ক্লাসে জামিলের পাশের ডেস্কেই বসে খালিদ হাউসের মৃদুল। প্রথম ক্লাসের দিনেই তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গিয়েছিল, পরে সেই পরিচয় প্রগাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হলো। ক্লাসটাইমে তো বিশেষ আলাপ হয়না, একটার পর একটা ক্লাস হতে থাকে। আবার ক্লাস বা প্রেপ থেকে ডাইনিং হলে বা হাউসে ফেরার সময়ে তারা দু’জন একসঙ্গেই হাঁটে, কিন্তু কথা বলার সুযোগ কম, ক্লাস-সেভেন বলে। তবে প্রেপ-ক্লাসে ডিউটি স্যারকে ফাঁকি দিয়ে অনেক গল্প-গুজব করার সুযোগ আছে।
মৃদুলকে খুব বুদ্ধিমান ছেলে বলে মনে হয় জামিলের। আর তার জানাশোনা, বাইরের পড়াশোনা বেশ ভালো। পরে জানা গেল, সে ছাত্রও ভালো। তার ভূগোল-জ্ঞান খুব ভালো, সানোয়ার স্যার এজন্য তাকে খুব পছন্দ করেন। তবে তার সাহিত্যপাঠের পরিধি উল্লেখ করার মতো। এই বয়সে সে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সত্যজিৎ রায়ের অনেক কিছু পড়ে ফেলেছে। বিশেষ করে কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ আর সত্যজিতের ‘ফেলুদা’ সিরিজের প্রায় সবই তার পড়া শেষ। ফেলুদা অবলম্বনে ‘সোনার কেল্লা’ ছবিটিও তার দেখা। মৃদুল জামিলকে বেশ কয়েকটি ফেলুদার গল্প শুনিয়েছে। ওর কাছ থেকে শুনে শুনে ফেলুদা-লালমোহন-তোপসে জামিলেরও প্রিয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
মৃদুল খুব কেয়ারিংও। কোনো অংক বুঝতে না পারলে সে বলামাত্র জামিলকে বুঝিয়ে দেয়। খাকি পোশাকের ব্যাজ-এর কলেজ-মনোগ্রামটা, কিংবা শার্টের ডান পকেটের ওপরের নেমপ্লেটটা জামিল কিছুতেই সোজা করে লাগাতে পারেনা। সেফটিপিনগুলো একটু এদিক-ওদিক হবেই। মৃদুল তাকে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে এইসব সোজা রাখা যায়। জামিলের পাটিগণিত বইটার বাঁধাই খুলে গিয়েছিল, মৃদুল ওর হাউসে নিয়ে গিয়ে সেলাই আর আঠা দিয়ে পরদিন মজবুত আকারে জামিলকে ফেরত দেয়।
--আঠা আর সুঁচ-সুতা তোমার কাছে ছিল?
--আমার মা একটা বক্সে এসব রেডি করে দিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কিছু জিনিস আছে সেই বক্সে। এই যেমন ধরো ছোট কাঁচি, নেইল কাটার, মার্কার পেন এইসব। অবশ্য এধরনের বক্স আমি অনেক ছোটবেলা থেকেই ব্যবহার করি। আমি লুজ বই, ছেঁড়া বই দেখতি পারিনা। লুজ বই দেখলেই আমি আঠা দিয়ে সেটা লাগিয়ে ফেলি।
--বইটা এখন খুব ভালো দেখাচ্ছে, থ্যাংক ইউ।
--নো মেনশন।
জামিলের বেশ ঈর্ষা হয় মৃদুলের সব কথা শুনে। তার পরিবার তাকে একটা ভালো পরিবেশ দিয়েছে। তার মা শিখিয়েছে কীভাবে স্বনির্ভর হতে হয়, নিজের কাজ নিজে করতে হয়। বাসায় রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-সত্যজিতের সমাহার ঘটিয়েছেন তারা বাবা-মা। সেই তুলনায় জামিল কোনো পরিবেশ পায়নি বাসায়।
জামিল কবিতা লিখতে চায়, কিন্তু তার কাব্যভাব খুব সীমিত। মৃদুল বলে, তোমার সব কবিতাতেই ‘ডাস্টবিনের পাশে ক্ষুধার্ত শিশু’ ভাবটা ঘুরেফিরে আসে। কবিতা কত বিচিত্র হতে পারে তা জানতে হলে তোমাকে অনেক কবিতা পড়তে হবে। কিন্তু সেইসব বিচিত্র কবিতা পড়ার সুযোগ জামিলের কখনোই হয়নি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বলতে গেলে কোনো কবিতাই তার পড়া নেই। পড়া হবে কী করে? যে-পরিবার প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়, কবিতা-গল্পের বইয়ের সরবরাহ সেই পরিবারে আসবে কোত্থেকে?
জামিলের বাবা থানাশহরের হাইস্কুলের শিক। মা গৃহবধূ। বাবামায়ের একমাত্র ছেলে জামিল। আর আছে ছোট বোন। কিন্তু পরিবারে আরও অনেক সদস্য আছে। বাবামায়ের বিয়ের কয়েকবছর পরে, জামিলের জন্মের পরপরই নানা মারা যান। দুই মামা ও এক খালা তখন অনেক ছোট, অগত্যা বাবাই মামা ও খালাদের অভিভাবক হন। মামারা জামিলের পাঁচ-সাত বছরের বড়ো মাত্র। অন্যদিকে জামিলের চাচাতো ভাইও পড়াশুনার খাতিরে জামিলদের বাসায় থাকছে। চাচার বাড়ি আরও প্রত্যন্ত গ্রামে, ভালো স্কুল সেখানে নেই। সেলিম ভাইকে পড়াতে চাচার অত উৎসাহ নেই, বরং ক্ষেতের কাজে লাগিয়ে দেয়াতেই তার আগ্রহ বেশি। কিন্তু সেলিম ভাইয়ের পড়াশুনায় আগ্রহ দেখে বাবা তাকে জামিলদের থানার ভালো স্কুলটায় ভর্তি করিয়ে দেন।
তবে দুই মামার পড়াশুনায় অতটা উৎসাহ নেই, বরং নানা ধরনের দুষ্টুমি করে বাবা-মাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন। প্রায়ই এখান-ওখান থেকে মামাদের নামে অভিযোগ আসে, সেসব নিয়ে সংসারে অশান্তি লেগেই আছে। তার চাইতে বড়ো ব্যাপার কাজের লোকসহ আট সদস্যের সংসারের খরচের যোগান দিতে বাবার খুব কষ্ট হতো। স্কুলের বেতন আর নানার রেখে যাওয়া অল্প কিছু জমিজমা, এই দিয়ে এতবড়ো সংসার চলার কথা না। এই সংসারে গল্প-কবিতার বই পড়া একটা বিলাসিতাই হয়তো। জামিল ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়ায় বাবা-মা তাই খুব খুশি হয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন, যাক, আমার ছেলের ভালো লেখাপড়া নিশ্চিত হলো।
মৃদুলের সাহিত্যপাঠের বহর দেখে তাই জামিল ঈর্ষান্বিত হয়।
অথচ জামিলের পড়ার আগ্রহ তো কম ছিলনা। বড়ো মামা কোত্থেকে একটা দস্যু বনহুরের বই এনেছিলেন, জামিল গোগ্রাসে পড়ে ফেলেছিল। বাবা মাঝে মাঝে শহর থেকে বিচিত্রা কি রোববার ম্যাগাজিন আনতেন, সেই হলো বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ। ঈদের সময়ে টেলিভিশন দেখতে যেতে হতো সেই জুটমিলের শ্রমিকদের টিভিরুমে। মৃদুলের সঙ্গে মিশে জামিলের পড়ার তৃষ্ণা বাড়ে। কলেজে একটা লাইব্রেরি আছে, কিন্তু সেখানে যাবার তো কোনো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। সারাদিনের যে শিডিউল, সেখানে তো পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার কোনো সুযোগই দেখা যাচ্ছে না।
তবে জামিলের সঙ্গে যে কেবল বইপড়ার গল্প হয়, তাই নয়। রাজ্যের বিষয় নিয়ে তারা প্রেপ-ক্লাসে নিম্নস্বরে আলাপ করে। আর মৃদুলই কেবল বলে তা নয়, জামিলও অনেক কথা বলে।
জামিল প্রথম প্রথম সঙ্কোচে নিজের কথা বলতে চাইতো না। অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠার কারণে তার ধারণা ছিল, মৃদুলদের সঙ্গে তার অনেক গ্যাপ। গর্ব করে বলার মতো কিছু নেই। এই কথা কেউ শুনলে কীইবা বলবে যে তাদের বাসায় টেলিভিশনই নেই। কিন্তু মৃদুল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অনেক কথা বের করে নেয়। দেখা গেল জামিলের অভিজ্ঞতা নিয়ে মৃদুল ঈর্ষান্বিত হয়। প্রথম প্রথম মনে হতো এইসব আবার বলার মতো কিছু হলো নাকি? কিন্তু মৃদুলের বিস্ময় আর আফসোসমাখা মুখচোখ দেখে জামিল বোঝে, তার সঞ্চয়ে যে অভিজ্ঞতা জমা আছে, তা অনেকেরই নেই।
--তুমি নদীতে মাছ ধরেছো?
--হ্যাঁ! আমাদের থানার ভেতর দিয়েই তো নদী গিয়েছে। নদীতে মাছ ধরা, গোসল করা কোনো ব্যাপারই না। আবার পুকুরেও মাছ ধরেছি। গ্রীষ্মকালে কাদার মধ্যে টাকি মাছ ধরতে বেশ মজা।
--আমরা শহরে বড়ো হয়েছি, এসব অভিজ্ঞতা একদম নাই।
--গ্রীষ্মকালে নদী শুকিয়ে গেলে হেঁটে হেঁটে আমরা নদী পার হয়ে ওপারের গ্রামে চলে যেতাম। দুয়েকটা গ্রামের ওপারে রেললাইন। রেললাইন ধরে অনেকদূর পর্যন্ত বেড়াতে যেতাম।
--কার সঙ্গে যেতে?
--মামাদের সঙ্গে। আমার দুই মামার পুরো এলাকা চষে বেড়ানোর অভ্যাস। আমি মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে যাই। কখনোবা অন্য বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম।
--ইশ, তোমার কী মজা!
--মজা আবার কীসের? এগুলো কি বলার মতো কোনো গল্প? এসব তো গ্রামের, মফস্বলের ছেলেরা করেই।
--না না, আমার খুব হিংসা হচ্ছে। আমগাছে চড়ে আম পেড়েছো?
--ওমা, এটা আবার কিছু হলো নাকি? আমি নিজেই আমাদের আমগাছে চড়ে বসে থাকতাম। বিরাট কাঁঠাল গাছ থেকে বড়ো বড়ো কাঁঠাল নামিয়েছি।
--দারুণ ব্যাপার!
--একবার থানার ইউএনওর বাসায় ডাব চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে যাচ্ছিলাম আরকি। মানে আমি যেতে চাইনি, মামাদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে ওদের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিলাম। ইউএনওর বিরাটা বাড়ি, পুরনো আমলের। বাড়ির পেছন দিকে বেশ কয়েকটা ডাবগাছ। সন্ধ্যার পরপর। বড়ো মামা গাছের ওপরে, আমি আর ছোট মামা গাছের নিচে। একটা ডাব ওপর থেকে পড়তে না পড়তেই, ডাব পড়ার শব্দ শুনে, গার্ড এসে হাজির। আমি আর ছোট মামা পাঁচিল টপকে পালালাম। কিন্তু বড়োমামা গাছের ওপরে। টর্চ দিয়ে খুঁজে খুঁজে গার্ড বড়ো মামাকে ধরে ফেললো।
--তারপর?
--তারপর আর কী? বাসায় কমপ্লেইন আসলো। বাবা মামাকে খুব বকলেন। বড়ো মামা অবশ্য আমার যাবার কথা বাবাকে বলেনি। বিনিময়ে আমার কাছ থেকে দশ টাকা আদায় করে নিয়েছিল।
--হুম। ডাবচুরি! শুনেছি, সিনিয়র ক্যাডেটদের জন্য ডাবচুরি এখানেও একটা বিরাট অ্যাডভেঞ্চার। আর সবচেয়ে বড়ো অ্যাডভেঞ্চার নাকি প্রিন্সিপাল স্যারের বাংলো থেকে ডাব চুরি করা।
--তুমি কোত্থেকে জানলে?
--কেউ বলেনি। তবে একদিন রেস্টটাইমে আমার রুমের ক্লাস এইটের ভাইরা বলাবলি করছিল। কাস ইলেভেনের কয়েকজন নাকি প্রিন্সিপালের বাংলোয় ডাব চুরি করে ধরা পড়েছে। এজন্য তাদের কয়েকটা করে এক্সট্রা ড্রিল হয়েছে।
--এক্সট্রা ড্রিল কী?
--এটা একটা বড়োসড়ো পানিশমেন্ট। এক এক্সট্রা ড্রিল মানে পারসোনাল ফাইলে একটা লাল দাগ। ঐযে দেখোনি, গেমস টাইমে আমরা করি ড্রিল, অন্যরা করে গেমস্। আর অল্প কয়েকজন খাকি পরে, বন্দুক হাতে অদ্ভূত সব ড্রিল করে -- ফ্রগ জাম্প, ফ্রন্ট রোল, চেয়ারসিটিং -- ওরা এক্সট্রা ড্রিল ভোগ করে। লাঞ্চটাইমে দেখবে ক্যাডেট নম্বর ধরে কলেজ প্রিফেক্ট মাঝে মাঝে এক্সট্রা ড্রিল-এর ঘোষণা দেয়।
--ও হ্যাঁ, তাই তো।
মৃদুলের সঙ্গে প্রেপ-ক্লাসে গল্প করার কারণে একদিন ডিউটি-টিচারের কাছে ধরা পড়ে গেল ওরা। পুরো কাসের সামনে ডেইসের ওপরে দাঁড়িয়ে পরস্পরের দুই কান ধরে ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে হলো আধা ঘণ্টা। সবাই মুচকি মুচকি হাসছিল, আর স্যার আধা ঘণ্টা একটা ফাঁকা ডেস্কে বসে রইলেন। কিন্তু মৃদুল আর জামিল চোখাচোখি তাকিয়ে রইলো। মুখে কথা না বলতে পারলেও চোখে চোখে অনেক কথা হলো। এই আধাঘণ্টায় তারা যা যা গল্প বলতে চাইতো, তা যেন চোখে চোখে বলা হয়ে গেল। বরং কান ধরার কারণে তারা এখন পরস্পরের খুব কাছে আসতে পারলো, ডেস্কে পাশাপাশি বসলেও দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
এভাবে সবাই জেনে গেল যে মৃদুল আর জামিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বেস্ট ফ্রেন্ড। জামিলের সঙ্গে অনেকেরই বন্ধুত্ব হয়েছে। পাকা-রশীদ, ভাটিয়ালী-আনোয়ার, চাঁপু-ফিরোজ, ইমরোজ-টোকাই এবং আরও অনেকে। তবে মৃদুলই হলো তার বেস্ট ফ্রেন্ড। হাউসে রুমে ফিরেও জামিলের মৃদুলের কথা মনে হতো। পরদিন সকালে কাসে দেখা না হওয়া পর্যন্ত সে অপো করতো, কখন ওর সঙ্গে দেখা হবে। নানাবিধ ভাববিনিময় হবে।
বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজের পর ক্যাডেটদের সুখের সময়। পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি এবং সেই সন্ধ্যায় প্রেপ-কাস নেই। বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যার চেয়ে মধুর সময় ক্যাডেটদের জন্য আর কিছু নেই। রুমে ফিরে সবাই গল্পগুজব করবে, আড্ডা দেবে। আড্ডার বিষয়বস্তু হলো এ ওর পেছনে লেগে খুনসুটি করা কিংবা কোনো স্যারের কিংবা ওস্তাদের নানান মুদ্রাদোষ অঙ্গভঙ্গি করে দেখানো আর হাসিতে ফেটে পড়া। হাসিমুখে ক্যাডেটরা ডাইনিং হলে যাবে স্পেশাল ডিনারের স্পেশাল খাবার খেতে। ডিনার সেরে টিভিরুমে খানিক সময় টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখবে। এই পুরো খুশির উৎসবে এমনকি কাস সেভেনের ক্যাডেটরাও খানিক ভাগীদার। টেলিভিশন দেখা, ক্যারম খেলা, স্পেশাল ডিনার পেটপুরে খাওয়া ... ক্লাস সেভেনের জন্যও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পরম কাঙ্ক্ষিত সময়। কিন্তু এইসব খুশি খুশি পরিবেশের মধ্যেও জামিলের খানিকটা মন খারাপ করে। কারণ পরদিন ছুটি থাকায় মৃদুলের সঙ্গে আর দেখা হবেনা।
জামিল মৃদুলকে খুবই অনুভব করে, সারাক্ষণ।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৪:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



