somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেড়ালের দেশে ইঁদুর হয়ে (পর্ব ৬)

০৭ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেলা একটার সময় ক্লাস শেষ হলো। মাঝে মিল-ব্রেক ছিল, ডাইনিং হলে গিয়ে সিঙ্গাড়া ও এক কাপ দুধ খেয়ে আসতে হয়েছে। কাস শেষ করে একাডেমিক বিল্ডিংয়ের সামনে থেকে আবার মার্চপাস্ট করে হাউসে ফিরতে হয়েছে। এরপর ডাইনিং হলে গিয়ে লাঞ্চ। রুমে ফিরে স্লিপিং ড্রেস পরে রেস্ট নেয়া। ঘণ্টাখানেক ঘুমাতে না ঘুমাতেই উঠে আবার একাডেমিক বিল্ডিংয়ে যেতে হলো প্রেপ-ক্লাসের জন্য।
‘প্রেপ’ শব্দটা প্রিপারেশন শব্দটা থেকে নেয়া হয়েছে, এর অর্থ সেই একই কাসরুমে গিয়ে পড়াশুনার প্রিপারেশন নেয়া -- প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট ডেস্কে বসে ডেস্কের ডালা খুলে বই-পুস্তক নিয়ে পড়াশুনা করা। রেস্টটাইমে বিছানায় গা এলানোর সুযোগ মিললো বেলা দুইটার দিকে। দ্রুতই চোখ মুদে আসে জামিলের, কিন্তু কিছুণের মধ্যেই ধুপধাপ শব্দে উঠে পড়তে হলো প্রেপ-ক্লাসের জন্য।
প্রেপ-ক্লাসে গিয়ে তাই খুব ঘুমঘুম পাচ্ছিলো জামিলের। দেখা গেল প্রায় সবারই একই অবস্থা। পাশের ডেস্কের তারিক হাউসের হাসানকে দেখা গেল টেবিলের ওপরে মাথা রেখে ঘুমিয়েই পড়েছে। হাসানের দেখাদেখি আরও দুয়েকজন ঘুমিয়ে পড়লো। এবং একসময় জামিলও।
কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ‘হেই’ ‘হুই’ শব্দে ঘুম কেটে গেল। দেখা গেল সাদা ধবধবে পোশাকে টাই-পরা একজন শিক প্রেপ-কাসে ঢুকেছেন এবং নিমিষে হৈ চৈ করে তিনি কাসটিতে তুলকালাম শুরু করলেন। ঘুমিয়ে পড়া ক্যাডেটদের কাউকে হ্যান্ডসডাউন, কাউকে চেয়ারসিটিং পজিশনে পানিশমেন্ট দিলেন।
জামিলের জন্য বরাদ্দ হলো চেয়ারসিটিং পজিশন। জামিল শিখলো চেয়ার নেই অথচ চেয়ারে-বসা ভঙ্গিতে থেকে দুই হাত ভূমির সমান্তরালে রাখাই হলো সিটিং পজিশন। কিছুণের মধ্যেই জামিলের কোমর ধরে এলো, দুই হাত ব্যথায় নেমে আসতে চাইলো।
প্রেপ-ক্লাসটি ছিলো এক ঘণ্টার। পানিশমেন্ট-পর্বও একসময় শেষ হলো। জামিলের দুপুরে দেড়-দুই ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাস অনেক পুরনো, সেই প্রিয় ঘুম তো হলোই না, উপরন্তু বিশ্রি এক কায়দায় শাস্তি খেয়ে তার মেজাজটাই গেল বিগড়ে। তার ওপরে প্রেপ-কাস শেষে যখন গেমস-টাইমে হাবিলদার রুস্তম এসে তাদের পাকড়াও করলো, তখন ষোলোকলা পূর্ণ হলো।
অন্যান্য ক্লাসের সবাই ফুটবল-ক্রিকেট-বাস্কেটবলে-ভলিবল-হকিতে মেতে উঠলো, আর জামিলদের লেফট-রাইট করেই বিকেলটা কাটাতে হলো। ইচ্ছের এই অবদমন অসহ্য কঠিন এক ব্যাপার। ড্রিলের পরে আবার গোসল, তারপর টি-ব্রেক। এরপরে মাগরিবের নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়া। এখানে জুম্মা ও মাগরিবের নামাজ বাধ্যতামূলক, তবে অন্যান্য নামাজ চাইলে রুমে পড়া যাবে। নামাজের পরে আবার প্রেপ-ক্লাসের জন্য একাডেমিক বিল্ডিংয়ে যেতে হলো। এবারে ডিনার ড্রেস, সঙ্গে সেই একই টাই। এরপরে ডিনারের জন্য ডাইনিং হলে। এরপর হাউসে ফিরে স্লিপিং ড্রেস পরে, মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি। রাত সাড়ে দশটায় ডিউটি ক্যাডেটের হুইসেল শোনা গেল, লাইটস আউট হয়ে গেল।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে কর্মব্যস্ত সারাদিনের কথা জামিল ভাবে ... ড্রিল ... ব্রেকফাস্ট ... এসেম্বলি ... ক্লাস ... লাঞ্চ ... প্রেপ ... ড্রিল ... নামাজ ... প্রেপ ... ডিনার ... লাইটস আউট। জামিল গুনতে থাকে সারাদিনে তাকে কতবার ড্রেস পাল্টাতে হয়েছে -- খাকি ... স্লিপিং ড্রেস ... গেমস ড্রেস ... ডিনার ড্রেস ... স্লিপিং ড্রেস ...।
জামিলের চোখে ঘুম নেমে আসে।
ঘুম আসতে না আসতেই জামিলের বিছানাটা হঠাৎ ওপরে উঠতে থাকে, যেন একটা লিফট। লিফটার চারপাশের দেয়াল আবার কাঁচের, তাই একেকটা ফ্লোর অতিক্রম করার সময় সেই ফোরে কে কী করছে তা দেখা যাচ্ছে।
দোতলায় দেখা গেল হাবিলদার রুস্তম ড্রিল শেখাচ্ছেন, তৃতীয় তলায় সানোয়র স্যার কার একজনের আঙ্গুলের মধ্যে পেন্সিল ঢুকিয়ে ডলাডলি করছেন, চতুর্থ তলাটি যেন ডাইনিং হল -- কিন্তু পুরো হলে মাত্র একজন বসে খাওয়া-দাওয়া করছে -- তাকে দেখা যাচ্ছে না পেছন ফিরে বসে আছে সে, পঞ্চম তলাটি যেন অডিটোরিয়াম -- এসেম্বলি চলছে, ষষ্ঠ তলাটি ...।
হঠাৎ কী হয়, লিফটি প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খায়। প্রবল বেগে নিচে নামতে থাকে। এক্ষুণি লিফটটি মাটিতে আছড়ে পড়বে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনা। বরং বিশাল এক সমুদ্রের পানিতে লিফটটি তলিয়ে যেতে থাকে। লিফটের ভেতরেও নোনা পানি জমে। জামিল সাঁতার কেটে লিফটের বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু কিছুতেই লিফটের দরজা আর খোলেনা। বদ্ধ লিফটে জামিলের দম আটকে আসে। ভয়ার্ত জামিল চিৎকার ওঠে।
--এই জামিল, জামিল! ঘুমের মধ্যে চিৎকার করছো কেন?
জামিল ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে। অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না কে কথা বলছে, সাকলায়েন ভাইয়ের গলা হবে।
--জামিল, বিছানায় কখনো চিৎ হয়ে শোবে না। সবসময় ডানদিকে কাৎ কয়ে শোবে। বিশ্রিভাবে ঘুমালেই কেবল মানুষ বিশ্রি স্বপ্ন দেখে।
সম্বিৎ ফিরে জামিল ভাবে, বিছানায় ঘুমানোরও তাহলে নিয়ম আছে!

শাস্তির রকমফের
কয়েকদিনের মধ্যেই জামিলের উপলব্ধি হলো কলেজের অত্যধিক নিয়মকানুনের বেড়াজালে সবাই এক ধরনের পরাধীন জীবন যাপন করে চলেছে। সিনিয়র কাসের ক্যাডেটরা শিক্ষকবৃন্দের শাসনাধীন, কিন্তু জুনিয়ররা, বিশেষত ক্লাস-সেভেনের ক্যাডেটরা পরাধীনদের মধ্যে পরাধীনতম। স্যাররা, এনসিওরা লেগে আছে ক্যাডেটদের পেছনে, কোথায় কে কী নিয়ম ভঙ্গ করছে তা শ্যেন দৃষ্টিতে পরখ করে চলেছেন।
আর ক্যাডেটদেরও নিয়মভঙ্গের প্রবণতা অত্যধিক। যেন অবিরত চোর-পুলিশ খেলা চলছে, কিংবা বিচ্ছুপ্রবণ জেরিকে চেজ করছে পরাক্রমশালী টম। অতিরিক্ত নজরদারীর কারণে চোরেরাও হয়ে ওঠে চতুর, ধুরন্ধর। তবে এই পুলিশি ব্যবস্থায় শাসিতের সব ক্ষোভ নিম্নগামী হতে থাকে। স্পাইরাল বেয়ে নামতে নামতে নিয়মের সব জাল ক্লাস-সেভেনের ওপরেই ফেলা হয়। সবারই নিয়ম ভঙ্গের অধিকার আছে, কেবল ক্লাস-সেভেনের নেই।
ডাইনিং টেবিলে ক্লাস-এইট থেকে ক্লাস-টুয়েলভ পর্যন্ত সবাই স্বাভাবিকভাবেই টেবিলে হাত-কনুই তুলে খাবার খায়, অথচ ক্লাস-সেভেনের কেবল কব্জি টেবিলের ওপরে থাকতে পারবে, পুরো হাত অথবা কনুই টেবিলে ওঠানো যাবে না। ডাইনিং হলে কিংবা একাডেমিক বিল্ডিংয়ে যাবার পথে অন্য ক্লাসের সবাই কথা বলতে পারবে, ক্লাস-সেভেন পারবেনা। লাইটস আউটের পরে অন্য কাসের সবাই রুমের বাইরে যেতে পারবে, কথা বলতে পারবে, ক্লাস-সেভেনকে লাইটস আউটের পূর্বেই টয়লেটে যাওয়া কিংবা অন্য যেকোনো কাজ সেরে রাখতে হবে।
দেখা যাচ্ছে সকালের ড্রিল থেকে শুরু করে রাতের লাইটস্ আউট পর্যন্ত তাদের মুখ বুজে সব নিয়ম সব শাসন মেনে নিতে হচ্ছে। কেবল ক্লাসে গেলে, বিশেষত প্রেপ-ক্লাসে গেলে খানিকটা বিরতি, খানিকটা স্বাধীনতা পাওয়া যায়। এখানে ক্লাস-এইট নেই, এনসিও রুস্তম নেই, কেবল ক্লাস-সেভেনের বন্ধুরা। মাঝে মাঝে একজন ডিউটি-টিচারকে দেখা যায়, সেসময়টুকু সাবধান থাকলেই হলো। নয়তো নিজ নিজ ডেস্কে বসে পড়াশুনা করো, বন্ধুদের সঙ্গে ফাঁকে ফাঁকে আলাপ করো, এমনকি অন্যের সঙ্গে দুষ্টুমিও করা যেতে পারে।
তারিক হাউসের ইমরোজের টিজ-নেম টোকাই। কে তাকে এত দ্রুত এই নাম দিয়ে দিল, কে জানে! তবে রনবীর টোকাইয়ের চেহারার সঙ্গে ইমরোজের চেহার সত্যিই খানিকটা মিল আছে। দেখা গেল ক্লাস-সেভেনের ফর্ম বি-তে টোকাই হলো দুষ্টুর শিরোমনি। একদিন প্রেপ-ক্লাসে দেখা গেল, তার সামনের সিটে-বসা মনিরুল সিট থেকে উঠে সাজেদের কাছে গিয়েছে কোনো কারণে, সে ফিরে সিটে বসতে গিয়ে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। ব্যাপার কিছুই না, পেছনের সিট থেকে ইমরোজ তার চেয়ারটা সরিয়ে রেখেছে। ক্লাসের মধ্যে চক একে ওকে ছুঁড়ে মারার প্র্যাকটিস টোকাইয়ের আবিষ্কার। এখন সুযোগ পেলেই স্যারদের চোখ এড়িয়ে এ ওকে চক ছুঁড়ে মারে। ব্ল্যাকবোর্ডের কাছের চকগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়। স্যাররা ক্লাস নিতে এসে আবার স্টাফরুমে ফিরে যান, চক আনতে।
জামিল অবশ্য এইসব চক ছোঁড়াছুঁড়িতে নেই। সে পানিশমেন্টকে ভয় পায়। কলেজের প্রথম দিনে কাসিম হাউসের নয় নম্বর রুমে সেই হ্যান্ডসডাউনের কথা সে ভুলতে পারেনা। আর সানোয়র স্যার আজমলের আঙ্গুলে ফাঁকে পেন্সিল ডলাডলি করছেন আর আজমল কাটা মুরগির মতো তড়পাচ্ছে, এই দৃশ্যও বীভৎস ইমেজ হয়ে তাকে সতর্ক করে তোলে।
কিন্তু ক্যাডেট কলেজে পানিশমেন্ট এড়ানো খুবই কঠিন। সাকলায়েন ভাই একদিন বললেন, প্রেপ-ক্লাস থেকে ডিনার করতে ডাইনিং হলে ফেরার পথে জামিল নাকি খালিদ হাউসের কোন ক্লাস-এইটের গায়ে টাচ করেছে অথচ সরি বলেনি। সাকলায়েন ভাইকে নাকি তার ফ্রেন্ড বলেছে, তোরা কি ক্লাস-সেভেনকে কিছুই শেখাসনা? সাকলায়েন ভাই তাতে বন্ধুর কাছে জাত গিয়েছে, এরকম একটা ভাব নিয়ে জামিলকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।
--তুমি সরি বলোনি কেন?
--আমি বুঝতে পারিনি।
--নাকি ইচ্ছে করে সরি বলোনি?
--আজ ডাইনিং হলে আসার সময়ে পাঁচজনের সঙ্গে টাচ লেগেছে, এরমধ্যে ক্লাস সেভেন ছিল দুইজন আর তিনজন ছিল সিনিয়র। আমি প্রত্যেককেই সরি বলেছি।
--না একজন বাদ পড়েছে। একজনকে তুমি সরি বলোনি। অন্য হাউসের একজন আমাকে এসব নিয়ে কথা শোনাবে, আর তুমি আমাকে পাটিগণিত শেখাবে, না? আর তুমি কয়জন সিনিয়র আর কয়জন ক্লাসমেটের সঙ্গে টাচ লেগেছে, এই হিসাব কেমনে রাখলে? ক্লাস-সেভেন হাঁটবে মাথা নিচু করে, তারতো চিনতে পারার কথা না, কার সঙ্গে টাচ লাগছে।
--সরি, আমি বুঝতে পারিনি।
--এই সরিটা তুমি তাকে বললে এত কথা হতো না। আর আমি যখন এবিষয়ে কথা শুরু করি, তোমার প্রথমেই সরি বলা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তুমি আর্গু করা শুরু করলে।
--সরি, এরপর আর ভুল হবেনা।
--তোমার অপরাধ মাল্টিপল। এক সরিতে হবেনা। তুমি এখন ৩৩৩ বার সরি বলবে।
জামিল সরি বলতে থাকে। সাকলায়েন ভাই তার সামনে বসে আঙ্গুল দিয়ে সরি বলার সংখ্যা গুনতে থাকে। কিছুক্ষণ বলার পরে সরি বলাটা একটা যান্ত্রিক ব্যাপারে পরিণত হয়, জামিল মুখ চালু রেখেই অন্য বিষয় নিয়ে ভাবতে সক্ষম হয়।
সে ভাবতে থাকে, এই ঘটনার মানে কী? সাকলায়েন ভাইয়ের আর কোনো কাজ নাই? জুনিয়র একজনকে ৩৩৩ বার সরি বলানোর মধ্য দিয়ে কী তৃপ্তি তিনি পাচ্ছেন? একাডেমিক বিল্ডিং থেকে ডাইনিং হলে কি হাউসে ফেরার সময় অপ্রশস্ত বাঁধানো শেড দিয়ে তিনশো ক্যাডেট আসতে থাকে, সবার হাঁটার গতি সমান নয়। আর এতো মার্চপাস্ট নয়, এলোমেলোভাবেই সবাই হাঁটে। ক্লাস-সেভেনের ডাইনিং হলে দেরীতে ঢোকারও নিয়ম নেই, তাই বিশেষত একাডেমিক বিল্ডিং থেকে ডাইনিং হলে আসার সময় ক্লাস-সেভেনের সবাই সিনিয়রদের তুলনায় দ্রুতই হাঁটে। তাই তাদের গায়ের সঙ্গে সিনিয়রদের টাচ লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেক্ষেত্রে সরি বলে নিলেই হয়। কিন্তু টাচ লাগাটা বুঝতে না পারলে কী করার আছে?
এই ব্যাপারটাও মারাত্মক যে যেকোনো সিনিয়র চাইলে অন্য সিনিয়রের রেফারেন্স দিয়ে পানিশমেন্ট দিতে পারে, এই যেমন সাকলায়েন ভাই এখন জামিলকে দিচ্ছে। কোনো সিনিয়র যদি কোনো কারণে কোনো জুনিয়রের ওপরে মনঃক্ষুণ্ন হয়, তবে এরকম হাওয়াই রেফারেন্সে যেকেউ পানিশমেন্ট দিতে পারে। এজন্য কোনো সাক্ষ্যসাবুদের দরকার নেই। এ এক অরাজক পরিস্থিতি, জামিল ভাবে।
তাই পানিশমেন্ট এড়ানোর কোনো উপায় নেই। কারও পানিশমেন্ট-ভাগ্য ভালো, অর্থাৎ চিহ্নিত ডিসিপ্লিন ভঙ্গকারী, তাই সে ঘন ঘন পানিশমেন্ট খায়। আর কারও কারও পানিশমেন্ট-ভাগ্য খারাপ, অর্থাৎ ডিসিপ্লিনড ক্যাডেট হিসেবে পরিচিত। তাই তাকে কম পানিশমেন্ট খেতে হয়, সরি বলে অল্পের ওপর দিয়ে পার পাওয়া যায়।
জামিল পড়ে দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে। সিনিয়রদের কাছে জেন্টেল ও ডিসিপ্লিনড ক্যাডেট হিসেবে মোটামুটি একটা পরিচিতি সে পেয়েছে। এই যেমন কলেজে এক মাস যেতে না যেতেই একদিন রুম নম্বর দশ-এ ক্লাস সেভেনের সবার ডাক পড়লো। সেখানে ক্লাস এইটের সব এসিট্যান্ট রুম লিডাররা সমবেত হয়েছে। তারা এক মাসের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আঠারোজন ক্লাস-সেভেনের একটা রেটিং করলেন। তাতে দেখা গেল সবচেয়ে ডিসিপ্লিনড ক্লাস-সেভেন নির্বাচিত হয়েছে রেজওয়ান। আর সবচেয়ে ইনডিসিপ্লিনড নির্বাচিত হয়েছে রশীদ। দু’জনই নয় নম্বর রুমের। জামিলের পজিশন ছিল ডিসিপ্লিনড ক্যাটাগরিতে তিন নম্বর।
কিন্তু তাকেও কম পানিশমেন্ট খেতে হয়না। এই যে সাকলায়েন ভাই বসে বসে সরি বলা গুনছেন, এই পানিশমেন্টটা অযথাই খাচ্ছে সে। জামিলকে তিনি সহজেই বকে-ঝকে ছেড়ে দিতে পারতেন।
তবে কলেজের প্রথম দিন যে দেলোয়ার ভাই তাকে হ্যান্ডস ডাউন দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, দেখা গেছে তিনিই জামিলকে বেশ স্নেহ করেন এখন। রুম ও টেবিল-মেট হাবিব ভাইও মোটামুটি সন্তুষ্ট জামিলের নিয়মনিষ্ঠায়। কিন্তু সে টের পায় সাকলায়েন ভাই তার ওপরে কোনো কারণে অসন্তুষ্ট। দেলোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। তিনি জামিলকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে ৩৩৩ বার সরি বলার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। জামিল প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। কারণ দেলোয়ার ভাইই বলেছিলেন সিনিয়রের নামে কমপ্লেইন করা ঠিক না।
--এসম্পর্কে কিছু বললে কমপ্লেইনের মতো শোনাবে।
--ওকে, আই উইল সি দ্যাট, তুমি বলো।
জামিল সবিস্তারে সব বলে। দেলোয়ার ভাই গম্ভীর হন।
--শোনো, সাকলায়েনের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। যদিও সে আমার ক্লাসমেট, কিন্তু তার এই ব্যাপারটা আমি পছন্দ করিনা। সে স্নবিশ। স্নবিশ বোঝো তো, নাক উঁচু আরকি। আর বায়াসড। সে ঢাকার ছেলেদের, স্মার্ট ক্যাডেটদের, সুদর্শন ক্যাডেটদের, একটু পশ-লুকিংদের পছন্দ করে। অন্যদের সে অপছন্দ করে। ও যেন না চটে সেদিকে খেয়াল রাখবে। আফটার অল, সে হলো এসিস্ট্যান্ট রুম লিডার।
জামিল পরে বুঝেছে দেলোয়ার ভাই ঠিক কথাই বলেছেন। নয় নম্বর রুমের কাস সেভেনের পাঁচজনের মধ্যে সাকলায়েন ভাই বেশি পছন্দ করেন রেজোয়ানকে। রেজোয়ানের বাসা রাজধানীতে, সে দেখতে সুন্দর, ট্যালেন্ট শোতে সে ‘কেয়ারলেস হুইসপার’ গেয়ে বাজিমাৎ করেছে। ক্যাডেট থেকে শুরু করে শিক্ষক, রেজোয়ানকে এখন সবাই একনামে চেনে। জর্জ মাইকেল থেকে এলটন জন, সবার গান গাইতে পারে সে। সাকলায়েন ভাই মাঝে মাঝেই তার কাছ থেকে গান শোনেন। অন্যান্য রুম থেকেও প্রায়ই তার ডাক পড়ে গান শোনানোর।
তুলনায় জামিলের কোয়ালিটি বলতে কবিতা লিখতে পারার ক্ষমতা। ট্যালেন্ট শোতে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তিও করেছিল, তাও নিজের মুখস্থ কবিতা এত অডিয়েন্সের সামনে প্রথমবারের মতো আবৃত্তি করতে গিয়ে শেষটা গুলিয়ে ফেলেছিল। নয়তো অন্যকে আকৃষ্ট করার মতো তার কী আর আছে? চেহারায় শহুরে স্মার্টনেস নেই, গায়ের রঙও বলতে গেলে কালো, কথাবার্তায় এখনও অপ্রতিভ। সাকলায়েন ভাইয়ের মতো মানুষের তাকে পছন্দ করার কোনো কারণ নেই।
না সিনিয়র না ক্লাসমেট, কারও কাছেই জামিল তেমন জনপ্রিয় নয়। কেবল দলোয়ার ভাই তাকে বেশ স্নেহ করেন। আর ক্লাসমেটদের মধ্যে একজনের সঙ্গে জামিলের খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:০৭
১১টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×