ঝড় শেষ হবার সাথে সাথেই নেমে স্নো পরিষ্কারের গাড়ীগুলো পরিকল্পনা মতো নেমে পড়েছে। যখন কাজ থেকে বাসায় ফিরছিলাম - তখন মনেই হয়নি আজ দিনভর রাস্তায় ছয় ইঞ্চি বরফ জমে ছিলো।
একটা চরম প্রতিকুল আবাহওয়ায় মানুষের এতো সুশৃংখল উন্নত জীবন দেখলে মাঝে মধ্যে খুব খারাপ লাগে। আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ - যেখানে একটা চমৎকার আবাহাওয়া থাকার পরও কেন আমাদের এতো সমস্যা। যেখানে মাত্র কয়েকটা টিন দিয়ে একটা ঘর তৈরী করে মানুষ বাস করতে পারে - সেই জন্যে কানাডার মতো দেশে শীত প্রতিরোধক ঘরবাড়ী বানিয়েও সেখানে ভিতরের উত্তাপ নিশ্চিত করতে হয়।
কানাডা আজকের এই অবস্থায় একদিনে আসেনি। ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়েছে। সামাজিক ভাবে কানাডা চরম উদারপন্থী নীতিমালার মাঝেও এরা মানবাধিকারের বিষয়ে কখনও সামান্য বিচ্যুতি দেখায় না। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের মতো মানবাধিকার লংঘনকারীর বিরুদ্ধে কানাডার চরম পন্থা অবলম্বন করে।
এই বছরের শুরুতে কানাডায় পরিচয় গোপন করে বসবাসকারী একজনকে ধরে ইটালীতে বিচারে জন্যে পাঠিয়েছে। আজ হেগের আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে রুয়ান্ডার গনহত্যার সহযোগী একজনকে পাঠানো হয়েছে - যে কানাডার উচ্চপর্যায়ের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে একটা কঠিন অবস্থান তৈরী করেছিলো। কিন্তু যখনই কারো নামে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিস্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সরকার সক্রিয় হয়ে বিচারের জন্যে পাঠিয়ে দেয়।
অনেকেই প্রশ্ন তোলে - আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবী করে দেশকে বিভক্ত করছি - উন্নয়নের বাঁধা তৈরী করছি। আসলে বিষয়টা হয় উল্টো। যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্যেই দেশকে বিভক্ত করছে। তা না হলে ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়ে যে কুৎসিত দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভুল প্রমান করলো - যুদ্ধাপরাধী আল বদর প্রধান নিজামী সেই অর্ধশত বছরের পুরানো আর জঘন্য দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করে আমাদের সকল অর্জনকে অস্বীকার করছে। নিজামীরা পরাজিত - এদের পরাজিত করার জন্যে ৩০ লক্ষ মানুষে জীবন দিয়েছে - আর সম্ভ্রম হারিয়েছে ২ লক্ষ মা-বোন। নিজামীর এই ধৃষ্টতা কি আমাদের লজ্জিত করে না?
উন্নত একটা দেশের জন্যে দরকার একদল প্রগতিশীল মানুষের নেতৃত্ব। সেই নেতৃত্বকে সামনে আসতে দিচ্ছে না পেট্রোডলারের শক্তিতে শক্তিমান যুদ্ধাপরাধীরা। এরা ৭১ এ একবার অপরাধ করেছে আমাদের ভাইদের হত্যা করে - বোনদের পাকি হায়েনার ভোগের সামগ্রী বানিয়ে - আমাদের মেধাবী মানুষের হত্যা করে। এখন এরা দ্বিতীয় অপরাধ করে ধর্মের নামে সমাজ বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। সহজ সরল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের নামে প্লট বরাদ্ধ আর ছেলে মেয়ের উন্নত জীবন নিশ্চিত করে। অন্যদিকে একটা উন্নত জাতির জন্যে একজন উন্নত "মা" নিম্চিত করার জন্যে প্রনীত নারী উন্নয়নের বিরুদ্ধে এরা সোচ্চার। মধ্যযুগের দিকে জাতিকে টানতে থাকা এই শক্তির অস্তিত্বই বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাঁধা। বিষয়টা আরো সহজ করে বললে বলা যায় - ত্রিশ লক্ষ মানুষের হত্যার সাথে জড়িত থাকা অপরাধীকে যে রাষ্ট্র বিচারের সন্মুখে আনতে ব্যর্থ - সেই রাষ্ট্রের আইনের শাসনের কথা বলা হাস্যকর। আর উন্নয়নের প্রথম শর্তই হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
তাই স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবীতে বিবেকবান মানুষরা সোচ্চার। এই দাবী নায্য দাবী। নায্য দাবী থেকে সরে যাওয়াই হলো অন্যায়কে মাথা পেতে নেওয়া। আজ হয়তো অনেকের কাছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়টা অবাস্তব দাবী মনে হতে পারে। যারা দূর্বল চিত্তের মানুষ - যারা দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার বাইরে চিন্তা করতে ব্যর্থ - তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যে দাবী নায্য দাবী - সেই দাবী এক সময় জোরালো হবে। প্রথম একজন দুইজন করেই ধীরে ধীরে একটা মিছিল শুরু হয়। সেই মিছিলের শ্লোগানগুলো একসময় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে।
আমরা সেইদিনের অপেক্ষায় আছি - যেদিন যুদ্ধাপরাধী বিরোধী মিছিলে শামিল না হতে পেরে মানুষ লজ্জিত হবে - দুঃখিত হবে - যেমনটা অনেকে দুঃখিত হয় মুক্তিযুদ্ধে না যেতে পেরে। সেইদিন খুব একটা দুরে নেই - যেদিন যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবীর মিছিলটাই হবে বাংলাদেশের মানুষের অহংকার।
সেই অহংকারের মিছিলে যোগ দিয়েছে সামহোয়ার ইন। আজ সত্যই ভাল লাগছে - আমিও এই ব্লগিং কমিউনিটির একজন সদস্য - যারা বাংলাদেশের জন্মের ঋন শোধ করার পথে একটা ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে।
ধন্যবাদ সামহোয়ার ইন কর্তৃপক্ষ - আপনাদের জন্যে রইল আন্তরিক অভিনন্দন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

