কানা গলির মুখে দাড় করিয়ে ব্যাটাকে গালি দিয়ে উঠলাম। পেছন ঘুরতেই পাছা বরাবর কষে এক লাথি। হুমড়ি খেয়ে উঠে পড়িমড়ি করে দৌড় লাগালো হাদাটা। আমি নিশ্চিন্তে ধীরে সুস্থে হেঁটে বের হয়ে আসলাম বড় রাস্তায়। এই লাইনে এতো বছর কাটিয়ে আমার লোক চেনা হয়ে গেছে। এই শালা আর ফিরে আসবে না। গণপিটুনীর হাত থেকে বেঁচে গেছে, এই তার জন্য ঢের।
পকেট থকে ঘড়িটা বের করে দেখলাম। বেশ দামী মনে হচ্ছে; সোনালী সাদা মিশেল। যাক, বৌটার অনেক দিনের শখ ছিল এমন একটা ঘড়ি। আজকে আর খ্যাপ নয়। ঘরে ফিরি। রাতটা না হয় একটু ফুরফুরে কাটুক।
চোরের উপর বাটপারীর এই পেশাটা আমার মাতুলের কাছ থেকে শিখেছিলাম।মামা বলতো, "ভাগ্নে, সবাই এ বিদ্যে কাজে লাগাতে পারে না। চোখ কান খোলা রাখবি। ছিঁচকেগুলির পিছু পিছু নজর রাখবি। আর সুযোগ মতো চেপে ধরে আদায় করে নিবি বখরা। পুলিশ তোর টিকিও ছুঁতে পারবে না।"
পেটে কিছু স্কুলে যাওয়া বিদ্যে ছিল দেখে, বোধহয় একেবারে ছিনতাই এ নামতে পারিনি কখনো। তাই এই লাইনেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি বেশ। সমস্যা একটাই, লাল দালানের লোকদের আর লাইনের বস্দেরকেও একটু বখরা দিতে হয়। সেমসাইড মাঝে মাঝে হলেও, কেন জানি এই লাইনের লোকজন আমাকে একটু ভক্তি শ্রদ্ধাই করে। তাই বড় ঝামেলায় পড়িনি কখনো।
বাসে উঠার পর পরই লোকটাকে চোখে পড়লো; বেশ রহস্যময় লাগছিলো। কেমন যেন ইঁদুর টাইপ চেহারা। ইতি উতি চারদিক তাকাচ্ছিল। মাঝে মাঝেই জিব বের করে শুকনো ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করছে। নার্ভাসনেস এর লক্ষন। সন্দ্ধ্যায় খ্যাপ মারবোনা ভেবেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, ব্যাটা মৌলবাদী কেউ নাতো?! আজকাল এইসব বোমারুদের পকেট বেশ ভারী থাকে, আর তাছাড়া ধরা খেলে চিৎকার চ্যাঁচামেচির ধারে কাছেও যায়না। চুপচাপ সটকে পড়ে।
কদিন ধরেই বউটা কক্সবাজার যাবার বায়না ধরেছে। মোটা কিছু হাতাতে পারলে একেবারে কলকাতা থেকে ঘুরিয়ে আনা যেত।
যা আছে কপালে! আজকে ব্যাটাকে ছাড়ছি না।
রোসো চান্দু! আজ তোমাকে সোনার ডিম পাড়িয়েই ছাড়বো!
তখনও বুঝিনি, ব্যাটা যে কি ঘড়েল মাল!
সম্বিত ফিরে পেলাম যখন; তখন আমি দাড়িয়ে শ্যাঁওলা মাখা এক স্যাঁতস্যাঁতে পথে। ঘড়িতে রাত প্রায় ১১ টা। ইতিমধ্যে বাস ছেড়ে দিয়ে ব্যাটা রিকশা বদলেছে দুইবার! একবার নসিমনে উঠেছে ১০/১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায়! দুইবার নৌকা করে খাল পার হয়েছে! ধামরাই ফেলে এসেছি সেই কখন! এখনতো চারদিক জংলা মতো জায়গা!
আমি এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করিনি তাকে। সে কিন্তু টের পেয়েছে সেই বাসে বসেই।
এখন খালি সময়ের অপেক্ষা, কখন ব্যাটা রণে ভ্ঙ্গ দেয়; একলা দেখলেই কপ করে চেপে ধরবো।
ঝিঁঝিঁর শব্দে বর্তমানে ফিরে এলাম। আশে পাশে কোথাও জনমানিষ্যির কোন চিন্হ নেই। এমনকি নেই কোন আলোর বিন্দুও। অমাবস্যার আধাঁরে কেবল টিমটিমে তারার আলোই ভরসা। ইঁদুরে লোকটা যেন হনহন করে উড়ে চলছে! আর দেরী করা সমীচিন হবেনা। এখনই মোক্ষম সময়। পকেট থেকে ক্ষুরটা বের করে হাতে নিলাম। শুধু ধমকিতে কাজ হবার কথা নয়; কঠিন পাত্র এই লোক।
"ঐ শালা!! থাম্!!"
বিকট পিলে চমকানো ডাকের সাথে সাথে লাফিয়ে গিয়ে পড়লাম ব্যাটার ঘাড়ে। হুড়মুড় করে বিনা বাঁধায় ছিটকে পড়লাম মাটিতে।
আজব তো! কোন ওজনই নেই যেন লোকটার; বিন্দুমাত্র বাঁধা পাইনি। আমার সাথে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে সেও। একদম নাড়াচড়া নেই। মরে গেলো নাকি?!!
পা দিয়ে নাড়া দিলাম শরীরটায়; গাটা কেমন যেন ছম ছম করে উঠলো।
পায়ের স্পর্শের সাথে সাথে মোচড়ানো শুরু করলো তার দেহটা; সাথে হিস্ হিস্ একটা শব্দ আর অস্ফুট গোঙ্গানী। প্রবল কষ্ট হচ্ছে যেন কোন মৃত্যুপথযাত্রীর!
ইয়া খোদা!!
লোকটা ধীরে ধীরে মুখ ফেরাতেই চোখে পড়লো তার সর্পিল লিকলিকে জীব। ঠোঁট ভেজানোর মতো করে নড়ছে।
টকটকে লাল দুটি চোখ যেন আটকে ফেলছে আমার দৃষ্টিকে। অবশ শরীরে পাথর অনুভুতি ছড়িয়ে পড়ছিল!
না তাকিয়েই বুঝতে পারলাম কিছু একটা হিম, শীতল স্পর্শ ধীরে ধীরে আবৃত করে ফেলছে আমাকে।
চারদিক আঁধার হয়ে আসার আগে হাত ঘড়িটার কথা মনে পড়লো।
বউটার শখটা বুঝি আর মেটানো হলো না!
পরিশিষ্ট:
পরদিন নির্জন জংলায় কাঠুরেরা ইঁদুর চেহারার লোকটিকে খুঁজে পেলো। দেখে মনে হচ্ছিল মাস কয়েকের পুরানো মরা। অজানা কারণে পঁচন ধরেনি। শুকিয়ে গেছে একদম ছিবড়ের মতো। তবে, সেদিন ভোরে মাঝারী গড়নের আঁশটে গন্ধওয়ালা যে লোকটিকে দ্রুত শহরের পথে চলতে দেখা গিয়েছিল; তার ভাবনা কারো মাথায় আসেনি।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৯:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



