ঈশ্বর হবার টাইম নাই!
_____________________________________________
: আপনাকে ঘন্টায় ৫ ইউরো করে দেয়া হবে, আর এখানে কাজ করতে হবে বৃহস্পতিবার থেকে সোম বার পর্যন্ত বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৪ টা। আপনার কাজ হবে ওয়াশিং ক্লিনিং থেকে শুরু করে খাবার সার্ভ পর্যন্ত। কুকিং শিখে নিতে পারলে আপনার মাইনে বাড়িয়ে দেয়া হবে। যেহেতু আপনি ভাষা জানেন না সেহেতু জোয়েল অর্ডার নেবে আপনি শুধু টেবিল অনুযায়ী সার্ভ করবেন। রিসেন্টলি এক পাকিস্তানী আমাকে ফাদে ফেলেছে, আজকে তার জরিমানা দিতে হবে। যাই হোক, আপনি কি এই শর্তে রাজী আছেন?
: আমি অবশ্যই রাজী। আমি কবে থেকে কাজ শুরু করবো?
: আপনি কাল বিকাল থেকে কাজে লেগে যেতে পারেন। এখানে এসে জোয়েলের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেবেন। আর ভালো কথা, আপনের একাউন্ট নাম্বারটা জানিয়ে দেবেন।
: ধন্যবাদ। আপনার যদি খুব তাড়া না তাহলে আমি কি আপনার ৫ টা মিনিট সময় নিতে পারি?
: (রিচার্ড বা হাত ঝাকিয়ে হাতঘড়িটা দেখে ভ্রু কুচকে বললো) আমার আসলেই খুব তাড়া আছে। তবু আমার কেন যেন মনে হয় আপনার ভিতরে একটা প্রচন্ড ঝড় বইছে। আমি এর গর্জন ইচ্ছুক!
: (এক নিঃশ্বাসে কাপা কাপা গলায়) আপনি আমাকে ফোন করেছেন ঠিক ১২: ৪৯ মিনিটে। তার কিছুক্ষণ আগে আমার ছোটবোন দেশ থেকে একটা এসএমএস করে। আমি তখন রাস্তা পার হবার জন্য ক্রসিং এ ওয়াক বাটনে চাপ দিয়েছি। রাস্তা পার হয়ে যখন বাসায় ফোন করি তখন বোন আমাকে একটা কথাই বললো," ভাইয়া, বাবা আজ সকালে বিষ খেয়ে বাথরুমে পড়েছিলো। অনেক দিন ধরে ধার দেনার চাপ সইতে পারছিলো না। ডাক্তার চাচু বললো অনেক দেরী হয়ে গেছে। ভাইয়া তুমি চলে আসো!" মূহুর্তে আমার মনে হলো সারা পৃথিবী যেন শব্দ শূন্য শুধু আমার ফুসফুসের ধ্বুক ধ্বুক আওয়াজ আমার কানে এসে লাগছে। মনে মনে ভাববার চিন্তা করলাম পায়ে শক্তি আছে কিনা এখনো, কারন আমাকে বাবার লাশটা বইতে হবে, কিন্তু.....(একটু সময় নিয়ে).. দেশে যাবার মতো আমার কাছে কোনো ইউরো নাই। মাথার ভিতর কিছু একটা তাল গোল পাকিয়ে আমার চিন্তাগুলো এক বিন্দুতে আটকে ছিলো। আর তখনই তুমি আমাকে দেখা করতে বললে আর এখন তুমি চাকরী দিতে চাইছো!
রিচার্ডের মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠলো। "এক্সকিউজ মি" বলে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে নামটা দেখে সাইলেন্ট করে রাখলো। তারপর চেয়ার থেকে উঠে শাকিলের সামনে এসে দাড়ালো, কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ওর সামনে টেবিলের উপর বসলো," দেখো যুবক, যদি কিছু মনে না করো, তুমি এক গ্লাস ভোদকা নিতে পারো আর যদি চাও তো দেশে যাবার টিকেট কেটে দিতে পারি। বাকী সিদ্ধান্ত তোমার। তবে তোমাকে একটা কথা বলি, আমি যখন এখানে আসি তখন আমার হাতে কিছুই ছিলো না, যুদ্ধে আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমার স্ত্রী কিছুদিন পর একটা মৃতসন্তান প্রসব করে আর তার কিছুদিন পর সেও মারা যায়। আমি তখন কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কিন্তু থেমে থাকিনি। তখন আমি তোমার মতোই যুবক ছিলাম। চিন্তা করো না, আমি জোয়েলকে সব বলে যাচ্ছি, তুমি ডিসিশন নাও, তোমার হাতে আশা করি সময় আছে এখন!"
এই বলে রিচার্ড দ্রুত উঠে দাড়ালো, জোয়েল গায়ে ওভারকোট পড়িয়ে দিলো। তারপর দুজন দ্রুত চলে গেলো বাইরে।
শাকিল বাইরে দিয়ে সদ্য শুরু হওয়া তুষারপাত দেখছে। আজ অনেক দিন পর লক্ষ্য করলো পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা সবুজ বনটা আজ আর সবুজ নেই, সব যেনো কন্কাল হয়ে আছে, তার ডালপালায় জমেছে বরফ সাদা তুলোর মতো ঠিক যেনো ছোটবেলায় দেখা তুলো ভর্তি শিমুল গাছ।
মনে পড়ে একবার বাবা এক ল্যাপ মিস্ত্রীকে ডেকে আনে আর সাথে কিনে আনে এক বস্তা শিমুল তুলা। তখন ওর বাবা ওকে ডেকে বলেছিলো," আয়রে শাকিল সোনা, আমি ঘোড়া হই আর তুই হবি রাজা। আজকে রাতে আমার শাকিল সোনা ল্যাপ মুড়ি দিয়ে মজা করবে আর ঘুমাবে!"
আশ্চর্য্য শাকিলের চোখ দিয়ে এক ফোটা অশ্রু ঝরছে না, কিন্তু তার বুকের ভিতর হাজারো কান্না জমে আছে ওর বাবার জন্য!
কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের থাকে না। আল্লাহ আমাদের নিয়ে মনে হয় খেলতে ভালো বাসেন!
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই অক্টোবর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


