somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেড়ালের দেশে ইঁদুর হয়ে (একটি নভেলা, পর্ব ৩)

০৩ রা মার্চ, ২০০৮ রাত ৯:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডিনারের পরে আবার কাসিম হাউসের নয় নম্বর রুমে। এবার রুম-লিডারের পালা। ক্লাস নাইনের রুম-লিডারের নাম রহমান। ডিনার সেরে রুমে আসতে না আসতেই রহমান ভাইয়ের খপ্পরে পড়তে হলো। রহমান ভাইটা দেখতে কালো কুচকুচে -- কাকের মতো, বৈশাখী মেঘের মতো কালো। আর মোটাসোটা, নাদুসনুদুস।
তিনি রুমের বিভিন্ন ম্যানারস শেখালেন। টেবিলের ওপরে বসা যাবে না। জুতা পরে বিছানায় শোয়া যাবে না। বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে বসে গালগল্প করা যাবে না। বাইরের রুমের কোনো সিনিয়র ভাই আসলে উঠে দাঁড়াতে হবে, তিনি বসতে না বলা পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকতে হবে। নিজের রুমের সিনিয়র ভাইদের জন্য অবশ্য এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। রুমের ভেতরের প্রান্তে অবস্থিত রুমলিডার ও এসিস্টেন্ট রুমলিডারের অঞ্চলে যাওয়া যাবে না। রুমের মেঝেতে দাগ কেটে সীমানা নির্দেশ করা আছে। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লম্বা রুমটার দু’পাশে দু’সারিতে সবার বিছানাগুলো ফেলা আছে, আর দু’সারির মধ্যে চলাফেরার কমন প্যাসেজের মাঝামাঝি লম্বালম্বি একটা দাগ টানা আছে। ভেতরের প্রান্তে গিয়ে দাগটা থেমে পড়েছে এবং আড়াআড়ি আরেকটা দাগ দিয়ে ভেতরের প্রান্তটিকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। সেখান থেকেই রুমলিডারদের অঞ্চল শুরু। কাস সেভেনের কারও সে-অঞ্চলে প্রবেশ নিষিদ্ধ; রাজবাড়ির সীমানায় সাধারণ প্রজার যাওয়ার যেমন অধিকার থাকেনা। রাত সাড়ে দশটায় লাইটস আউট হয়ে গেলে কোনো কথাবার্তা বলা যাবে না। এমনকি লাঞ্চের পরের রেস্টটাইমেও কথা বলা যাবে না। তোয়ালে বা কাপড়চোপড় বেডের সামনে টানা তারে ঝোলানো যাবে না। সব কাপড়চোপড় লন্ড্রিতে দিতে হবে, তারাই কেচে দেবে। তবে আন্ডারগার্মেন্টসগুলো নিজেকেই কাচতে হবে এবং সেগুলো বাথরুমের পাশের ড্রাইং রুমে শুকাতে হবে অথবা বেডের পেছনে দেয়াল ঘেঁসে টানা তারে ঝোলাতে হবে। ড্রাইংরুমটা আবার রয়েছে ফোরের এক প্রান্তে কমন বাথরুম ও টয়লেটের পাশে। এছাড়া রুমের ভেতরে জোরে কথা বলা যাবে না, গান গাওয়া যাবে না। বাথরুমেও গোসল করতে করতে গান গাওয়া যাবে না।
--যা যা বললাম, এগুলো স্ট্রিক্টলি তোমাদের মেনে চলতে হবে। আরো অনেক নিয়মকানুন আছে, সব ধীরে ধীরে জানতে পারবে। দ্যাটস্ অল ফর টুডে। কারো কোনো প্রশ্ন আছে?
--বাড়িতে কবে যাওয়া যাবে?
--মাই গুডনেস! বাড়ি যাবে কেন? কী নাম তোমার?
--রনি।
--রনি ইজ নট ইয়োর নেম। ক্যাডেট নাম কী?
--রেজওয়ানুল ইসলাম।
--দ্যাটস্ নট ইয়োর ক্যাডেট নেম। ইট মাস্ট বি রেজওয়ান।
--হ্যাঁ। তাই হবে।
--শোন রেজওয়ান। অন্যরাও শোন। বাড়ির কথা ভুলে যাও। তুমি যে-নামে প্যারেন্টস্, ফ্রেন্ডস্-এর কাছে পরিচিত ছিলে, সেসবও ভুলে যেতে হবে। তোমাদের সবার নতুন নাম হয়েছে, দ্যাট ইজ ইয়োর ক্যাডেট নেম। এখানে তুমি এনামেই পরিচিত হবে। তোমাদের প্রত্যেকের একটা ক্যাডেট নম্বরও হয়ে গেছে।
আজ থেকে তোমার, তোমাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছে। এই কলেজ, এই ১০৩ একরের টেরিটরি, এটাই তোমাদের ওয়ার্ল্ড। ১০৩ একরের পুরোটাও নয়, কলেজের প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে প্রিন্সিপালস্ বাংলো, টিচার্স এন্ড অফিসার্স কোয়ার্টার্স, ডেইরি এন্ড এগ্রিকালচারাল ফার্ম -- পেছনদিকের ঐ এলাকায় যাওয়া স্ট্রিক্টলি প্রহিবিটেড। কেবল অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হবার প্রশ্ন আসলে জন্য ঐদিকে যাওয়া লাগতে পারে। নয়তো হাউস, একাডেমিক বিল্ডিং, ডাইনিং হল, স্পোর্টস গ্রাউন্ড -- এটুকই তোমার জীবন। কিন্তু এটুকুর মধ্যেই তোমাকে এত ব্যস্ত থাকতে হবে যে, মনেই হবে না কোনো ছোট্ট জায়গায় আছো।
আর বাড়ির সঙ্গে, বাইরের জগতের সঙ্গে তোমাদের যোগাযোগ হবে ছুটিতে গেলে। ৩৬৫ দিনের ১০০ দিনই ছুটি পাবে তোমরা, চার দফায় -- দুই ঈদে এবং আরো দু’বার তোমরা ছুটি পাবে। কিন্তু এই কলেজই তোমাদের জীবন। প্যারেন্টসের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ থাকবে আর প্রতি মাসের লাস্ট ফ্রাইডেতে থাকবে প্যারেন্টস্ ডে। তোমাদের প্যারেন্টস্ আসবেন তোমাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাবেন, আবার সেদিনই চলে যাবেন। ইন ফ্যাক্ট, দুয়েকদিন গেলেই বুঝতে পারবে -- পড়াশোনা, গেমস্, ড্রিল, কালচারাল ইভেন্টস্ সব মিলিয়ে এত ব্যস্ত থাকবে যে বাড়ির কথা মনেই পড়বে না। ছুটিতে বাড়ি গেলেও কলেজেই তোমার মন পড়ে থাকবে, বন্ধুদের কথা মনে পড়বে। অপো করতে থাকবে কবে ছুটিশেষে কলেজে ফিরবে।
নাও গেট লস্ট। স্লিপিং ড্রেস পরে নাও। রাত প্রায় দশটা বাজে। সাড়ে দশটায় লাইটস আউট হয়ে যাবে। স্লিপিং ড্রেস পরার পর মশারি টাঙিয়ে নাও। লাইটস আউট হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়বে।
--রহমান ভাই, মশা কি খুব বেশি? আমার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।
--মশা কম কি বেশি, এটা কোনো প্রশ্নই নয়। তোমাকে প্রতিদিন মশারি টাঙাতেই হবে।
--আমি জীবনে মশারি টাঙাইনি। আমার আপু সবসময় টাঙিয়ে দিত।
--ও নো। কী নাম তোমার?
--ওয়াসি।
--লিসেন ওয়াসি, হিয়ার ইউ হ্যাভ টু ডু এভরিথিং বাই ইয়োরসেল্ফ। আর জীবনে যা করনি, তার অনেক কিছুই এখানে তোমাকে প্রথমবারের মতো করতে হবে। সুতরাং নো ওয়ে। আর মশারি টাঙানো কোনো কঠিন কাজ নয়। যেকোনো বিষয়ে কোনো সমস্যা হলে এইটের সিনিয়র ভাইদের কাছে সবিনয়ে জানতে চাইবে, তারা তোমাকে হেল্প করবেন। নাও গেট লস্ট।
রহমান ভাই গট গট করে হেঁটে চলে গেলেন। কেবল তার মুখে উচ্চারিত নানান নিয়মকানুনের বেড়াজাল জামিলদের ঘিরে প্রদণি করতে থাকে। জামিলের নিজেকে খুব বিধ্বস্ত মনে হলো। এত্ত এত্ত নিয়ম মানতে হবে। আর শুধু এই নয়, আরো অনেক অনেক নিয়ম আছে!
--এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না ... কী করা যাবে সেটাই বলনা তাহলে। পাকা-রশীদ বেশ ুব্ধ মনে হলো।
--এসব হয়তো আমাদের ভালোর জন্যই করা হয়েছে। জামিল মিন মিন করে বলে।
--ওই পিচ্চি, বেশি ঢঙ দেখাস না। আমি এখানে কাস সেভেনে ভর্তি হইছি, কিন্তু আমার পাইলট স্কুলে আমি নাইনে পড়তাম। আমার এক কাসমেট রহমান হোঁৎকার সঙ্গে পড়ে, তারিক হাউসে থাকে সে। আমি সব জানি বুজছোস। এইসব নিয়মকানুন খালি কাস সেভেনের জন্য। ক’দিন পরে দেখবি তুই সব নিয়ম মেনে হয়রান হচ্ছিস, আর এইট থেকে টুয়েলভের কেউ সেসব মানছে না। আর এইটগুলা আমাদের জ্বালাবে সবচেয়ে বেশি। এরা গতবছরে সেভেনে ছিল, সব নিয়ম-কানুন মানতে হইছে, এতদিন ওয়েট করতেছিলো, সেভেন কবে আসবে আর ক্যাঁক করে ধরবে। তোরা বুঝলি কিছু?
--বুঝলাম, কিন্তু রহমান হোঁৎকাটা কে? রেজওয়ান জিজ্ঞেস করে।
--ধুশ্শালা। তুই তো একটা আস্ত গরু। আরে আমাদের এই রুমের রুমলিডারের নাম কী, তুইই বল দেখি?
--রহমান।
--আরে এরেই তো তার কাসমেটরা রহমান হোঁৎকা ডাকে। ব্যাটার চেহারা দেখেছিস, এপ্রোপ্রিয়েট নাম। এটা হলো তার টিজনেম। প্রত্যেক ক্যাডেটের একটা ক্যাডেটনেম থাকে, আর একটা টিজনেম থাকে। তোদের প্রত্যেকেরই একেকটা টিজনেম হয়ে যাবে।
--তোমার টিজনেম আমি ঠিক করে ফেলেছি। জামিল বলে।
--এই খবরদার, উল্টাপাল্টা নাম দিবি তো খবর আছে।
সবাই “কী নাম শুনি” বলে শোরগোল করে ওঠে।
--পাকা-রশীদ।
“এই খবরদার” বলে রশীদ জামিলের দিকে তেড়ে আসে, জামিল পালানোর চেষ্টা করে, বাকিরা হৈ হৈ করে ওঠে।
--হোয়াটস্ গোয়িং অন?
একজন কাস-এইট রুমে প্রবেশ করে, হুঙ্কার দেয়। জ্বলন্ত চোখে সবার দিকে একে একে তাকায়। চোখের আগুন জ্বালিয়ে রেখে সে জামিলদের প্রত্যেককে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।
--তোমাদের হৈচৈ সিঁড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে। তোমরা কাস টুয়েলভের মতো শাউট করছো। তোমরা কি এখনও আইডিয়া পাওনি যে কী করা যাবে আর কী যাবে না? স্কুলে, ফ্যামিলিতে কে কী আচরণ করতে, ভুলে যাও। এখানে থাকতে হলে এখানকার মতো চলতে হবে। নইলে সোজা কলেজ-আউট হয়ে যাবে। আর একবার কলেজ-আউট হলে হোল লাইফ হেল হয়ে যাবে। একটু পরেই লাইটস্-আউট হয়ে যাবে, এখনও তোমরা মশারি টাঙাওনি, স্লিপিং ড্রেস পরোনি! দুই মিনিটের মধ্যে স্লিপিং ড্রেস পরবে ও মশারি টাঙাবে। গো, কুইক। যার হবে না, তাকে পানিশমেন্ট খেতে হবে।
রুমের ভেতরের দিককার একটি সিঙ্গেল আলমারি থেকে একটি কালো রঙের ক্যাসিও ঘড়ি এনে কাস-এইটটি দাঁড়ায়। জামিলরা দ্রুত স্লিপিং ড্রেস পরে, মশারি টাঙাতে থাকে। মশারির ফিতেগুলো কোথায় কোনটা লাগাতে হবে, তা বুঝতে বুঝতেই বেশ কয়েক সেকেন্ড লেগে যায়।
--স্টপ! দেখি, কার কী অবস্থা?
কেউ একটা ফিতে, কেউ দুইটা ফিতে লাগাতে সম হয়েছে। জামিল তিনটা। কেবল পাকা-রশীদের চারটি ফিতেই লাগানো শেষ। যখন স্টপ বলা হলো তখন মশারির প্রান্ত তোষকে গোঁজাও শেষের দিকে।
--গুড! ইউ অল হ্যাভ টু বি স্মার্ট লাইক, হোয়াটস ইয়োর নেম ...?
--রশীদ।
--ইয়েস, লাইক রশীদ। ও পারলো, বাকিরা কেন পারলে না? যাহোক, ফার্স্ট ডে ইন ক্যাডেট কলেজ, আজ এক্সকিউজ করা গেল। নয়তো বাকিদের জন্য পানিশমেন্ট অবধারিত ছিলো। দিস ইজ সাকলায়েন, এসিস্ট্যান্ট রুম-লিডার অব রুম নম্বর নাইন। আমি যা বলি তা করি। আর ইনডিসিপ্লনড কিছু দেখলে আমি টলারেট করতে পারি না। এখন যে যার বেড রেডি করে ঘুমিয়ে পড়ো। জার্নি করে এসেছো, ইউ মাস্ট বি টায়ার্ড।
এসিস্ট্যান্ট রুম-লিডার নিজেও স্লিপিং ড্রেস পরে, মশারি টাঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। হয়তো বাথরুমে।
জামিল রশীদকে জিজ্ঞেস করে, তুই কীভাবে পারলি?
--একে বলে ডজ দেয়া। এই দ্যাখ।
রশীদ স্লিপিং ট্রাউজারের নিচ থেকে সাদা ট্রাউজার সবাইকে দেখায়।
--আমি আগের প্যান্ট খুলিইনি। প্যান্ট খোলা, আন্ডারওয়্যার খোলা থেকে পনের-বিশ সেকেন্ড বাঁচিয়েছি। সেইটা দিয়ে মশারি টাঙানো শেষ করেছি।
--তাহলে স্মার্ট হতে হলে ডজ দিতে জানতে হবে? জামিল বলে।
--কিন্তু ধরা পড়লে চলবে না। রফিক আমাকে কিছু কিছু আইডিয়া আগেই দিয়েছে। সে কীভাবে ডজ দিতো তার গল্প করেছে।
--রফিকটা কে?
--আরে বললাম না তখন, আমার পাইলট স্কুলের কাসমেট, এখানে নাইনের ক্যাডেট, তারিক হাউসে থাকে।
--এই কারা যেন আসছে, শুয়ে পড়, শুয়ে পড়।
ক্লাস এইটের সবাই একযোগে প্রবেশ করে। ড্রেস জেঞ্জ করে সবাই স্লিপিং ড্রেস পরে। কেউ মশারি টাঙায়, কেউ টাঙায় না। এটা ওটা কথা বলে। কাছে কোথাও একটা বাঁশি বাজে। রুমের আলো নিভে যায়। বোঝা যায় সবাই একে একে শুয়েও পড়েছে।
কিন্তু এইটের লোকজন গল্প চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায়না। কেউ একজন বলে, হোঁৎকা কইরে? আরেকজন বলে, সাত নম্বরে আড্ডা দিচ্ছে দেখলাম। বোঝা যায় রুমলিডার রহমান ভাইয়ের বিষয়ে কথা হচ্ছে।
রশীদ ফিসফিস করে জামিলকে ডাকে।
--জামিল, এই জামিল।
--কী?
--বলছিলাম না, রুমলিডারের টিজনেম রহমান-হোঁৎকা। শুনলি তো?
--হুম।
--হু ইজ টকিং? এই দুই বেড থেকে কথা আসছিলো। হু ইজ ইট? রশীদ না জামিল? কাস এইটের কেউ একজন চেঁচিয়ে ওঠে।
দু’জনই নিরুত্তর।
--বলো। নইলে দু’জনেরই পানিশমেন্ট হবে।
দু’জনই নিরুত্তর।
--ওকে, মশারি থেকে বের হও। দু’জনেই বের হও। হ্যাঁ, এবার এখানে হ্যান্ডসডাউন হয়ে থাকো।
--হ্যান্ডসডাউন কী, আমিতো জানিনা। জামিল বলে।
--এুণি জেনে যাবে।
--এই যে এভাবে। রশীদ বলে।
--বাহ্, এতো দেখি সব জানে। লাইটস আউটের পরে কথা বলতে জানে, আবার হ্যান্ডসডাউনও জানে। দু’জন এভাবে থাকো, না-বলা পর্যন্ত এভাবেই থাকবে। এই, এটা কে, তোমার হাঁটু মেঝেতে ঠেকে যাচ্ছে কেন? হাঁটু স্ট্রেইট করো ...
রুমের ভেতরে প্রবেশ করা স্ট্রিটলাইটের আভায় জামিল রশীদের মতো পজিশন নেয়।
এভাবে কক্ষণ থাকতে হবে, এধরনের পানিশমেন্টের মেয়াদ কতণের হয়, জামিলের খুব জানতে ইচ্ছে করে। রশীদের নিশ্চয়ই জানা আছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে যাওয়া মানে নতুন পানিশমেন্টের রাস্তা দেখিয়ে দেয়া। এদিকে হাতের ওপরে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে, পা ধরে আসছে। শরীরটাও নিচে নেমে আসতে চাইছে। ফ্যান চলছে, কিন্তু মে মাসের গরমে জামিল দ্রুত ঘামতে থাকে। স্লিপিং ড্রেসটার পিঠের অংশটা একেবারে ভিজে গেছে।
কতণ হলো? দশ মিনিট? নাকি আরও বেশি। রশীদের কী অবস্থা, খুব একটা জানতে ইচ্ছে করছে না। রশীদের ওপরে খুব রাগ হয়। ওর জন্যই তো একটু কথা বলতে হলো। স্কুলের একমাত্র শাস্তি ছিল বেতের বাড়ি। আর এখানে এসব কী? আর তো পারা যাচ্ছে না। জামিল কান্ত হয়ে পড়ে। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। এইটের কারও সাড়া-শব্দ নেই। ঘুমিয়ে পড়লো নাকি সবাই? কার যেন নাক ডাকারও শব্দ শোনা যাচ্ছে। এভাবে পানিশমেন্ট দিয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে? জামিলের মাথা থেকে ঘামের কয়েক ফোঁটা মেঝেতে পড়ে। সঙ্গে কয়েক ফোঁটা চোখের জলও।
--এই, এই কে এখানে? রহমান ভাই কোনোরকমে নিজেকে সামলে নেন। রশীদ আর জামিলকে তিনি প্রায় মাড়িয়ে দিচ্ছিলেন।
--তোমাদের এভাবে হ্যান্ডস্-ডাউন দিয়ে রেখেছে কে? হু আর ইউ? কাস সেভেন? গেট-আপ। আর ইউ ক্রাইয়িং? কে তোমাদের পানিশমেন্ট দিয়েছে? কেন দিয়েছে?
--আমরা লাইটস-আউটের পরে সামান্য কথা বলেছিলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জামিল বলে।
--কে পানিশমেন্ট দিয়েছে?
--অন্ধকারে বুঝতে পারিনি।
রুমলিডার ক্লাস এইটের সবার খাটে হাত দিয়ে বাড়ি দেন, হেই ইউ, গেট-আপ। তোমাদের কে ওদের পানিশমেন্ট দিয়েছো? কে? সাকলায়েন, হাবিব, দেলোয়ার, জাকির ... কে?
কাস এইটের সবাই উঠে পড়েছে।
--আমি দিয়েছিলাম।
--কে? জাকির?
অন্ধকার রুমে কাউকে দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে।
--না, আমি, দেলোয়ার।
--পানিশমেন্ট দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
--ওরা লাইটসআউটের পরে কথা বলছিলো।
--কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে কেন? আর ওরা নিউকামার, সব নিয়মের সঙ্গে একাস্টামড হতে তো সময় লাগবে। আর তুমি মশারি করোনি কেন? ওদের ফার্স্ট ই¤েপ্রশন কেমন হচ্ছে?
--আপনি নিজেও করেননি।
--এন্ড আই এম সরি ফর দ্যাট। আমাদের রুমলিডারদের হাউসপ্রিফেক্ট ডেকেছিলো। আমরা সেটা নিয়ে আলাপ করছিলাম, রুমে ফিরতেই দেরী হয়েছে আমার। আদারওয়াইজ আমি প্রতিদিন মশারি করি, ইউ নো দ্যাট। টিচ দেম লেসনস, বাট ডোন্ট বি হোস্টাইল টু দেম। যাও, ঘুমিয়ে পড়ো সবাই।
বিছানায় পিঠ ঠেকানোর সঙ্গে সঙ্গে জামিলের সারাশরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। হাত-পায়ের পেশীগুলো কাঁপছে যেনবা। মা-বাবার কথা মনে পড়ে জামিলের। বাবা এতণে শুয়ে পড়েছে। মা রান্নঘর সামলাচ্ছে। নাকি জামিলের জন্য তারাও মন খারাপ করে বসে আছে? তারা কি জানেন, জামিল এইমাত্র কী কষ্ট পেয়েছে! চোখের পানিকে আটকানো যাচ্ছে না। নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে সে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও টের পায়নি।

চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০০৮ রাত ৯:০৫
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×