আমার প্রিয় পোস্ট

মাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের পাঠশালা। সঙ্গে সাহিত্যের সুবাস ...

ব্ল্যাক আউট: সাহসী ও নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র (২)

২৭ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১১:৩৬

                       

তবে বিষয়ের পাশাপাশি আঙ্গিকেও টোকন ঠাকুর বহুমাত্রায় নিরীার আশ্রয় নিয়েছেন। আগেই বলেছি, ব্ল্যাক আউটই, সম্ভবত, এযাবতকালের বাংলাদেশে সবচাইতে নিরীাধর্মী পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই ছবির আঙ্গিকে কিছু প্রতীক-রূপকের ব্যবহার ও স্বপ্নীল পরাবাস্তবতা জটিল এক ন্যারেটিভ নির্মাণ করেছে। টোকন ঠাকুর মুরুব্বি হিসেবে ঋত্বিক ও কুরোশাওয়াকে টাইটেল-কার্ডে মানলেও, তার ছবিতে ঋত্বিকের মেলোড্রামা কিংবা কুরোশাওয়ার সামুরাই-সংস্কৃতিকে ঘিরে নির্মিত বিশেষ সিনেমারীতির তেমন কিছু দেখা গেলনা। বরং চলচ্চিত্রিক ভাষা নির্মাণের েেত্র তিনি যেন বুনুয়েল কিংবা ফেলিনিকে অনুসরণ করছেন। অশ্ব এই ছবিতে অনন্য এক রূপক হিসেবে হাজির হয়েছে। টোকন ঠাকুর তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছেন ‘আস্তাবল’। মাদল-রাফির চিলেকোঠার কলিংবেল হ্রেষাধ্বনি করে। অর্ণবকৃত সাউন্ডট্র্যাকে বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে এই হ্রেষাধ্বনিকে। ছবিশেষের টাইটেলকার্ড শেষেও এনিমেশনে দেখা যায় একটি ঘোড়া পাহাড় থেকে নেমে আসছে উপত্যকা বেয়ে। হয়তো তারুণ্য, তেজ, গতি ও পৌরুষ ইত্যাদি নানা অর্থ নির্মাণে অশ্ব-রূপকের এই যথেচ্ছ ব্যবহার। পরাবাস্তব-মুহূর্ত নির্মাণ করতে টোকন কুয়াশাঢাকা সকালকে বহুবার ব্যবহার করেছেন। বাউলের শিঙা, পুষ্পাবৃত শাল্মলীর কাছে মাদলের ছুটে আসা ইত্যাদি মুহূর্তগুলোকে স্বপ্নময় করে তুলতে কুয়াশাকে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো পরাবাস্তব মুহূর্ত তৈরি করতে পরিচালকের চিন্তাশক্তির সীমাবদ্ধতা ল করা গেছে। যেমন একটি কল্পনার দৃশ্যে দেখা যায় রাফি ও মিটির স্থিরচিত্রনির্ভর কয়েক মিনিটের একটি দৃশ্য, যেখানে সাউন্ডট্র্যাকে রাফি ও মিটি প্রেমময়, কবিত্বপূর্ণ অথচ হেঁয়ালীতে ভরা সংলাপ শোনা যায়। এই সিকোয়েন্সটির পরে দেখা যায় রাফি ও মিটি বিয়ের পোশাকে একটি সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে। সিঁড়িভাঙ্গা শেষ হলে তারা একটি গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাফি গেটের তালা খোলার জন্য চাবি ঘোরায়, তালা খোলে না। ইতস্তত ও বিব্রত রাফি মিটিকে জানায় সে ভুল চাবি নিয়ে এসেছে। স্বপ্নদৃশ্যের অবসান ঘটে। কনসেপ্ট হিসেবে চমৎকার, অর্থাৎ মিটিকে তার জীবনসঙ্গী করা হচ্ছে না। কিন্তু এই চমৎকার স্বপ্নটির কী অপূর্ব চিত্রায়ণই না হতে পারতো: ধরা যাক একটি সাদা সিঁড়ি, আশেপাশে কোনো দেয়াল নেই, কেবলই শূন্যতা, সিঁড়ির শেষে একটি পরাবাস্তব ধাঁচের গেট, তাতে ওই ধাঁচেরই একটি তালা ...। এধরনের দৃশ্য কীভাবে নির্মিত হতে পারে, তা উপলব্ধি করতে আমরা ফেদেরিকো ফেলিনির এইট এন্ড হাফ ছবিটির কথা স্মরণ করতে পারি। ব্ল্যাক আউট ছবিতে বেশ কিছু লং শট রয়েছে, তবে বিগ কোজ-আপের ব্যবহার সচেতন দর্শকমাত্রই চোখে পড়বে। এই বিগ কোজ-আপের অতিরিক্ত ব্যবহারের হেতু বোঝা গেলনা। টোকন কি এভাবে নিজস্ব সিনেমা-ভাষা নির্মাণ করতে চাচ্ছেন? পোড়োবাড়িতে বালক মাদল ও যুবক মাদলের, সময় ভেঙ্গে, একইসঙ্গে ঘোরাঘুরির দৃশ্যটি নির্মাণে দতা দেখিয়েছেন পরিচালক, তবে এই দৃশ্যটি মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর প্রত্যাবর্তন টেলিফিল্মটির কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। ঠিক একই রকম দৃশ্য প্রত্যাবর্তন-এ রয়েছে।

এই ছবির অভিনয়রীতি খুবই অনানুষ্ঠানিক, একারণে বিশ্বাসযোগ্য ও প্রশংসাযোগ্য। রাফি ও মাদল চরিত্রে তানভীর হাসান ও রাহুল আনন্দ দু’জনেই চমৎকার অভিনয় করেছেন। তবে মিটির চরিত্রে তিনার অভিনয় সাবলীল হয়নি। বিশেষত তার স্বরপ্রপেণ দুর্বল মনে হয়েছে। রাফি ও ধ্র“ব এষের আলাপচারিতার দৃশ্যটি খাপছাড়া লেগেছে, দৃশ্যটির সংলাপগুলোও পারম্পর্যহীন মনে হয়েছে। অন্যান্য চরিত্রাভিনেতাদের মধ্যে ধ্র“ব এষের অভিনয়ও খুব কাঁচা মনে হয়েছে। রাফি ধ্র“ব এষের বাসা থেকে নেমে যাবার পরে দেখা গেল তারা দু’জন কথা বলছেনÑ একি সম্পাদকীয় ভরাডুবি, নাকি অপ্রথাগত ন্যারেটিভের খেয়াল, তা ছবি দেখে ঠাহর করা মুশকিল।

এই ছবির সম্পদ হলে এর সংগীত। শায়ান চৌধুরী অর্ণব তরুণ মিউজিশিয়ান, ফোক গানের ফিউশন করে যিনি আলোচিত, কিন্তু এই ছবিতে তিনি ব্যাপকভাবে পশ্চিমা যন্ত্রের ব্যবহার করেছেন। বিশেষত পিয়ানোর ব্যবহার বেশি করা হয়েছে। ছবির শব্দগ্রাহকও তিনি, তাই সংগীত আর শব্দকে তিনি একহাতে নিয়ে সৃজনশীলতার প্রয়োগ ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছেন। ছবিতে ব্যবহৃত ‘মুহূর্ত কেন এত বড়ো’ এবং ‘সময়, সবুজ ডাইনী’ গান দু’টিও তিনি দতার সঙ্গে গেয়েছেন, প্রথমটি তার স্বভাবসুলভ কণ্ঠে ও কম্পোজিশনে, দ্বিতীয়টি থিম সং আকারে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তার গায়কী এেেত্র আমাদের অদ্ভূত এক নিঃসঙ্গ চরাচরে নিয়ে হাজির করে। কফিল আহমেদের ‘আগুনে খাই আগুনে ঘুমাই’, ‘বন্ধু থাকো বন্ধু থাকো’, ‘যিশু আমার চন্দ্র কোপায়’ গান তিনটিও এই ছবিতে ভিন্ন দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে। তার ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ ধাঁচের গানগুলো এই সময়ের বাংলা গানে অন্যতম সংযোজন, টোকন ঠাকুরের ছবিতে গানগুলোর সুপ্রযুক্ত ব্যবহার হয়েছে।

ভিডিওগ্রাফি ও সম্পাদনা এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন সামির আহমেদ। একই ব্যক্তির কাজ হওয়ায় এই দু’টির সমন্বয় ভালোমতোই হয়েছে। সম্পাদকের সুপার ইম্পোজিশন ব্যবহার চোখে পড়ার মতো, স্বপ্নদৃশ্যের খাতিরে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। চিত্রনাট্যের ডকুমেন্টশনের ঝোঁকের পাশাপাশি ক্যামেরাও কখনো কখনো প্রামাণ্যচিত্রের মতো করে পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এলোমেলোভাবে মুভ করেছে। এেেত্র চিলেকোঠায় সবাই মিলে মদ্যপানের দৃশ্যটির কথা মনে করা যেতে পারে। ছবির শেষের দিকে পিকাসো-দালি-ভ্যানগগসহ অন্য অনেকের চিত্রকর্ম কোলাজ করে চোখের নিমিষে দেখিয়ে দেয়া, দ সম্পাদনার উদাহরণ। একের পর এক স্টিল না-দেখিয়ে দ্রুতগতিতে দেখিয়ে দেবার মাধ্যমে কিছু কারণ ও কিছু অকারণ রহস্যসহ পুরোটা বুঝে উঠতে না-পারার অপ্রাপ্তি দর্শকদের মধ্যে কাজ করবে, যা ছবিটির শৌর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ব্ল্যাক আউট ছবিটির চমক হলো এর এনিমেশন ও চিত্রকর্মের বিপুল ব্যবহার। ছবি আঁকা, শিল্পনির্দেশনা ও এনিমেশনের কাজটি করেছেন আব্দুল হালিম চঞ্চল। বাংলাদেশের কোনো ছবিতে এই মাত্রায় এনিমেশন ব্যবহার করা হয়নি। শুরুর ও শেষের টাইটেল কার্ড ছাড়াও ছবির ভেতরেও ‘জোছনা রাতে নিঃসঙ্গ ঈগল’ প্রভৃতি চিত্রকল্প নির্মাণ করতে পরিচালক এনিমেশনের ব্যবহার করেছেন। বিশেষত শেষের টাইটেল কার্ডে দালির ‘গলিত সময়’ চিত্রকর্মের কনসেপ্ট আশ্রয় করে যে-এনিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে তা মুগ্ধ হবার মতো।

পরিশেষে বলা যায়, ব্ল্যাক আউট হলো বক্তব্যে সাহসী ও আঙ্গিকে নিরীাধর্মী একটি চলচ্চিত্র। টোকন ঠাকুর তার প্রথম ছবিতেই পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। বোঝা যায় চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্বে তার ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।

 

প্রকাশ করা হয়েছে: চলচ্চিত্র  বিভাগে ।

 

  • ৫ টি মন্তব্য
  • ২৫৩বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:০৬
comment by: কেএসআমীন বলেছেন: আমার লিনাক্স বিষয়ক পোস্টে সহমত পোষন করায় আপনাকে ধন্যবাদ। ট্রাফিক আইনের খসড়া বিষয়ক পোস্টটি দেখার অনুরোধ রইল।
২. ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১০
comment by: লাল দরজা বলেছেন: আপনার ব্লগে এই প্রথম আসা, এখানে পড়বার মতো কিছু মিলেছে।
বার বার আসবার কারন আছে, আসব।
ধন্যবাদ।
৩. ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ৮:৩৬
comment by: ফাহমিদুল হক বলেছেন: ধন্যবাদ, আবার আসবেন। আরো লেখা পোস্ট করবো, ধীরে ধীরে
৪. ২৭ শে নভেম্বর, ২০০৭ ভোর ৪:৩১
comment by: নির্বাসিত বলেছেন: চমত্কার লেখা। ছবিটি দেখতে ইচ্ছে করছে। ইউ-টিউবে কি পাওয়া যাবে?
৫. ২৭ শে নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:২৬
comment by: ফাহমিদুল হক বলেছেন: নির্বাসিত, ধন্যবাদ। না, সম্ভবত ইউটিউবে পাওয়া যায়না। ডিভিডি বের হতে পারে, ঢাকায় খোঁজখবর রাখতে হবে।

 



 


আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াই। ফিকশন ও নন-ফিকশন দুই ধরনের লেখাই লিখি। গল্প লিখি, প্রবন্ধ লিখি, অনুবাদ...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৪৯৬৫৩