somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিজ-অবয়ব, সংঘাত ও সংশ্লেষ: ডিপজল প্রপঞ্চ

২৫ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


যোগাযোগ ৮-এ প্রকাশিত (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)
মানস চৌধুরীর নিবন্ধ

...............................................................

"গড়গড়ার মা লো, তোর গড়গড়াটা কই?
হালের গরু বাঘে খেয়েছে, পিঁপড়ে টানে মই।"
--প্রচলিত ছড়া

আমি ইদানীং হিরোশিমার উপকণ্ঠে থাকছি আর ডিপজল বহুদিন ঢাকার প্রান্ত গাবতলি ও ফুলতলিতে থাকছেন। তিনি আরও নানান জায়গায়, দেশে ও বিদেশে, থেকে থাকতে পারেন, যেমনটা পারি আমিও, কিন্তু এগুলোই আমাদের স্বীয় স্বীয় মুখ্য নিবাসস্থল এই মুহূর্তে। আমাদের সাাৎ নাই। এমনকি আমি ঢাকায় গাবতলিতে বা ফুলতলিতে থাকলেও, সিনেমা হলের পর্দায় কিংবা দেয়ালের পোস্টারে তাঁকে দেখা ছাড়া, সেই সম্ভাবনা ছিল না। তথাপি একটি অভিন্ন জিজ্ঞাসার আমরা দুই বিষয়বস্তু। আমাদের দুজনেরই নিজ নিজ অবয়ব হাজির করা নিয়ে সেই জিজ্ঞাসা Ñ আত্মপ্রতিকৃতি পরিবেশন। দুজনেই আমরা সজাগভাবে নিজ-প্রতিকৃতি পরিবেশনের ফর্মুলা ঠিক করে থাকি। এই তথ্যটা এণে একটা হঠাৎ-আবিষ্কার নয়। কিন্তু বেশ কিছুকাল বাংলাভাষী চলচ্চিত্রে ও ঢাকার রাজনীতিতে ডিপজলের ক্রমাগত সাফল্যের (এবং আমি সমেত অনেকের ব্যর্থতার) পর, তাঁর সংসদ সদস্য হবার প্রচেষ্টার প্রাক্কালে তাঁর পরিবেশিত অবয়ব নিয়ে কিছু ভাবনাচিন্তা করার উদ্দেশ্যেই এই রচনা। আমার অবয়ব এখানে একটা উপল হয়ে আসবে।

ঢাকাই চলচ্চিত্র এবং ঢাকাই রাজনীতি উভয় নিয়েই বাংলাদেশী শিতি-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, বিশেষতঃ ঢাকাকেন্দ্রিক, বাহ্য নাক-সিঁটকানিটা এতদিনে উল্লেখকৃত প্রপঞ্চ। যেটা ল্য করবার তা হচ্ছে এই উভয় প্রকার তাচ্ছিল্যেরই গুণগত মিল আছে দারুণ। ঢাকাই রাজনীতি নিয়ে তাচ্ছিল্যকার মধ্যবিত্তের বড় অংশই, আপদকালে, প্রাণভরে শীর্ষস্থানীয় মতাধর লোকদের খুঁজতে প্রাণপাত করেন। এই আপদকালের তালিকাটা সূক্ষ্ম বিধায় দীর্ঘ। হাউজলোনের গ্রাহক হওয়া থেকে শুরু করে টেলিফোনের লাইন না-কাটা; বিমানবন্দরে লম্বা লাইনে না-দাঁড়াতে চাওয়া থেকে শুরু করে সঙ্গে আনা সামগ্রির ট্যাক্স-কাটানি Ñ এগুলো হচ্ছে মতাধরদের কাজে লাগানোর মামুলি খাত। তালিকাটা সম্ভাব্য পূর্ণ আকারে পেশ করা চিত্তাকর্ষক এক অনুশীলন হতে পারে। কিন্তু এখানে নয়। পান্তরে, ঢাকাই চলচ্চিত্র নিয়ে তাচ্ছিল্যের বাহ্যপ্রকাশ ও সেসংক্রান্ত ভণ্ডামি নিয়ে এতটা সহজে চিত্রহাজির সম্ভব নয়। এখানে মূল প্রক্রিয়াটা বড় পর্দা থেকে বিনোদন-আইকনগুলোকে ছোটপর্দায় টেনে আনার, এবং ছোটপর্দার নির্মাতাদের বড়পর্দার বড়মানুষ রূপে দেখতে চাইবার স্বপ্ন। কিন্তু দুটো েেত্রই Ñ চলচ্চিত্র কিংবা [জাতীয়] রাজনীতি Ñ মধ্যবিত্ত গড়পরতা মনোভঙ্গির একটা সারাৎসার অবলীলায় চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রাইভেট কনসাম্পশনের উপাদান হিসেবে এগুলো পেতে তাঁরা ব্যগ্র। অন্য ভাষায় বললে, নিজ অস্তিত্ব সমুন্নত রাখার তাগিদে এবং নিজ ভোগাকাক্সার অংশ হিসেবে এগুলো তাঁরা কনস্যুম করতে আকুল আছেন। একটা ব্যবস্থাতন্ত্র হিসেবে এটার প্রতি তাঁদের বাহ্য মনোভঙ্গি নেতিবাচক। কিন্তু সেটাকেও খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটা তাচ্ছিল্য না মোটেই, বরং একটা ব্যবস্থাতন্ত্র হিসেবে এই ত্রেগুলোতে তাঁরা ক্রিটিক্যালি/সপ্রশ্ন সংমিশ্রিত হতে নারাজ। এর আশু মানে দাঁড়ায়, এই ব্যবস্থাতন্ত্রগুলো নিয়ে তাঁদের মনোভঙ্গি বড়জোর এগুলোর অভ্যন্তরীণ জটিল এবং বহুমুখিন উহ্য উপাদানগুলোকে আড়াল করতে সহায়তা করে। তা সেটা তাঁরা ইচ্ছা করেই করুন আর নেহায়েৎ অনিচ্ছাতেই হয়ে থাকুক। শিতি-মধ্যবিত্ত নিজেদের ভোগপ্রক্রিয়াকে এত গুরুত্ব দেয় বলেই আরও জরুরি হয়ে ওঠে এই শ্রেণীর কঠোর সীমানার বাইরের মানুষজনের জন্য কনসাম্পশনপ্রণালীকে বুঝতে চেষ্টা করা। দৃশ্যগত সামগ্রীর েেত্র ডিপজল এই পরিমণ্ডলে কেন্দ্রীয় একটা জায়গায় রয়েছেন।

এবারে আমার অন্তর্বর্তীকালীন ঢাকা সফরের সময়টুকু বাংলাদেশের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের সময়। ফলে আগ্রহী এমপি পদপ্রার্থীদের এখন ময়দানে ও দল-অভ্যন্তরে নড়াচড়ার সময়। এর মধ্যে শেষোক্তটা জটিল এবং সময়সাপে প্রক্রিয়া। বিশেষতঃ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া খোদ নির্বাচনে জেতার কুস্তির থেকে একটুও কম কান্তির নয়। ফলে, অনেকেই মনোনয়ন পাবার অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভোটারদেরকে বঞ্চিত রাখতে চান না। নিজেদের অবয়ব ও ব্যক্তিত্ব থেকে যাতে ভোটাররা দূরত্ববোধ না করেন সেজন্য আগেভাগেই ময়দানে নেমে পড়েন, তা নির্বাচনে ভোটারদের আদৌ কোনো নির্ধারণী মতা থাকুক আর নাই থাকুক। নৈর্বাচনী পদ্ধতিতে প্রতিকৃতি/ইমেজ এবং সেটার প্রতি নির্মিত আমজনতার ‘সমর্থনলাভ’-এর এই খেলাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মিরপুর বা ঢাকা-১১ আসনে এবারে মতাসীন বিএনপি’র অন্ততঃ চারজন মনোনয়নপ্রার্থী আছেন। এঁদেরকে জানা যায় এই অঞ্চলের দেয়ালের দিকে মনোযোগী-চোখসমেত হাঁটাহাঁটি করলে। চারজন সম্ভাব্য বিএনপি প্রার্থী ইতোমধ্যেই দেয়ালে-পোস্টারে আবির্ভূত হবার ব্যবস্থা করেছেন। এঁদের একজন সাবেক সাংসদ ও ঢাকাই পাবলিক জবানে ব্যাপক আলোচিত প্রতিকৃতি এস. এ. খালেক। আরেকজন হলেন আহসানউল্লাহ হাসান যিনি, সম্ভবতঃ, ইতোমধ্যেই কমিশনার হিসেবে ছিলেন আশপাশে। অন্যজন আরেক সাবেক সাংসদ হারুন মোল্লার পুত্র এখলাস মোল্লা। এবং সর্বশেষ জন, বর্তমান আলোচনার মধ্যমণি, মনোয়ার হোসেন দিপু ওরফে ডিপজল। এই লেখা প্রকাশিত হবার আগে এসব বিষয়ে ফয়সালা হয়ে গেলে কিংবা খোদ নির্বাচন হয়ে গেলেও প্রোপট হিসেবে এই তথ্যগুলোর গুরুত্বহানি হবার কারণ নেই।

নির্বাচনের পোস্টারে কিংবা সাধারণভাবে রাজনৈতিক প্রচারণার যেকোনো পোস্টারে পুরুষের ব্যক্তি-অবয়ব প্রকাশরীতিতে গত কয়েক বছরের বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল হয়েছে। আপাতঃ সাধারণ এই পর্যবেণটিকে মনোযোগ দিয়ে পাঠ করা যায়। এক তো হলো খুব কারিগরিভাবে দেখলে সাদাকালো ছবি প্রায় উঠেই গেছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরিবেশিত ইমেজের পোশাক-বাছাই। কলেজ নির্বাচন থেকে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবয়বের অবধারিত অংশ হয়ে পড়েছে পাশ্চাত্যীয় আনুষ্ঠানিক পোশাক Ñ হালকা রঙের জামার উপর ঘন রঙের কোট, মিলিয়ে একটা টাই। আব বিধায় নিুাঙ্গে কে কী পরছিলেন, ছবি তুলবার কালে, তা জানা যায় না। এই পোশাকের সঙ্গে মুখাভিব্যক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত। ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর আসনের ইদানীংকার নিয়মিত প্রার্থী খন্দকার মাহবুবউদ্দিনের মতো সজাগ-অভিজাত প্রতিকৃতি বাদ দিলে, এমন পোশাক পরে স্টুডিওতে বসে ছবি তোলার কালে কারও মুখে বিশেষ হাসি থাকবার কথা নয়। অধিকন্তু, এই বিশেষ পরিবেশনে সেটা বিশেষ রীতিনিষ্ঠও নয়। ফলে হাসি থাকে না। মানে সাধারণভাবে পাসপোর্ট ছবি বলতে যেসব আচরণবিধির ধারণা সুগঠিত আছে, এসব পোস্টারে টাই-বাঁধা এই মুখগুলো সেসবের কঠিন শাসনবিধিতে পর্যূদস্ত অবস্থাতেই ছবিকৃত হন। রাজনীতি অঙ্গণের পুরুষ-প্রতিকৃতি নিয়ে বলবার সময়ে স্মরণ রাখা জরুরি যে আওয়ামী পরে প্রতিকৃতি-পরিবেশন-রীতি মাঝেমধ্যেই এর প্রবাদ-আইকন শেখ মুজিবের পোশাকের স্মারক বা রেফরেন্ট হবার চাপে কিংবা দায়িত্বে থাকে। তুলনায়, বিএনপি-পীয়রা শেষ সত্তরে নির্মিত সচেতন মিডিয়ানিষ্ঠ আইকন জিয়ার সাফারি ও রোদচশমা (রে-ব্যান না হলেও, যেকোনো একটা অন্ততঃ) বয়ে বেড়ানোর চাপ স¤প্রতি আর বহন করেন না। তারেক জিয়াও, সাফারি ও চশমার সম্ভাব্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরসূরী হতে পারতেন যিনি, এর ভার একনাগাড় ছবিতে বহন করেন না। এর একটা কারণ হতে পারে, পোশাকটিকে প্রায় হুবহু লে. জে. এরশাদ ত্যক্ততার সীমা পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন। ফলে পাশ্চাত্যীয় পোশাকে, আনুষ্ঠানিক শক্ত মুখাবয়বে, এই পরিবেশনরীতি যে কেবল বিএনপি পকে এরশাদ-কিষ্ট পরিবেশনরীতি থেকে বিকল্প সরবরাহ করেছে তাই নয়, বরং, নানান পরে জন্য একটা আধুনিকতাকামী তোড়জোড় ইউনিফর্মিটি প্রদান করেছে। অধিকন্তু, মুখাবয়ব অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক-দাপ্তরিক হবার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থেকেছে, শেখ মুজিব হতে সৃষ্ট জনবাদী একটা পাটাতনে যেটা আদৌ একইরকম ছিল না।

এরকম প্রোপটে, মনোনয়নের আগেই ডিপজল যে ছবিখানি দিয়ে তাঁর প্রতিকৃতি প্রোথিত করছেন, তাঁর প্রজাদের অভিজ্ঞানে, সেটা চমকপ্রদ। ডিপজল টাই পরেননি, জামাই পরেছেন একখানা কেবল। হতে পারে ইদানীং তিনি বাড়তি চুল পরেন মাথায়। সেটাতে পরিপাটি সিঁথি। দু’ ধরনের পোস্টারে দু’দিকে সিঁথি, অন্যথায় একই প্রতিকৃতি Ñ অনুমান করা যায় নেগেটিভ উল্টে ছাপানো। কিন্তু যেটা এই আলোচনার মুখ্য মনোযোগের জায়গা তা হলে অবয়বটিতে ডিপজলের প্রণোদিত হাসি। এটা এমন একটা হাসি, যেটার পরিবেশন রীতি ঠাহর করতে আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্রের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দৃকপাত করতে হবে।৩ পোস্টারে ডিপজলের হাসিখানা নির্বাচনী/রাজনীতিক প্রচারণায় কিছুকাল আগ পর্যন্ত অল্প হলেও নজরে-পড়া অন্যান্যদের রীতিমাফিক হাসির সঙ্গে কিছুমাত্র মেলে না। ডিপজলের এই হাসিতে মুখের পেশীর অধিকন্তু চোখ এবং নাক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহৃত। এমনিতে, তাঁর চোখের আকৃতি গড়পড়তা মানুষজনের থেকে বেশ বড়, অেিগালকের সাদা অংশ তুলনায় বেশি এবং সেটি বেশ বাইরের দিকে ভাসা ভাসা। ডিপজলের চোখ সুস্পষ্ট। অনুমান হয়, চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ দেখলে, তাঁর চোখের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে তিনি বিশেষ সজাগ। এই পোস্টারটিতে চোখজোড়া গভীর নিবদ্ধ, ক্যামেরায় নয়, বাইরে কোনো ল্যবস্তুর দিকে। নিবদ্ধ বললেও চোখজোড়ার ভূমিকা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয় না, বরং বলা উচিত বিদ্ধকারী, পিনেট্রেটিভ। নাকের পাদদেশের দু’পাশ থেকে কুঞ্চিত। সজাগ এই কুঞ্চনের ফলে ঠোঁট এবং ঠোঁটের উপর মোঁচ নাকের দু’পাশ বরাবর দুইটা বাঁক নিয়েছে। মোঁচটা তাঁর নিজেরই, বাড়তি কিছু লাগাননি বলেই মনে হয়। মোঁচের দু’ধারের প্রান্তসীমা ঠোঁটের প্রান্তসীমা ডিঙ্গিয়ে এসে থেমেছে। তাঁরা সাদা দাঁতগুলো এরই মধ্যে ঝকঝকিয়ে উপস্থিত।

ডিপজলের এই হাসিমাখা ছবিখানা আত্মপ্রতিকৃতির পাবলিকীকরণের যাবতীয় পুরাতন কায়দাকানুনকে একদম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। পাবলিকীকরণের প্রতিকৃতিতে Ñ রাজনীতিক ময়দানের কথাই হচ্ছে Ñ কিছু অনুভূতিকে ইশারা করবার স্পষ্ট চর্চা চিহ্নিত করা সম্ভব। টাই-বাঁধা নৈর্ব্যক্তিকতার বাইরে যেসব পরিবেশন ল্য করা যায় সেখানে কতগুলো মৌলিক অনুভূতি শনাক্তযোগ্য Ñ লাস্য, প্রসন্নতা, [প্রজা]-বাৎসল্য, দৃঢ়তা/ঋজুতা ওরফে চলতি ভাষায় যাকে ব্যক্তিত্ব বলে৪ ইত্যাদি। আমি বলতে চাইছি, সচেতন কিংবা অচেতন, প্রতিকৃতি-রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে যেন ছবির ভোক্তাকুলে প্রতিকৃতির মালিক সম্বন্ধে এসব অনুভূতি সৃজিত হয়। এসব অনুভূতি কেন নিরন্তর ইতিবাচক পরিত্রে ইঙ্গিত করে সেটা একদম স্বতন্ত্র জিজ্ঞাসা, এবং এণে আলোচ্য নয়। কিন্তু আলোচ্য ডিপজলের এই ছবিখানা এসকল অনুভূতি সৃজনে/সঞ্চালনে কিছুমাত্র বিচলিত ছিল না; বরং তিনি নির্দেশ/রেফার করতে চেয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু।

আব ছবির সীমাবদ্ধতা এখানে আসলেই গুরুতর। সেটা যে কেবল নিুাঙ্গের পোশাক সম্পর্কে আমাদের অবহিত করে না তাই নয়, পরন্তু শরীরভঙ্গির সম্ভাবনাগুলো হয় আড়াল করে নয়তো, ছবিকৃত হবার কালেই, পরিসীমিত করে। খুঁটিয়ে দেখলে, তারপরও, বোঝা সম্ভব যে তাঁর পৃষ্ঠদেশ খাড়া উল্লম্ব নয়। অধিকাংশ আলোকচিত্রীই এই ধরনের ছবি তুলবার সময়ে বিষয়বস্তু-মানুষটাকে একদম পিঠ-সোজা করে বসতে বলেন। ডিপজল, হয়তো নিজে থেকেই, দশ ডিগ্রি মতো সমুখে, এবং ত্যারছাভাবে, ঝুঁকে আছেন বলে মনে হয়। সেটা তিনি পিঠ থেকে করেছেন নাকি ঘাড় থেকে তা বোঝা যায় না। তাঁর এই ছবিখানা ঠিক আবও নয়, বরং আগর্দান। তিনি কী অনুভূতি দর্শককুলে সঞ্চার করতে চেয়েছেন সেটা নিশ্চয়ই সহজ জিজ্ঞাসা নয়। কিন্তু প্রচলিত পরিবেশনরীতির মধ্যকার ইতিবাচক কোনো পরিকাঠামোতে তিনি থাকতে চাননি। অনুবর্তীতে, তাঁর অবয়ব যে অনুভূতি তৈরি করতে পারে তাকে বিশেষ একটা নামে বন্দি না-করে বরং আমি ঢাকাই চলচ্চিত্রের পাঠকত্বে ‘ভিলেন’ ধারণার আওতায় আগে রাখতে চাইছি। এসূত্রে প্রস্তাব করছি, প্রাক-মনোনয়ন নির্বাচনী প্রচারণায় এখন পর্যন্ত ডিপজলের একমাত্র ছবিখানা নির্দেশ/রেফার করতে চাইছে নিষ্ঠুরতা, জিঘাংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা ইত্যাকার ফিল্মি অনুভূতিকে। এখানে স্পষ্ট করবার প্রয়োজন আছে, আমার তরফে ‘ফিল্মি’ বিশেষণটা ব্যবহারের কারণ কী। ভেঙে বললে, আমার বক্তব্য এই নয় যে ডিপজলের ছবিখানা নিষ্ঠুরতা ও ইত্যাকার অনুভূতি সৃজনে-নির্দেশে প্রচেষ্ট, বরং ঢাকার চলচ্চিত্রে খলচরিত্রগুলোর যে স্থায়ী ও অনড়প্রায় প্রতিকৃতি সেখানে এই অনুভূতিগুলোর ব্যাঞ্জনাকে নির্দেশ করতে সচেষ্ট। ফলতঃ, ছবিখানা আদতেই ইমেজ-নির্মাণ প্রচেষ্টা নয়, বরং বিশেষ পরিসরে (চলচ্চিত্র) নির্মিত ইমেজকে নির্দেশ করতে সচেতন প্রয়াস। এ পর্যন্ত ভাবতে পারলে আর সন্দেহ থাকে না যে ঢাকাই চলচ্চিত্রে ডিপজলের বিশাল ও এখন পর্যন্ত (একাডেমিক) ব্যাখ্যাতীত সাফল্যের সঙ্গে এই অবয়ব-প্রস্তাব সম্পর্কিত। ডিপজল ভিলেন চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে অত্যন্ত নিশ্চিত তাঁর চলচ্চিত্র-জনপ্রিয়তার বিষয়ে এবং নিজ-অবয়ব হাজির করবার বেলায় কথিত ইতিবাচক অনুভূতিগুলোকে নির্দেশ করতে কিছুমাত্র চাপ বোধ তিনি করেননি। আত্মপ্রতিকৃতি আমকরণের আধুনিক প্রক্রিয়ায় এটা একটা চিত্তাকর্ষক ঘটনা।

এখানে দুটো বিষয় উল্লেখের দাবিদার। জটিলভাবে যদিও, সেগুলো সম্পর্কিত। প্রথমটা হলো: যদি ইতিবাচক অনুভূতিগুলোর বিপরীতেই কিছু ডিপজল রেফার/নির্দেশ করতে চান, যদি ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রে খল হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তার উপর দাঁড়াতে চান তাহলে সঙ্গত ছিল ছায়াছবিরই কোনো স্থিরচিত্র হাজির করা যেখানে তিনি নিষ্ঠুর খল হিসেবে উপস্থিত। একথা এখন চলচ্চিত্র-দর্শক মহলের পাবলিক জবানে সাধারণভাবে স্বীকৃত যে ডিপজল-রূপায়িত নিষ্ঠুরতা পূর্ববর্তী সকল খল-ইমেজ থেকে ছাপিয়ে গেছে। ডিপজলের পে একছবির পোস্টার কিংবা কোলাজ-ছবির পোস্টার করে তাঁর চলচ্চিত্র-প্রতিকৃতির পুনরুৎপাদন সম্ভব ছিল অনেক সহজে। কিন্তু তিনি একটা আনকোরা ছবিই পোস্টারের জন্য তুলতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো: এই পোস্টার যখন প্রকাশিত হয়, তার বেশ আগে কিছুকাল ধরে ডিপজল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজেকে খলচরিত্রের কাঠামো থেকে বের করে এনে কাজ করছেন। এটা বিশেষ জরুরি তথ্য। সা¤প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্তগুলোর মধ্যে কোটি টাকার কাবিন, চাচ্চু, পিতার আসন৫ ইত্যাদি রয়েছে। এসব ছবির পোস্টারে ডিপজলের অবয়ব দেখে বোঝা যায় চরিত্রাভিনেতা বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে ডিপজল এখন সেখানে স্বার রাখতে চাইছেন। এখানেও একটা চমকপ্রদ বিষয় আছে। ডিপজল খলনায়ক হিসেবে কাজ করেছেন এমন বহু চলচ্চিত্রের পোস্টার বা বিজ্ঞাপনী কার্যক্রমে তিনি নায়ককেও ছায়ার তলে নিয়ে ফেলেছিলেন। অন্য কিছু বাদ দিলেও, পোস্টারে তাঁর মুখটাই বড় করে ছাপা হবার একাধিক নজির অতীতে ছিল। কিন্তু তিনি নিজে লগ্নিকার হয়ে চরিত্রাভিনেতা হবার প্রাক্কালে পোস্টারের জায়গা শরীকীভাবে নিচ্ছেন Ñ রাজ্জাকের সঙ্গে কিংবা অন্য ছবিতে একজন বাচ্চার সঙ্গে। এরকম। যাহোক, পর্দায় ডিপজলের এই ‘ভালমানুষ’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা তাঁর দর্শকদের অনেকের কাছেই ওমরাহ্ করে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটা খুব জটিল জিজ্ঞাসা এবং বর্তমান আলোচনায় খুব প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষতঃ তাঁর সম্ভাব্য গ্রেফতার ও ওমরাহ্ সম্পর্কিত সামান্য তথ্যাদি যা জানা যায় তার আলোকে। কিন্তু ছায়াছবিতে খলনায়ক থেকে সরে-আসা এবং নির্বাচনী পোস্টারে সেই বিশেষ দর্শকত্বের সঙ্গেই যোগাযোগ করবার সচেতন প্রয়াস যুগপৎ এককালে ঘটায় ডিপজলের আলোচ্য অবয়বটি আরও বিশেষ গুরুত্ববহ মনে হ
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×