নিজের স্ফিত তলপেটে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছিলো নুইমা।
এখন হাতের আঙুলেই গুণে ফেলা যায়। তবু সে গুণেনা কখনো। তিরাকও কখনো তার কাছে জানতে চায়নি আর কতদিন বাকি আছে। কিন্তু তারা দুজনেই জানে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ খুব কাছে চলে এসেছে।
আজকাল তারা কেউ কর্মস্থলে যায় না। অবশ্য নিয়মও আছে কেউ চাইলে শেষ দুই মাস ছুটি কাটাতে পারবে।
সে বসে ছিল লম্বা টানা বারান্দায়। সামনে সবুজ ঘাসের কার্পেট মোড়ানো চত্বর। মাঝে মাঝেই কিছু অচেনা গাছ দাড়িয়ে আছে গাঢ় সবুজ পাতার ছায়া বিছিয়ে। এই রিসোর্ট টা বাংলো প্যাটার্নের। এটাই গ্রীন ল্যান্ডের সবচেয়ে দামী ইমিউন সেন্টার।ওদেরকে এখানে রাখা হয়েছে গত সাত মাস ধরে। তাদের ৫ ফিট বাই ৮ ফিট এপার্টমেন্টের কাছে এটা স্বর্গ বৈকি!
"ধর, চিনি হয়েছে কিনা দেখো।"- তিরাক চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল তার কাছে। এখানে এসে চায়ের খুব নেশা হয়েছে তিরাকের। সারাদিনে সে তো তিন/চার বার নিবেই, সাথে নুইমাকেও তাই করতে হয়। তারও এই বিলাসিতাটুকু মন্দ লাগে না।
"আচ্ছা, ছেলের নামটা কি সত্যি তোমার পছন্দ হয়েছে?"
" হুম, দুজনে মিলেই তো ঠিক করলাম; পছন্দ হবে না কেন?"
"কিন্তু ওরা যদি 'স্বাধীন' নামটা পছন্দ না করে?"
সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো তিরাক। মুখে বললো-
'আশা করি আমাদের ইচ্ছাটুকুর মর্যাদা ওরা দিবে।"
কিন্তু এইচ আর ডি র কর্মী হিসাবে সে নিজেই জানে, তাদের কোন জায়গায় কতটুকু সীমাবদ্ধতা আছে। এতোদিন সে তার অফিসে বসে কতো জুটির স্বপ্ন আর চাওয়া কাটাকুটি করেছে, কখনোবা সম্মতি দান করেছে। কখনো ভাবেনি কিংবা ভাবতে চায়নি একদিন তাদেরও ..........।
"আচ্ছা, কোন উপায় কি নেই? একেবারেই কি সম্ভব না? তুমি এতো বড় পোস্টে ছিলে, কিছুই কি করা যায় না?"
অনুনয়ের সুরে কথা শুরু করলেও শেষটা অসহায় কান্নার মতো শোনালো।
কিন্তু তিরাক জানে ২৪শ শতাব্দীর এই পৃথিবীর বাস্তবতা কতোটা নিষ্ঠুর!
বিশ ভাগের একভাগ মাটিতে বারোশ কোটি লোক গাঁদাগাঁদি করে থাকছে নুন্যতম সুবিধা নিয়ে। আকাশ জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাত হয়েছে সেই দুশ বছর আগেই। উষ্ণতার কারণে সবাই সরে এসেছে মেরু অঞ্চলের পাহাড়ি ভূমিগুলোতে।
প্রকৃতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা হলো- জরাকে জয় করেও মানুষ এখন স্বেচ্ছা মরণ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে সন্তান জন্মদানের শর্তে।
এই মেয়াদকাল দুই বছর ছিল। আগে বাচ্চার সাথে বাবা-মা সর্বোচ্চ দুই বছর কাটাতে পারতো। USW (ইউনাইডের স্টেটস অব ওয়ার্ল্ড) সরকার, গত সংবিধান সংশোধনী করে-সন্তান জন্ম দানের সাথে সাথেই স্বেচ্ছামরণের বিধান করা করেছে। জন্মহার সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাচ্ছে দেখে এই নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। মাঝে মাঝে তিরাকের মনে হয়- সে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিলো নাতো?!
"বাবা- মার কথা মনে আছে তোমার?"- নুইমার গলার স্বরে স্বপ্নময়তা।
"হুম, ওনাদের ডাটাগুলি আমার কাছেই রাখি সবসময়। তোমার কথাও আছে ওতে। আমাদের দুজনকে নিয়ে দুই পরিবারে কতো স্বপ্ন জমানো ছিল। একদিক থেকে ওনাদের ভাগ্যবানই মনে হয়, কারণ তাদের স্বপ্নের কারণেই তোমাকে নিজের করে পেয়েছিলাম।"
তিরাকের চোখে না তাকালেও নুইমা জানে কি অপরিসীম ভালোবাসা মাখা তার চোখ দুটি। আর্দ্র হয়ে উঠেছে বিষাদের কষ্টে। পিতামাতাহীন এক পৃথিবীতে তারা একজন আরেকজনের জন্য কতোটা মমতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে, সেটা আমরা নাইবা জানলাম।
দিগন্তে সূর্য ডুবছে। পায়ে পায়ে ছায়া ঘনিয়ে আসছে ঘাসের ঢেউ সাগরে। দূর ভবিষ্যতের পৃথিবীর দুই মানব মানবী পরম ভালোবাসা ও মমতায় হাতে হাত রেখে অপেক্ষা করছে অনাগত সন্তানের। যাকে কখনও তাদের ছুঁয়ে দেখা হবেনা। কিন্তু বুকের ভেতরে অপরিসীম মমতার একফোঁটাও কমতি নেই। কখনো কমতি হয়ওনি- সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০০৯ বিকাল ৪:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


