১.
সে তাকিয়ে থাকতো নীল আকাশের দিকে, সাদা সাদা মেঘ উড়ে যায়। দেখে মনে হতো গ্রামে ফেলে আসা সারি সারি সাদা কাশ ফুল। যখন মনটা উদাস হয়ে যেত তখনি কবিতার খাতা খুলে লিখে ফেলতো কবিতা অথবা নিজের মনের কথা ছন্দের ভাষায়- শুধু নিজের জন্য! ইদানিং ক্লাশ খুব একটা হচ্ছে না। দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে তার থোড়াই কেয়ার কিন্তু তার কাছে এই গুরুত্বহীন জিনিসটিই নিয়ন্ত্রন করছে রাস্ট্রের প্রতিটি প্যারামিটার।
পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে তবে সময়মতো পরীক্ষা হবে কিনা সেটা নিয়ে যথেস্ট সন্দেহ থেকে যায়। একদিন পাবলিক লাইব্রেরীতে বসে টুকিটাকি নোট করছিলো, এমন সময় পাশে এসে দাড়ালো শরত।
-গত ক্লাশের নোটটা কি আছে?
-(সে একটু অবাক হয়ে)উমম.. আজ আনা হয়নি!
-তা কী খবর?
-এই তো!
-পরীক্ষার ডেট পিছানো হবে বোধ হয়।
-এটার কোনো মানে হয় না।
-তোমারতো সমস্যা নেই, আগে হোক পরে হোক তুমি টপ করবেই!
আসলেই তাই। ক্লাশে ১ম বর্ষ থেকেই সে প্রথম হয়ে আসছে, কিন্তু এটা কোনো যুক্তি নয় তার কাছে। শুধু শুধু সময়ের অপচয়।
অবশ্য তার অপচয়ের দিন গুলোতে অবশ্য শরত ঠিকই সময় দিতো। যখন তাকে হতাশায় গ্রাস করতো, শরত তার নির্মল হাসি দিয়ে মাথাটা বুলিয়ে দিতো, ধুয়ে ফেলতো সকল দুর্ভাবনা। এখন সে উদাস হলে দুটো জিনিস নিয়ে চিন্তা করে-একটা হলো কবিতা আরেকটা শরতকে নিয়ে বুনা নতুন দিনের ভাবনা।
২.
চতুর্থ বর্ষে পা দিয়েই ওরা বিয়ে করে ফেললো।নতুন সংসার। এখন শরত পুরোপুরি ভার্সিটির বড়ভাই যাকে বলে বিরোধী দলের ভাষায় "বিপ্লবী নেতা"। এদিকে সরকারের দমন পীড়ন নীতি দিনে দিনে বাড়তে লাগলো আর ভার্সিটি হতে থাকলো অশান্ত। ভার্সিটিতে গেলেই দেখা যায় মিছিল মিটিং যেনো মনে হয় এই নোংরা রাজনীতির কাছে এত গুলো মেধাবী জীবন কতটা অসহায়। শরতের সাথে এখন মাঝে মাঝেই ঝগড়া হয়। একসময় সে হাল ছেড়ে দেয় ইচ্ছা করেই। কারন আসছে নতুন অতিথি আর শরত যা করছে তা তাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই।তখন নিজেকে বেশ স্বার্থপর মনে হয়।
কোনো এক মঙ্গল বার সামিহা ভার্সিটিতে যায় পরীক্ষার ডেট জানতে যদিও কিছুদিন আগে এক হত্যাকান্ডের জের ধরে ভার্সিটি অনির্দিস্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। ঘরে যেনো মন টেকে না, এখন শরীরের এমন অবস্হা যে সাবধানে পা ফেলতে হয়। শরত অবশ্য দুদিন ধরে বাসায়ও আসছে না। আসলে হয়তো তার এ কারনেই ভার্সিটিতে ছুটে আসা। ওর ঘরে ফেরাটাই নিয়মিত ভাবেই অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। মধুর ক্যান্টিনে বসে যখন চা খাচ্ছিলো এমন সময় জহিরের সাথে দেখা!
-আরে সামিহা, কেমন আছিস?
-এই তো! তোদের কোনো খবর নেই কেনো?
-আর খবর! (মন খারাপ করে)আসলে আমাদের বোধ হয় কিছুই করার ছিলো না!
-এসব ঝামেলা না করে কি পেটের ভাত হজম হয় না? শুধু শুধু বসে থেকে ক্যারিয়ারের তেরটা বাজানো!
-মানে, আমি কি বলতে চাচ্ছি, সেটা কি জানিস না?
-কোন ব্যাপারে?
-শরত.. ওকে কালকে ডিবি ধরে নিয়ে গেছে ক্যাম্পাস থেকে।
সামিহার বুকটা ধ্বক করে উঠে, হাত থেকে চায়ের কাপটা পরে যায় মেঝেতে। হঠাত মনে হলো তার চারপাশের পৃথিবীটা চূর্ন বিচূর্ন হয়ে যাচ্ছে চায়ের কাপের মতো আর ঘন আধার তাকে গ্রাস করছে। এরপর আর ওর কিছুই মনে নেই!
৩.
আজকের সকালটা দারুন। শুধু দারুন বললে ভুল, অতিরিক্ত মাত্রায় দারুন! মনে হয় চুলে দুটো ঝুটি বেধে কিশোরীদের মতো ছাদে গিয়ে আকাশ দেখতে শরতের এই নির্ঝর দিনে আর নাচতে- কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা, মনে মনে..
ইরিন এসে বসলো নাস্তার টেবিলে, খুব সুন্দর লাগছে ওকে! ক্লাস সিক্সে পড়ে, কিন্তু ভাব দেখে মনে হয় বাসার মুরুব্বি! ঝুটি বেধেছে দুটো। চোখদুটো ঠিক ওর বাবার মতো। একটা সাদা ফ্রক গায়ে লাগছে সাদা পরীর মতো!
শরত চলে যাবার কয়েক মাস পরেই ইরিন আসে পৃথিবীতে।তখন ও একটা জটিল পরিস্হিতির মুখে পড়ে। শরতে পরিবার ওদেরকে মেনে নেয়নি। এদিকে পিতা হীন সংসারে ওর মাও ওদের বইবার মতো সমর্থ ছিলো না। পড়াশুনা শেষ করবে সেটাও বোধহয় ওর কপালে লেখা নেই। টিউশনি যোগাড় করতে পারে মাত্র একটি, কিন্তু তাতে মুক্তবাজার অর্থনীতি আর পুজিবাদী গনতন্ত্রের চাপে নিজের আর ইরিনের শরীরের পুস্টি নিয়ে বড় টানাটানি দেখা দেয়। তার কিছুদিন পরই শরতের যাবজ্জীবন সাজা হয়ে যায়!
উপায় না দেখে পা বাড়ায় রাতের জীবনে নিজের অজান্তে! টাকা পয়সা ভালই আসতো। মাসে ৪-৫টা ক্লায়েন্ট মানে অনেক টাকা আর বিভিন্ন সুবিধাতো আছেই।কিন্তু মনে মধ্যে দুঃখটুকু একসময় নিজে থেকেই মারা যায়, কখন যে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে নিজেই বুঝতে পারে না! এত চিন্তা করে কি হবে, তার জন্য সকল দৈবিক সম্ভাবনা বৃথা!
তবে আজকে একটা অন্যরকম দিন, কালকে ঈদ এজন্য নয়, আজ শরত মুক্তি পাচ্ছে। আজকে সে বুক ভরে নিবে নির্মল বাতাস, ইরিনের গালে চুমা দিবে আদর করবে মন ভরে!ওরা এখন পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যাবে হাতে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে। আমিও যাচ্ছি তবে শরতের সাথে দেখা করতে নয়, ইরিনের হাসি আর সামিহার আনন্দাশ্রু দেখার জন্য আর ওদেরকে ঈদ মোবারক জানাতে।
আপনাদের সবার কালকে ইরিনের বাসায় দাওয়াত রইলো তার আনন্দ শেয়ার করার জন্য তবে একটা অনুরোধ কেউ যেনো তাদের সাথে চোখের জল আনবেন না, আনবেন শুধু হাসি!
ঈদ মোবারক সবাইকে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

