somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই সময়ে চলচ্চিত্র-সংসদ আন্দোলন

২৬ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১০:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সময় পাল্টেছে, তাই এই সময়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মপরিধি, তৎপরতা কেমন হবে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এদেশে ষাট, সত্তর ও আশির দশকে সংসদ আন্দোলন যেমন চাঙ্গা ছিল, বিগত দুই দশক ধরে তাতে তীব্র ভাটার টান। পাল্টানো সময়ে কেবল এটুকুই দ্রষ্টব্য নয়, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম যে-কার্যক্রম, ভালো চলচ্চিত্র সদস্যদের দেখানো, তাও তাৎপর্যহীন হয়ে পড়েছে। কারণ, অতীতে-দুর্লভ সেইসব ক্লাসিক কিংবা মডার্ন ক্লাসিক চলচ্চিত্রগুলো এখন ডিভিডি-আকারে ঢাকায় সুলভ। তাই অদেখা ভিনদেশী চলচ্চিত্র দেখানোর মাধ্যমে চলচ্চিত্র-সংসদগুলো সদস্যদের যেভাবে চমৎকৃত ও চমকিত করতেন, সেই মহত্ত্ব আর শেষ পর্যন্ত বলবৎ থাকছে না। একশো টাকাতেই একটি 'সেভেন্থ সিল' বা 'সিটিজেন কেন' বা 'ব্যাটেলশিপ পটেমকিন' যেকেউই সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকি ধীরে ধীরে যেকেউ নিজ বাসগৃহেই একটি ফিল্ম-আর্কাইভ গড়ে তুলতে পারেন, যেমন সংগ্রহ আগে কেবল চলচ্চিত্র সংসদগুলোরই ছিল। প্রযুক্তির কল্যাণে চলচ্চিত্র-সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কি একটি বিগতপ্রায় প্রপঞ্চে পরিণত হবে, নাকি এর তৎপরতার ধরন পরিবর্তিত হবে? এই নিবন্ধে এবিষয়টিতেই আলোকপাত করা হবে।

এই সময়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কার্যক্রম অন্তঃত তিনটি এলাকায় চলতে পারে: চলচ্চিত্র আস্বাদন, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির উন্নয়ন। অতীতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনই সংসদের প্রধান কাজের অন্তর্গত ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে দায়িত্ব কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্যে সীমিত রাখলে চলবে না, বরং প্রদর্শিত বা নির্বাচিত চলচ্চিত্রকে নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি জরুরি। চলচ্চিত্রের সহজপ্রাপ্যতা চলচ্চিত্রপ্রদর্শনের বিষয়টিকে অপেক্ষাকৃত অগুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিগণিত করেছে। তার স্থলে চলচ্চিত্র আস্বাদনের বিষয়গুলোকে জোরদার করা একটি ভালো সংসদের কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আস্বাদনের কাজটি হতে পারে নানা উপায়ে। একটি হতে পারে নির্বাচিত চলচ্চিত্র অথবা চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে নিয়মিত আলোচনা। সাপ্তাহিক পাঠচক্র এক্ষেত্রে খুব কার্যকর হতে পারে। বড়ো আকারে সেমিনারও মাঝে মাঝে করা যেতে পারে। আর প্রয়োজন প্রকাশনার। এটিও যতটা সম্ভব নিয়মিত করা দরকার। নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্রবিষয়ক একটি পত্রিকা চালানোই একটি সংসদের বিরাট একটি অর্জন হতে পারে। পাঠচক্র, সেমিনার ও প্রকাশনার মাধ্যমে চলচ্চিত্র আস্বাদনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র সমালোচনা বা গবেষণার একটি ধারাও তৈরী হতে পারে। যেকোনো দেশের উন্নত চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি বিকাশে একটি শক্ত সমালোচনা-গবেষণার ধারা খুবই জরুরি। আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো চলচ্চিত্র-নির্মাতাদেরই চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখি করতে দেখা যায়। এর কারণ চলচ্চিত্র সমালোচক-গবেষকের অভাব। কোনো পরিচালক যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেখেন ভিন্ন কথা, কিন্তু অন্য কেউ একাজটি করছে না বলে তা যদি তাদের ঘাড়ে দায়িত্বের মতো এসে পড়ে তবে তা সার্বিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতির দৈন্যকেই নির্দেশ করে।

অগ্রগণ্য চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী মুহম্মদ খসরু মনে করতেন চলচ্চিত্রনির্মাণ সংসদের কাজ নয়। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজকের স্বাধীনধারার স্বনামখ্যাত পরিচালকবৃন্দ -- তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, আবু সাইয়ীদ -- এরা প্রত্যেকেই চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ছিলেন। এমনকি আশির দশকে শুরু হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন যা স্বাধীনধারায় রূপলাভ করেছে, তাকে সরাসরি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফসলই বলতে হবে। তাই বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্র সংসদের পরিচালক সৃষ্টির কাজটি বাদ পড়ছে না। বরং পূর্বে সংসদগুলোর তেমন কোনো ল্য না-থাকলেও পরিচালকরা ঠিকই বেরিয়ে এসেছিলেন, বর্তমানে একটি সংসদের ল্যই হতে পারে চলচ্চিত্রনির্মাতা তৈরীর। নিয়মিত ছবি দেখা-আলোচনার পাশাপাশি এপ্রেসিয়েশন কোর্স আয়োজনের মাধ্যমেও সংসদ কাজটি করতে পারে। কোনো সম্ভাবনাময় নির্মাতার জন্য অর্থ সংগ্রহ করাও সংসদের কাজের বাইরে পড়বে না।

সার্বিক চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি বিকাশের জন্য অবদান রাখার বিষয়টি অনেক ব্যাপক। এবং একটি সংসদের পক্ষে এর পুরো এলাকায় কাজ করা সম্ভব নয়। একটি সংসদ কয়েকটি লক্ষ্য স্থির করতে পারে। যেমন, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের তৎপরতা কেবলই রাজধানীকেন্দ্রিকÑ এরকম একটি অভিযোগ রয়েছে। একটি সংসদ এর তৎপরতাকে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে দেবার মতো গুরুদায়িত্ব নিতে পারে। প্রতিটি জেলায় না হোক, প্রতিটি বিভাগীয় কিংবা বড়ো বেশ কয়েকটি শহরে একটি সংসদের শাখা খোলা যেতে পারে। সেইসব শাখা স্থানীয় সদস্যদের দ্বারা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারে। কেন্দ্রীয় সংসদ কেবল কিছু দিকনির্দেশনা দেবে। এই পর্যায়ে এসে চলচ্চিত্রপ্রদর্শনের পুরনো কার্যক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ ক্লাসিক চলচ্চিত্রগুলো কেবল ঢাকাতেই পাওয়া যায়। ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে সংসদের শাখাগুলোর আর্কাইভ এক্ষেত্রে বিশ্বচলচ্চিত্রের বিশাল ভাণ্ডার স্থানীয় দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে, নিয়মিত চলচ্চিত্রপ্রদর্শনের মাধ্যমে এবং চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে। যদি জেলা পর্যায়ে শাখা খোলাটা খুব বড়ো ব্যবস্থাপনার কাজ বলে মনে হয়, তবে পর্যায়ক্রমে জেলাগুলোতে উৎসব করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে। চলচ্চিত্রের সহজপ্রাপ্যতা যেকোনো উৎসব আয়োজন করাকেও সহজ করে দিয়েছে। উন্নত চলচ্চিত্র কী, এই বোধটা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেয়া খুবই দরকারি কাজ এই মুহূর্তে। কারণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন চলচ্চিত্রনির্মাণের খরচ অনেক কমে আসছে এবং সম্পাদনাসহ পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজগুলোও প্রায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসছে। এখন চাঁপাই নবাবগঞ্জের কিংবা বাগেরহাটের একজন মেধাবী মানুষের পক্ষে চলচ্চিত্র নির্মাণের সাহস করা সম্ভব। ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি ছাড়াই তিনি এই নির্মাণের কাজটি সারতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র স্থানীয়, জাতীয় এবং এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রদর্শিত হতে পারে। এজন্য স্থানীয় ঐ শিল্পমনস্ক মেধাবী মানুষটিকে বিশ্বমানের চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া জরুরি। মানি, এই কাজটি বাস্তবায়নে সরকারী উদ্যোগ থাকলে আরও ভালো হতো, কিন্তু যেহেতু তা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই চলচ্চিত্র সংসদই শেষ ভরসাস্থল যারা চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি সম্প্রসারণের কাজটি করতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:১০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×