বেশ কয়েকদিন যাবত ভাবছি দেশে যাবে। শেষ বার গিয়েছিলাম ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর থেকে পরিকল্পনা করছি। আসলে দেশে যাবার মুল আনন্দটা বোধ হয় প্রস্তুতিতেই। যাই হোক - দেশে যাবো ভাবলেই দেশের অনেক ছবি - অনেক কথা - অনেক ঘটনা মনে পড়ে যায়। সেই ধরনের কিছু ঘটনা ইদানিং খুবই মনে পড়ছে। তারই কয়েকটা বলবো আজ।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশে গিয়েছিলাম। সেই সময়কার ঘটনা এইটা। থাকি পুরানা পল্টনের ছোট ভাইএর বাসায়। জেট ল্যাগের কারনে ঘুম ভেঙ্গে গেছে ভোর চারটা- সাড়ে চারটায়। কিছুক্ষন শুয়ে থেকে ভাবলাম - ভোর বেলার ঢাকা শহরটা দেখে আসা যাক আর এই সুযোগে হলে পরটা আর ভাজি খেয়ে আসা যাবে গরম গরম - ভাবতে ভাবতে একাই বেড়িয়ে গেলাম।
রাস্তায় প্রায় ফাঁকা। একটা দুইটা রিক্সা এদিকে ওদিকে যাচ্ছে। কয়েকজন ঝাড়ুদার রাস্তায় ঝাড়ু দিচ্ছে। শব্জিওয়ালার গলিতে ঢুকছে। পত্রিকার হকাররা সবেমাত্র পত্রিকা নিয়ে সাইকেলে করে আসছে। হেটে হেটে যখন বাইতুল মোকাররমের পশ্চিমদিকটায় এসেছি - দেখি কয়েকটা বাচ্চা ছেলে সামান্য কাপড় গায়ে দাড়িয়ে জটলা করছে। বেশ শীত লাগছে - কিন্তু ওরা কিভাবে শীত সহ্য করছে তাই ভাছিলাম। হটাৎ দেখি দুইজন টহল পুলিশ ওদের দিকে দৌড়ে আসছে। নাগালের মধ্যে আসতেই একজন পুলিশ বাচ্চাগুলোকে বেদম পেটাতে লাগলো। ওরাও পড়িমড়ি দৌড়। পুলিশরাও বেশ দৌড়ালো। এক পর্যায়ে পুলিশগুলো থেমে গেলো - আর বাচ্চাগুলো অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি কিছুটা হতবাক হয়ে দাড়িয়ে দেখলাম। অবশেষে এগিয়ে একজন পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম - "ভাই, ওদের মারলেন কেন?"
উত্তর - "হালার পুতেরা পায়খানা কইরা এলাকা ভরাইয়া ফেলে।"
বললাম - ওরা তো দাড়িয়ে ছিলো। আমিতো ও রকম কিছু দেখলাম না।
পুলিশ একটু বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো - "আপনে কি ওগো চিনেন?"
বললাম - "না।"
একটু দুরে দেখি একটা ফুটফুটে বাচ্চা রিক্সায় একজন ভদ্রলোকের সাথে বসে আছে। আমি রিক্সার দিকে দেখিয়ে বললাম। "আপনি কি ওকে মারতে পারবেন?"
পুলিলের জবাব - "ভাই, ভ্যাজাল কইরেন নাতো। ওগো মারলে কি হয়?"
তাইতো। ওদের মারলে কি হয়। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বেতন দিয়ে পোষা পুলিশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে অবহেলিত শিশুদের মেরে বলছে - ওদের মারলে কি হয়। ওরা সকালে উঠে খাবার যোগার থেকে রাতে ঘুমারো জায়গা খুজে বের করা পর্যন্ত জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মিটানোর অপরাধে ওদের মার খেতে হয়। বঞ্চিত - লাঞ্ছিত এই শিশুরাই একদিন বড় হবে - তখন ওদের গায়ে শক্তি হবে - ওদের মগজে বুদ্ধি বাড়বে - ওরা হয়তো ঐক্য বদ্ধ হবে - তখন সমাজের প্রতি যদি তাদের শিশুকালে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয় - তখন কি হবে। এই সব আবোল তাবোল ভেবে মনটা ভীষন খারাপ হলো।
সকালের ঢাকা দেখা এভাবেই শেষ করে বাসায় ফিরে এলাম।
পাঠক হয়তো ভেবে থাকতে পারেন - বিদেশে থাকার কারনেই দৃশ্যটা আমার নজরে পড়েছে। আসলে তা না। শিশুদের উপর অমানুষিক নির্যাতনের অনেক দৃশ্য একের পর একটা মরে পড়তেই থাকে - যখন একটা মনে পড়ে - সবগুলো এসে ভিড় করে - তখন ভীষন খারাপ লাগে।
আরেকটা ঘটনা বলি।
সম্ভবত ১৯৯৪ সাল হবে। সঠিক মনে নেই। ক্রিকেট খেলা দেখার প্রচন্ড নেশায় অফিস ফাঁকি দিয়ে স্টেডিয়ামে বসে থাকতাম। একদিন এমনভাবেই খেলা দেখছি। সাথে এক ব্যবসায়ী বন্ধু। মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখছি আর গল্প করছি আশে পাশের দর্শকদের সাথে। এর মধ্যে একটা প্রচন্ড "চটাশ" শব্দে সব মনোযোগ চলে গেলো উপরের দিকে। দুই গ্যালারীর মাঝের সিড়ি দিয়ে তখন গড়িয়ে যাচ্ছে একটা গামলা - চারদিকে ছড়ানো মুড়ি, টমাটো আর পিঁয়াজ। আরো কিছু সরঞ্চাম। দেখি একটা দশ-বার বছরের শিশু সিড়ির উপর পড়ে আছে। পাশে দাড়িয়ে একজন স্বাস্থ্যবান মানুষ হৈ চৈ করছে। আমার ব্যবসায়ী বন্ধুও বেশ শক্তিশালী মানুষ - ব্যায়াম করে তৈরী শরীর। ( খেলার মাঠে বন্ধুকে সাথে রাখলে নিজেকে সবসময় নিরাপদ ভাবতাম)। বন্ধু উঠে গিয়ে লোকটা সাথে কথা বললো। আমরাও গিয়ে ছেলেটাকে উঠালাম। দেখলাম ওর ঠোঁট কেঁটে রক্ত ঝরছে।
জানা গেল ঝাল মুড়িতে কাংখিত পরিমানে পিঁয়াজের কুঁচি না থাকায় লোকটির মাথায় রক্ত উঠে যায়। ফলে ঝালমুড়িওয়ালা ছেলেটাকে থাপ্পর মারে আর মুড়ির গামলায় লাথি দেয়।
ছেলেটা এদিকে কাঁদছে। লক্ষ্য করলাম - ও নিজের কষ্টের জন্যে কাঁদছে না - কাঁদছে ওর ব্যবসার সরঞ্জাম আর পুঁজির কথা ভেবে। মাকে বাসায় গিয়ে কি বলবে তা ভেবে ও আকুল। মা বুয়ার কাজ করে - কোন সাহেবের থেকে টাকা ধার করে ওকে ব্যবসা করতে দিয়েছে।
এদিকে লোকটাকে যখন ওকে মারার জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিলো - তখন সে বেশ চিৎকার করে বললো - "ফকিন্নির পোলারে মারছি - কি অইছে। কোন মাংগের পোলা পারলে কিছু কর।"
কেউ তাকে আর কিছু বললো না। অবশ্য অনেকে পকেট থেকে টাকা বের করে ছেলেটাকে দিয়েছিলো।
আজও ভাবি। যে ছেলেটার স্কুলে থাকার কথা। সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঝালমুড়ির ব্যবসা করে - আর তুচ্ছ একটা কারনে ওকে মার খেতে হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ভিতরে এই শিশুরা কোন মানুষ হিসাবে বিবেচিত না। না-মানুষ হিসাবে বড় হয়ে উঠা এই শিশুর থেকে রাষ্ট্র বা সমাজ কি আশা করবে।
এতো গেল একটা ঘটনা। ট্যাম্পুর হেলপার, চায়ের দোকানের কর্মচারী, হলের বয় থেকে শুরু হালের চাওয়ালা যে বিডিআরের ঘটনায় গুলি খেয়েছে - এমন অসংখ্য শিশু আছে বাংলাদেশে - যারা রাষ্ট্রের সকল আইন আর ব্যবস্থাপনার বাইরে। শিক্ষা থেকে শুরু করে মৌলিক অধিকারগুলো স্বাধীনতার চারদশক পরও এদের জন্যে সোনার হরিন।
আরেকটা ঘটনা বলি। তখন কলেজে পড়ি। একদিন কলেজ থেকে সাইকেলে বাড়ী যাচ্ছি। রাস্তার পাশে দেখি বেশ কয়টা বাচ্চা ছেলে একটা শুকনা-পাতলা ছেলেকে মাটিতে ফেলে বেশ পেটাচ্ছে। সাইকেল থামিয়ে ওদের দিকে দৌড়ে গেলাম। ভাবছিলাম আমাকে দেখে হয়তো ওরা পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওদের কোন ভাবান্তর হলো না। কাছে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটাকে উদ্ধার করে ওদে কাছে জানতে চাইলাম মারামারির কারন। একটা ছেলে বেশ রাগ হয়ে বললো - "আপনে কি বরিশাইল্ল্যাহ, ওতো বরিশাইল্লাহ। ওরে মারলে আপনের কি?"
আমিতো আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। বললাম - "বরিশাইল্লাহ হলেই মারতে হবে?"
উত্তর - "হ, হালারা দেহেনা ওগো দেশ থাইক্কা এহানে আইনা কম পয়সায় কাম করে - আর চুরি করে।"
বুঝলাম সমস্যা অনেক গভীরে। ওদের কাছ থেকে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে নিরাপদ দুরত্বে দিয়ে বাড়ীতে চলে এসেছি।
অবশ্যই পড়ে যখন চাকুরীতে গেলাম। দেখলাম - আঞ্চলিকতা কতটা গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে আমাদের সমাজে। অফিসের বস থেকে পিয়ন পর্যণ্ত একসাথে বসে থাকে এক জেলার হলে - আর ভিন্ন জেলার হলে পিয়ন ঠিকমতো বসের সামনে না দাড়ালে চাকুরী হারায়। তখন বুঝতে পেড়েছি শিশুদের কি শিক্ষাই না দেই আমরা।
শেষ ঘটনাটা বলি।
তখন সবে চাকুরী শুরু করেছি। ৭ জন মিলে ভুতের গলির একটা বাসায় মেস করে থাকি। মিঠুর মা আমাদের রান্নাবান্না করে দেয়। চমৎকার মহিলা। সবচেয়ে মজার হলো মিঠু। ৩/৪ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। মাথায় সামান্য চুল। দেখা হলে জিজ্ঞাসা করতাম - "মিঠু তোর চুল কই?"। উত্তর দিতো - "কাউয়ায় লইয়া গেছে।" উত্তর দিয়ে মিঠু হাসতো - তার চেয়ে বেশী হাসতো মা। আমার লাভ হতো - এককাপ চা। মুলত মেসের প্রায় সবাই মিঠুকে আদর করতো।
একদিন কাজ থেকে ফিরে বাসায় ঢুকার পথে দেখি মিঠুর মা মিঠুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। জিজ্ঞাসা করলাম - কিন্তু সহজে জবাব দিতে চায়না। এক পর্যায়ে বললো - "ভাই, মুকুল ভাই রাগ হইছে। মিঠুরে বাপ তুইলা কথা কইছে।"
ঘটনা হলো - সাপ্তাহিক মুরগী জবাই হয়েছে। মুরগীর গিলা-কলজে একেক সপ্তাহে এক একজনের জন্যে বরাদ্ধ হতো। আমি জানতে পেরেছিলাম মিঠু কলজে খেতে খুব পছন্দ করে - তাই সেইটা মিঠুর জন্যে বরাদ্ধ হতো আমার সময়ে। কিন্তু সেইদিন মুকুলের ( হাইকোর্টের উকিল) টার্ন। কিন্তু মিঠু খুবই কান্নাকাটা করায় মিঠুর মা কলজেটা মিঠুকে খাইয়ে দিয়েছিলো। মুকুল ফিরে এসে রাগ করে বলছে - " এই পোলার বাপের টিক নাই - আবার কইলজা খাওয়ার শখ।"
মিঠুর মা অপমানের সবটুকু ছোট্ট মিঠুর উপর ঢেলেছে। যখন আমি মিঠুকে দেখলাম - বেচারা মার খেয়ে আর ভয়ে জড়সর হয়ে আছে।
একদল মানুষের বাচ্চারা ঠিকমতো খায়না - তাই ডাক্তার দেখায়। আর মিঠুরা খেতে চেয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়। একই দেশের নাগরিক। একই সংবিধানে সকল শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা আছে। দুর্ভাগ্য - এতো শুধু কাজীর গরু মাত্র - কিতাবে আছে - গোয়ালে নেই।
(২)
উপরের ঘটনাগুলো কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। পুরো সমাজেই নানান ভাবে শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে - আমরা হয়তো আমাদের জীবনে সবাই দেখি - কিন্তু এড়িয়ে চলি। আমাদের চোখের সামনেই একদল শিশু অমানুষের মতো বেড়ে উঠছে। আমরা সবাই চেচাই - দেশের আইন শৃংখলার চরম অবনতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করি। সরকার র্যাব বানায় - আমাদের অবৈধ সম্পদ যাতে যুদ্ধ করে বড় হওয়া শিশুরা কেড়ে নিতে না পারে - তার জন্যে ক্রশ ফায়ার করে। আমরা নিরাপদ বোধ করি - নয়তো বাড়ীর দেওয়াটা আরো উচু করি - গেটে নতুন তালা লাগাই। আরো ভাল সিকিউরিটি কোম্পানীর কথা ভাবি। কিন্তু তাকিয়ে দেখিনা - আমার ছেলের স্কুল ব্যাগ টেনে নিয়ে যাচ্ছে যে শিশুটা - সে কতটা ঘৃনা নিয়ে বড় হচ্ছে। আমরা সমানাধিকারের কথা বলি - কিন্তু বাসার বুয়া যদি সোফায় বসে টিভি দেখে বা ডাইনিং টেবিলে বসে ভাত খায় - তখন তার অপরাধ ক্ষমাহীন বিবেচনা করি। অফিসের পিয়ন যদি ঠিকমতো ছালাম না দেয় বা রিক্সাওয়ালা যদি বিরক্ত হয়ে কথা বলে তাকে গালি দিতে কুন্ঠিত হইনা।
(৩)
একটা জাতি কোনদিনই সোজা হয়ে দাড়াতে পারবে না - যতক্ষন না দেশের প্রত্যেকটা নাগরিকের নুন্যতম চাহিদাগুলো নিশ্চিত না হবে। রাষ্ট্র একদল মানুষের নিরাপত্তার জন্যে বাহিনী তৈরী করবে - কিন্তু আরেক দলকে অধিকার বঞ্চিত রাখবে - তাহলে একটা বৃত্তের মধ্যেই আটকে থাকবে দেশ। পুলিশকে ২৬০০ টাকা বেতন দিয়ে ১৬০০ টাকার বেতনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের অসন্তোষকে দমনের প্রক্রিয়া বেশি দিন কাজ করবে না। যেমনটা করেনি বিডিআর এর দরিদ্র শ্রেনী থেকে আসা সৈনিকদের উপর রাজকীয় বাহিনীর শাসন চাপিয়ে দিয়ে বিপর্যয় ঠেকানো। সমাজের মুল সমস্যা হলো একদল মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। যতদিন না - প্রতিটি শিশু সমান অধিকার না পাবে - যতদিন না প্রতিটি শিশু সমান শিক্ষার অধিকার না পাবে - যতদিন না প্রতিটি শিশু মানবিক সমাজে বেড়ে উঠার নিম্চয়তা না পাবে - ততদিন আমরা বাংলাদেশ নামক দেশটাকে একটা বৃত্তের ভিতরে ঘুরতেই দেখবো। অধিকার বঞ্চিত শিশুদের একদল অপরাধী হবে - একদল পুলিশের চাকুরী নেবে - দুইদলই একদল আরেকদলের উপর অমানবিক আচরন করবে। আর যতক্ষন না তাদের থাবা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনীকে নাড়িয়ে না দেবে ততদিন আমরা চুপচাপ থাকবো। এদের বঞ্চনার খবর টিভিতে আসবে না - এরা অগুনতিহারের মরে গেলেও শোকাভিত হবো না।
একটা সুন্দর আর মানবিক দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে দেখতে চাইলে আরো কোন বড় ধরনের বিপর্যয়ের আগেই দেশের প্রতিটি শিশুকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করে তাদের সকলের জন্যে সমানাধিকার নিশ্চিত করা দরকার - এখনই।
(নোট - বাফড়া নিকের আড়ালে থাকা একজন মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে আমার লেখাগুলো পড়ে। তার কথা মনে রেখেই এই পোষ্টটা লেখা হলো। ভাল থাকবেন, বাফড়া)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

