আব্বা চলে গেলেন।
আমাদের খুব বেশী ভাবনা-চিন্তার সময় আর ঝামেলার বোঝা না চাপিয়েই বিদায় নিলেন তিনি। সারাজীবন যিনি বাহুল্যতাকে এড়িয়ে, নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন; শেষ মূহুর্তটি পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানদের নির্ঝঞ্ঝাট রাখতে চেয়েছিলেন।
হঠাৎ করে ব্লাড প্রেশার ড্রপ করার কারণে ১৬ই জুন, মঙ্গলবার ভর্তি হলেন ক্লিনিকে। ডিহাইড্রেশন আর দূর্বলতা ধরা পড়লো। রাতটি ক্লিনিকেই থাকতে হয়েছিল; ব্লাড প্রেশার রেগুলার হলেও দূর্বলতার কারণে স্যালাইন দিতে হচ্ছিল, মুখে তেমন কিছুই খেতে পারছিলেন না। কিন্তু পরদিন থেকে কিডনি ফাংশন কিছুটা অনিয়মিত হয়ে গেলো; একটু ঘোরের ভেতরেই ছিলেন। এর ভেতরেই বিড়বিড় করে আমাকে বললেন, মা'কে নিয়ে যেন বাসায় চলে যাই। অভ্যাসমতো তসবির খোঁজে মাঝে মাঝে ভুল করে আঁকড়ে ধরছিলেন স্যালাইন টিউব। সেটাকেই আঁকড়ে ধরে জপছিলেন নীরবে।তখনও আমার মাথায় খেলেনি উনার চলে যাবার চিন্তা।
বুধবার রাতে খুব একটা বেশী জানান না দিয়েই নীরবে চলে গেলেন তিনি।
বৃহস্পতিবারে চিরতরে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে গেলেন। পিতৃপুরুষের শায়িত ভূমিতেই তার স্থান হলো; একদিন আমরাও যেখানে ফিরে যেতে চাই।
পেছন ফিরে তাকালে বাবাকে দেখি একজন অসম্ভব ধৈর্য্যশীল আর কষ্টসহিষ্ণু একজন মানুষ হিসাবে। ক্লাশ ফাইভে পড়ার সময় পিতাকে হারিয়েছিলেন। অসম্ভব কষ্টের ভেতর দিয়ে ছোট দুটি ভাই বোন আর বিধবা মা কে নিয়ে জীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। কারো কাছ থেকে খুব বেশী আশা করেন নি কখনোই; হয়তো চেয়ে কখনো পান নি বলেই। সৃষ্টিকর্তার উপর তার অগাধ বিশ্বাসকে কখনো টলতে দেখিনি। খুববেশী এক্সপেক্টেশন কখনোই ছিলনা তার। কিছুটা স্বাচ্ছন্দ থাকলেই তিনি তৃপ্ত থাকতেন। ছোটবেলায় খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গতো ওনার অজিফা পড়ার শব্দে। একদিন লেখাগুলি খুলে দেখেছিলাম সেখানে তার কয়েক প্রজন্ম পূর্বের সকলের নাম উল্লেখ করা আছে, তাদের শান্তি কামনা আর তাদের জন্য দোয়া। নিজের পরিচয়কে কখনো বিস্রৃত হননি তিনি। প্রথম জীবনে আধ্যাত্মিকতাকে আঁকড়ে ছিলেন বেশ কিছু বছর। পরে তার শিক্ষকের ( বাইতুশ শরফের বড় ইমাম আখতার সাহেব) নির্দেশে সংসার ধর্মে চলে আসেন। ধর্মান্ধ ছিলেন না কিন্তু ধর্মভীরু ছিলেন। কখনও কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলতে বা কটুকাটব্য করতে শুনিনি ওনাকে। সন্তানদের গায়ে হাত তুলেছেন বলেও দেখিনি। বড়জোর ধমক দিতেন। শত আঘাত পেলেও প্রতিঘাতের চিন্তা ছিলনা তার; সবসময় বলতেন- " থাক, বাদ দে।'
সরকারে চাকুরীতেও সততার বাইরে কখনো কোন ভাবনা আনেননি। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত নিজের উপার্জনে চলেছেন। বড়জোর মাঝে মাঝে কিছু অর্থ চাইতেন অভাবী লোকজনদের দিবেন বলে।
গত তিন মাস চট্টগ্রামে যাবো যাবো করে যাওয়া হয়ে উঠছিলো না। ১৫ তারিখে গিয়েই ওনাকে হারিয়ে আসলাম দুদিন পর।
হয়তো উনি অপেক্ষায় ছিলেন।
ছয়বছর আগে আজকের এই দিনে উনি অকালে কনিষ্ঠ সন্তান কে হারিয়েছিলেন। তারপরও সৃষ্টিকর্তার মহিমাকির্তনে তার কোন দ্বিধা ছিল না কখনো। যদিও সেই শোক তাকে খুব বেশী কাবু করে রেখেছিল এ কটা বছর। সেই জুন মাসেই প্রিয় সন্তানের কাছে চলে গেলেন তিনি।
আমরাও অপেক্ষায় থাকলাম;
সময় হলে পিতা তোমার কাছে যাবার জন্যে।
ভেবেছিলাম বাবা দিবসে কিছু লিখবো, সম্ভব হলে ওনাকে দেখাতাম। হলো না। কষ্ট টা সারাজীবনের জন্য রয়ে গেলো; আমার কিংবা রানার লেখালেখির তেমন কিছু উনাকে দেখানো হলো না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

