১.
কেএফসি তে বসে আছি কোনটা দিয়ে শুরু করবো সেটা ভেবে, হঠাত এক জুনিয়র পোলা এসে জুটলো।
-আরে ভাইয়া কেমন আছেন?
-এইতো, তুমার কি খবর?
-এইতো।
-চাকরি-বাকরি?
-ভালোই চলছে?
-বিয়ে শাদী?
-আরে না ভাই, আপনেরা থাকতে কেমনে আগাই?তবে ভাইয়া একটা কাজ কইরা ফেলাইলাম!
-কারো ভাগাইলা নাকি?
-আরে না, একটা গাড়ী কিনেই ফেললাম।
-ও!
-ভাই লাগে তো আসলে। একটা দরকারী জিনিস তাই কিনে ফেললাম।
-তা ঠিক।
-সাথে একটা লোকও রেখে দিলাম। ওটাওতো দরকার।
-অবশ্যই।
মনে মনে একটা প্যারোডী চ্যাট বানাইলাম:
-ভাইয়া একটা বিবাহ করে ফেললাম। আসলে লাগেতো একটা বুঝেন না!
- তাই নাকি?
-ভাই সাথে একটা লোকও রাওখা দিলাম, এটাওতো প্রয়োজন!
-লে হালু্য়া, দারুন কাম করছো!
প্যারোডীটা মনেই রাখলাম, কারন ছেলেটা সহজ সরল। ওর কেবল সামনে সুখী হবার দিন!
২.
সেদিন শীতের দুপুরে হাটছিলাম মেঠো পথ দিয়ে। কাজ কাম নাই, হুদাই হাটাহাটি। ঢাকা শহরে একলা হাইটা মজা নাই, কারন একলা থাকাটাই টাফ। তয় এই খানে হাইটা একটা আলাদা মজা।কারন আমার লগে হাটতাছে এই গ্রামের অনাথ ফটিকীয় কুদ্দুস। ফটিক নামটা আমিই দিছি, কারন ওকে দেইখাই মাথার মধ্যে এই ওয়ার্ডটাই আসলো। ও একটা গান গাইতাছিলো। ভাবলাম কোনো বাংলা ব্যান্ডের গান, পরে না ঐটা ব্যান্ডের গান আছিলো না, খাস গ্রাম বাংলার গান।
"আমার নতুন গাছে লাউ ধইরাছে, লাউটা বড় সোহাগী, ও আমার লাউয়ের পিছে লাগছে বৈরাগী!"
-ল ফটিক, আমরা দুই বৈরাগী হাটি!
-আমি বৈরাগী না, আমি কুদ্দুস!
-আইচ্ছা ল!
বেসুরো গলার একটা গভীর গান। মাঝে আমার হঠাত মনে হলো আমার গাছে তো লাউও ধরে নাই, বৈরাগী তাহইলে লাগলো কার পিছনে?
ওকে জিজ্ঞেস করি,"বাসায় কে আছে?"
-কেউ নাই? গতকাইলা মা আছিলো, আজকা সেও নাই!
-কেন মারা গেছে নাকি?
-আরে না,গতকাইল রাইতে আরেকটা বিয়া করছে, আর আজকে সকালে আমারে কয় , নিজের রাস্তা নিজে মাপ!
-ক্ষুধা লাগছে?
-ক্ষুধা লাগছে দেইখাই তো গান গাইতাছি!
ক্ষুধা লাগছে বইলাই ও গান গাইতাছে, আমার খুব বুকে লাগলো। চারিদিকে তাকালাম, দেখতে চেস্টা করলাম পৃথিবীটা কি এখন নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, নাকি সময় ক্ষমতা দিয়ে সব জবর দখল করেছে।
কাছাকাছি কোথাও গেলাম খাইতে, অবশ্য ঐ জায়গাটা ও নিজেই চেনালো। ওর আগে আমি নিজেই খেতে বসলাম, কারন সকালে আমি নিজেই খাই নাই। যখন ওর প্লেট থেকে পরোটা ছিড়ে খাচ্ছিলাম, ওর মুখে ফুটলো একটা সুন্দর হাসি। কিছুক্ষণের জন্য আমার খাবার চিবানো বন্ধ হয়ে গেলো। কি সুন্দর হাসি!কি করা যায় যদি এই হাসিটা ফ্রেম বন্ধ করে রাখতে চাই?
আগে খাবার শেষ করলাম, কারন পেটে ক্ষুধা থাকলে মাথা কাজ করেনা। দিলাম আমার এক বন্ধুকে ফোন, বেটা আবার মহা চোর কিন্তু গরীব, আর গরীব বলেই সে সমানে অফিসে বসে ঘুস খায়।একটা সিগন্যাচার ১০০০০টাকা! বললাম," একটা হাসি ধইরা রাখতে চাই, কিন্তু কেমনে?"
ও কইলো,"আর কারো পাইলি না,আমারেই ফোন দিলি!৫টা মিনিট ওয়েট কর আমিই ফোন দিতাছি!"
এই বইলা লাইন কাইটা দিলো। আমি জানি ও আর ফোন করবে না, হয়তো লাইন অলরেডী বন্ধ করে দিয়েছে। আমি কাকে ফোন করবো বলে ভাবতে লাগলাম আর এদিকে কুদ্দুস একটা ঠোকনা দিয়া কয়,"কি হইলো?এত খাইলেন এখন বিল দেন না কেন?"
আমি টাস্কি খাইলাম। আরে বিল দেয়া হয় নাই। পকেট হাতড়ে একটা কচকচা ৫০০ টাকার নোট দিলাম। দোকানী আমার দিকে তাকাইয়া ক্রোধে ফাইটা পড়লো। ফটিক মিয়া অন্যদিকে তাকাইয়া গান ধরলো," আমায় ভাসাইলিরে, ডুবাইলি রে!"
দোকানদার খুব কস্ট কইরা ভদ্র ভাষায় কইলো,"ভাই ভাংটি নাই, এই গ্রামে তিন দিন ধইরা বিক্রি করলেও ৫০০ টাকা হয় না।"
আমি পরলাম মুসিবতে। দিলাম ড্রাইভাররে ফোন, মাগার ফোন দিতে গিয়া দেখি ঐ চোর শালায় ফোন দিছে। কি আচায্য, ও ফোন দিলো কেন?
-কিরে, ভেজাল কি আছে নাকি ছাইড়া গেছে?
-আরো ভেজাল ঘাড়ের উপর বাটখাড়ার মতো জুটছে! এখন বল ফোন দিলি কেন?
-ঐ পিচকিরে কুরিয়ারে কইরা ফেনীতে পাঠাইয়া দে। আমার দাদার জন্য ফোন দিছিলাম। দাদার সাথে থাকবো নে আর লেখা পড়া কইরা নিজের আখেরও গুছাইবো নে। দাদা মরতে মরতে পিচকি বড় হইয়া যাইবোনে। তয় পিচকির কি হাত টানের অভ্যাস আছে নিকি?
-মনে হয় না, কারন অনেকক্ষন ধইরা লগে আছে। আমারে নিজে নিয়া একটা দোকানে খাওয়াইলো, তয় ভেজাল হইছে বিল দিবার পারতাছি না।
-কেন তোর কাছে টাকা নাই? তাইলে একটা কাম কর পিচকি যেই মাইর খাইবো তা তোর মাইরের সাথে এ্যাড কইরা ল।
-আরে না টাকা আছে, মাগার ভাংতি নাই।
-তাইলে টাকাটারে দুই ভাজ কইরা ভাইঙ্গা দে, নাকি শরীরে বল নাই? যাই হোউক,কুরিয়ারের ঠিকানা এসএমএস কইরা দিতাছি। তগো কোম্পানীরে কিছু ভিক্ষা দেই!
এমন সময় কুদ্দুস আমার শার্ট ধইরা টান দিলো। আমি কইলাম কি হইছে?
-ট্যাকা দেন, আমি ভাংতি কইরা আনছি।
আমি দেখলাম ওর হাতে ৫টা ১০০ টাকার নোট। আমি হালে পানি পাইলাম। পাশের মুদির দোকান থিকা ম্যানেজ কইরা আনছে।
হিসাব চুকতা কইরা কইলাম, মহাফটিক কুদ্দুস বয়াতী, যাইবা নাকি আমার লগে? আমার হাতে কাজ আছে। থাকতে হইবো ফেনী। থাকা খাওয়া ফ্রী, লগে স্কুলে পড়ান হইবো।
সে কিছুক্ষন আমারে পর্যবেক্ষন করলো।
আমার গেন্জীর দিকে নিশানা কইরা কইলো,"আপনি কি এই কোম্পানীর লোক?"
-লোক না গতর খাটা কেরানী!
সে হাইসা কইলো,"আমারে এরম এটা গেন্জী দেন।"
-তার আগে ল তোর বাসায় যাই, তো মা-বাপেরে জানাইয়া আসি তুই চাকরি পাইছোস!
-না যামুনা!
-আরে ল!
জোর কইরা টান দিলাম। দেখি যাইতে চায় না, তাও জড়াজড়িতে নিয়া গেলাম। বাসায় গিয়া দেখি আক্কেল গুড়ুম দেখি টিনের বাসা আর উঠানের এক মহিলা ওরে দেইখা বুকে টাইনা নিলো। কুদ্দুস দেখি ধরা পড়া চোরের ন্যায় আমার দিকে তাকাইয়া রইলো।আমিও বুঝতাছিলাম না কি হইছে ঘটনা খানা। পরে যেইটা জানতে পারলাম গতকাল দুপুর থিকা এ লাপাত্তা কারন সকাল বেলা নাকি বাপে সান্টিং মারছে। পুরা ঘটনা মাথায় ঢুকার পর আমার নিজেরই কুদ্দুস বইলা মনে হইলো। তবুও একটা উন্মাসিক পোলার বাউন্ডুলে কাজ, এই না হইলো কি মানুষ, উদাস পুলাপান।
আমি আবার একলা!
৩.
একবার কোনো এক দম্পতী গিয়েছিলো এক হাসপাতালে খুব সম্ভবত ডাক্তার দেখাতে। হঠাত জানতে পারলো তাদের সন্তান কোনো কারনে হচ্ছে না। তাদের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তারা কথা বলতে বলতে জানতে পারলো আজ নাকি একটা নবজাতক শিশুকে হাসপাতালের ডাস্টবিনে পড়ে থাকতে দেখেছে কোনো ওয়ার্ড বয়। সুন্দর ফটুফুটে নাদুস নুদুস। কে যে রেখে গেলো বুঝতে পারছে না। সদর হাসপাতাল, ব্যাবস্হাপনাও ঢিলে ঢালা, তাই কে যে করলো কাজটা কোনো খবর নাই। তখন ঐ দম্পতি একটা ডিসিশন নিলো। তাকে নিয়ে এলো বাসায় যা জানতে পারলো দু'তিনজন মানুষ। ছেলেটা লকলকিয়ে বড় হয়ে উঠলো। সবাই ভুলে গেলো ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাবার কথা, বরং সবাই জান দিয়ে ভালো বাসলো তাকে, ভুলেও মুখ খুললো না কখনো। আসলেই ছেলেটা সৌভাগ্য বান।
ছেলেটা ছোটবেলা থেকে উদাস হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে দুস্টমী, মাইরের টাইম হইলে উদাস ভাব। মারবেই বা কিভাবে পোলাটা হেভী কিউট ছিলো। কিন্তু কিউট পোলাটা শত ভীড়ের মাঝেই নিঃসঙ্গ। চিন্তা ভাবনা সব উচ্চমার্গের। নিজেকে কি ভাবতো কে জানে, তবে মাঝে মাঝে উধাও হওয়াটা ছিলো একটা ছুপা স্বভাব।
ছেলেটি পথে নেমেছিলো একদিন নীল মায়ার হাতছানিতে। নিঃসঙ্গতায় হেটে যেতে আবিস্কার করে নিঃশব্দ চাদ তার সঙ্গী। এখন সে হাতড়ে বেড়ায় পুরোনো সুখস্মৃতি।
তার জীবনে এসেছিলো প্রেম নিরবে, সুখে এসেছিলো মহাসমারোহে, অশ্রু এসেছিলো বিষন্ন ঘোড়ায় চড়ে। সে গড়ে তোলে তার স্বপ্নের পৃথিবী বিন্দু থেকে। তার সঙ্গী হয় ছন্দহীন এলোমেলো কবিতারা। সবকিছু চলে গেছে, শুধু কবিতা থেকে গেছে সঙ্গ দিতে।
৪.
আজকে ভ্যালেন্টাইনস ডে। ছোটকালে এই দিনটা আমার জন্য বিশেষ কোনো দিন ছিলো না। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্বগুলো, কোথায় কোন ব্লাকহোল পাওয়া গেলো, শ্যারন স্টোন কবে, কখন, কাকে কাকে বিবাহ করলো, ম্যাডোনার সাথে কবে গাই পিয়ার্সের বিচ্ছেদ ঘটবে, মেটালিকার নতুন এ্যালবাম টপ চার্টের কততে উঠলো! হঠাত করে আজ লক্ষ্য করলাম এই ভ্যালেন্টাইনস ডে টা আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারন সকালে অফিসে এসেই জানতে পারলাম (মূলত আমার এক কলিগ হচ্ছে এখানকার নিয়মিত ব্লগার)নীতিমালায় চেন্জ্ঞ এসেছে। অপার বাস্তব ২ ছাপানো হচ্ছেই। আমার এক প্রিয় কলিগ আরো ভালো জবের প্রস্তাব পেয়ে চলে যাচ্ছে আজই। আমার সাগরে যাবার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে (যদিও বাসায় কেউ জানে না এখনও)। এক সাথে অনেক গুলো নিউজ। যেই ব্লগ রীতিমত ছেড়েই দিলাম সেই ব্লগের এই নিউজ পেয়ে ছুটে আসলাম। যদিও এখনও ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষ্যে কারো ফোন পাইনাই, এক্সপেক্টও করি নাই অবশ্য, তবু মনে হয় অসম্ভবের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমি নিজের কাছেই এখন অসম্ভব হয়ে গেছি। কতটা জানি না, তবুও আশা করি আমার খুব কাছের মানুষদের কাছে এখনো সেই আগের পুলাপানই আছি। কত নরমাল আমি সেটা নিজেই বুঝতে পারি না। অবশ্য আমার সাথে যারা অনেক আগে থেকেই মিশছে তাদের কাছে রনি মানেই একটা কিছু আর সেটা যে কি তা তারাই ভালো জানে।
না, আসলেই ভালো আছে উদাসী স্বপ্ন, তবে থেমে গেছে হয়তো তার নিক, তার লেখা, তার বেচে থাকার মানে!(থমকে যাবার আর টাইম পাইলো না!)
হ্যাপী ভ্যালেন্টাইনস ডে!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



