[মাইকেল প্যারেন্টি আমেরিকার একজন প্রথম সারির প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। Against Emperor, Dirty Truths, Blackshirts and Reds-সহ তার দশটিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়াকে সমালোচনা করে তার রচিত দু-টি গ্রন্থ হলো: Inventing Reality, Make Believe Media. মাইকেল প্যারেন্টির সর্বসা¤প্রতিক গ্রন্থগুলো হলো The Terrorism Trap(সিটি লাইটস্); To Kill a Nation: The Attack on Yugoslavia(ভারসো); এবং Democracy for the Few (ওয়াডসওয়ার্থ)-এর ৭ম সংস্করণ। তার পরবর্তী গ্রন্থ হলো The People’s History of Ancient Rome আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দি নিউ প্রেস থেকে বইটি বেরুবে। এখানে অনূদিত ইরাকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা বিষয়ক প্যারেন্টির To Kill Iraq: The Reasons Why নিবন্ধটি ইন্টারনেটের প্যারেন্টি আর্কাইভে জানুয়ারি ২০০৩-এ প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধটির উৎস হলো: http://www.michaelparenti.org/IRAQGeorge2.htm]
অক্টোবর ২০০২-এ হাউসে ও সিনেটে বেশ কয়েকদিনের বিতর্কের পরে মার্কিন কংগ্রেস প্রায়-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বুশের কাতারে সামিল হয়; তাকে ইতোমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ ইরাকের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালানোর ম্যান্ডেট দেয়া হয়। কংগ্রেসে বক্তৃতাগুলোও হয় তার স্বভাবগত কাপুরুষতার মধ্য দিয়ে। অনেক সিনেটর ও প্রতিনিধিবর্গ যারা প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করেছেন তারাও প্রায় একই আচরণই করেন। তারা কষ্ট করে জানান: তারাও কী পরিমাণে সাদ্দাম হোসেনকে ঘৃণা করেন, প্রেসিডেন্টের অনেক বক্তব্যের সঙ্গে তারাও কতখানি একমত; তারা এও জানান ইরাককে নিয়ে কীভাবে কিছু একটা করা যায়Ñ কিন্তু এখনই নয়, ঠিক এভাবে নয়। তো এই হলো কংগ্রেস: এতো বেশি রাজনৈতিক কথাবার্তা এখানে হয়, কিন্তু আলোচনার জায়গা কত কম! কিছু সদস্য অবশ্য এরকম প্রশ্ন তোলার সাহস করেছিলেন যে, এসব করে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত কী দাঁড়াবে তা পরীা করা হয় নি; আর কোন রাষ্ট্রের টিকে থাকা উচিত ও কোন রাষ্ট্রের বিনাশ হওয়া দরকারÑ এই সিদ্ধান্ত নেবার সাম্রাজ্যবাদী অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের আছে কিনা, সেব্যাপারেও তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন। খুব সামান্য কয়েকজন, অবশ্য যদি আদৌ কেউ থেকে থাকেন, দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন যে, উদ্ধত মার্কিন প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু যুদ্ধাপরাধ করেছে যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
যুদ্ধের পূর্বকথন
বুশ এবং তার সরকারের সদস্যরা ইরাকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’-কে (এটা ঠিক যুদ্ধ নয়, একপাকি গণহত্যার আয়োজন) জায়েজ করার জন্য নানা কিসিমের বিশ্বাসঅযোগ্য কারণ দেখিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এই যুদ্ধ দরকারী; কারণ ইরাক ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে সম নিউকিয়ার মিসাইলসহ নানা ধরনের মারণাস্ত্র তৈরি করছে। কিন্তু জাতিসংঘের পরিদর্শক দল এব্যাপারে দৃঢ় মত ব্যক্ত করেছে যে ইরাকের সেধরনের নিউকিয়ার অস্ত্র তৈরির মতা নেই।
এটা সত্যি যে ইরাকের একসময় রাসায়নিক ও ব্যাকটেরীয় অস্ত্র তৈরীর কারখানা ছিল। কিন্তু সেেেত্র প্রকৃত অপরাধী কে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সাদ্দাম হোসেনকে এধরনের বস্তু সরবরাহ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরাকের এই পূর্ব-সখ্যের এটা অন্যতম একটি তথ্য যা করপোরেট মিডিয়া সবসময়ই গোপন করে এসেছে। সে যাই হোক, জাতিসংঘের পরিদর্শক-প্রতিবেদন ইরাকের পামাণবিক অস্ত্র তৈরির মতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত দিয়েছে। এরপরও বুশীয়রা ইরাকের বিপজ্জনক ‘মতা’ সম্পর্কে বকে যাচ্ছেন। এসোসিয়েট প্রেস এর একটি রিপোর্টে (২ নভেম্বর, ২০০২) পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি জন বোল্টন বলেছিলেন যে “ইরাক যদি যথার্থ প্রযুক্তি পায় তবে এক বছরের মধ্যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সমর্থ হবে”। যদি যথার্থ প্রযুক্তি পায়? এর অর্থ কী? এই উক্তির সত্যতা সবার নজর এড়িয়ে গেল। যদি “যথার্থ প্রযুক্তি পায়”, তবে জিবুতি, কাতার এবং নিউ জার্সি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সমর্থ হবে।
২০০২ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জুড়ে হোয়াইট হাউস এটা স্পষ্টভাবে বলেছে যে যদি ইরাকের মারণাস্ত্র থাকে তবে তাকে আক্রমণ করা হবে। এরপর নভেম্বর ২০০২-এ বুশ ঘোষণা করেন, সাদ্দাম যদি তার মারণাস্ত্র থাকার কথা অস্বীকার করে তবে তাকে আক্রমণ করা হবে। তাহলে কী দাঁড়ালো? যদি ইরাক স্বীকার করে যে তার ঐ ধরনের অস্ত্র আছে, তাহলে দেশটিতে বোমা হামলা হবে; আর যদি তা থাকার কথা অস্বীকার করে তাহলেও, অস্ত্র থাকুক বা না থাকুক, বোমা হামলা হবেই।
বুশীয়রা ইরাককে এই বলেও অভিযুক্ত করেছে যে আল-কায়েদা-সন্ত্রাসীদের দেশটি প্রশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই জানিয়েছিল যে ইসলামী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ইরাকের সংশ্লিষ্টতা নেই। হাউস কমিটির একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে মার্কিন জনগণের জন্য সাদ্দাম হোসেন বড়ো কোনো হুমকি কিনা, তারা সম্মিলিতভাবে জানিয়েছিলেন যে তাদের কাছে সেরকম কোনো প্রমাণ নেই (সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল, ২০ সেপ্টেম্বর ২০০২)। সত্যি বলতে গেলে বলতে হয়, লাদেন-পরিবারের সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের চাইতে বুশ-পরিবার বেশি ঘনিষ্টতা ছিল। মার্কিন নেতারা কীভাবে তাদের ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের প্রশিণ ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা অনুমোদন করেন সেব্যাপারে কেউ প্রশ্ন তোলেন না। কিউবান যাত্রীবাহী বিমানকে ধ্বংস করার অভিযোগে অভিযুক্ত অরলান্ডো বোশ মিয়ামিতে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়।
বুশ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা যুদ্ধের আরেকটি কারণ বর্ণনা করার চেষ্টা করেন: সাদ্দাম যুদ্ধাপরাধী এবং আগ্রাসী। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন ও বহু কুর্দিকে হত্যা করেছেন। কিন্তু পেন্টাগনের নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে যে মালাহ্জায় কুর্দিদের হত্যার সঙ্গে ইরান জড়িত ছিল, ইরাক নয়। (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০২) আরেকটি সত্য খুব কমই উচ্চারিত হয়: ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন নেতারাই ইরাককে উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করেছেন। আর যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনই যদি ইস্যু হয়ে থাকে তবে গ্রানাডা ও পানামায় মার্কিন আগ্রাসনকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, নিকারাগুয়া, এল সালভেদর, গুয়াতেমালা, যুগোস্লাভিয়া এবং অন্য অনেক দেশে লাখ লাখ বেসামরিক লোককে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড যে প্রত্য মার্কিন প্ররোচনা ও প্রশ্রয়ে হয়েছিল, সেকথা ভুলে গেলে চলবে না। বিগত দু-দশকে কোনো সমাজতন্ত্রী বা কোনো ’সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্রের প থেকে অন্য কোনো দেশের ওপরে এরকম ভয়ংকর আগ্রাসনের কোনো রেকর্ড পাওয়া যাবে না।
যুদ্ধের পূর্বকথন হিসেবে এইসব ফাঁপা বুলির পরে বুশপন্থীরা চূড়ান্ত যে-কারণটি দেখাচ্ছেন তা হলো, সাদ্দাম একজন স্বৈরাচারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পে থাকে, তাই ইরাকে শাসনমতা পরিবর্তন আনতে মার্কিন নেতাদের বলপ্রয়োগ ও সহিংসতা সৃষ্টি ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। এই যুক্তির বিরুদ্ধেও আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি। সাদ্দাম যে স্বৈরাচারী এবিষয়ে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। কিন্তু তিনি এবং তার সহযোগীরা মতায় কীভাবে এলেন? বাথ পার্টির ভেতরে সাদ্দামের রণশীল অংশটিকে সিআইএ দীর্ঘ সময় জুড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল ইরাকের গণঅভ্যুত্থানকে ধ্বংস করার, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী প্রগতিশীল ব্যক্তিকে নির্মূল করার এবং তারা এই দায়িত্ব সুচারুরূপে পালনও করেছিল। তারা বাথ পার্টির প্রগতিশীল অংশটিকেও ধ্বংস করেছিল। মার্কিন মিডিয়া এই সত্যটিকেও স্মৃতির অতল গহ্বরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ঠান্ডা লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাদ্দাম ছিলেন ওয়াশিংটনের পোস্টার-সাঁটানো-বালক।
তাই দ্বিতীয় জর্জ কেন তার বাপের মতো ইরাককে টার্গেট করেছেন? যখন লোকে একটি বিশেষ কাজের পেছনের কারণ হিসেবে নতুন নতুন ও বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা দিতে থাকে, তখন তারা মিথ্যা কথাই বলে। রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকরা তাই করছেন। হোয়াইট হাউসের প থেকে যুদ্ধকে জায়েজ করার জন্য যে-কারণগুলো দেখানো হচ্ছে, তা দেখে কেউ কেউ মনে করছেন প্রশাসন অপ্রকৃতিস্থ অথবা ‘পাগল’। কিন্তু যেহেতু তারা জনগণকে বিপথে চালিত করছেন ও তাদের মধ্যে দ্বিধার জন্ম দিচ্ছেন, তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারা নিজেরা কিন্তু বিপথগামী বা দ্বিধাগ্রস্ত নয়। বরং এটা এমন হতে পারে যে, প্রকৃত কারণগুলোকে তারা জনসম্মুখে আসতে ও বিতর্কের জন্য ছেড়ে দিতে চান না। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতি ধনী ও মতাবানদের স্বার্থকে সিদ্ধ করে। এই স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে আমেরিকান জনগণের ও এই ধরিত্রীর প্রত্যেকটি মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসনের প্রকৃত কারণ আমি যা মনে করি তা এখানে উপস্থাপন করছি।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে মাতব্বরী
বুশ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ড. স্ট্রেঞ্জলাভস-এর মতে এেেত্র যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ল্য হলো বিশ্বব্যাপী মার্কিন উচ্চাসন বহাল রাখা। এ কেবল নিজের মতাকে জাহির করার ব্যাপার নয়। এ হলো বিশ্বে ধনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে নিশ্চিত করা, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের সব স্থানের জনগণের বারোটা বাজিয়ে অবাধ ‘মুক্তবাজার’-কর্পোরেট-পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই লড়াই হলো দুই পরে মধ্যে; যেখানে এক প মনে করে বিশ্বের ভূমি, শ্রম, পুঁজি, প্রযুক্তি ও বাজার কিছু লোকের পুঁজির পরিমাণ বাড়িয়ে তুলতে ব্যবহৃত হবে; আরেক প মনে করে এই বিষয়গুলো বহুর স¤প্রদায়গত লাভালাভ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে।
ল্যটি কেবল এরকম বৈশ্বিক পুঁজিবাদের উচ্চাসন বজায় রাখা নয়, বরং মার্কিনীদের বৈশ্বিক পুঁজিবাদকে বহাল-তবিয়তে রাখার ল্য। এবং এজন্য সম্ভাব্য কোনো পরাশক্তির উত্থানকে এবং একই কারণে কোনো আঞ্চলিক শক্তির উত্থানকে রদ করাই যুক্তরাষ্ট্রের ল্য। এেেত্র ইরাক একটি কেস। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশে তেল আছে কিন্তু জল নেই। আবার কারও কারও জল আছে কিন্তু তেল নেই। ইরাক হলো একমাত্র দেশ যার উভয় সম্পদই বিপুল পরিমাণে আছে, এবং সঙ্গে আছে কৃষির একটি ভালো ভিত্তিÑ যদিও ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বোমাবর্ষণের কারণে উর্বর কৃষিযোগ্যভূমি ইউরেনিয়াম দ্বারা দূষিত হয়ে পড়েছে।
একসময় ইরাকের তেলত্রেসমূহ সম্পূর্ণভাবে মার্কিন, ব্রিটিশ ও অন্যান্য দেশের কোম্পানির মালিকানায় ছিল। ১৯৫৮ সালে ইরাকে একটি জনঅভ্যুত্থান হয়। দশ বছর পরে বাথ পার্টির ডানপন্থী অংশ সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে মতা দখল করে, এখানে সাদ্দাম সিআইএ-এর পছন্দের লোক হিসেবে কর্মকুশলতা দেখান। তার কাজ ছিল বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঠেকানো, যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু মতায় আসার পরে নিকারাগুয়ার সোমোজা, চিলির পিনোচেট, পেরুর ফুজিমোরার এবং অন্য অনেকের মতো পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের মুৎসুদ্দি-দালালরূপে কাজ করেন নি। তিনি ১৯৭২ সালে ইরাকী তেলশিল্পকে রাষ্ট্রীয়করণ করেন, পশ্চিমা মুনাফাখোরদের তেলশিল্প থেকে সরিয়ে দেন এবং জনগণের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের মধ্যে ইরাক মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ জীবনযাত্রার দেশ হিসেবে পরিণত হয় (যদিও তা বলার মতো এমন বেশি কিছু নয়)। এটা প্রমাণিত হয় যে ১৯৫৮ সালের বিপ্লবের ফলাফলকে সুদূরে ঠেলে দেবার পরও যুক্তরাষ্ট্র তা থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারে নি। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবিপ্লবী একটা ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্র পালন করতে সম হয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন আর সহ্য করা যাবে না। যুগোস্লাভিয়া ইউরোপে একটি ‘খারাপ’ উদাহরণ সৃষ্টি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য দেশের কাছেও ইরাক খারাপ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর ওয়াশিংটনের ধনিকরা যে-জিনিসটা একেবারেই চান না, সেটা হলো মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোনো আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রের উদ্ভব হোক যে নিজের ভূমি, শ্রম, ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরে নিজেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়।
মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি প্রতিযোগিতামূলক যেকোনো পরিবেশকে বারংবার দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। কিউবা, ইরাক ও যুগোস্লাভিয়ার মতো আত্মসচেতন দেশগুলোকে এজন্য টার্গেট করা হয়েছে। যুগোস্লাভিয়ার কথাই ধরুন। সে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ও ন্যাটোতে যোগ দিতে আগ্রহী ছিল না। এর একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতি ছিল। যুগোস্লাভিয়ার শতকরা ৮০ ভাগ জিনিস ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের নামে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে দেশটিকে খণ্ডিত করার ও য়িত করার যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয় এবং দরিদ্র মতাহীন ডানপন্থী কয়েকটি ুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়। এই দেশগুলোর অর্থনীতিকে বেসরকারীকরণ করা হয়েছে, সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়া হয়েছে এবং বিনিয়োগের আদর্শ পরিবেশের বরাত দিয়ে পশ্চিমা কর্পোরেটদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। খুব স¤প্রতি সার্বিয়াতে এরকম ঘটনাই ঘটেছে। সবকিছু জলের দরে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মানবিক সেবা, চাকুরী ও পেনশন ভাতা অন্তর্হিত হচ্ছে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও দারিদ্র্য হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে; তেমনি বেড়ে যাচ্ছে অপরাধ, গৃহহীনের সংখ্যা, পতিতালয়ের সংখ্যা ও আত্মহত্যার পরিমাণ। সার্বিয়ার মুক্ত বাজার স্বর্গরাজ্যে স্বাগতম!
সার্বিয়া, বসনিয়া, মেসেডোনিয়া, পানামা, গ্রানাডা ও অন্যদের ভাগ্যে যা ঘটেছে, আমরা অনুমান করতে পারি মার্কিন আগ্রাসনের পরে ইরাকের ভাগ্যেও একই বিপদ রয়েছে: মতায় ইরাকের একটি পুতুল সরকার বসানো হবে, এমন একজনকে সরকারপ্রধান করা হবে যে টনি ব্লেয়ারের মতো হোয়াইট হাউসের প্রতিটি নির্দেশে আনুগত্য প্রদর্শন করবে। ইরাকের রাষ্ট্রীয় মিডিয়াকে ধনী ও রণশীল বেসরকারী কর্পোরেশনের হাতে তুলে দেয়া হবে এবং তা তখন ‘অবাধ ও স্বাধীন’ মিডিয়ায় পরিণত হবে। মার্কিন বৈদেশিক নীতির ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির মৃদুতম সমালোচককে কায়দামতো বঞ্চিত করা হবে। রণশীল রাজনৈতিক দলগুলো মার্কিন উৎস দ্বারা বহুল অর্থপ্রাপ্তির মাধ্যমে, যদি কোনো বামপন্থী গোষ্ঠী থেকে থাকে, তাকে দমন করবে। এই অসম খেলার মাঠে, মার্কিন উপদেষ্টারা মার্কিন-ধাঁচের ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত করবেন, সম্ভবত যেখানে ফোরিডা ও অন্যান্য অংশের মতো গ্রহণযোগ্য ফলাফল পাওয়া যাবে। ইরাকী অর্থনীতির বেসরকারীকরণ করা হবে, জলের দরে সব ছেড়ে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে বিদ্যমান দারিদ্র্য ও কর্মহীনতা অনতিক্রম্য উচ্চতায় পৌঁছবে। বৈদেশিক অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে ইরাক ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়বে। অন্যের শিকার হবার খেসারত এভাবেই তাকে দিতে হবে। সরকারী সেবাখাত সংকুচিত হয়ে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়াবে। ইরাকের আজকে বিপদগ্রস্ত, আগামী দিনেও দুর্ভোগের পরিমাণ এভাবে বেড়ে যাবে। আমাদের এটা বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে যে ইরাকী জনগণ মুক্ত বাজারের স্বর্গে পৌঁছার জন্য আরেকবার ব্যাপক বোমা হামলার শিকার হতে রাজি আছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন
ইরাককে টার্গেট করার আরেকটি কারণকে এক শব্দে বর্ণনা করা যায়: তেল। সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র নিকট অতীতের ঔপনিবেশিক লুণ্ঠননীতিই গ্রহণ করেছে। হোয়াইট হাউসের বর্তমান প্রশাসন তেলমানবদের দ্বারা অলংকৃত। তারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ইরাকের তেলসম্পদের মজুদ নিয়ে চিন্তিত। ব্যারেল প্রতি ২৫ ডলার হারে ১১৩ বিলিয়ন ডলারের ইরাকী সরবরাহের মূল্য দাঁড়ায় ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু তার একটি ফোঁটাও মার্কিন তেলজোটের জন্য নয়; ইরাকী তেলেেত্রর সবই রাষ্ট্রীয় মালিকানার। বাগদাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



