somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি: দ্বিতীয় পর্ব (সহিংসতা)

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[ গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হকের বইমেলায় প্রকাশিতব্য 'বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সঙ্কটে জনসংষ্কৃতি' শীর্ষক গ্রন্থের একটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হচ্ছে। গ্রন্থটি শেষ সপ্তাহে বইমেলায় আসার কথা। প্রকাশক শ্রাবণ প্রকাশনী।]


সহিংসতা

সা¤প্রতিক বাংলা ছবির আলোচনায় যৌনতা-অশ্লীলতার কথা যতটা উচ্চারিত হয়, ছবিগুলোর সহিংসতা বা ভায়োলেন্সের দিকটা ততটাই কম আলোচিত। ঢাকাই ছবিগুলোর ‘ডাকনাম’ যেন ‘অশ্লীল ছবি’ হয়ে গিয়েছে। পত্র-পত্রিকা, দর্শক বর্ণনা, কিম্বা সচেতন সমাজের আলোচনা অশ্লীলতাভিত্তিক হয়ে পড়বার ফলে, বর্তমান চলচ্চিত্রের আর একটি তিকর উপাদান ‘সহিংসতা’ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থাকে। এই উপেক্ষার মধ্যে দিয়ে আরো বেশি চোখে পড়ে চলচ্চিত্র আলোচকদের নীতিবাগীশ দৃষ্টিকোণ। এর ফলে, ঢাকাই চলচ্চিত্র প্রধানত কী প্রদর্শন করে তার সার্বিক বিচার হয় না।

অথচ, এফডিসি উৎপাদিত ছবিগুলো ভয়ঙ্করভাবে সহিংস। এ ধরনের ছবির পর্ণোগ্রাফিক উপাদানগুলোও অনেকেেত্র হিংস্রতার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। ‘সন্ত্রাস’-জাতীয় শব্দে বাঁধা ছবিগুলোর নামই প্রমাণ করে এসব ছবির কেন্দ্রীয় বিষয় কী। আজকের সন্ত্রাসী, কুখ্যাত সন্ত্রাসী, ঢাকাইয়া মাস্তান, গোলাগুলি, বোমা হামলা, খুনী শিকদার, সিটি টেরর, কোপা শামছু, দুধর্ষ খুনি ইত্যাদি অনেক নাম করা যাবে যেসব নাম প্রমাণ করে কয়েকটি গান, কয়েকটি প্রেমের দৃশ্য তুলে দিলে এসব ছবিতে সহিংসতা ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

পরিচালক কাজী হায়াৎ নব্বইয়ের দশকে ‘রাজনৈতিক গডফাদার-অসৎ পুলিশ-প্রতিবাদী নায়ক’ ফর্মুলায় পরপর দাঙ্গা (১৯৯২) ও ত্রাস (১৯৯২) নামক দু’টি এ্যাকশন ছবি নির্মাণ করলে তা দর্শক গ্রহণ করে এবং মান্না-অভিনীত এই ধারার ছবির কদর বাড়ে। কাজী হায়াৎ মান্নানির্ভর বেশ কয়েকটি ছবি নির্মাণ করেন এবং নব্বই দশকের শেষ দিকে ডিপজল ভিলেন হিসেবে যোগ দিয়ে এইসব ছবির সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলেন (আম্মাজান, ১৯৯৯)। মান্না-ডিপজল জুটিনির্ভর ‘সহিংসতা-গোলাগুলি-ঢাকাইয়া স্ল্যাং’ মার্কা একশন ছবিগুলো টিন-এজ প্রেম, পারিবারিক সেন্টিমেন্ট, মার্শাল আর্টনির্ভর খোকনীয় চলচ্চিত্র -- সবকিছুকে ম্লান করে দেয়। শূন্য দশকে নির্মিত বেশিরভাগ ছবিই সহিংস ছবি, বলা যায়, এগুলো সবই কাজী হায়ৎ প্রবর্তিত ফর্মুলার ব্যর্থ সংস্করণ। হাত-পা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলা, শ্বাসরোধ করে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, গলায় কামড় দিয়ে হৃদপিণ্ডসহ কণ্ঠনালী বের করে আনা, শিশুকে পুড়িয়ে নির্যাতন ইত্যাদি নানান কায়দায় সহিংসতা কায়েম করা হয় এবং ছবিগুলোর মধ্যে এর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। বলা যায়, এই সহস্রাব্দের শুরুতে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র সফট্ পর্নোগ্রাফি এবং হার্ড ভায়োলেন্সের সমাহার।

রিচার্ড ডায়ার হলিউডের সা¤প্রতিক সহিংস (একশন) ছবিগুলোর বিশ্লেষণ জন্য জ্যান ডি বন্ট পরিচালিত স্পিড ছবিটিকে বেছে নিয়েছেন। এখানে স্পিড শব্দটি দ্ব্যর্থক -- সা¤প্রতিক হলিউডী ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গতি এবং স্পিড ছবিটির ভেতরেই এসব ছবির সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি বলছেন, “এই ছবিটি হলো রোলারস্কেটারের মতো: কেবলই অ্যাকশন ও কোনো কাহিনী নেই বললেই চলে।” (ডায়ার, ২০০০: ১৭) বাংলাদেশের ছবির ব্যাপারেও রিচার্ড ডায়ারের কথাটি খাটে -- কোনো কাহিনী নেই, কেবলই গোলাগুলি, হত্যা, রক্তপাত। তিনি আরও বলছেন, “কতজন মৃত্যুবরণ করলো, স্পিড আমাদের সেটা গণনা করারও সময় দেয় না।” (ডায়ার, ২০০০: ১৯) অসংখ্য হত্যার এই ব্যবহার ঢাকাই ছবিতেও দৃশ্যমান। ব্রাশফায়ারে অগণিত হত্যা, কথায় কথায় হত্যা, সামান্য কারণে হত্যা -- ঠিক কতজন মৃত্যুবরণ করলো দর্শকের পক্ষে তা মনে রাখা খুবই কঠিন।

চিত্র ১: এম এম সরকার পরিচালিত বাঘের বাচ্চা (২০০৪) ছবিতে মান্নার বিক্রম।
চিত্র ২: গ্রন্থের প্রচ্ছদ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:২২
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×