সম্ভবত জ্বর কাটার ঘোরেই সব উল্টা পাল্টা লাগছে!
তিনদিন ধরে বিছানাতেই পড়ে ছিলাম। ভাইরাস জনিত সর্দি জ্বর ছাড়া আর কিছুই না। এটাই যে এতোটা ভোগাবে , কে জানতো?!
নাক বন্ধ হয়ে প্রায় শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেছিলো। কালকে কিছুটা ভালো লাগায় আজ বের হয়েছিলাম অফিসের দিকে।
সকালেও কিছুটা অস্বস্তি লাগছিলো কেন যেন। সারা ঘর জুড়ে কেমন একটা আতর- তেজপাতা মেশানো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। অথচ আমি যেই কোলনটা ব্যবহার করি সেটা 'জিলেট' এর। শেষমেশ একগাদা স্প্রে করায় মনে হলো গন্ধটা দূর হয়েছে।
যাচ্ছিলাম বাসে করে। পথের মধ্যে এখন আবার এই বিপত্তি।
কপালে হাত দিয়ে দেখলাম; জ্বর আছে বলে তো মনে হচ্ছেনা!
অনেকে হয়তো ভাবছেন, এ আর এমনটা কি! রাস্তায় তো কতো গন্ধই ভেসে বেড়ায়! ( তেজগাঁও এর নাবিস্কোর কাছে বিস্কিটের গন্ধটাতো আমার নিজেরই খুব ই প্রিয়! ) তাছাড়া সর্দি সারলে ঘ্রাণ শক্তি অনেক সময় একটু তীক্ষ্ণ বোধ হয় বৈকি!
কিন্তু তাই বলে এমন চমৎকার এসি বাসের ভেতর ফার্মের মুরগীর তীব্র গন্ধ ভেসে বেড়াবে?! আর গন্ধটা কোন প্যাকেট বা বস্তা থেকেও আসলে হতো। গন্ধটা বেশী আসছে পাশের সীটের ভদ্রমহিলার কাছ থেকে! চারপাশে সুবেশী সব ভদ্রলোকেরা অফিসে পৌছানোর জন্য ব্যগ্র হয়ে বসে আছেন। কাউকে মুরগীর ব্যাপারী বলে তো মনে হচ্ছেনা। শুধু কি তাই। আরো কিছু গন্ধ আছে যা চেনা কিছুর সাথে মেলাতেই পারছিলাম না। একবার মনে হলো সামনের সীটের টেকো ভদ্রলোকের গাঁ থেকে কাঁঠালের তীব্র ঘ্রাণ পাচ্ছি। কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকলাম। সামনের সিটের টেঁকো লোকটা নামার সাথে সাথেই কাঁঠালের গন্ধটা হারিয়ে গেলো! আজব তো! লোকটার হাতে কিন্তু কোন কাঁঠাল দেখিনি, হতে পারে সকালে ঠেসে কাঁঠাল খেয়ে এসেছে। তবে, ব্যাটা যে এক নাম্বারের মিথ্যেবাদী সেটা আমি নিশ্চিত! আমার সামনে টিকেট কাটলো ফার্মগেটের, নেমেছে মহাখালীতে।
কনডাক্টর এসে ভাড়া চাইলো পাশে মহিলার কাছে। সে আরেক দৃশ্য! উনি দশ মিনিট ধরে ব্যাগ খুলে ঝেরে ঝুরে চারআনা আটানা মিলিয়ে ৯ টাকা ৫০ পয়সা ভাড়া দিলেন। কনডাক্টারও ততক্ষণে অধৈর্য্য হয়ে পড়েছিল নিশ্চই। বাকি আটআনা আর চাইলোই না! কত আজব আজব লোক যে দুনিয়ায় আছে! মহিলাকে দেখলেই বুঝা যায় মহা কৃপণ! একটা টিস্যুকে চারটুকরা করলো বাসে বসে বসেই! সেখান থেকে একটা টুকরা নিয়ে নাক মুছলো, বাকি তিনটা ব্যাগের পকেটে! মহিলার কাজকর্ম হয়তো
আরো কিছুক্ষণ ফলো করতাম। কিন্তু ততক্ষণে বাসের ভেতরে ভাড়া নিয়ে তুলকালাম বেঁধে গেছে কনডাক্টার আর একটা কলেজ ছাত্রের ভেতরে! কেউ কাউকে ছাড়তে রাজী না। এই হট্টগোলের ভেতরেও আলাডা করে টের পেলাম কনডাক্টার আর সেই ঝগড়াটে ছাত্রের শরীর থেকে তেলাপোকার তীব্র গন্ধ পাচ্ছি। ঝগড়ার দাপটের সাথে সাথে গন্ধটাও যেন বাড়ছিল!
হঠাৎ করে বিদ্যুত চমকের মতো একটা চিন্তা খেলে গেলো মাথার ভেতর! আচ্ছা, এমনটা কি হতে পারে, কোন কারণে আমি মানুষের চরিত্রের গন্ধ পাচ্ছি?!
তবে ধারণাটা নিয়ে খুব বেশী ভাবনার সুযোগ পেলাম না। আমার স্টপেজ চলে এসেছে ততোক্ষণে। মাথায় তখন বসের চিন্তা। তিন দিন অফিস মিস দেয়ায়, বদ লোকটা কিভাবে ঝাড়িটা দিবে সেটাই ভাবছি।
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই!
ডেস্কে বসতে না বসতেই তলব এলো ভেতর থেকে!
এসি করা রুম; অথচ ঢুকতেই পাঁঠার বিকট বোঁটকা গন্ধে বমি পেয়ে গেলো। মুখটা বোধকরি বিকৃত করে ফেলেছিলাম-
"থাক থাক, আর মুখ না বাঁকালেও চলবে; বুঝেছি; খুব অসুস্থ ছিলেন গতকদিন!" - তীব্র শ্লেষ মাখানো লোকটার প্রতিটা উচ্চারণে!
"জী, মানে স্যার, আমি এটা পাওনা ছুটির সাথে এ্যাড্জাস্ট করে নিবো নাহয়।"- ভাড়টাকে থামানোর একটাই উপায়।
"সেটা দেখা যাবে!"- গলার সুরটা একটু নরম হলো মনে হয়! "সামনের শীপমেন্টের আগে যেন আর কোন অযুহাত শুনতে না হয়। এখন বিদেয় হন!"
এক প্রকার ধমক দিয়েই বিদেয় করে দিলো ব্যাটা আমাকে। তবে রুম থেকে বের হবার আগেই আসলে আমি তার ধাঁতানির কথা ভুলে গেলাম। মাথায় তখন আবার ঘ্রাণ বিষয়ক ভাবনা।
আমি ঠিকই ধরেছিলাম! মানুষের চরিত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমি! এটা নিশ্চই মানসিক কোন ব্যাপার। কেন হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে, সেটা জানিনা। কিন্তু আমি পাচ্ছি!
একটু পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম!
আমাদের ডাইনিং এর বুয়া তার ঝগড়ার জন্য বিখ্যাত। চা দিয়ে যেতে বলেছিলাম। টেবিলে চা রাখার আগেই পেলাম তেলাপোকার গন্ধটা! ঠিক বাসের ভেতর পাওয়া কনডাক্টার আর কলেজের ছেলেটার মতো!
আমার পাশে বসেন একাউন্টসের রমিজ সাহেব। কাছে না গিয়েও বাসী টক দৈ এর মতো যে ঘ্রাণটা পাচ্ছিলাম, আমি নিশ্চিত আমাদের এমডির কাছ থেকেও এমন গন্ধই পাবো; লোভী মানুষের গন্ধ!
পিয়ন শামছু যখন সিগারেটের ভাংতি টাকা দিয়ে গেলো, না গুনেই টের পেলাম কিছু টাকা সরিয়েছে চোট্টাটা। রসুনের গন্ধটাতাহলে চোরদের !?
দুপুরে লান্চের আগ পর্যন্ত এইসব ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকেই অনেকটা সময় কেটে গেলো। অস্থির লাগছিলো।
নাঃ! কাউকে খুলে বলতেই হবে।
মওকাটা পেলাম ক্যাফেতে। আমি, অসিত আর রিমু বরাবর একসাথে লাঞ্চ করি। অসিত আমার সেকশনেই কাজ করে। রিমু এইচ আরডিতে। কিন্তু আমাদের দুজনের সাথেই ওর খাতিরটা বেশী। আড়ালে লোকজন কিছুটা ফিসফিস করে টের পাই। পাত্তা দেইনা। রিমু আমার খুব ভালো বন্ধু আর অসিতের সাথে কিছু আছে বলে তো মনে হয়না।
দুজনকে খুলে বল্লাম সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা।
প্রশ্নটা কেন যেন আশা করছিলাম রিমুর কাছ থেকে; করলো অসিত।
"দোস্ত, আমার কাছ থেকে কোন ঘ্রাণ পাচ্ছিস?"
"হুম; লবঙ্গের! "
"মজার ব্যাপার তো!" অবাক দেখালো রিমুকে! "মাসীর কাছে গেলে কিন্তু আমি এমন একটা ঘ্রাণ পাই!"
মাসী মানে অসিতের মা; আমরা সুযোগ পেলেই অসিতের বাসায় আড্ডা দেই। আমার মনে পড়লো, মাসীর সাথে অসিতের মিলটুকু। মায়ের সরলতার সবটুকুই পেয়েছে সে। এমন প্রতিভাবান একটা ছেলে এতোটা সাদাসিধে, না মিশলে কেউই বিশ্বাস করবে না।
অসিতকে কিছুটা চিন্তিত দেখালেও রিমু দেখলাম হাসছে মুখটিপে।
"যাক বাবা, ভালোই হলো; এখন থেকে তোমাকে নিয়ে মিটিং এ গেলেই হবে, কে কেমন লোক সেটা শুঁকে শুঁকে আগে থেকে জানিয়ে দিবে আমাদের!" রিমুর গলার স্বরে দুষ্টুমীটুকু টের পাই।
রসিকতাটা কেন যেন পছন্দ হলো না।
"আচ্ছা, রিমুর কাছ থেকে কোন গন্ধ পাচ্ছিস?"
আগ্রহটা অসিতেরই বেশী মনে হলো। রিমু প্রশ্ন শুনে মুখ টিপে হাসলো; কোন কথা বললো না। উৎসুখ তার চোখও।
একটু ভেবে নিয়েই বল্লাম।
"গোলাপের পাপড়ির সাথে কেমন যেন একটা স্পিরিটের গন্ধ। ঐ যে নেল পলিশ রিমুভার আছে না? তেমন।"!
আসল কথাটা চেপে গেলাম; ওটা স্পিরিট না, একদম ওয়াইনের মাতাল করা সুবাস!
রিমু হাসতে গিয়ে বিষম খেলো।
অসিতের নিস্পাপ চাউনিটা একটু বোকা বোকা হয়ে গেলো।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।
রিমু হাসি থামিয়ে বললো," তুমি দেখছি আমাকে কক্টেল বানিয়ে ফেল্লে!"
"আমার যেটা মনে হলো, সেটাই বল্লাম" -অসহায়তা আমার গলার স্বরেও।
রিমু আর কিছু বল্লো না। রহস্যের হাসির ছটা তার চোখে মুখে খেলা করছে।
লাঞ্চের পর কাজে একটুও মন বসাতে পারছিলাম না। চারদিকের নিত্যনতুন ঘ্রাণ তো আছেই, সেই সাথে মাথায় খেলা করছিলো রিমুর হাসির ছটা। কেন যেন ওর কথা ভাবতে ভালো লাগছিলো।
আচ্ছা, রিমুও কি..........?
নাহ! মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল্লাম ভাবনাটা। ও আমার খুব ভালো বন্ধু; কখনোতো কিছু বলেনি। আভাসে ইঙ্গিতেও তো কিছু বুঝায়নি। এটা আমারই বোঝার ভুল।
কিন্তু, কেন যেন ভাবনাটা মাথা থেকে একেবারে দুর করতে পারছিলাম না। তার উপর আশে পাশের নানা ঘ্রাণের আনাগোনা মনটাকে একেবারেই স্থির হতে দিচ্ছিলো না। এক ফাঁকে চলে গেলাম এইচ আর ডি তে। রিমু ডেস্কে একাই ছিল। আমাকে দেখে আবার মুখটিপে হাসলো।
মেয়েটা আজকে এতো রহস্যময়ী হয়ে উঠলো কেন?!
"আচ্ছা, প্লিজ বলবে, তোমার কাছ থেকে পাওয়া এই ঘ্রাণটা এমন হচ্ছে কেন?" অনুনয়ের সুর আমার কন্ঠে।
ও উঠে দাড়ালো ডেস্ক ছেড়ে।পূর্ণ চোখে তাকালো আমার দিকে।
"এটা ভালোবাসার মহুয়া গন্ধ!" আরেকবার মুখ টিপে হাসলো সে।
আমি কিছু বলার শক্তি হারিয়ে ফেল্লাম।
চকিত পায়ে বসের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা রিমুর চমৎকার দেহবল্লরীর দিকে বিমুঢ় ভাবে তাকিয়ে থাকলাম।
কি বলে গেলো মেয়েটা?!
তবে একটা জিনিষ, বেশ বুঝতে পারছি! সকাল থেকে আমার নিজের দেহে যে হালকা ঘ্রাণটা পাচ্ছিলাম, সেটা আসলে কিসের গন্ধ!
আমি নিশ্চিত, বোকা- গাধা টাইপ লোকেদের গায়ের গন্ধটা, হালকা আতর- তেজপাতা মেশানো হয়!!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

