সাম্প্রতিক ব্লগের সবচেয়ে বেশী আলোচিত দুইটা ঘটনাই আমাকে চরম হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছে। দুঃখিত আর হতাশার সাথে ভাবছি - একটা দেশের স্বাধীনতার পর চার দশকেও সমাজের চালিকা শক্তিগুলোর সঠিক উপাদানগুলো এখনও কাজ করছেনা।
হয়তো দীর্ঘকাল বাইরে থেকেই একটা চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে। হয়তো ইতিবাচক ভাবে যে কোন সমস্যার সমাধান দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।
আগে দুইটা ঘটনা বলি - পরে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিষয়গুলো আলাপ করা যাবে।
টরন্টো শহরের যে এলাকায় আমরা থাকি - সেইটা বেশ জমজমাট এলাকা। ২৪ ঘন্টাই মানুষ আর যানবাহনের কারনে সচল থাকে। এই এলাকায় যথারীতি সব রকমের দোকানপাট আছে - যার মধ্যে বার আর এডাল্ট ভিডিওর দোকানও অন্যতম। একদিন একদল লোক এলো। এরা এলাকায় একটা স্ট্রিপ - পাব স্থাপন করবে। দোকান ভাড়া নিয়ে সাইনবোর্ডও লাগিয়ে লাইসেন্সের জন্যে আবেদনও করলো। লাইসেন্স দেবার আগে সিটি থেকে তদন্ত দল এলে এলাকাবাসী পাবের বিষয়ে নেতিবাচক মতামত জানালো। পরে সিটি কাউন্সিলের ডাকে টাউন হল বিতর্ক হলো। পাবের পক্ষে বিপক্ষে বিতর্কের পর ভোটাভোটি হলো। "না" ভোট জয়ী হওয়ায় পাবের অনুমোদন হলো না।
এখানে পাঠকদের একটা বিষয় লক্ষ্য করতে বলবো - গনতান্ত্রিক সমাজে সকল সিদ্ধান্তে কিভাবে নেওয়া হয় তার একটা উদাহরন হলো এইটা। যে কোন এলাকায় নতুন কোন ধরনের স্থাপনা তৈরী আগের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলেটি স্টাডি)এর সময় গন-শুনানী (পাবলিক হেয়ারিং) একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন বাস সার্ভিস থেকে শুরু করে ম্যাগডোনালডসের ড্রাইভ ওয়ের অনুমোদনের আগে সিটি থেকে গন-শুনানীর অনুষ্ঠান প্রকৃত পক্ষে জনমতের প্রতি অনুগত একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থারই নমুনা।
দ্বিতীয় ঘটনাটা দেখেছিলাম নেদারল্যান্ডসে। সেখানে সরকার পূর্ব- পশ্চিমে একটা রেললাইন স্থাপন করে ভাড়া ও সময় কমিয়ে একটা এলাকার মানুষের দাবী পুরনের পরিকল্পনা করছিলো। কিন্তু যেহেতু রেল লাইনটি যেতে হবে একটা বনের ভিতর দিয়ে এবং বনের কিছু অংশ ধ্বংশ হবে - তাই পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে গনশুনানী ও ভোট হয়। ভোটে পরিবেশবাদীরা জয়ী হয়। এলাকাবাসী দশ বছরের সারচার্জ দিয়ে রেললাইনের একটা অংশ মাটির নীচ দিয়ে তৈরী করে বন রক্ষায় রাজী হয়।
এখানেও দেখি - সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় কিভাবে জনগনকে সম্পৃক্ত করে আর তাদের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়।
এমনটাই কি হওয়া উচিত নয়, একটা গনতান্ত্রিক স্বাধীন সমাজে। সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে - সবার মতামত শুনা হবে। কাউকে ছোট বা কম গুরুত্বপূর্ন বিবেচনা করে তার উপর কোন মতামত চাপানো হবে না।
এতোক্ষনে হয়তো অনেকে বুঝে গেছেন আমি কেন গল্প দুটো বলার চেষ্টা করেছি।
লালন শাহের মুর্তি / স্থাপত্য বসানো আর না বসানো বিতর্কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ - মুলত ঢাকা শহর সরগরম হয়ে গেছে। মনে হয় বিষয়টা বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই - এখন মুখোমুখি দুই দল। সবাই সবার মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠতর ধরে নিয়ে তা প্রতিষ্ঠায় জানবাজি যুদ্ধের প্রস্তৃতি নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো - একটা দেশের মানুষ এতো দ্রুত কেন বিভক্ত হয়ে মুখোমুখি হয়ে যায়? পৃথিবীর সকল দেশে - সকল সমাজেই মতভিন্নতা থাকে, কিন্তু সবাই কি মতাদর্শের বিরোধের এমন যুদ্ধংদেহী হয়? অবশ্যই কেউ কেউ হয় - যেমন পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নীর মমভেদের মসজিদের বোমাবাজি হয়। কিন্তু অনেকে যুদ্ধংদেহী না হয়ে অন্যপথে সমাধান করে। যারা যুদ্ধংদেহী হয় না - তারা কিভাবে তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করে?
আমরা কি পারি না আমাদের দৃস্টিকে আরো প্রসারিত করে বিশ্বের সকল বিবাদ বিসংবাদ থেকে শিক্ষা নিতে?
লালন মুর্তি বা স্থাপত্য ইস্যুতে বিবদান দুইপক্ষকে আমরা ভাল ভাবে বুঝতে পারি। একদল ধর্মের নামে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমেছে - ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিষ্টার লক্ষ্য ছাড়া তেমন গুরুত্বপূর্ন উদ্দেশ্য যে এদের নেই- এইটা নিম্চিত। অন্য পক্ষ প্রতিপক্ষের কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়ার ফলাফল হিসাবে নিজেদের এজেন্ডা প্রতিষ্টায় ব্রতী হয়েছে।
এরচেয়ে অনেক বড় ইস্যুতে দেখি আমাদের বিবেক নিরব - বিদেশী মেহমানের চোখে চকচকে শহর দেখানোর জন্যে যখন একজন কর্মকর্তার মনে হয় শহরটাকে বস্তিমুক্ত করা জরুরী - যখন বুলডজারগুলো বস্তির ঘরগুলোকে মাটিতে মিশায় - আমরা টিভিতে দেখি আর কোক খাই। যখন একজন মানুষকে বিনাবিচারে হত্যার পর মিথ্যা বানানো গল্পটা টিভির খবর পাঠিকা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পড়ে যায় - আমাদের বিবেক তখনও ঘুমায় - তাই যদি কেউ বলে লালনের স্থাপত্য ভাঙ্গর কারনে জাতির বিবেক চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত - কথাটা মেনে নিতে কষ্ট হবে।
প্রকৃতপক্ষে মুর্তি ইস্যুতে মধ্যবিত্তের খন্ডকালীন বিপ্লবীপনা আর কাঠমোল্লাদের রাজনীতির লাইম লাইটে আসার প্রচেষ্টা কোনটাই তেমন গুরুত্বপূর্ন নয় আমার কাছে - কারন লালনের স্থাপত্য স্থাপন বা না স্থাপনে লালনের বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে লালনের অবস্থানের হেরফের হবে না - তেমনি সেখানে হজ্জ মিনার বানালে পুরো বাংলাদেশের মানুষও বেহেস্থের দিকে এক ধাপ এগিএ যাবে না। এখানে যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ন তা হলো এই বিবাদের শুরুটা হলো যে কারনে - সেই কারনটা।
যারা এই স্থাপত্য নির্মানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন - এরা কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমরা জানি না - এর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক লাভের কোন অংশগুলো বিশেষভাবে বিবেচিত হয়েছে - আমরা জানি না। এই বিষয়ে কোন সংস্থা জড়িত - কোন প্রক্রিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগনের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে - আমাদের জানা নেই। এখনইবা এরা কেন কচ্ছপের মতো মাথা ভিতরে লুকিয়ে রেখে পুলিশের হাতে সমাধানটার ভার দিয়েছে - তাও আমাদের অজানা।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ন স্থানে একটা স্থাপনা তৈরীর বিষয়ে যথেষ্ঠ স্বচ্ছ আর গনতান্ত্রিক ভাবে সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বিষয়টা হঠাৎ জেগে উঠা চরের মতো অব্ষা সৃস্টি হয়েছে হয়েছে - এখন দুই পক্ষ সেই চর দখলের যুদ্ধে নেমেছে।
রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করে নাগরিকদের পরষ্পরের মুখোমুখি দাড় করিয়ে যারা কাছিমের মতো মুখ লুকায় তাদের বিষয়েই আমার প্রশ্নটা রেখে গেলাম - এরা কারা? সরকার আসে সরকার যায় - কিন্তু আইয়ুব খানের যুগের মতো এখনও এরা নিজেকে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ভাবে - তাদের একটা সিদ্ধান্তে লাখো মানুষ বসতশূন্য হয় আবার বিপদ দেখলে এরা উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকে।
(২)
দ্বিতীয় যে ঘটনাটা ভীষন ভাবে পীড়িত করেছে - তা হলো জাহাঙ্গীর নগরে ছাত্র কর্তৃক শিক্ষককে জুতা পেটা করা। রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠা অপরাধ অস্বাভাবিক নয় - যেহেতু শিক্ষকের কাছে আমাদের নৈতিক চাহিদাটা অনেক বেশী - তাই সকলেই এই ধরনের অভিযোগ শুনে আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেন। দশজন অপরাধীর জন্যে যে আইন - শিক্ষক অপরাধীর জন্যে তো একই আইন - সুতরাং আমাদের কি আইনের প্রতি আস্থা থাকার কথা ছিলো না? কেন আইনকে এখানে সবার উপরে বসানো হয়নি - কেন অভিযোগকারীরাই বিচারকের ভুমিকায় নেমে গেল?
একদল শিক্ষকের সমন্বয়ে তৈরী তদন্ত কমিটির প্রতি অভিযোগকারীদের আস্থা নেই। আস্থা না হয়তো সেখানেও যে বিষয়গুলো সবচেয়ে কম চর্চা হয়েছে - তা হলো সচ্ছতা আর জবাবহীতা। শিক্ষকগন তাদের দলবাজি আর গোষ্ঠীবাজি করে নিজেদের এতো নীচে নামিয়েছেন যে - তাদের কোন সিদ্ধান্তই সাধারন ছাত্রদের আস্থায় আসছে না। এই পরিস্থিতিটা ভয়াবহ। আমরা প্রকৃত পক্ষে অভিযুক্ত শিক্ষক দোষী কিনা সেই বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে পারছি না। এখানে কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা বলছে - তা নির্ধারনের মতো যথেষ্ঠ সচ্ছ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। তারমধ্যে আছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারীদের সুযোগ সন্ধানের প্রচেষ্টা। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবসময় কেন বিভিন্ন ইস্যুতে সমস্যা তৈরী হয় - কেন সেই সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় নি বা হতে দেওয়া হয় না - এর পিছনে শিক্ষাকে পন্য হিসাবে ব্যবসা করার গোষ্ঠীর ভুমিকা কি, এগুলোও আমাদের ভাবায়।
শেষ কথা হলো - একটা সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় মতপার্থক্য মিমাংসার সবচেয়ে সহজ পথ হলো গনতন্ত্রের চর্চা - গনতন্ত্রের মানে শুধু মাত্র ভোটাভুটিতে সীমাবদ্ধ না রেখে - সমাজের সর্বত্র সচ্ছতা, জবাবদিহীতা আর জনমতের প্রতিফলন জরুরী। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় জেকে বসা আমলাতান্ত্রিক ধারার অবসান ঘটাতে হবে। এখানে আমলাতন্ত্র যে শুধু সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা না - বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক - বা সমাজের যে কোন প্রতিষ্ঠান - যেখানে সামান্য সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা আছে তাদেরও সংক্রামিত করেছে।
এখনও বাংলাদেশে এমন কোন প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়নি যা সচ্ছতা আর জবাবদিহীতার আলোকে তাদের কর্মপরিচালনা করে - এই ভাবনা থেকেই সবচেয়ে বেশী হতাশ। কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনের আগে যথেষ্ঠ সচ্ছতার সাথে জনমানুষকে সম্পৃক্ত করার চর্চাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। না হলে সর্বত্র চরদখলের যে সংস্কৃতি চলছে - তা বিশ্বাবিদ্যালয়ে মাদ্রাসা ছাত্রদের ভাংচুর থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বলয় পর্যণ্ত যা বিস্তৃত তা কোন ভাবেই একটা গনআন্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে সহায়ক হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০০৮ ভোর ৬:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


