একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে সংসদে যাবে পরাজিত যুদ্ধারাধী - এইটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো - বিবাদমান রাজনৈতিক শিবিরের পরষ্পরকে ঘায়েল করার কৌশল হিসাবে যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচিত করার একটা অবস্থা বিরাজমান।
আজ পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে দেখা যায়, ২১ যুদ্ধাপরাধী জন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছে। তাদের দলীয় ও জোটের হিসাবে বিভাজন হলো:
১) ১৬ জন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।
২) বিএনপির একজন।
৩) দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির আরও দুজন।
৪) জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে মনোনয়ন পেয়েছেন দুজন।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের নাম আর সংক্ষিপ্ত কুর্কীতির বিবরন দেওয়া হলো: -
জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী প্রার্থীরাঃ
পাবনা-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী।
নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিল (সূত্রঃ এ এস এম সামছুল আরেফিনের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪২৭)। ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ "বদর দিবসঃ পাকিস্তান ও আলবদর" শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয়তে নিজামী লিখেছিলেন "...শুধু পাকিস্তান রক্ষার আত্মরক্ষামূলক প্রচেষ্টা চালিয়েই এ পাকিস্তানকে রক্ষা করা যাবে না।?"
ফরিদপুর-৩: জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিল।
১৯৭১ সালের ১৭ অক্টোবর রংপুরে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় তিনি আলবদর বাহিনী গড়ে তুলতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন (সূত্রঃ ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ই¯ট পাকিস্তান)।
শেরপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান।
১৯৭১ সালের ১৬ আগ¯ট দৈনিক সংগ্রাম-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ময়মনসিংহ জেলা আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
রংপুর-২ আসনের প্রার্থী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এ টি এম আজহারুল ইসলাম
আজহার আলবদর বাহিনীর রাজশাহী জেলা শাখার প্রধান ছিল। ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ই¯ট পাকিস্তানে এ টি এম আজহার মুক্তিযোদ্ধাদের শায়েস্তা করতে তৎপর ছিলেন বলে উল্লেখ আছে।
পাবনা-৫ আসনে চার দলের প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ সুবহান
সুবহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনার শান্তি কমিটির প্রধান ছিল (মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪১১)। পাবনার একাধিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জানান, একাত্তরের জুন মাসে মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মাওলানা কাসিমউদ্দিনকে হত্যা করে শান্তি কমিটি। তাঁরা জানান, স্বাধীনতার ৩৫ বছর পরও মাওলানা সুবহানকে তাঁরা ভয় করেন।
ঢাকা ৮ আসনে মীর কাসেম আলী
মীর কাসেম আলী চট্টগ্রাম জেলা আলবদর বাহিনীর প্রধান রাজাকার বাহিনীর প্রধান ও আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিল। ২ আগ¯ষ্ট চট্টগ্রামের মুসলিম হলে এক সমাবেশে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ করে বএ, "গ্রামগঞ্জের প্রতিটি এলাকায় খুঁজে খুঁজে শত্রুর শেষচিহপ্ত মুছে ফেলতে হবে (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম)।"
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী (নির্বাহী কমিটির সদস্য) দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধথাপরাধী হিসাবে একজন চিহ্নিত ব্যক্তি।
গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজাকার বাহিনীর সদস্য আবু সালেহ মোহাম¥দ আবদুল আজিজ মিয়া
আজিজ রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লায়েক আলী খান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের মাঠের হাটসংলগ্ন সেতু পাহারা দেওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা মনে করে একটি ঘোড়াকে গুলি করে মেরে ফেলেন। এর পর থেকে এলাকায় তাঁর নাম হয় "ঘোড়া মারা আজিজ"।
সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মোহাম¥দ আবদুল খালেক
খালেক নৃসংশতার জন্য "জল্লাদ খালেক" বলে পরিচিত ছিল বলে সাতক্ষীরার জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক এনামুল হক বিশ্বাস জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এম রিয়াসত আলী বিশ্বাস
রিয়াসত আলী ছিলআশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের শান্তি কমিটির সেক্রেটারি। আশাশুনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মতিয়ার রহমান বলেন, '"একাত্তরের আগ¯ষ্ট মাসে তাঁকে ধরে আনেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু রোজার মাস হওয়ায় আমি তাঁকে হত্যা না করে বাসায় দিয়ে এসেছিলাম। তখন সে কথা দিয়েছিল আর রাজাকার থাকবে না; কিন্তু ওই কথা রাখেনি।?
খুলনা-৬ আসনে শাহ্ মোহাম¥দ রুহুল কুদ্দুস
শাহ্ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক (মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪২৮) ছিল।
ঠাকুরগাঁও-২ ঠাকুরগাঁওয়ের আলবদর বাহিনীর সদস্য মাওলানা আবদুল হাকিম।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও
হাবিবুর রহমানও শান্তি কমিটির সদস্য ছিল বলে চুয়াডাঙ্গার গেরিলা কমান্ডার আবদুল হান্নানের স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া বইয়ের ১৯১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।
সিলেট-৫ আসনে ফরিদউদ্দিন চৌধুরী
সিলেট বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল প্রথম আলোকে জানান, জামায়াতের প্রার্থী ফরিদউদ্দিন চৌধুরী আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন।
সিলেট-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হাবীবুর রহমান
১৯৭১ এ জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ করত।
কক্সবাজার-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন ও আলবদরের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন (সূত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়, পৃ-১৪৬)।
বিএনপির তিনজনঃ
চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী নতুন চন্দ্র সিংহ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত¦ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সেদিন নতুন চন্দ্রকে তাঁর বাড়ি কুণ্ডেশ্বরী ভবন থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসেন সাকা চৌধুরী। এরপর পাকিস্তান বাহিনীর একজন মেজর তাঁকে গুলি করেন। পরে সাকা চৌধুরী তাঁকে তিনটি গুলি করেন। একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় বইয়ে এ তথ্য রয়েছে।
জয়পুরহাট-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স¦তন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আবদুল আলীম।
তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের সারিতে দাঁড় করিয়ে নিজের হাতে গুলি করে মারার অভিযোগ আছে। সে ছিল শান্তি কমিটির অন্যতম সংগঠক ও জয়পুরহাট মহকুমার চেয়ারম্যান ( সূত্রঃ একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়)। গত ৪ নভেম্বর সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর তালিকাতেও আবদুল আলীমের নাম আছে।
ভোলা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স¦তন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মোশারেফ হোসেন শাজাহান।
তিনি '৭০-এ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েও মুক্তিযুদ্ধের সময় দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
মহাজোটের দুজন:
পিরোজপুর-৩ থেকে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় পার্টির আবদুল জব্বার।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মঠবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মঠবাড়িয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এ ইউ এম নাছিরউদ্দিন। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর পর জব্বার এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় পার্টির মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে জয়ী হন। কেশবপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, "সাখাওয়াত হোসেন একজন কুখ্যাত রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কেশবপুরের মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, লুট করেছে।"
নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে জাতীয় পার্টি ও মহাজোটের প্রার্থী ফারুক কাদের
ফারুক কাদেরের প্রয়াত বাবা মুসলিম লীগের নেতা কাজী কাদের স্বাধীনতাবিরোধীদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় কাজী কাদেরের নাম আছে। তার স্বাধীনতা বিরোধী ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
উপরের তালিকায় যারা আছে এরা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধঅ, স্বাধীনতা বিরোধী। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো জনসচেতনা তৈর করা - একজন স্বাধীনতা বিরোধী যাতে বিজয়ের মাসে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে লাখো শহীদের রক্তে বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থহীন না করে ফেলে তা লক্ষ্য রাখা।
দল মত নির্বিশেষে ক্ষদ্রতা আর বিভেদ ভুলে আসুন এবারের বিজায়ের মাসকে নতুন ভাবে মহিমান্বিত করি। একটা স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারমুক্ত সংসদ গঠন করি।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: তথ্যসূত্র দৈনিক প্রথম আলো ডিসেম্বর ০৬, ২০০৮)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

