রাতের বেলা জানালা পাশের বিভিন্ন ফ্লাট গুলায় উকি মারতে মারতে খেয়াল করলাম আমাগো এলাকার একমাত্র ট্রান্সফর্মারের একটা ফেজে গাছ লাগতাছে আর ছড়ছড় কইরা আগুন (করোনা) বাইর হইতাছে। লগে লগে কয়েকটা বিল্ডিং আন্ধার। তখনও ট্রান্সফর্মার পুরাটা ট্রিপ করে নাই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন ভিজা গাছ পর্যন্ত আগুনে ঝইলসা গেলো তখন পুরা হাউজিং আমাগো ব্লাক আউট। লগে লগে কামাইল্যারে ফুনাইলাম: দুস্ত কাম আছিলো!
: হ শালা, তুমি তো কাম ছাড়া ফোন করো না। ইদানিং তুমার পাংখা গজাইছে!
হাবিজাবি কথা রাইখা কাজের কথা বলতেই লগে লগে এলাকায় টিম পাঠাই দেবার ব্যাবস্হা করলো। তবু বাইরে সুন্দর বাতাস থাকায় জানালা খুলে ঘুমিয়ে গেলাম একটু বোলগিং চ্যাটিং করে।
সকালে উঠেই দেখি পুরা হাউজিং কোমড় পানির নীচে। মনে পড়ে ২০০৬ সালে যখন খালেক সাহেবের অবৈধ দখলের কারনে হাউজিং এর অর্ধেক অংশে পানি উঠলো তখনই সবাই ডিসিশন নিয়েছিলো খালেককে আর না। কিন্তু এবার এক কনভিক্টেড আসামী আসলামকে ভোট দিয়ে প্রথম থেকেই খেল দেখানো শুরু করেছে। কিছু দিন আগে সোয়া ৪ কোটি মূল্যের জায়গা দখল করেছে সে। আর আজকে সকালে পুরা হাউজিং ড্রেনের কোমড় পানির নীচে!
২ টার পরে বাইরের এক ভেন্ডরের সাথে মিটিং, রানিং প্রজেক্টের ইমপ্লিমেন্টেশনের খবর নেয়া, আর আরেকটা আনশিডিউলড মিটিং আর সব কাজের প্রগ্রেস। কোনো মতে বাদ না দেয়ার একটা দিনে নেমে গেলাম ময়লা পানিতে, উদ্দেশ্য অফিস যেতেই হবে। গাবতলী তে গিয়ে দেখি একুশের দু তিনটা বাস ছাড়া সব বাস ডুবে গেছে। শুধু একুশে না, শাহ আলি, হানিফ সহ আর বেশ কিছু বাস পানির তলে। কাউন্টারে বোরাক ছাড়া অন্য কোনো বাসই নেই।
একটা রিক্সা থামিয়ে মিরপুর ১ নম্বর যেতে বলতেই বললো ৩০ টাকা। শুনে আক্কেল গুড়ুম, নামতেই এক লোক কাছে এসে বললো,"ভাই চলেন শেয়ারে যাই!"
আমি মুখে হাসি দিয়ে রাজী হয়ে গেলাম। মিরপুর ১ নম্বরে এসে ২ আর ৯ নম্বর ছাড়া আর কোনো বাসই নেই। প্রিন্স হোটেলের সামনে দাড়াতেই একটা অভূতপুর্ব দৃশ্য দেখলাম। ৬ ফুট লম্বার একটা ব্লন্ড মাথায় ঘোমটা দিয়ে পিংক কালারের সালোয়ারে অসাধারন লাগছিলো কিন্তু হাতের সিগারেট টা দেখে মাথাই ঘুরে গেলো। মনে হলো পরীর পাশে দাড়িয়ে একটা ছবি তুলি। হাতে সময় না থাকায় দৌড়ে বেঙ্গলের গাড়ীর পিছনে ছুটতে লাগলাম। কারন এই একটা বাসই মহাখালী কাকলি যাচ্ছে শ্যমলি হয়ে। উঠে দেখি বাসে কোনো সিট খালি নেই, তবে আমি যেখানে দাড়ালাম সেখান টা মহিলাদের প্রথম তিনটা সীট!
উকি দিয়ে দেখতে লাগলাম আজকের বাসে কালেকশন কি। শুধু একটা বাদে কেউ জুইতের না। তবে যেই একটা সেই একটাও খারাপ না। বোঝা যায় রিসেন্টলি চুল স্ট্রেইট করেছে, মেকআপে সুন্দর মানিয়েছে, চোখা নাক, চোখা চেহারার দেখতে খারাপ না। এমন ফর্সাও না যে চামড়া ঝলসে গেছে, আবার এমন শ্যমলা না যে শ্যামল বর্ন বলা যায়!তবে সবুজ সালোয়ারটা মনে হচ্ছে শুধু এই মেয়েটার জন্যই।
যাই হোক, আমি খুব একটা পাত্তা না দিয়ে ডাইনে বায়ে লোকজনের সাথে কথা বলা শুরু করলাম আর ফোন তো আছেই। আগার গাও পর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো কিন্তু জ্যাম শুরু হলো আগার গায়ের মোড় ছেড়ে সামনে ডাইভারসন দিয়ে যেটা প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে বের করে দিয়েছে। তবুও একটু একটু করে গাড়ি ভালো এগুচ্ছিলো কিন্তু বিপত্তি ঘটলো বিজয় স্মরনী পার হবার সময়। ডাইভারশনের ডান পাশে কোনো গাড়ী নেই পুরো ফাকা আর আমাদের সামনে বিশাল স্হবির জ্যাম। ৪০ মিনিট ধরে বসে থাকতে থাকতে বাস খালি হতে লাগলো। দেখলাম একে একে সবার সাথে ঐ মেয়েটিও নেমে গেলো। আমি তখন সীটে বসে ১০ মিনিট অপেক্ষা করে দেখলাম বসে থাকাটা আসলেই বোকামী। আমিও হাটা ধরলাম, পিঠের ল্যাপটপটার জন্য বড় একটা ব্যাগ কিনেছি, যেটা বৃস্টি বাদলে দৌড়া দৌড়িতে ভালোই সাপোর্ট দিচ্ছে। নিশ্চিন্তে হাটতে হাটতে সামনে যেতেই চক্ষু ছানাবড়া। প্রধানমন্ত্রী অফিসের সামনে বিশাল খাল হয়ে গেছে। রাস্তার দুই সাইডে কোমড় পানি। গাড়ীগুলো যেগুলো পানির মধ্যে আছে সব বিকল। রাস্তা দুধারেই বন্ধ হয়ে গেছে, আরপানি থৈ থৈ। কিন্তু রিক্সা চলছে গাড়ীর ফাকে। আমি একটা রিক্সার সামনে দাড়াতেই দেখি একটা মেয়ে রিক্সা থামিয়ে দাম দর করছে। পার হেড ৩০ টাকা চাচ্ছে। আমি আপার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে উঠে পড়লাম। জিজ্ঞেস করতেই বললো সিএমএইচ। বুঝলাম কেউ হাসপাতালে অসুস্হ!
রিক্সা জাহাঙ্গীর গেটে একটু এগুতেই দেখি পানি দিয়ে ঐ সবুজ ড্রেস পড়া মেয়েটা যাচ্ছে আর পারলে পানিতে পড়ে যায়। আমি রিক্সা আলাকে বললাম ডানে তার কাছে ভিড়াতে। রিক্সা তার কাছে ভিড়াতেই সে আমাকে দেখে হেসে বলে," লিফট দেয়া যাবে?"
আমি উপরে উঠে বললাম," উঠে পড়েন!"
রিক্সায় আমরা হলা এখন তিনজন। আমি উপরে উদাস মনে চারিদিকে দেখছি আর মেয়েরা সাঙ্গ পেয়ে দুজনে কুটুর কুটুর দেশ ঠিক করা গল্প শুরু করে দিলো। রিক্সা পানির অংশ পার করতেই পড়লাম বিপাকে। তিনজনে ১০০ টাকা চাচ্ছে। ঐ দুইজন মেয়ের একজন ২০ টাকা আর ঐ সবুজ ড্রেস ১০ টাকা দিয়ে উধাও। আমি রফায় আসলাম ৫০ টাকা! এয়ার ফোর্সের কোয়ার্টারের সামনে থেকে একটা ঝাড়ি দিয়েই হাটা ধরলাম জাহাঙ্গীর গেটের দিকে। হাটতে হাটতে দেখি সামনেই সবুজ ড্রেস পরা মেয়েটা দাড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বললো," আপনি তাহলে ছাড়া পেয়েছেন?"
আমি হেসে বললাম," হ্যা"
হাটতে হাটতে কথা বলা শুরু হলো। মেয়েটা যেচেই বাসার ঠিকানা বলছে কোথায় চাকরি করে, সবই বললো। আমি শুধু বললাম আমার অফিস ডেলভিস্তার ৫ তলায়। একটু কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো আমার দিকে। মনে হয় এ্যালিয়েন দেখলো।
আমি হেসে বললাম," আজকা অফিস করবো না, গুলশান ২ এ একটু কেনাকাটা করে তারপর লান্ঞ্চের পর একটা মিটিং এটেন্ড করবো। এভাবে এভাবে কথা বলতে বলতে যখন ফ্লাই ওভারের কাছে আসলাম তখন মেয়েটা উদাস হয়ে বললো,"এই ফ্লাই ওভারে হাটা হলো না!"
: চলেন এখনি উঠে হেটে দেখি!
: না আজ না, আমার অফিস উল্টো দিকে।
আমি হাসলাম। সামনে যেতেই দেখি আবারও পানি জমে রাস্তা তলিয়ে। সে আমাকে দেখে বললো,"কি করি?"
: চিন্তা নেই, বাম দিক দিয়ে ফ্লাই ওভারের নীচের এক্সটেনশন দিয়ে হেটে গেলে পানি লাগবে না।
: আপনি আছেন বলেই সাহস পাচ্ছি।
এটা বলেই সে হাতে তার স্যান্ডেল হাতে নিয়ে পানি দিয়ে হাটা শুরু করলো। আমি একটু দাড়িয়ে প্যান্ট গুটালাম। দেখি একটু দূরে দাড়িয়ে আমাকে দেখে হেসে দিলো। আমি সামনে গিয়ে বললাম,"চলেন যাই, পানি দিয়ে হাটতে ভালই লাগছে।"
: দেখেন দেখেন বাম দিকে, ছেলে পেলে মাছ ধরছে!
: কি মাছ পাইলো দেখবেন?
: কিছুই পায় নাই।
বলে এটা সুন্দর হাসি দিলো। ওর দিকে তাকাতে তাকাতে আমরা পানির অংশ পার করে রেলগেটের কাছে এসে পড়লাম। ও একটা রিক্সা ঠিক করে ফেললো, আমি একটু হেসে "বাই" দিয়ে চলে আসলাম।
রেলগেট পার হবার নিজেকে একটা আস্ত ভুদাই বলে মনে হচ্ছিলো কারন আমি যখন চলে আসছিলাম তখনও মেয়েটি রিক্সায় না উঠে দাড়িয়ে ছিলো। হয়তো কথা বললে নামটা জানা যেতো অথবা মোবাইল নম্বরটা!
শীট ম্যান.....আমার মাথাটা জায়গা মতো কাজ করে না!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সকাল ৮:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



