somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মখুনের আগে

১২ ই মে, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আত্মখুনের আগে
মাহমুদ শাওন

যদি মনযোগী হও, সুস্থির আর বিশ্বাসী হও, একটি গল্প তোমাকে শোনাতে চাই- যা বহুদিন তুমি শোনার আগ্রহ দেখিয়েছো। বলেছো, ‘বলো, যা তোমার জীবনঘনিষ্ঠ। যাতে দুর্বোধ্য তোমাকে কিছুটা হলেও বুঝতে পারি!’ না, এই গল্প সেই রহস্য উন্মোচনের সূত্র নয়। কেবল একটি বিলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ভাবতে পারো।

মনে আছে, এই সন্ধ্যা সন্ধ্যা রাত, তোমার চুলের সমান দীর্ঘ, সাদা পাহাড়ী তুষারের মতো এলোমেলো! কোথায় যাচ্ছ? আর তাকিয়ে আছো অনন্ত সুন্দরের দিকে। ওখানে প্রান্ত নেই, উপাত্ত নেই, দাঁড়াবার জায়গাটুকু নেই। তবু হাঁটছি। আজ কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আমি ঘুমাবো ভেবে শুয়ে পড়ি। আলো নিভিয়ে দেই।

আমার যেন কী হয়েছে- ভালো না লাগা রোগ। ক্লান্তি রোগ। ঘুমহীন অনন্ত জেগে থাকায় কী রকম ঘুম ঘুম রোগ। অসহ্য! তবু দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে ঐ ট্রাফিক পুলিশের পাশে। ‘ট্রাফিক’ শব্দটাতে একটা ঝংকার আছে- এই মাত্র জানলাম। মনে হচ্ছে আমি এখনই হেসে ফেলবো। কতদিন থেকে আমি থেকে যাব এইসব হাহাকার নিয়ে, কতদিন, জানি না।

তোমাকে বলা হয়নি, আমার এক দুসম্পর্কের দিদি আছেন, মানু। আমি প্রায় প্রায়ই তার বাসায় যেতাম। ভালো লাগলেও যেতাম, ভালো না লাগলেও যেতাম। আমাকে দেখে দিদি খুব খুশি হতেন। দিদির ছোট্ট মেয়েটা, কী যেন নাম, টুশি? না। হুইটি? না। হতে পারে টুইটি- মনে পড়ছে না, আমাকে দেখে সে’ও খুব খুশি হত। যদিও কোনদিন একটি কাঠি লজেন্সও তার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়নি।

অথচ শিশুকালে বাসায় বেড়াতে আসা অতিথিদের হাতে থাকা প্যাকেটের দিকেই আমার চকচকে চোখ নিবদ্ধ থাকতো। যাহোক, প্রায় দুপুরেই দিদির বাসায় আমার যাওয়া হতো। দিদির বাসায়, ড্রইং রুমে আমি চুপচাপ বসে থাকতাম। দিদি রান্না-বান্নার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। মাঝে মাঝে এসে দেখে যেতেন আমি আছি না চলে গেছি। আর রান্না শেষ হলেই বলতেন- ‘আজ কিন্তু খেয়ে যাবি। টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’

দিদির মুখে এই কথা শোনা মাত্রই আমি উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম- আজ না, আর একদিন। তারপর সোজা বেরিয়ে আসতাম দিদির বাসা থেকে। প্রায় প্রায়ই এমন হতো। তো একদিন হলো কী, সেদিন সকাল থেকেই কিছু খাওয়া হয়নি। পকেটে কোনও টাকা পয়সা ছিল না (যেমনটা আমার মাঝে মাঝেই হয়)। ভাবছিলাম কী করা যায়! হঠাৎ দিদির কথা মনে হলো। ভাবলাম, দিদির বাসায় গেলে তিনি তো অবশ্যই খাবারের কথা বলবেন।

আজ অন্তত ‘না’ করবো না। ভাবানুযায়ী দিদির বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। সত্যি বলছি, ক্ষুধায় আমার শরীরে তখন কোনও শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। দিদি আমাকে দেখে যথারীতি খুব খুশি হলেন। জানতে চাইলেন, এতদিন না আসার হেতু কী?

আমি কোন উত্তর করলাম না। ক্ষুধায় আমার পেট জ্বলছে। অপেক্ষা করছি, দিদি কখন আমাকে খেতে বলবেন- সেই আশায়। আমি ড্রইং রুমে বসে আছি। কিচেন থেকে নানা রকম রান্নার ঘ্রাণ নাকে এসে লাগছে।

দিদি মাঝে মাঝে এসে আমাকে দেখে যাচ্ছেন। বলছেন, ‘বস্, রান্নাটা শেষ করেই আসছি। তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে।’ আমি বসেই আছি। ভাবছি, দিদি কখন বলবেন সেই কাঙ্খিত কথাটি, ‘আজ কিন্তু খেয়ে যাবি’। রান্না শেষ করে ঘাম মুছতে মুছতে দিদি আমার কাছে এসে বসলেন। আমার পেট জুড়ে হাহাকার। পেট জুড়ে কান্না। দিদি অনেক কথাই বলছেন, কিন্তু আমি শুনতে চাচ্ছি সেই কাঙ্খিত কথাটি।

এক সময় দিদি উঠে গেলেন আমার পাশ থেকে। আর যেতে যেতে বলে গেলেন, ‘শোন্, আজ কিন্তু খেয়ে যাবি। টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’ কিন্তু হঠাৎ কী হলো, আমাকে পেলো কোন্ ভূত! দিদির চিরাচরিত সেই কথার প্রেক্ষিত আমার বহুদিনের অভ্যাসবশত সাজানো উত্তর, ‘আজ না, আর একদিন’, বেরিয়ে এলো মুখ ফসকে। কথাটি শেষ হতেই আমি আর অপেক্ষা করিনি।

আমার খুব হাসি পাচ্ছে। আবার কান্না কান্না লাগছে। জানি, আমার জন্য কোনও সুন্দর আজ আর গোলাপ হাতে অপেক্ষা করে না। মেঘলা না, বর্ষা না, না কোনও তুষার শুভ্র সকাল। আমি তবে কার অপোয় জেগে জেগে থাকি?

কিংবা যার অপেক্ষা আমার কাছে দীর্ঘশ্বাসের সমান দুঃখী মনে হয়, সে তো প্রাক্তন সময়ের কাছে পরাজিত অবিকল আমারই ছায়া। ছায়ার সঙ্গে সখ্যতা গড়লে ছায়ারা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে আর ওরা গড়বে অনন্ত ছায়াপথ।

সে দীর্ঘ অন্ধকার যাত্রায় আমার কোনও রুচি নেই, কামনা নেই। মনে আছে, আমি ছুটছি। অনেক পেছন থেকে বাবা চিৎকার করে ডাকছেন, ‘আর যাবি না, ওখানে পথের শেষ’। বাবা, পথের কোনও শেষ আছে? কত পথ হেঁটেছো তুমি? আমি গিয়ে দেখে আসবো তার শেষটুকুও।

মনে আছে, আমি দৌঁড়াচ্ছি একটা সাইকেল নিয়ে। পিছনে বাবার হাত শক্ত করে ধরা। সাইকেলের হাতল ছেড়ে দেব, বাবার হাত ছাড়বো না। নির্ভরতার ঐ হাতদ্বয় এত কোমল, এত আন্তরিক!

এই যা! মা’র কথা ভুলে যাচ্ছি। যেন কোথাও পড়েছি দু’একটা হঠাৎ মুগ্ধ লাইন। মনে পড়ছে না। মা-কি আমার কেউ ছিল মায়ের মতো! আমি হাঁটছি- ওপথ সবুজের শাড়ি পড়া, দীর্ঘ। হাঁটছি। ক্লান্ত। শুধু জানি, আমার জন্য পৃথিবীর কোথাও কোনও রাজপথ নেই; অজস্র গলিপথ অলিতে-গলিতে। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব।

সারাদিন ঘুমহীন অনন্ত জেগে থাকায় ঘুমঘুম দিনানিপাত এবার অবসরে যাবে। কাল তুষানের ফোন আসবে, তুষান আসবে না। কাল তন্বীর দীর্ঘচিঠি আসবে। চিঠি ভরা আবেগ আর মধ্যবিত্তীয় শাসন। কাল সুরভী কী মনে করে একবার দেখা করতে চাইবে।

ওর চাকুরিটা হয়ে গেছে বোধ হয়। কাল অভিমান ভেঙ্গে তুমি ঝড়ের মতো দ্রত দুয়ারে এসে দাঁড়াবে। কাল বাবা টাকা পাঠাবে- মেস ভাড়া, মিল চার্জ, বুয়ার বেতন, পেপার বিল সব মেটানো হবে। কাল একটা মীমাংসা হবে, চূড়ান্ত...



১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×