বাংলাদেশের স্বপ্লকালীন চাকুরী জীবনে এক বস পেয়েছিলাম - উনি ছিলেন অফিসের বড়কর্তা আর আমি নবিস। উনার অবসরের ভাবনার বিপরীতে আমার ছিল স্বপপুরনের শুরু। যাই হোক, এই পর্যন্ত যত লোকের অধীনে কাজ করেছি - তার মধ্যে উনি ছিলেন সবচেয়ে চৌকশ। উনি ব্যবহারে ছিলেন রসিক, বুদ্ধিমান আর প্রচন্ড আধুনিক মানুষ। অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অসামাজিক ও ধর্মীয় ভাবে গোড়া।
ভদ্রলোকের সাথে চাকুরী করা কালীন প্রচুর জ্ঞানার্জন করেছি - তারমধ্যে কিভাবে বদনার ভিতরে পলিথিনে করে ঘুষের টাকা লেনদেন হতো তার থেকে শুরু করে মন্ত্রনালয়ের মিটিং এ মন্ত্রীদের কথার মারপ্যাচে বোকা বানানো পর্যন্ত। আমি মোটামুটি মেন্টর হিসাবে উনাকে অনুসরন করা শুরু করেছিলাম।
কিন্তু উনার কিছু কিছু বিষয় আমার মোটেও ভাল লাগতো না। তাদের মধ্যে একটা ছিল - উনার অতিরিক্ত পিয়ন-ড্রাইভার নির্ভরতা। উনার অফিসে তিন জন পিয়ন, বাসার কাজে একজন আর একজন থাকতো বাজার হাটের দিকে দৌড়ানো অবস্থায়। আর ড্রাইভার ছিলো তিনজন - যদিও গাড়ী ছিলো একটাই। উনি টেবিলের উপর একটা পিন সরানোর জন্যেও বেল চেপে পিওনকে ডাকতে দেখছি।
ভদ্রলোক বছরের একটা উল্লখযোগ্য সময় ইউরোপ - আমেরিকা-জাপান ঘুরে বেড়াতেন। একদিন উনার কাছ থেকেই শুনলাম - উনি মাস্টার্স করেছেন ক্যালিফোর্নিয়াতে। দেখে শুনে আরো বেশী অবাক হতাম - একজন লোক এতো বিদেশ ভ্রমন করে আর দেশে এলে পিয়নদের দিয়ে সব কাজ করায়। কেন?
একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম - স্যার, আপনার এতো পিয়ন নির্ভরতার কারন কি? বিদেশে থাকার সময় কিভাবে নিজের কাজ করতেন?
উনি বললেন - দেখো, যদি আমি বিদেশে না থাকতাম, তাইলে হয়তো পিয়ন দিয়ে কাজ করানো যে মজা - তা হয়তো বুঝতামই না। একবার যখন মজাটা পেয়েছি - তা আরো বেশী বেশী ব্যবহার শুরু করেছি। এখন মনে হয় আমি আসক্ত হয়ে গেছি।
(২)
এতো বছর আজ কেন বসের কথা মনে পড়লো, সেই কথাটাই বলছি। তবে আগে একটু সূচনা দেওয়াটা মনে হয় খারাপ হবে না।
বাংলা ব্লগের পথিকৃত সামহোয়ার ইনের চড়াই উৎরাই এর অনেকটাই ছিলো 'মডারেশন' বিষয়ে। কিভাবে মডারেশন হবে, কতটা হবে, কি কি মডারেশনের আওতায় থাকবে - ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর জ্ঞনগর্ভ আলোচনা শুনেছি। কেউ কেউ মডারেশন বলতে শুধু বিভিন্ন শব্দের অপব্যহার - বা গালাগালি থেকে মুক্তি বুঝিয়েছেন। কেউ বা ব্লগের বিপরীতে অন্য ব্লগের ষড়যন্ত্র দেখেছে - আর মডারেটরদের গালাগালি করেছেন। ইতিহাস অনেক বড়। সংক্ষেপে বলা যায় - মডারেশনের মতো একটা ব্যাপক বিষয - যার কোন সুস্পষ্ঠ সংজ্ঞা নেই - তাকে যার ইচ্ছা যযেমন তেমন ভাবেই ব্যবহার করা যায় - সেই মডারেশনের নিয়ে জ্ঞানী আলোচনা পড়ে মনে হতো - প্রচলিত মিডিয়ার কর্পোরেটের ছায়া থেকে বেড়িয়ে বিকল্প মিডিয়া হিসাবে বিশ্বে ব্লগের যে অগ্রযাত্রা তার মুল ধারা বিষয়ে খুবই কম জ্ঞানই রাখে এই সকল জ্ঞানী লোকজন।
যাই হোক - এক পর্যায়ে মডারেশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে একদল মেধাবী লেখক আরেকটা ব্লগ তৈরী করে চলে গেলেন। কিন্তু হায় - তাকে কি ব্লগ বলা যায় - সেখানে প্রবেশের আগেই আপনার পুরো ঠিকুজী জমা দিতে হবে। তবে উনাদের ধন্যবাদই দিতে হয় - উনারা সেইটাকে ব্লগ না বলে "অনলাইন রাইটার্স কমিউনিটি" নামে ডাকছেন - যা আসলেই ঠিক। এই পরিচয়টা আসলেই ঠিক। বিকল্প মিডিয়া হিসাবে গড়ে উঠা ব্লগিং এর কোন ধরনের চিহ্ন নেই সেখানে।
যখন সেই ববলগের জন্ম হলো - তখন একবার বসে কথা মনে হয়েছিলো। বসের মতো সেই ব্লগের উদ্যেগতারাও সামহোয়ার ইনে মডারেশন বিরোধী বিবিধ কর্মকান্ডের অংশ নিয়ে মডারেশনের মজাটা বুঝেই হয়তো নিজেদের ব্লগের জন্যে কোন জানালা রাখেন - শুধু একটা দরজা রেখেছেন - মেটাল ডিটেক্টর সহ।
এবার নতুন আরেকটা ব্লগের জন্ম এবং তার মডারেটরের কর্মকান্ডের সাথে চারপাতার নিচ্ছিদ্র নীতিমালা দেখে আবারও আমার বসের কথা মনে পড়লো। যদি বসকে কোথাও কয়েকদিন ব্লগানোর সুযোগ দিয়ে নতুন ব্লগের মডারেটর বানানো হতো - উনিও হয়তো এমন নিচ্ছিদ্র নীতিমালা বানাতেন যাতে বশংবদ আর মেরুদন্ডহীন যশলোভী কিছু ব্লগার ছাড়া কোন আত্নসন্মান সম্পন্ন মানুষ সেখানে থাকতো না। কোন কর্পোরেট মানসকিতায় চালিত ব্লগকে কি প্রকৃত অর্থে বিকল্প মিডিয়অ হিসাবে ব্লগ বলা যাবে কি না, সেইটাই ভাবতে হবে। কোন পত্রিকা কোন ভাবেই চাইবে না তার উপর আশির্বাদ বর্ষনকারী গোস্ঠীর জন্যে অসস্থিকর কোন বক্তব্য - তা যতই সত্য হোক - তা বিনে পয়সায় ব্লগানো কোন অর্বাচীন ব্লগারের কাছ থেকে শুনতে। তাই তাদের দরকার একজন প্রকৃত বশংবদ মডারেটর যিনি কিনা একদল তাবেদার ব্লগার শ্রেনী তৈরী করতে পারবে। সেই ক্ষেত্রে আমার বসের মতো একজন বিচক্ষন ও চৌকশ মানুষ উপযুক্ত হতো।
বলাই বাহুল্য - অন্ধকার আর পরাজিত গোস্ঠীর জন্যে যত কঠিন আইন-কানুন তৈরী করে নিরাপদ স্থান তৈরী হবে - তারা ততই নিরাপদ বোধ করবে। সেই নিরাপত্তার দায়িত্বে আমার বস মনে হয় খুবই ভাল করতো। যেখানে পিয়নবিহীন জীবন থেকে উনি পিয়ন রাখার মজাটা বুঝেছিলেন - তেমনি মডারেশন নিয়ে হৈ চৈ করে উনিও নিশ্চয় মডারেশন কাকাহে বলে - কত প্রকার ও কি কি - তার সুস্পষ্ট উদারহন তৈরী করতেন।
তবে একটা কথা কি - পৃথীবিটা কিন্তু বিশাল -তেমনি বিশাল হলো ইন্টারনেট জগত। যাদের মুক্তমনে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশকে যশের লোভের মেরুদন্ড হারানোর উপর প্রাধান্য দিতে চান - তাদের জন্যে ইতোমধ্যে তৈরী হয়েছে নতুন নতুন জগত - যেখানে একজন মানুষ নিজের মর্যাদাকে সামান্য খাটো না করেই স্বাধীন ভাবে মতামত ব্যক্ত করতে পারবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

