লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত এই কল্পকাহিনীতে ক্যাডেট কলেজের মতো একটি ভিন্নধর্মী প্রতিষ্ঠানের কিশোরদের ঘটনাবহুল জীবনযাপনের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। এই কিশোর-উপন্যাসে লেখক কোনো একক বা সরলরৈখিক ঘটনাক্রমের বর্ণনা দিতে চাননি, বরং একটি চরিত্রের বরাত দিয়ে, খণ্ড খণ্ড ঘটনাবলীর বর্ণনার মাধ্যমে, একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ফলে এই গল্পের শুরু থাকলেও শেষ থাকেনি। আপাতভাবে এটি ক্যাডেটদের ভিন্নধর্মী জীবনের হাসি-কান্না, চাপল্য-উত্তেজনায় ঠাসা আধা-সামরিক জীবনের নির্মোহ চিত্রায়ণ মনে হলেও, গল্পের শেষ দিকটায় ক্যাডেট কলেজের সীমিত গণ্ডির বাইরের রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে রূপক আকারে লেখক হাজির করতে চেয়েছেন। ফলে গল্পটি শেষ পর্যন্ত কেবল বেড়ালের দেশে ইঁদুরের টিকে থাকার প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ঘটনাক্রমের বৃহত্তর দিকমাত্রা ধারণ করার চেষ্টা করেছে। গল্পের প্রেক্ষাপট আশির দশক ধরতে হবে; তাই এখানে মোবাইল ফোনের বদলে চিঠি গল্পের অনুষঙ্গ আকারে এসেছে। তবে রাজনৈতিক রূপকতার অংশটি ২০০৮ সালের প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক হবে।
...
অভ্যর্থনা
ভর্তি হবার পর জামিলের কাসিম হাউসের একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা হল। সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাবা-মা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যাবার আগে হাউস-মাস্টার স্যারের হাত ধরে বাবা বললেন, ও আর এখন আমাদের সন্তান নয়। আপনাদের হাতে ওকে দিয়ে গেলাম।
যাবার সময় মা খুব কাঁদছিলেন।
জামিলের অবশ্য অত মনখারাপ লাগছিল না। মার কান্না দেখে কেবল একটু কেমন কেমন লাগছিল। নতুন একটা জায়গায় তাকে থাকতে হবে -- বেশ মজাই হবে নিশ্চয়। বিশাল বিশাল ফুটবল গ্রাউন্ড দেখে তার মন খুশি হয়ে উঠলো। ক্রিকেট গ্রাউন্ডের বাউন্ডারিটা বেশ বড়ো মনে হলো, চার-ছয় মারতে বেশ বেগ পেতে হবে মনে হয়। বাস্কেটবল গ্রাউন্ডও দেখা যাচ্ছে, খেলাটা শিখে নেয়া যাবে। ভলিবল আর হকির মাঠও নাকি কোথায় আছে।
জামিলের রুম নম্বর নয়। দোতলার রুমটি বেশ বড়োসড়ো -- দশজনের থাকার ব্যবস্থা। একেকজনের জন্য একটা কাঠনির্মিত বেড; একটা আলমারি -- ঠিক একজনের জন্য নয়, এক আলমারির দুটো পাল্লা। একেকটা পাল্লা একেকজনের জন্য। আলমারিটা অনেক বড়োসড়ো হবার কারণে একজনের জন্য তা যথেষ্ঠ। আলমারিতে আবার কতকগুলো তাক আছে। আর রয়েছে এক সেট চেয়ার-টেবিল। একটা সু-র্যাকও আছে।
দশজনের জন্যই একই ব্যবস্থা। শুধু রুমের ভেতরের শেষ দুটো আলমারি একক এবং সাইজে একটু ছোট। চমৎকার বাদামী দেয়াল, রুমটা বেশ সাজানো -- কাগজ দিয়ে, হাতে আঁকা ছবি দিয়ে। আর ঝকঝকে পরিস্কার। সবার বেডে একই বেডশিট, সবার গায়ে একই পোশাক -- সাদা ধবধবে ট্রাউজার আর ফুলস্লিভ শার্ট। গলায় আবার লাল-নীল টাই ঝোলানো।
জামিলও তাহলে টাই পরবে? আচ্ছা, টাইটা ওরকম সুন্দর করে কীভাবে সবাই বাঁধে? জামিল কি পারবে টাই বাঁধতে?
বাবা-মা যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে। এখন কী করণীয় তা বুঝতে না পেরে জামিল চুপচাপ বেডের ওপরে বসে আছে। সে রুমে অবশ্য একা নয়, তার মতো আরো পাঁচজন নবাগত রয়েছে। তারাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ চেয়ারে বসে আছে, কেউ বেডে শুয়ে আছে। একজন আবার চেয়ারে বসে, টেবিলে হাতের-ওপর-মাথা রেখে অনেকণ চুপচাপ রয়েছে। কেবল মাঝে মাঝে শরীরটা কেঁপে উঠছে। কাঁদছে নাকি! হতে পারে, এখন একা একা বাপ-মা-ভাই-বোন ছেড়ে এখানে থাকতে হবে। কান্না তো আসতেই পারে। জামিলের অবশ্য কান্না পাচ্ছিলো না। এরপর কী হয় তার জন্য অপো করছিলো।
জামিলের আলমারি-মেটের সঙ্গে অবশ্য আলাপ হয়েছে। ওর নাম রশীদ। বেশ লম্বা আছে সে, আর একটু ইঁচড়ে পাকা মনে হয়। জামিলকে প্রথমেই বলে, ওই পিচ্চি, তোমার নাম কী? সে এই মুহূর্তে শুয়ে পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে গান করছে। কী গান বোঝা যাচ্ছে না, কেবল গুনগুনটা শোনা যাচ্ছে। হিন্দি হতে পারে।
একজন টাই-পরা হঠাৎ ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকলো। তাকে এরমধ্যেই কয়েকবার দেখা গেছে বলে মনে হলো।
--কাম অন বয়েজ, গেট রেডি। ইউ হ্যাভ টু গো টু দ্য গ্রাউন্ড ফোর।
টাই-পরাটা হড়বড় করে কী বলল জামিল বুঝতে পারে না। তবে সে যে কথাগুলো ইংরেজিতে বলেছে, সেটা বোঝা গেল। সে অপ্রস্তুত হয়ে টাই-পরার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মতো সবাই কিছু বুঝতে না পেরে মুখ চাওয়া-চায়ি করছে। কেবল পাকা-রশীদ হাসিমুখে টাই-পরার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন সে কথাটা বুঝতে পেরেছে।
--কী ব্যাপার, সবাই হাবার মতো তাকিয়ে আছো কেন?
--ভাইয়া, কী বললেন বুঝতে পারিনি। জামিল নিুস্বরে বলে।
--আমাদের সবাইকে নিচতলায় যেতে হবে। রশীদ বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করে।
--ইউ কিপ মাম। ও তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কিছু বলার থাকলে আমিই বলব। আগ বাড়িয়ে কখনো কথা বলবে না। ... তোমরা এখন নিচতলায় হাউস-প্রিফেক্টের রুমের সামনে যাবে। তিনি তোমাদের ইন্ট্রোডাক্টরি ব্রিফিং দেবেন। তোমরা লাইন ধরে দাঁড়াও, আমি তোমাদের নিয়ে যাবো।
ওরা লাইন ধরে দাঁড়ায়। এরপর টাই-পরার পেছন পেছন তারা নিচতলায় নেমে আসে। নামতে নামতে জামিল রশীদকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে, এই, ব্রিফিং মানে কী?
--কিছু বোঝো না, কিছু জানো না, এখানে চান্স পাইলা ক্যামনে? রশীদ তিরষ্কার করে।
--হু ইজ টকিং? নো টক। টাই-পরা পেছন ফিরে হুংকার দেয়।
নিচতলায় গিয়ে দেখে তাদের মতো আরো অনেকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। টাই-পরা অন্য সবার সঙ্গে জামিলদের দাঁড়াতে বলে বিদায় নেয়। যাবার আগে ''কেউ কথা বলবে না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো'' বলে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে সামনের রুমের দরোজা ঠেলে আরেক টাই-পরা বেরিয়ে আসে। এটা দেখতে বেশ বড়োসড়ো। চোখে চওড়া কালো ফ্রেমের চশমা, চশমার কারণে তার চেহারায় একটা রাশভারি ভাব এসেছে। কপালে একটা ছোটো কাটা দাগও আছে।
--ওয়েলকাম টু কাসিম হাউস। আই অ্যাম মাহবুব, হাউস-প্রিফেক্ট অফ দিস হাউস। তোমরা কাস সেভেনের নিউ ক্যাডটস, আর আমি হলাম কাস টুয়েলভের সিনিয়র-মোস্ট ক্যাডেট। আই অ্যাম দ্য নাম্বার ওয়ান ক্যাডেট অফ দিস হাউস। ... ইউ কুড বি প্রাউড অফ, তোমরা কাসিম হাউসের ক্যাডেট হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। কাসিম হাউস হলো অল-ওভার চ্যাম্পিয়ন হাউস, গত বছরের অল ওভার চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটা আমরাই পেয়েছি। এ হাউসের ক্যাডেটদের বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা তারিক হাউসের মতো ইনডিসিপ্লিন্ড না, আবার খালিদ হাউসের মতো এক্সট্রা ডিসিপ্লিন্ডও না। আমরা হলাম অলরাউন্ডার একটা ব্যালান্সড হাউস। ...
তোমরা যে যে রুমে আছো সেখানে কাস নাইনের একজন রুম-লিডার পাবে, একজন কাস এইটের অ্যাসিটেন্ট রুম-লিডার পাবে এবং আরো কয়েকজন কাস এইটের সিনিয়র ভাইদের পাবে। তোমাদের প্রথমে বাসায় যেভাবে থাকতে, স্কুলে যেভাবে চলাফেরা করতে সেগুলো ভুলে যেতে হবে। এখানে এই ক্যাডেট কলেজের নিজস্ব নিয়ম-কানুন আছে, সেগুলো মেনে চলতে হবে। আর কাস সেভেন হলো নিয়মকানুন শেখার সবচেয়ে ভালো সময়। তোমাদের রুম-লিডার এবং কাস এইটের সিনিয়র ভাইরা সব নিয়মকানুন তোমাদের শিখিয়ে দেবেন। অন্যান্য ব্যাচের সিনিয়ররাও তোমাদের শেখাবেন, তবে কাস এইটেরই মূল দায়িত্ব।
হাউস-প্রিফেক্ট এবার কথা বলায় একটু বিরতি দেন। তিনি কথাগুলো বলছিলেন নাটকীয় ভঙ্গিতে, যেন মঞ্চে অভিনয় করছেন। কখনো কোমরে হাত দিচ্ছেন, কখনো পায়চারি করছেন, কখনো বা আঙ্গুল তুলে নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তার গলাটা গমগম করছিলো।
--এবার আমি তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হই। তোমরা সবাই তোমাদের নাম বলো। স্টার্ট ফ্রম দ্য লেফট।
নিজেদের লেফট না হাউস-প্রিফেক্টের লেফট ওরা তা বুঝতে পারে না। ফলে দু’দিক থেকেই নাম বলা শুরু হয়ে যায়।
--স্টপ! নিজেদের বাম দিক থেকে বলো।
নাম বলা শেষ হলো।
--তোমরা সবাই বাসা থেকে এক সেট করে ড্রেস নিয়ে এসেছো। কলেজ তোমাদের আর এক সেট করে দেবে। আর আমি এখন তোমাদের কিছু জিনিস দিচ্ছি। এগুলো তোমাদের বিভিন্ন ড্রেসের সঙ্গে পরতে হবে।
হাউস-প্রিফেক্ট টাই দেখিয়ে বললেন, এটা তোমাদের সাদা ডিনার ড্রেসের সঙ্গে পরতে হবে। গাঢ় নীল একটা কাপড়ের টুকরা দেখিয়ে বললেন, এটা হলো অ্যাপুলেট, খাকি ড্রেসের কাঁধে পরতে হবে। এটা তুমি কোন কাসে পড় তা নির্দেশ করে। তোমাদের অ্যাপুলেটের মাঝ বরাবর একটা দাগ আছে, কাস এইটের থাকবে দুটো দাগ, নাইনের তিনটি। গোল একটা সবুজ জিনিস দেখিয়ে বললেন, এটা হলো কলেজের মনোগ্রাম-অলা ব্যাজ, খাকির সঙ্গে পরতে হয় বাম বাহু বরাবর। এটা বেল্ট, এটাও খাকির সঙ্গে পরতে হয়। এছাড়া তোমাদের জন্য ক্যাপ আছে, ফুম আছে, নেমপ্লেট আছে ... কীসে কীভাবে পরতে হয় সবই তোমার রুমের সিনিয়ররা দেখিয়ে দেবে। তোমরা জিনিসগুলো নাও, এন্ড গেট লস্ট। রুমে গিয়ে ডিনারের জন্য রেডি হও।
ছবির লিঙ্ক: Click This Link
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



