাওয়াত পাইনি।
কোথায় পিজজা! ভাগ্যিস আমাকে বলেনি। আমার মুখে চুলবুল করছে কিছু একটা বলার জন্যে। মনে হয় কথা চেপে যাওয়া জন্যেই হয়তো পেটের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠলো। বললাম - আপনাদের ওয়াশ রুমটা যেন কোন দিকে?
ওয়াশ রুম থেকে ফিরে এসেই বললাম - "ভাই, পিজ্জা দারুন হয়েছে। হালাল বলেই হয়তো একটু নরম আর চামচ দিয়ে খেতে হচ্ছে।"
ভদ্রলোক কি যেন বুঝলো জানি না - তবে মনে হলো বেশ মজা পেয়েছে। হো হো করে হাসতে লাগলো - তার হাসি থামেই না।
তাকিয়ে দেখলাম গিন্নী গৃহকত্রীর সাথে রান্না ঘরে - সম্ভবত পিজ্জার রন্ধন প্রনালী নিয়ে গভীর আলোচনা করছে। মনে মনে বললাম - সদা সত্য কথা বলিবে - আদর্শলিপির এই সামান্য শিক্ষাটাও আমার গিন্নী আজ ভুলে গেল!
(লেখাটা কৈলাসকে উতসর্গ করা হলো।)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



