somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নগরায়ণের পরে (গল্প)

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকালের খাওয়ার পর একদফা ক্ষেতের কাজ সেরে ঘর্মাক্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে বাড়ির দণিদিকের মাচানে একটু হাওয়া খেতে বসে আব্দুল হাকিম। ফ্যান বলতে তো বাড়িতে ঐ একটাই, আফজাল বিয়ে করে বৌ আনলে ফ্যানটা ওর ঘরেই দিয়ে দিতে হয়েছে, নতুন বৌকে তো আর গরমের মধ্যে রাখা যায় না। তাই আব্দুল হাকিম বা বাড়ির অন্যদের খুব গরম লাগলে দক্ষিণমুখী এই মাচায় এসে বসতে হয়। আর গরমও পড়ে বটে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ্য মাসে, খোলা মাঠে তাকানো যায়না। জলার ওপারে হঠাৎ-শেষ-হয়ে-যাওয়া শহরের দালান-কোঠাগুলোও যেন সাদা আগুনে জ্বলতে থাকে -- শীতের সময়ে যে-দালানগুলো বাদামী-সাদা-হলুদ রঙে ঝকঝক করতে থাকে, গ্রীষ্মে তাদের চেনাই দায়। খরদাহে তাদের আবছা আর বিবর্ণ দেখায়। তবে সামনের এই নিচু আর খোলা মাঠটা বেশ বাহারী। গ্রীষ্মে ফেটে চৌচির, পাড়ার পোলাপান তাতে দৌড়ায়, ফুটবল-ক্রিকেট খেলে। বর্ষায় আবার জলে থৈ থৈ, কোত্থেকে চারদিকের পানি এসে জড়ো হয়, নৌকা ছাড়া চলাফেরা করাই দায়। শীতের আগ দিয়ে অঘ্রাণে, যখন রোদের তীব্রতা কমে অদ্ভূত-কোমল রঙ ধারণ করে, তখন এই মাঠের দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। সবুজ-পক্ক ধানে ধানে পুরো এলাকা ছেয়ে যায়, সোনালি রঙ পাবার অপোয় গন্ধ ছড়াতে থাকে। তবে যত গরমই পড়–ক, আব্দুল হাকিমের ভিটার এই আমগাছের-নিচের-ছায়ায়-বাঁধা মাচানে এসে বসলে ভ্যাপসা-গরমে-সেদ্ধ শরীরও জুড়িয়ে যায়। আর হাওয়ারও তো কমতি নেই, সামনের মাঠের তপ্ত মাটির তাড়া খেয়ে শীতল হতে হাওয়াগুলো পাক খেতে খেতে আব্দুল হাকিমের এই আমগাছে-ছাওয়া এই ভিটার দিকেই যেন দৌড়ে আসে -- এসে তারা নিজেরাও শীতল হয়, আর মাচানে বসা আব্দুল হাকিমের পরিবারের সদস্যদেরও গা জুড়িয়ে দেয়।

আব্দুল হাকিম কৃষিজীবী এক প্রৌঢ়। সারাদিন েেত কাজ করার কারণে, কালচে শরীরে সূর্যের কিরণ আরেক পোচ কালি লেপে দিয়েছে। মলিন চেহারা হলেও হাত-বুক-পিঠের পেশীতে পেশীতে কঠোর পরিশ্রমের ঋজুতা। বয়সের কারণে সৃষ্ট ত্বকের কুঞ্চনকে পেটানো পেশী খুব বেশি স্পষ্ট হতে দেয়নি। আব্দুল হাকিম মাচানে এসে বসলে, শীতল হাওয়া শরীরে লাগলে, অবসন্ন শরীর খানিকটা আরাম পায়, আর তার চোখ সরু হয়ে দৃষ্টি জলার ওপারের শহরের সীমানায় নিপ্তি হয়। থুতনিতে লেগে থাকা অবিন্যস্ত দাড়ি প্রবল হাওয়ায় খানিক পেছনে সরে স্থির হয়ে থাকে, তখন আব্দুল হাকিমকে প্রাচীন-স্থানু এক প্রস্তরমূর্তি বলে মনে হয়।

ওই নিচু জলা-এলাকায় তার এক বিঘের কাছাকাছি জমি আছে, বছরে একবার তারা ফসল দেয়। সেই ফলনে অবশ্য তার দু-এক মাস বাদে প্রায় সারা বছরের ভাতের সংস্থান হয়ে যায়। আর আছে ভিটে-লাগোয়া কয়েক কাঠা উঁচু জমি, তাতে সব্জির চাষ হয়। শাক, আলু, কপি, মূলা, বেগুনের চাষ করে সে, আজকাল ফলনও ভাল হয়। নিজেরা কিছু রেখে শহরে বিক্রি করে দেয়। শহরের মহাজনের লোকেরা এসে আগাম কিনে রাখে সব্জি। কিন্তু দাম খুব কম দেয়। তবুও একসঙ্গে বেশ কিছু টাকা হাতে আসে, তা সংসারের এটা সারাতে ওটা কিনতে কাজে লাগে। ছোটকালের অল্প পড়াশোনা একসময় তাকে হোমিও চিকিৎসা করতে প্ররোচিত করেছিলো। তবে তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তেমন পসারও নেই, লাভও নেই। তবুও শখের বশে, সময় কাটাতে সে প্রতি সন্ধ্যায় বসে। রোগী আসে-আসে না, আসলেও টাকা দেয়না ঠিকঠাকমতো। আব্দুল হাকিম এখানে-ওখানে সবসময়ই বলে, এই গ্রামের সব মানুষ চশমখোর, চিকিৎসা করাবে কিন্তু ট্যাকা দিবে না। তবে সেও জানে, গ্রামের গরিব মানুষÑ রোগ তাদের সহজেই জোটে, চিকিৎসার টাকা জুটবে কোত্থেকে?

কিন্তু আব্দুল হাকিমের সংসারে অনটন বাড়ছে। বিশেষ করে সংসারের সদস্যসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাড়তি উপার্জন আসছে না। তাও তো বছর সাতেক আগে সব্জি চাষ শুরু করার পর থেকে ঘরে কিছু নগদ টাকা আসছে, নইলে সংসারের যে কী হাল হতো তা খোদাই জানে। কৃষি বিভাগের লোকজন এসে আব্দুল হাকিমকে জানিয়ে গেল যে শহরে এখন টাটকা সব্জির প্রচুর চাহিদা, সারা বছরই নানা ধরনের সব্জি ফলানো যায়, লাভও বেশি হয়। তাই তার সব্জি চাষ শুরু করা উচিত। আর চাষবাষের কিছু কায়দা-কানুনও শিখিয়ে দিয়ে গেল তারা। প্রথমবার বাঁধাকপির ফলনের নানা পর্যায়ে তারা এসে পরামর্শ দিয়ে যেত। এখন আর কারোরই পরামর্শ লাগেনা, অধিক ফলনের সব নিয়মই এখন আব্দুল হাকিমের মুখস্থ। সেই থেকে সব্জি চাষ চলছে বছরব্যাপী। কিন্তু গতবছর আফজাল বিয়ে করলো। আর দুই-তিন মাস পরে একটা বাচ্চাও হবে। ছোট মেয়েটা দুইবার ম্যাট্রিক ফেল করলো, এবছর থেকে পড়াশুনা বন্ধ। বিয়ের জন্য দেখাদেখি চলছে, মেয়েকে পছন্দ হয়, কিন্তু সব পাত্রই প্রচুর যৌতুক চায়। মেয়েটাকে বিদায় করতে পারলে আব্দুল হাকিম অনেক নিশ্চিন্ত হতে পারতো। কিন্তু বিয়ে দিলেই আজকাল আর নিশ্চিত হওয়া যায়না। বড়ো মেয়েজামাই নানা উছিলায় টাকা চেয়ে পাঠায়। গত শীতে তো বড়ো মেয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে হাজির। প্রথমে বললো বেড়াতে এসেছে। পরে জানা গেল পাঁচ হাজার টাকার ব্যবস্থা না-হওয়া পর্যন্ত তার যাওয়ার উপায় নেই, কাপড়ের ব্যবসা নাকি জামাই বাড়াতে চায়, পুঁজি দরকার।

তবে আব্দুল হাকিমের সবচাইতে বড়ো যন্ত্রণা হলো একমাত্র ছেলে আফজাল। নকল-টকল করে দুই পরীা পার হলো, কিন্তু ডিগ্রি পড়তে পড়তে বাদ দিলো। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। সকালে বেকার পোলাপানের সঙ্গে তাস খেলে, বিকেলে স্কুলের মাঠে হাঁটুর বয়েসী পোলাপানের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে, সন্ধ্যার পরে চায়ের দোকানে গিয়ে গুলতানি মারে। এই হলো তার দৈনন্দিন জীবন, তার বিনোদনও এই। সারাদিন বাইরে বাইরে, বাপের সঙ্গে কৃষিকাজে হাত লাগাবে না। বলে, লেখাপড়া শিখাইছো কি চাষাগিরি করতে? তাও যদি লেখাপড়াটাও ঠিকঠাকমতো শিখতো! একবার আব্দুল হাকিম মনে মনে ঠিক করলো বাজারে একটা দোকান ভাড়া করে কিছু একটার ব্যবসাতে লাগিয়ে দেবে। কিন্তু তার নাকি দোকানদারি করতেও প্রেস্টিজে লাগে। তার একটাই ইচ্ছা, দুই-তিন লাখ ট্যাকা দ্যাও, বিদেশে যামু। দুই-তিন লাখ টাকা আব্দুল হাকিম কোত্থেকে জোগাড় করবে? জমিগুলো বেচলে হতে পারে, কিন্তু পরে খাবে কী? ছেলের মা একদিন বললো, ছেলের বিয়া দিয়া দাও, তাহলে আর বাহিরে বাহিরে ঘুরবো না। তাই করা হলো। কিন্তু সেই যে ঘরে ঢুকলো, এবার আর বেরই হয়না। সারাদিন বৌয়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকে। এখন বৌয়ের বাচ্চা হবে, কত যে আব্দার! এইটা খাইতে পারে না, ঐটা কিনা আনো।
কত তামাশা যে দেখলাম, এই জীবনে! আব্দুল হাকিম মনে মনে বলে।

মাচায় বসে হাওয়া খেতে খেতে এইসব নিত্যকার ভাবনাই ভাবতে থাকে আব্দুল হাকিম। হঠাৎ খেয়াল করে, শুকনো খটখটে মাঠ পেরিয়ে দুইজন লোক তার ভিটার দিকেই আসছে। বাম দিকের ভিটের বাঁক থেকে তারা হঠাৎ উদয় হয়। একজনের মাথায় ক্যাপ পরা, আরেকজন চোখের ওপরে হাত দিয়ে তীব্র রোদ থেকে চোখকে বাঁচিয়ে আব্দুল হাকিমের ভিটের দিকে তাকিয়ে, যেন কাউকে খুঁজছে। তাদের পোশাক দেখে বোঝা যায় জলার ওপারের লোক তারা। ক্যাপঅলা লোকটা লম্বা, একটু ফর্সা দেখতে, চোখে রঙিন চশমাও আছে। আরেকজন বেঁটে, কম বয়েস কিন্তু অর্ধেক মাথাজুড়ে টাক। দু’জনের কারও বয়সই তিরিশের বেশি হবে না।
--ও চাচা মিয়া, একটু পানি খাওয়াতে পারেন? বেঁটে লোকটা জিজ্ঞেস করে।
--আপনারা কারা?
--আগে একটু পানি খাওয়ান, তারপরে দু’টা কথা কই আপনার সঙ্গে।
--বসেন পানি আনতেছি।
তারা তৃপ্তি সহকারে দ্ইু গ্লাস করে টিউবওয়েলের পানি খায়।
--যা গরমরে বাবা। পানি খেয়ে প্রাণ জুড়ায়ে গেল। তা চাচামিয়া এই ভিটা কি আপনার? বেঁটে লোকটাই কথা বলছে। ক্যাপঅলা চুপচাপ।
--হ্যাঁ। আপনারা কি শহর থাইকা?
--হ্যাঁ। ওই নিচে কি আপনার জমি আছে?
--হ্যাঁ।
--কতখানি?
--এক বিঘা। আপনারা কী চান?
--ওপরে আছে?
--আছে। আপনারা কে? কী চান?
--আপনার কয় ছেলেমেয়ে? কী করে তারা?
--এক ছেলে, বেকার। এক মেয়ের বিয়া দিছি। আরেকটা বিবাহযোগ্য। আপনারা কী চান কইলেন না কিন্তু।
--চাচামিয়া, আমরা একটা প্রস্তাব নিয়ে আসছি।
ক্যাপঅলা, ফর্সা লোকটা এই প্রথম মুখ খোলে। আব্দুল হাকিম ভাবে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব। কিংবা সব্জির ব্যবসাসংক্রান্ত কিছু।
--চাচামিয়া, প্রস্তাবটা মন দিয়ে শুনবেন। প্রথমেই হ্যাঁ বা না বলার দরকার নেই। সময় নিয়ে ভাবেন। তবে খুব বেশি সময় আবার আমাদের হাতে নেই। আপনার ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে, আপনার পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রস্তাবটি যুক্ত।
--কী কইতে চান আপনারা?
--আমরা এই এলাকায় একটা প্রজেক্ট করতে যাচ্ছি। সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করবো। আপনার ভিটা ও জমি আমাদের প্রজেক্ট-প্ল্যানের মধ্যে পড়েছে।
--তার মানে? কী কইতে চান আপনারা?
--আমরা এখানে একটা থিম পার্ক করবো, পার্কের পাশেই আধুনিক ঘাট হবে, নৌবিহার হবে। আরও অনেক প্ল্যান আছে আমাদের। সব আপনাকে বলছি না। শহরের লোকজন এসব খুব পছন্দ করবে। দলে দলে বেড়াতে আসবে। আপনাদের এই এলাকার চেহারাই পাল্টে যাবে। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে, আপনাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
--আমারে কী করতে হবে?
--আমাদের প্রজেক্টে আপনার ছেলের চাকরি হবে তার শিাগত যোগ্যতা অনুযায়ী। যা টাকা পাবেন তা দিয়ে আপনার মেয়ের বিয়ের পরে ভবিষ্যতের সঞ্চয়ও থাকবে। কত টাকা পাবেন, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না -- আমাদের কোম্পানির কিছু জমি এখানে আগে থেকেই আছে, আরও কিছু লাগবে। আপনার জমি আর ভিটা আমরা কিনতে চাই, প্রজেক্টের জন্য।
--অসম্ভব। আমার সব যাইয়া অল্প কটা জমি আছে, আমি বিক্রি করমু না। ভিটা বিক্রি করার তো প্রশ্নই আসে না। বাপজন্মেও শুনি নাই কেউ বসতভিটা বিক্রি করে!
--চাচা, আপনি উত্তেজিত হইয়েন না। আমরা তো আপনাকে সময় দিচ্ছি। এখনই রাজি হতে হবে, তাতো বলি নাই। আপনার ছেলেমেয়েদের কথা ভাবেন, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবেন।
--আপনারা এখন আসেন।
--চাচা মাথা ঠাণ্ডা করেন। ঐদিকে তাকান। আহা তাকান না। কী দেখা যায়? ঐযে শহরটা দেখা যায়, কত উঁচু উঁচু দালান, লাখ লাখ মানুষ বাস করে ঐখানে। কয়জন মানুষ নিজের বাড়িতে থাকে বলেন? আর আমরা যে-টাকা দিবো তা দিয়ে সস্তায় আরেকটা ভিটা কিনে নিবেন, কোনো অসুবিধা তো নাই।
--আমি আর কুনো কথা শুনতে চাইনা। আপনারা এখন যান।
--ঠিক আছে আমরা যাচ্ছি। আমরা তিনদিন পরেই আবার আসবো। আপনি বিষয়টা নিয়া ভাবেন। চাচী, ছেলের সঙ্গে আলাপ করেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন, আপনার মাথা যখন আপনার টিউবওয়েলের পানির মতো ঠাণ্ডা হবে, তখন আমাদের প্রস্তাবটা ভাববেন।
লোক দুইটা নেমে যেইপথে এসেছিলো, সেইপথে ফিরে যায়। দূর থেকে হাত নেড়ে নেড়ে উচ্চস্বরে বলে, আমরা তিনদিন পরে আবার পানি খেতে আসছি।

সেদিন সন্ধ্যার পর আফজাল একটু বাড়ির বাইরে গেছিলো, কিন্তু অল্পণেই ফিরে আসলো।
--আব্বা, আজ সকালে নাকি দুইজন লোক আসছিলো?
--হ্যাঁ। তুই কেমনে জানলি?
--চায়ের স্টলে শুনলাম। অরা আরও কয়েক বাড়ি গেছে।
--তো কী হইছে?
--তুমি কী ঠিক করছো?
--কী ঠিক করবো?
--প্রস্তাবে রাজী হও নাই?
--কোন দুঃখে রাজী হমু? বাপ-দাদার ভিটা কেউ বিক্রি করে?
--এতবড়ো সুযোগ তুমি হাতছাড়া কইরো না। তুমি পারবা আমারে একটা চাকরি দিতে?
--আমি এইডা নিয়া কুনো কথা বলতে চাইনা।
--আব্বা, আমি বিদেশে যামু না। এইখানে চাকরি হইলে কে আর বিদেশে যায়? বেকার হইয়া কতদিন থাকবো? যা টাকা পাইবা, আমি নিমু না। আমার খালি চাকরি হইলেই হয়। বাবা, ভাইবা দেখো, ইনকাম নাই বইলা বৌয়ের কাছে মুখ দেখাতে পারিনা। তোমার ছেলের ভালো তুমি চাওনা?
--তরে আমি কী কইলাম?
--গোঁ ধইরা থাইকো না। সুযোগ আসছে, নিয়া নাও।
আব্দুল হাকিম নিশ্চুপ।
--বুড়া মিয়া, গোঁয়ার্তুমি কইরো না। মানুষের জীবন একভাবে যায়না। তুমি কৃষিকাজ করছো, আমরাও কি কৃষিকাজই করবো সারাজীবন? চাকরি করবো, মাস গেলে বেতন পাবো। এই সুযোগ আর কি আসবে?
--তর লগে এইডা নিয়া পরে কথা কমু। এখন আর ভাল্লাগতাছে না। তুই যা এইখান থাইকা।
--আমার চাকরি না-হইলে তোমার ভিটায় আমি আগুন লাগামু, এই আমি কইয়া দিলাম। তখন দেখবো ভিটার মায়া কই থাকে।
আফজাল হন হন করে আবার বাড়ির বাইরে চলে যায়।

রাতে ঘুমানোর সময় আবার এই প্রসঙ্গ, আব্দুল হাকিম কোথায় যায়! এবার আফজালের মা।
--লোক দুইটা কী নাকি কইয়া গেছে?
আব্দুল হাকিম নিশ্চুপ।
--সেলিম মিয়া আবার আইছিলো। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলেই রেহানার বিয়াটা হয়। অরা নাকি আর দু-এক মাস অপো করবো, তারপরে অন্যখানে মাইয়া দেখবো।
আব্দুল হাকিম নিশ্চুপ।
--আফজালের চাকরি হইলে তো আমরাও নিশ্চিত থাকতে পারতাম।
--ওই মূর্খ মাইয়ামানুষ, কথা কইস না। ভিটা জমিজমা বিক্রি করলে থাকবি কই, খাবি কী?
--ক্যান, আফজালের সঙ্গে বাসাভাড়া কইরা একসাথে থাকুম।
--তর পোলার যে মতিগতি, বৌয়ের যে ভাবসাব, যদি ক’দিন পরে খেদাইয়া দেয়, যাবি কই? তর ওই কুলাঙ্গার পোলার ভাত আমি খামু?
--এইখানে যদি সত্যি সত্যি অনেক কারবার হয়, তাইলে তুমিও জমির পুঁজি দিয়া দোকান দিবা।
--সারাজীবন করছি জমির কাম, এখন করমু দোকানদারি? কবে কী হইবো তার ঠিক নাই, আমি সব বিক্রি কইরা বইসা থাকি, না?
--তুমি রাজি হইতাছো না দেইখা আফজাল খুব মনখারাপ করছে। বৌও খুব চায়, আফজালের চাকরিডা যদি সত্যিসত্যি হইতো। সামনে নতুন বংশ আইতেছে।
--তুই তোর পোলা আর পোলার বৌয়ের কথা আমারে কবিনা। চুপ থাক, ঘুমাইতে দে।

সকালে জমিতে নিড়ানি দিচ্ছিলো আব্দুল হাকিম। আজিমুদ্দিনের ছেলে শফিককে আইল ধরে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ছেলেটা কী একটা রাজনীতি করে কলেজে। ভালো ভালো কথা বলে, কিন্তু সাপোর্টার নাই। আজকালকার পোলাপান তো হয় আওয়ামী লীগ নাহলে বিএনপি। ছেলেটার কথাবার্তা অবশ্য ভালোই লাগে আব্দুল হাকিমের। এর আগেও এসে মাঝে মাঝেই এমনসব গল্প করতো আব্দুল হাকিমের সঙ্গে, যার অর্ধেক সে বোঝে, বাকি অর্ধেক বোঝে না:
--চাচা দেখেন, আপনারাই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, অথচ আপনাদের সারে ভর্তুকি নাই। কৃষিঋণ পাওয়া যায় কি যায় না। আপনাদের ঘামের মূল্যে ওই শহরের চাকচিক্য বাড়ছে, অথচ আপনাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য আপনারা পাচ্ছেন না। এই সিস্টেমের মধ্যে দেশের কোনো উন্নতি হবার সম্ভবনা নাই। শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য এভাবে ফিরবে না। বিরাট একটা পরিবর্তন দরকার, বুঝলেন চাচা, মৌলিক পরিবর্তন।
আব্দুল হাকিমের অবশ্য এইসব জটিল বিষয় নিয়ে ভাবে না। মাঝে মাঝে সারের দাম বাড়ে, তখন খুব সমস্যা হয়। কৃষিঋণ বলে যে একটা জিনিস আছে, সেতো জানেই না। আর শহরের লোক ধনী হবে, গ্রামের লোক গরিব হবে এতো চিরাচরিত কথা।

কিন্তু আজ ছেলেটা যা বললো, তা পরিস্কার বোঝা গেল। এতো তার মনের কথাই।
--চাচা, কাল শহর থেকে দু’জন লোক আসছিলো আপনার কাছে?
--হ্যাঁ।
--হুম। ওরা তো আর খালি আপনার কাছেই আসে নাই, কয়েক বাড়িতে গেছিলো। সবাইকেই টাকা আর চাকরির লোভ দেখাইছে। আপনি কিছু বুঝতেছেন? কিছু সিদ্ধান্ত নিছেন?
--না, আমি সরাসরি না-কইরা দিছি।
--ঠিক করছেন। দেখেন চাচা, শহরের মানুষ, পুরা শহর বিল্ডিং কইরা জঙ্গল বানাইয়া ফেলছে। ঝিল-বিল ভরাট করছে, পার্ক দখল নিছে। তারপর খালি বিল্ডিং তুলছে। এখন ওদের বিনোদনের জায়গা নাই। তাই এদিকে চোখ দিছে। বিদেশের মতো করে পার্ক বানাবে, ফুতি-টুর্তি করবে, হাওয়া খাবে। ওদের ফুর্তির জন্য আমরা শিকড়চ্যুত হবো কেন? ওরকম কিছু হইলে এই এলাকা আর আমাদের এলাকা থাকবে? বড়োলোকের পোলামাইয়া আইসা চানাচুরের ঠোঙায় ভরায়ে ফেলবে আমাদের এলাকা।
--কী করমু রে বাবা। আমার পোলাই চাকরির লোভে পইড়া লাফাইতেছে। আমারে হুমকি-ধামকি দিতেছে।
--আফজাল ভাইকে বোঝান। উনার এই পড়াশুনা দিয়া বড়োজোর দারোয়ানের বা পিয়নের চাকরি পাবে। কত টাকা বেতন পাবে? বাসাভাড়া দিবে কোত্থেকে? এখন তো অন্তঃত কেউ বাসাভাড়া চাইতে আসতেছে না।
--আমি তো সবই বুঝতেছি। কিন্তু কাঁচা টাকার লোভ, চাকরির লোভ সামলাতে পারে কয়জন?
--আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলছি। আমিরুল চাচা, জয়নাল চাচার সঙ্গেও কথা বলছি। শিকড়চ্যুত হবার ভয় সবাই পাচ্ছে। কিন্তু কারও কারও মধ্যে টাকার লোভও দেখলাম। সংসারে টানাটানি থাকলে, নগদ টাকার লোভ জাগতে পারে। কিন্তু দেখেন, আপনাদের কারোরই এত টাকা হ্যান্ডেল করার অভ্যাস নাই। যারা মনে করছে অনেক টাকা হাতে আসলে এখানে ওখানে খাটাবে, দেখবেন এক দুই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই হাতের টাকা সব শেষ, কোথাও খাটানো আর হয়নি। আপনারা মুরুব্বিরা সবাই একটু বসেন। আজই বসেন। তিনদিন বাদেই অরা আবার আসবে।

সেদিন সন্ধ্যায় আজিমুদ্দিনের বাড়িতে মুরুব্বিদের এক সভা হয়। সভায় কেউই জমি বিক্রি করবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন সকালে আব্দুল হাকিম েেত কাজ করতে করতে দেখে, আফজাল আর জয়নাল আবেদীনের ছেলে রফিকুল মেইনরোডের দিকে যাচ্ছে। শহরে যাবার বাসস্ট্যান্ডটা ওইদিকেই। রাতে জানা যায় কারা যেন আজিমুদ্দিনের ছেলে শফিককে মারাত্মক জখম করেছে, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। এখবর শোনার পরপরই আব্দুল হাকিম আফজালের খোঁজ করে।
--শফিককে কে মারছে?
--আমি তার কী জানি?
--তুই আইজ শহরে গেছিলি?
--হ্যাঁ।
--ক্যান গেছিলি?
--এমনি, বেড়াতে।
--আফজাল, সত্যি কথা ক।
--সত্যি মিথ্যা জানিনা। একটা কথা জাইনা রাখো, অরা খুব শক্তিশালী। জমি এমনি এমনি না দিলে, শফিকের মতোই অবস্থা হবে। আব্বা, তুমি রাজি হইয়া যাও।
দাঁতে দাঁত চেপে আব্দুল হাকিম বলে, তুই একটা কুত্তার বাচ্চা!

রচনাকাল: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৬
প্রথম প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৬, কালের খেয়া, সমকাল
২৮টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×