[কিউবায় জন্মগ্রহণকারী ভার্জিলিও পিনেরা তার আভাঁ-গার্দ থিয়েটারের সুবাদে যতোটা পরিচিত, কবিতা ও ছোটগল্পের জন্য ততটা বিখ্যাত নন। কিন্তু এরপরও অনেকেই তাকে ছোটগল্পের মহান কারিগর বলে স্বীকার করেন। তার বিখ্যাত দু-টো ছোটগল্পসংকলন হলো 'কুয়েন্তো ফ্রিও' (১৯৫৬) এবং 'পেকুনা মেনিওব্রা' (১৯৬৩)। ১৯৫০-এর দশকে তিনি বুয়েনস আয়ারসে বসবাস করেন এবং সেখানে বোরহেসের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বোরহেস, নির্বাসিত পোলিশ লেখক উইটোল্ড গোমোব্রোভিচসহ অন্যান্যদের সংস্পর্শ তার মানসগঠনে প্রভাব ফেলে। কিউবার বিপ্লবের পরে দেশে ফেরার পর এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালে 'রাজনৈতিক ও নৈতিক অপরাধ'-এর জন্য তিনি গ্রেফতার হন। জেল থেকে ছাড়ার পর কয়েকজন বন্ধুর সাহচর্য ও সমর্থন বাদে তিনি সাহিত্য ও সামাজিক জীবনে কোণঠাসা হয়ে পড়েন, যদিও ১৯৬৯ সালে তার নাটক 'দো ভিয়েজো প্যানিকো'-র জন্য 'কাসা দি লা আমেরিকা' পুরস্কার পান। অদ্ভূত বিচিত্র বিষয় তার গল্পের বিষয় এবং সেগুলোতে কাফকায়েস্ক ধাঁচ রয়েছে। অনূদিত গল্প 'মাংসের আকাল'-এ (Meat) চরিত্রগুলোর কর্মকাণ্ড মেটফিজিকাল। পিনেরা ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। গল্পটি ইংরেজি অনুবাদ করেছেন মার্ক শেফার; গল্পটি রবার্তো গনজালেজ এশেভারিয়া সম্পাদিত 'ল্যাটিন আমেরিকান শর্ট স্টোরিজ' (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৯) গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।]
...
ব্যাপারটা ঘটলো কোনো কারণ ছাড়াই। কারণ থাকলেও সেটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই; ব্যাপারটা হলো এই, নগরে মাংসের আকাল দেখা দিল। এই সংকটে প্রতিবাদের কথা ভেবেছিল কেউ কেউ। কিন্তু অনেক নাগরিক-সুবিধা খর্ব হলেও যেমন মানুষ সবসময় সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না; খুব দ্রুতই বিপন্ন নগরবাসী নানা ধরনের নিরামিষে অনায়াসে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো।
কেবল মি. আনসালদো একদিন হঠাৎ রীতি ভঙ্গ করলেন। নিবিড় মগ্নতায় তিনি রান্নাঘরের ছুরিটা ধার দিলেন, এরপর প্যান্ট খুলে হাঁটু পর্যন্ত নামালেন এবং বাম নিতম্ব থেকে চমৎকার কচকচে মাংসখণ্ড কেটে আনলেন। মাংসখণ্ডটি ধুয়ে পরিস্কার করে লবণ মাখিয়ে ভিনেগারে চুবালেন, চুল্লীতে নিয়ে ঝলসালেন এবং প্রতি রোববারে যে-তাওয়ায় তিনি অমলেট বানিয়ে থাকেন, সেই তাওয়ায় মাংসখণ্ডটি ফ্রাই করলেন। টেবিলে বসে তিনি চমৎকার মাংসখণ্ডটির গন্ধ শুঁকছিলেন। ঠিক সেই সময়ে দরোজায় কে যেন কড়া নাড়লো।
আনসালদোর প্রতিবেশী এসেছেন মাংসবিষয়ক একরাশ হতাশা নিয়ে। ... আনসালদো বেশ গর্বের অভিব্যক্তি নিয়ে মাংসখণ্ডটি প্রতিবেশীকে দেখালেন। প্রতিবেশী যখন ব্যাপারটা বুঝতে চাইলো, আনসালদো কোনো কথা না-বলে নিজের বাম নিতম্ব দেখালেন। কী ঘটেছে বুঝতে আর বাকী রইলো না। প্রতিবেশী হতবাক হয়ে কোনোকিছু না বলেই বেরিয়ে গেল; কিন্তু অল্পণের মধ্যে নগরপতিকে নিয়ে ফিরো এলো। নগরপতি আনসালদোকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন নগরবাসীকে বলেন যে, তারা যদি তাদের নিজেদের রিজার্ভ থেকে মাংস খেতে থাকেন তবে নগরে আর মাংসের আকাল থাকবে না। আনসালদো নগরপতির প্রস্তাবে রাজি হলেন। নগরের প্রধান জনচত্বরে গেলেন এবং (তার ভাষায়) ‘জনগণের জন্য একটি সত্যিকারের সমাধান’ শীর্ষক বক্তৃতা করলেন।
তিনি সেখানে বললেন যে, যেকেউ তার বাম নিতম্ব থেকে দু-টি মাংসখণ্ড কাটতে পারেন। বোঝার সুবিধার্থে তিনি মাংস-রঙা দু-টি কৃত্রিম নমুনা চকচকে হুক দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। তিনি দেখালেন কীভাবে একখণ্ডের স্থলে দু-খণ্ড মাংস কেটে ফেলতে হয়। এক নিতম্ব থেকেই দু-খণ্ড মাংস কেটে ফেললে মাংস সঞ্চিত রাখার সুযোগ কমে যায়। ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গেলে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ নিতম্ব থেকে দু-খণ্ড করে মাংস কাটতে শুরু করলেন। সে-এক জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্য। কিন্তু অনুরোধ আছে যে, সে-দৃশ্য বর্ণনা করা যাবে না। নগরে এই মাংস কতদিন সহজলভ্য থাকবে তার হিসেবও বের করা গেল। একজন ডাক্তার হিসেব করলেন যে প্রত্যেক ব্যক্তির ওজন একশ পাউন্ড। নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য খাবার অযোগ্য অঙ্গ বাদ দিলে প্রতিদিন আধা পাউন্ড হিসেবে এই পরিমাণ মাংস প্রত্যেকের একশ’ চল্লিশ দিন চলবে। এই হিসেবের মধ্যে অবশ্যই ফাঁকি আছে। ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো তা হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের মাংসই কেবল খেতে পারবে। শোনা গেল আনসালদোর আইডিয়া অনুসারে মেয়েরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে। যেমন যারা তাদের স্তন কেটে খেয়ে ফেলেছে তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ আর কাপড় দিয়ে আবৃত করতে হচ্ছে না, নাভী পর্যন্ত পৌঁছেই তাদের পোশাক থেমে যাচ্ছে। সবাই না-হলেও কোনো কোনো মেয়ে আর কথা বলতে পারছে না, কারণ তারা জিহ্বা খেয়ে ফেলেছে। রাজপথে সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা ঘটলো: দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া দু-জন মহিলা পরস্পরকে চুমু খেতে গিয়ে ব্যর্থ হলো, কারণ তারা উভয়েই তাদের ঠোঁট সুস্বাদু পিঠা বানাতে গিয়ে ব্যবহার করে ফেলেছে। জেলবিচারক একজন দোষীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সই করতে গিয়ে পারলেন না, কারণ তিনি তার আঙ্গুলের মাংস খুবলে খেয়ে ফেলেছেন।
কিছু মৃদু প্রতিবাদও হলো। মেয়েদের পোশাক প্রস্তুতকারী গার্মেন্টস ইউনিয়ন যথাযথ কর্তৃপরে মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানালো যে, তাদের পে এমন কোনো স্লোগান বের করা সম্ভব হচ্ছে না যেটা দিয়ে তাদের কর্মীদের উৎসাহিত করার জন্য হলেও মেয়েদের পুনরায় ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক কেনানোর জন্য অনুপ্রাণিত করা যাবে। কিন্তু এই প্রতিরোধটি দানা বাঁধতে পারে নি এবং নগরবাসীর নিজ নিজ মাংস ভণের প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি।
এইসব মনোহর ঘটনাবলীতে একটি অন্যতম বর্ণিল ঘটনা হয়ে দাঁড়ালো নগরের ব্যালে নৃত্যশিল্পীর শেষ মাংসপিণ্ড কাটার দৃশ্য। শিল্পচেতনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি তার সুন্দর পদাঙ্গুলি সব শেষে খাবার জন্য রেখে দিয়েছিলেন। তার প্রতিবেশীরা ল করলো তিনি কয়েকদিন ধরে খুব অস্থির হয়ে আছেন। বৃদ্ধাঙ্গুলির মাংসল অংশই কেবল বাকি রয়েছে। এই পর্যায়ে শিল্পী তার বন্ধুদের অঙ্গুলিকর্তন-অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন। রক্তহিম নিরবতার এক পর্যায়ে তিনি তার শেষাংশ কেটে ফেললেন এবং এমনকি তা না ঝলসেই মুখের মধ্যে পুরে ফেললেন (মুখগহ্বর অবশ্য আগে ছিল, এখন নেই)। উপস্থিত সবাই খুব মর্মাহত হয়ে পড়লো।
কিন্তু জীবন বয়ে চলে, এটাই সবচেয়ে বড়ো কথা। নৃত্যশিল্পীর জুতোজোড়া এরপর নগরজাদুঘরে শোভা বর্ধন করতে থাকলো। আর নগরের সবচেয়ে স্থূলাকায় মানুষটি (চারশ পাউন্ডেরও বেশি যার ওজন) মাত্র পনের দিনের মধ্যেই সমস্ত খাদ্যোপযোগী মাংস খেয়ে ফেললো (সে স্ন্যাকস্ ও মাংসের চপ খুবই পছন্দ করতো, আর তার বিপাক-ক্রিয়া বেশি বেশি খাবার দাবি করে)। কিছু পরে তাকে কেউ আর খুঁজে পেল না। কারণ সে লুকিয়ে ছিল ...। আর সে যে একাই লুকিয়ে ছিল, তা নয়; অন্যান্যরাও নানা ধরনের আচরণ রপ্ত করে ফেললো। এক সকালে মিসেস ওরফিলা তার ছেলেকে ডাকলেন, কিন্তু কোনো উত্তর পেলেন না (সে তখন তার কানের লতি চুকচুক করে চুষছিল)। অনুরোধ হুমকি কোনো কিছুই কাজে আসলো না। নিখোঁজ-ব্যক্তি-সম্পর্কিত-বিশেষজ্ঞকে ডাকা হলো। কিন্তু তিনিও ছেলেটির মনুষ্য-মলের সামান্য স্তূপ ছাড়া আর কিছুই আবিষ্কার করতে পারলেন না। মিসেস ওরফিলা আফসোস করলেন, এইখানেই তার প্রিয় পুত্র ছিল। কিন্তু এধরনের কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা বাকি নগরবাসীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাঘাত ঘটাতে পারলো না। তাহলে, কীভাবে মাংসবিষয়ক অভিযোগের উত্তরে তাদের আশ্বস্ত করা গেল? মাংসের আকালের ফলে যে-সংকট তৈরী হয়েছিল তার সমাধান কি দেয়া গেল না? লোকজন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল, তা মূল সমস্যার পার্শ্বফলক্রিয়া, কিন্তু তাদের মূল সমস্যার সমাধান তো হলো। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রত্যেকের শরীর থেকে মাংস কাটা পড়লো, এটাও কি একটা পার্শ্বফলক্রিয়া? কিন্তু এধরনের অনুচিত প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। কারণ এই দুশ্চিন্তিত জনগোষ্ঠীকে ভালোভাবে মাংস খাওয়ানো গেছে।
প্রথম প্রকাশ: নন্দন, আলফ্রেড খোকন সম্পাদিত, ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সংখ্যা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



