কাহিনীর নায়ক বিশাল বড়লোক। ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে পরিচয় হয় গরিব ঘরের সুন্দরী একটি মেয়ের। প্রথম দেখাতেই মেয়েটিকে পছন্দ করে ফেলে নায়ক। কিন্তু মেয়েটি কোনোভাবেই রাজি নন নায়কের প্রস্তাবে—কারণ নায়ক অনেক বড়লোক। অনেক জোরাজুরির পর প্রেম পাওয়া যায়। কিন্তু নায়কের পরিবার তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এদিকে সুন্দরী বলে মেয়েটির এলাকার চরিত্রহীন কোনো যুবক মেয়েটিকে পেতে চায়। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় নায়ক। শুরু হয় ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব। নায়ক বনাম ভিলেন বনাম বড়লোক বাবা। শেষ পর্যন্ত নায়কের জয়, ভিলেনের পরাজয় আর বড়লোক বাবার মেনে নেয়া। ছয় লাইনে পুরো তিন ঘণ্টার একটি ছবির এটা হলো অতি পরিচিত গল্প। আবার এই ফর্মুলার ঠিক উল্টো গল্পও আছে। অর্থাত্ সেই গল্পে নায়ক গরিব আর নায়িকা বড়লোক। বাকি সব ঠিক আছে। এটাকে বলে ধনী-গরিবের সেন্টিমেন্ট। এই হলো দুই ধারার ঢালিউডের সিনেমার ফর্মুলা। এর বাইরে রয়েছে আরও দুটি ধারা। এক. সমাজের মন্দলোকের বোন সুন্দরী নায়িকা। আর সেই সমাজে বসবাস করে সাধারণ একটি প্রতিবাদী ছেলে। এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসে। একপর্যায়ে ভিলেনের বোনের সঙ্গে সেই প্রতিবাদী নায়কের প্রেম। এর আগে অবশ্য ভিলেনের মন্দ ব্যবসায় মন্দা অবস্থা তৈরি করে দেয়ার জন্য ভিলেনের সঙ্গে নায়কের গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। ভিলেন যখন জানলেন তার বোন ওই নায়কের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন তখন তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক অত্যাচার, যা নায়ক জানতেই হুংকার দিয়ে ভিলেনকে বলে আসে তার বোনকে সে বিয়ে করবেই তার সামনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দিনক্ষণও বলে দেয়া হয়। ভিলেন মারাত্মক ক্ষেপে গিয়ে নায়কের বোনকে তুলে এনে নিজে অথবা তার গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে ধর্ষণ করায়। এই শোকে নায়কের মা মারা যায়। নায়ক মায়ের রক্ত আর ধর্ষিতা বোনের মাথা ছুয়ে কসম কাটে প্রতিশোধ নেয়ার। এ সময় নায়িকার সঙ্গেও সমস্যা হয়। নায়িকা স্যাড সং করেন। তারপর নায়ক ভিলেনকে পরাস্ত করে প্রতিশোধ নেয়। নায়িকাকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে লাইন ধরে দাঁড়ান। লেখা ওঠে সমাপ্ত। দুই. নায়কের ছোটবেলার খেলার সাথী তারই পাশের বাড়ির কেউ। একসঙ্গে তারা বড় হয়। দু’জনের ভাব এত যে, একজন আরেকজন ছাড়া চলতে পারে না। দুই পরিবার মনে মনে তাদের বিয়ে ঠিক করে রাখে। বড় হওয়ার পর নায়িকা কল্পনায় নায়ককে নিয়ে গানটানও করে। নায়ক পড়ালেখা অথবা চাকরির জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে পরিচয় হয় আরেক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে। নায়ক তার প্রেমে পড়ে যান। নায়িকাও প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। আর অন্যদিকে ছোটবেলার খেলার সাথী মালা গেঁথে অপেক্ষা করছেন। এক সময় জানা যায়, নায়ক সব সময় তাকে ছোটবোনের চোখে দেখেছে। ব্যস শুরু হয় ত্রিভুজ প্রেমের বিরহ। শেষ পর্যন্ত বিয়ে করা সম্ভব নয় বলে একজনকে মারা যেতে হয়। নায়ককে বাঁচাতে গিয়ে অবধারিতভাবেই তার ছোটবেলার খেলার সাথীই মারা যান। আর নায়ক-নায়িকা তখন সুখের সংসার বাঁধেন। এই চার ফর্মুলার বৃত্তে আটকে আছে আমাদের সিনেমা। এর বাইরে কখনও কখনও মা আর বোনের সেন্টিমেন্টকে তুলে ধরা হলেও মূল গল্প আবর্তিত হচ্ছে এই ত্রিভুজ প্রেম, অথবা ধনী-গরিবের সেন্টিমেন্ট না হয় ভিলেনের বোনের সঙ্গে নায়কের প্রেমকে কেন্দ্র করে।
সিনেমার সোনালি অতীত বলতে মূলত সিনেমা বোদ্ধারা বলে থাকেন, আশির দশকের কথা। এরপর নব্বই দশককেও সিনেমার সমৃদ্ধ দশক বলা হয়। এরপর সিনেমায় চলে আসে এক ধরনের অস্থিরতা। উদ্ভট গল্প আর অশ্লীতায় নিমজ্জিত হয় ঢালিউডের সিনেমা। এ সময়ে সিনেমার প্রচলিত ফর্মুলায় আসে পরিবর্তন। তিন-চারটি ধর্ষণ দৃশ্য, কিছু অর্ধ উলঙ্গ গানকে পুঁজি করে ছবি নির্মিত হয়। গল্পের কোনো প্রয়োজন ছিল না এ সময়ের সিনেমায়। তবে এখন দিন বদলেছে। অশ্লীলতা থেকে সিনেমা শিল্পকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শুরু হয়েছে কাহিনীর আকাল। শিল্পী সংকটের কারণে বৈচিত্র্যময় কাহিনীর দিকে ঝুঁকতে পারছেন না কাহিনীকার আর প্রযোজকরা—এমনটিই তাদের বক্তব্য। আর যে ধারার ছবি ব্যবসাসফল হয় সব প্রযোজকই সেই ধারায় নিজেদের সঁপে দিচ্ছেন এমনটিও বলছেন কাহিনীকাররা। ইদানীং শাকিব খান ব্যবসাসফল ছবির অন্যতম প্রধান নায়ক। আর তিনি থাকলে দুই নায়িকার গল্পকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সুতরাং এক নায়িকার মৃত্যু সেই গল্পে অনিবার্য। কোনোভাবেই এর বাইরে যেতে পারছেন না শাকিব খানের প্রযোজক পরিচালকরা। কিন্তু এই ধারা চলতে থাকলে অচিরেই বৈচিত্র্যহীন গল্পের অভাবে সিনেমাগুলোর ব্যবসা যে লাটে উঠবে তাও সবাই জানেন। তারপরও প্রচলিত ফর্মুলার বাইরে যেতে চাচ্ছেন না কেউই। অন্যদিকে গত প্রায় দেড় বছর ধরে সিনেমায় নিজেকে সফল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ডিপজল। তার ছবির গল্প মানেই মা আর ভাতের সেন্টিমেন্ট। মা ফর্মুলা মানে মায়ের জন্য ছেলের জীবনবাজির গল্প। ভাত সেন্টিমেন্ট মানে ধনী-গরিবের সেন্টিমেন্ট। সুতরাং এই প্রচলিত ধারার বাইরে কেউই যেতে পারছেন না। সিনেমা থেকে একেবারেই ওঠে গেছে, ফোক ফ্যান্টাসি, পোশাকি, নিটোল প্রেম কিংবা গ্রামীণ পটভূমি। তারকা শিল্পীদের সঙ্কটের কারণে সিনেমার গল্পেও বৈচিত্র্য আসছে না—এটা বোদ্ধারা সহজেই মানছেন। তবে এই সঙ্কট থেকে সিনেমা শিল্পকে মুক্ত করতে কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না বলে মত দিয়েছেন পরিচালক আর কাহিনীকাররা। তবে বোদ্ধারা এ কথাও স্বীকার করছেন যে, যেভাবে চলছে এভাবে চললে আবারও সিনেমা ব্যবসা নিম্নগামী হতে শুরু করবে। সেই দিন আসার আগেই ছবির গল্প আর উপস্থাপনায় ভিন্নতা অতি জরুরি।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

