মানুষের মত মানুষ হতে এসেছিলাম ঢাকা শহরে। তাঁদের ইচ্ছে ছিল আমাকে মানুষের মত মানুষ করবে।
আমাকে সবাই ঘেন্না করতো। আমি খারাপ কাজ করতাম না। তবে আমি মাথায় চুপচুপা করে নারিকেল তেল দিয়ে বেরুতাম। পরতাম ফুলবাবু নাল নীল গোলাপী শার্ট। ছেড়া স্যান্ডেল মুচি দিয়ে তালি লাগিয়ে পরতাম। কোনদিন মাথায় দিতাম সর্ষের তেল। আমাকে এড়িয়ে চলতো শহরের ভদ্র বাবুদের ছেলেপেলেরা। আমার পোশাক আশাকে দৈন্যতা আর দারিদ্রতার ছাপ লেগে থাকতো। আমি বুঝে পেতাম না শহরের মানুষগুলো কেন আমাকে ঘৃণা করতো।আমি কোন খারাপ কাজ করতাম না, মানুষকে ভালবাসতাম, ভালবাসতাম পাখি আর ফুলদের। আমি কাউকে ঠকাতাম না, কাউকে হিংসে করতাম না , কারোর ক্ষতি করবো বলে পণ করতাম না।
যে মেসে আমি থাকতাম তার পরিবেশ ছিল দারিদ্রতা ও অশ্লীলতায় আগাগোড়া মত্ত। অনেক খুঁজেছি একটি ভদ্রলোকের মেস। কিন্তু আমার লিকলিকে দারিদ্রক্লিষ্ট ও গাল চুপসে যাওয়া চেহারার বিকটতায় কোন ভদ্রলোক আমাকে জায়গা দেয়নি । অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছিলাম এই মেসটি। সাথে পেয়েছিলাম আরো চারজনকে। তাঁরাও ঢাকায় এসেছিল মানুষের মত মানুষ হতে। ছোট্ট একটি মেসে চার পাঁচজন গাদাগাদি করে থাকতাম আমরা। পড়ার টেবিলে যখনই মন দিতে চাইতাম তখনি শুনতাম ওদের অশ্লীল আড্ডা থেকে আসা নোংরা শব্দগুলো। তখন আমি বড় হইনি বেশি। সবে মাত্র ক্লাস এইটে উঠেছি। টাকা পয়সা পাঠাতে পারতো না আমার বাবা। তার কষ্ট আমি বুক দিয়ে বুঝতাম। শুটকি মাছের ভর্তা দিয়ে আধপেটা খেয়ে যখন স্কুলে বসতাম তখন ভদ্রপাড়ার ছেলেরা আমার সাথে বসতে চাইতো না। ক্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেছিল দুধে মাখনে বড় হওয়া ঘুষ খাওয়া ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসারের নাদুষনুদুষ নিষ্পাপ চেহারার ছেলেটি, আমার শরীর আর মুখ দিয়ে নাকি দুর্গন্ধ বের হয় , ও আমাকে ঘৃণা করে , ও চায়না আমার মতন নোংরা ছোটলোক ক্লাসে থাকুক । তার সাথে অনেক ভদ্রলোকের ছেলেরা সায় দেয়। পেছনের বেন্চে লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে গিয়েছিল। আমার কি দোষ ! বাজে খেয়ে আমার অসুখ হয়ে গিয়েছিল পেটে। টিফিন টাইমে খাওয়ার টাকা পাঠাতে পারতো না বাবা। না খেয়েই কাটিয়ে দিতাম স্কুল পিরিয়ড। তাই আমার মুখ থেকে উৎকট গরিবী অসহ্যরকমের দুর্গন্ধ বেরুত ।শহরের ছেলেগুলো ও সম্ভ্রান্তেরা আমাকে ঘৃণা করতো। শহরের গরীবরাও আমাকে ঘৃণা করতো। বুঝতাম না কি অপরাধ ছিল আমার!একবার আমার টিচার থাপ্পর মেরে গাল ফুলিয়ে দিয়েছিল। ওর ধারণা ছিল আমি দাঁত না মেজেই স্কুলে যেতাম। মাঝে মাঝে আমার সৎ বাবার উপর ঘেন্যা আসতো রাগ আসতো। সে কেন পারলো না আমাকে ফার্স্টক্লাস ঘুষখোর অফিসারের ছেলের মত বড় করতে ! রাতে মেসে পড়ার সময় আমার গা ভরে ঘাম আসতো । সেই পোশাক পরেই স্কুলে যেতাম পরদিন সকালে। আমার সরলতাকে সবাই ঘৃণা করতো।
একদিন রাতে মেসে ঢুকে দেখি আমার বন্ধু দুইজন এক বেশ্যার সাথে সঙ্গমরত। ছি:। তবে তাদের দোষ কি, সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মায়নি বলে ওদের এভাবেই আদিম প্রবৃত্তি প্রশমন করতে হত। ওদের একজন একটি মেয়েকে ভালবেসেছিল। কিন্তু মেয়েটির আবেগ কেটে গেলে ওর গরিবী হালত আঁচ করতে পেরে । অন্য এক ধনীর দুলালের সাথে চম্পট দেয় পরে মেয়েটি । ওকে ও বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছিল। হতভাগা মেস মেম্বারটির বাবা মা রাজী থাকলেও মেয়েটি রাজী হয় নি শেষে। জন্মগতভাবে দরিদ্র হওয়ার অপরাধ ওকে ক্ষমা করেনি।
আর আমার ওই ধনীর দুলাল বন্ধুটির কথা ভাবতাম। তার ছিল অঢেল সম্পত্তি। সোনার বাঁট মুখে নিয়ে বড় হয়েছিল ও। তাই তাঁর প্রেমিকা ওকে ছেড়ে দেয় নি কখনো। তাকে কখনো তাই বেশ্যা ঘরে এনে তৃষ্ণা নিবারণ করতে হত না। সে তাঁর প্রেমিকার বুক থেকেই পুষ্টি আর স্বস্তি পেত। তার মুখ চোখ পবিত্র নূরানিতায় ঝকমক করতো সবসময়। তার মাথা থেকে ফ্রেন্চ শ্যানেল ব্রান্ডের শ্যাম্পুর সুবাস বেরুতো। সে সাহেবদের পোশাক পরতো। বড়লোক আর সম্ভ্রান্ত ঘরের সৈয়দ বংশের ছেলে হলেও সে চুরি চামারীও করতো মাঝে মাঝে। একবার স্যারের বাসা থেকে দামী ফাউন্টেন পেন চুরি করতে গিয়ে ধরা খায় ও। তবে মা সৈয়দ ও বাপ ধনী চৌধুরী হওয়ার কারণে ছিচকে চোরদের মত পিটুনি খেয়ে মরতে হয় নি ওকে। স্যারকে একদিন একটি ছিচকে চোরকে কিলিয়ে হাগু বের করে দিতে দেখেছিলাম। হাতে রড নিয়ে স্যার ওর মাথায় আঘাত করে যাচ্ছিল অনবরত। ও স্যারের ঝুলানো সেন্ডো গেন্জি চুরি করতে এসেছিল তাই । চোরটিকে পরে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। তবে চৌধুরী আর সৈয়দ বংশের বন্ধুটিকে স্যার মাথায় হাত দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলেছিল “ ছি: বাবা , এরকম করতে নেই” পরদিন আরো অবাক হলাম স্যার যখন নতুন একটি দামী ফাউন্টেন কলম ওকে উপহার দেয় । ও মাঝে মধ্যে মদ গাঁজাও খেত লুকিয়ে লুকিয়ে। বন্ধুদের কাছ থেকে জিনিষপত্র মেরেও দিত সে। তাকে কেউ ঘৃণা করতো না। ভালবাসতো স্কুলের টিচাররা , ভালবাসতো পাড়ার লোকেরা , বুক ভরে ভালবাসতো ওর ডবকা টগবগে প্রেমিকা। সব রমণীরাই তাকে বুক উতলা করে ভালবাসার ঘন রসে চুবিয়ে রাখতো। তাই ওর কোনদিন বেশ্যা আনতে হয় নি ঘরে। সবাই রাধা হয়ে ওকে অকাতরে ভালবাসার মধু খাইয়েছে। ওকে ভালবাসতো সবাই। আমিও ওকে ভালবাসতাম। কিন্তু আমার মেসের বন্ধুরা ছিল ভাগ্যহত , তাঁদের বেশ্যা এনে এভাবেই প্রেমনিবারণ করতে হত মেসের মধ্যে। আমি ঘেন্যায় বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম চিঁকা মরে থাকা মেসের বারান্দায়।
পরীক্ষায় কয়েকটি সাবজেক্টে ফেল করি একবার। তবে আমার ধনীর দুলাল বন্ধু ১ম হয়েছিল ক্লাসে। পরীক্ষার এক মাস আগেই ও পেয়ে যেত একটি সাজেশন। যে সাজেশন আর প্রশ্নপত্রের মধ্যে পার্থক্য খুজেঁ পাওয়া যেত না। তবে সেই সাজেশন আমি শত চেষ্টা করেও পাই নি । কারণ ওগুলো তাঁরাই পেতো যাদের তেলে মাথায় তেল থাকতো। আমার ধনীর দুলাল বন্ধুটি খারাপ ছাত্র ছিল বললে ওর প্রতি অবিচার করা হবে । ও খুব তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্ত করতে পারতো। সবকিছু তাড়াতাড়ি বুঝে যেত ও । পড়ার টেবিলে ও মন দিয়ে পড়ালেখা করতে পারতো। প্রেমিকার যৌবনের সুখ নিংড়ানো মধু ও দুধেতে ওর ইন্দ্রীয়গুলো থাকতো প্রশমিত আর শান্ত। তাই একান্ত মনোযোগ দিয়ে বাড়ির কাজগুলো শেষ করতে পারতো ও। তাই পরীক্ষায় ফার্স্ট হতো ও সবসময়। ওর ব্রেনের নিউরণ সেলগুলো ছিল দুধ , মাংস , মাছ আর গোশতে পরিপুষ্ট। তাই ও ফার্স্ট হতো।
আমি খারাপ ছাত্র ছিলাম ভিষণ । ফেল করতাম । তাই আমাকে সবাই বখাটে আর খারাপ ছেলে বলে ঘৃণা করতো। আমার মন দারিদ্রতায় ছিল ক্লিষ্ট , মন বসাতে পারতাম না কখনো পরাশুনাতে। ইন্দ্রীয়গুলো ছিল অপ্রশমিত ও অশান্ত । আমার যৌনতা ছিল অত্যাচারিত ও কৃত্রিম। আমার ব্রেনের নিউরন সেলগুলো চেপা-শুটকি মরিচভর্তা আর দারিদ্রতার দুর্গন্ধে নিদারুণ যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে থাকতো সবসময়। তাই আমি পেছনের বেন্চে পড়ে থাকা এক বখাটে ও ঘৃণিত শুদ্র ছিলাম। খুব একটা লেখাপড়া করতে পারিনি আমি । পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলে আমায় সম্ভ্রান্ত সমাজ। থার্ড ক্লাস আর সেকেন্ড ক্লাস দিয়েই ক্যারিয়ারের আলমারি সাজিয়েছি আমি। একটি চাকরী করে কোনরকম আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছি এখন। যে বেতন পাই তাতে নিজেও চলতে পারি না। অমানুষিক কষ্ট করতে হয় আমাকে। পেটের আলসার এখনো প্রচণ্ড যন্ত্রণা দেয় মাঝে মধ্যে। তবু জীবনকে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে নিচ্ছি । আমার সৎ পিতার অকৃত্রিম ঋণ এখনো শোধ করতে পারিনি আমি। তবে আমার সেই ধনীর দুলাল বন্ধুটি আগে টোয়োটাতে চড়তো এখন চড়ে পাজেরো প্রাডো গাড়িতে। বড় চাকরী করে ও। ও নাকি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল অনার্সে। প্রচুর বান্ধবী আর একটা বউ ওর। বিয়ের পরে ও নিউ ইয়োর্কে হানিমুনে গিয়েছিল। বাবার বাড়িতে ও এখন আর থাকে না , থাকে গুলশানের হালফ্যাশনের একটি বাড়িতে। বছরখানেক হল কিনেছে ওটা। দুধ ফল আর মধুতে ভরা ওর জীবন!
*পুরো ঘটনা ও তার চরিত্রগুলো কাল্পনিক।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১০ সকাল ৯:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



