নানা ভাবে নিজেকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করছি, অটোসাজেশন দিচ্ছি। শান্ত হয়ে বসে দীর্ঘ শ্বাস টেনে টেনে মনকে প্রশান্ত রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু.....
এই একটু আগের কথাই ধরুন। শাওয়ারে ঢুকে সবেমাত্র ঝরনাটা ছাড়লাম। শীতল পানির প্রবাহ যেন, উত্তাপটা ভাবনার কেন্দ্র থেকে শুষে নিতে পারে; তৎক্ষণাত দরজায় টোকা!
"এই,,, তুমি টাওয়েল ছাড়া গোসলে ঢুকলে কেনো?!! একটু আগে মাত্র ঘরটা মুছে গেলো। ধরো, টাওয়েল নাও।"
খট করে শব্দের সাথে সাথে খুলে গেলো দরোজা; হাত বাড়িয়ে টাওয়েলটা এগিয়ে দিলো নীলা।
সে কি?!! দরোজা বন্ধ করতে ভুলে গেছিলাম?!!
আতংকে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো! হাঁস ফাস করতে লাগলো যেন ফুসফুসটা এক ঝলক বাতাসের জন্য। প্রবল ইচ্ছের জোরে, কোনমতে টাওয়েলটা টেনে নিয়ে দরজা ঠেলে বন্ধ করে, লক টিপে দিলাম।
আহ.........................!!!
ফুঁপিয়ে উঠে বুক ভরে বাতাস নিলাম। থর থর করে কাঁপছিলো পা। মসৃণ টাইলসের দেয়াল ঘেষটে মেঝেতে ধ্বসে পড়লো যেন শরীরটা। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিলাম কপালের ঘাম।
এতো বড় ভুল কিভাবে হলো?! দরজা লক করতে ভুলে গিয়েছিলাম?!!
আরো বারকয়েক টেনেটুনে দেখে নিলাম ঠিকমতো বন্ধ হয়েছে কিনা।
তবুও গোসলের পুরোটা সময় তাকিয়ে থাকলাম দরজার দিকে।
তারপর খাওয়ার সময়টার কথাই বলি।
চুপচাপ খেয়ে চলছিলাম। কথা যা বলার নীলাই বলছিলো যথারীতি। মাঝে ও উঠে গিয়ে কি যেন আনতে বাটি নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকলো। চোখের কোনা দিয়ে ওকে কিচেনে ঢুকতে দেখে হঠাৎ শীরদাড়া বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল!
আচ্ছা, ও যদি খাবারে কিছু মেশায়?! আমি তো এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি না। আচ্ছা, যদি ছুরি হাতে তেড়ে আসে আমার দিকে?! চট করে আশে পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম, হাতের কাছে কিছু পাওয়া যায় কিনা, যা দিয়ে অন্তত ঠেকিয়ে রাখতে পারি ওকে। ভাবনা শেষ হবার আগেই সে ফিরে আসলো। নাহ, হাতে সেই তরকারীর বাটিটাই আছে।
তবে, খাওয়া সেখানেই শেষ করে উঠতে হলো আমাকে। কিছুতেই আর কিছু মুখে রুচলো না!
সারাদিনে ঘরের বাইরে যে সময়টুকু কাটাই; অন্তত সেই সময়টা স্বস্তিতে কাটাতে পারি। তারপরও কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভাবনাগুলি কেবলই নীলাকে নিয়ে ঘুরপাক খায়।
কি করছে সে? কারো সাথে শলাপরামর্শ? কাউকে কি ফোন করলো?
বাসায় মোবাইল রাখিনা কখনো। টি এন টি তে ফোন করে নিশ্চিত হয়ে নেই, এনগেইজড্ আছে কিনা। নীলার কন্ঠ শুনলেই ভয়েরা ঘিরে ধরে। প্রাণপণ চেষ্টায় কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি।
"কি করছিলে?"
"কি আবার?! রান্না শেষ করে একটু ফ্যানের নীচে বসেছিলাম, টিভিতে একটা সিরিয়াল চলছিলো, তাই ফোনের শব্দ শুনতে পাইনি..." লজ্জিত শোনালো যেন তার কন্ঠ! "ওটা শেষ করেই গোসলে ঢুকবো।"
টিভিতে সিরিয়াল চলছিলো?!!
শব্দ শুনতে পাইনি?!!
ঘৃণায় রি রি করে উঠলো সারা শরীর। কিন্তু শুষ্ক কন্ঠে খালি বলতে পারলাম -"হু"!
অফিস ছুটির সময় হলে হলে পা যেন সরতেই চায় না। বাসায় ফেরার কথা চিন্তা করলেই অবশ হয়ে আসে।
কিন্তু, সবচেয়ে বিভীযিকাময় যায় রাতটা।
ভেবে দেখুন, আমি অসহায়, অরক্ষিত, অপ্রস্তুত অবস্থায় শুয়ে আছি নীলার সাথে একই বিছানায়! নীলা আবার কোল বালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারেনা।
মাঝরাতে বাতাসের অভাবে খাবি খেতে থাকে ফুসফুসটা!
নাকের উপর বালিশ চেপে ধরলো নাতো ডাইনীটা?!!
হুড়মুড় করে উঠে বসে ছিটকে পড়তে যাই। নাহ!
নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! কোল বালিশ চেপে ধরে।
প্রায়সই বাকিরাতটুকুতে চোখের পাতা এক করতে পারিনা। লিভিং রুমে বসে একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে সময়টা পার করে দেই। তবুও বেডরুম থেকে বের হয়ে এসে অনেকটাই স্বস্তিতে থাকি। আতংকটা বাঁধা পড়ে থাকে নীলার পাশ ঘেষে!
জানিনা এভাবে কতদিন বাঁচতে পারবো।
কতোদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে মেয়েটা।
আজকে ও খুব সাজ গোঁজ করেছে।
সন্ধ্যায় শাওয়ার নিয়ে মাথায় দিয়েছে বেলী ফুলের মালা। কে এনে দিয়েছে জানতে চাইনি। রাতের খাবার আগে ভাগেই দিয়ে দিলো।
কাজের মেয়েটাকেও বিদেয় করে দিলো একটু আগেই।
জানিনা আমার ইনটুইশনের কারণেই কিনা, আজকে আতংকটা আমাকে নিস্তেজ করতে পারছে না। লক্ষ করলাম ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছি আর একটু একটু হাঁপাচ্ছি।
কিন্তু বেডরুমের দরজাটা বন্ধ করে যখন হালকা আলোটা জালিয়ে দিয়ে ঘুরে দড়ালো সে; তখন অনুভব করলাম আমার সব প্রতিরোধ অসহায় হয়ে পড়েছে ওর কাছে। শীতল হয়ে আসছে হাত পা।
মুখে রহস্যময়, লাস্যমাখা হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো আমার দিকে।
তীব্র কামনায় মৃদু উম্মোচিত হয়ে আছে গোলাপী ঠোঁটজোড়া।
বুকের ভেতরে হৃদপিন্ড যেন ছিঁড়ে আসতে চাইলো প্রবল আতংকে!
নিরুপায় প্রতিবর্তকে (Reflex) হাত বাড়িয়ে তুলে নিলাম পাশ বালিশটা!
পরিশিষ্ঠ
পুলিশ এসে যখন বিশিষ্ঠ গায়িকা নীলা আহমেদের শ্বাসরোধ করে হত দেহটা উদ্ধার করে; তার স্কিটজোফ্রেনিয়াক স্বামী আফজাল রহমান তখনও ঘরের কোণে গুটিসুটি মেরে থর থর করে কাঁপছিলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

