সেদিন লাইটস্-আউটের পর হঠাৎ হৈ চৈ-এ জামিলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। খুব নিকটবর্তী কোত্থেকে যেন ‘ধর ধর’, ‘মার মার’, ‘শালারে মাইরা ফালা’ -- এইসব শব্দ ভেসে আসছে। এছাড়া দৌড়াদৌড়ি, ধুপধাপ শব্দ মিলে পুরো কাসিম হাউস জেগে গেছে যেন। জামিল অনুমান করে কোথাও সাংঘাতিক খারাপ কিছু হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুইসেল বাজতে থাকলো, স্যারদেরও কণ্ঠ শোনা গেল। একটি প্রাইভেট কার এসে থামলো যেন, কাসিম হাউসের নিচে। নয় নম্বর রুমের সবাই জেগে গেছে।
রহমান ভাই প্রথমেই ধমকাধামকি করে সবাইকে বলেছেন, ক্লাস এইট কেউ বাইরে যাবে না, ক্লাস সেভেন ঘুমাও, ভয় পাবে না। আমি দেখছি কী হয়েছে।
নিচে হুইসেল বাজছে, হাবিলদার রুস্তমের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। হাউস মাস্টার স্যারের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। এডজুটেন্ট মেজর হাফিজের আদেশ শোনা গেল, এই রুস্তম, তুমি ওদিকে যাও। দেখ কে কোথায় আছে।
রহমান ভাই বেশ কিছুক্ষণ বাইরে গেছেন, আসার নাম নেই। ক্লাস এইটের সবাই ধীরে ধীরে রুম ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে জটলা শুরু করলো। জামিল মাথা উঁচু করে অন্ধকারেও দেখে, পাকা-রশীদ বিছানা থেকে নেমে প্রায় দরজার কাছে গিয়ে বারান্দায় উঁকি দিচ্ছে।
--এই রশীদ, কী হচ্ছে, কিছু বুঝলি? ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে জামিল।
--গ্যাঞ্জাম নিচতলায় এগারো নম্বর রুমের কাছে। রশীদও ফিসফিস করে জানায়।
--মানে, ক্লাস ইলেভেনের রুমে?
--হুঁ।
--এডজুটেন্ট, প্রিন্সিপাল সবাই আসছে মনে হয়। রেজওয়ান বলে।
--হুঁম! রশীদের উত্তর।
লম্বা এক হুইসেল বাজে। এডজুটেন্টের হুঙ্কার শোনা যায়, অল ক্যাডেটস, গেট ইনসাইড। হাবিলদার রুস্তমের হুইসেল এবার দোতলার সিঁড়িতে শোনা যায়। তিনি উপরে উঠে আসছেন।
ক্লাস-এইটের সবাই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকে। কিছুক্ষণের মধ্যে রহমান ভাইও ভেতরে আসেন। রশীদ ততক্ষণে তার বিছানায় শুয়ে পড়েছে। হাবিলদার রুস্তম হুইসেল বাজাতে বাজাতে দোতলার এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যান আর আওয়াজ করতে থাকেন, এই, ওখানে কারা ... সবাই ভেতরে! ভেতরে! ঘুমিয়ে পড়! ঘুমিয়ে পড়!
কিছুক্ষণের মধ্যে সব চুপচাপ হয়ে যায়।
রুমের ভেতরে ক্লাস এইটের সবাই রহমান ভাইকে ফিসফিস করে ধরে, কী হয়েছে রহমান ভাই? ঘটনা কী?
--তোমরা কোনো শব্দ করো না। আমি মোটামুটি একটা ধারণা দিচ্ছি, এটুকু শুনে সবাই ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে ডিটেল জানা যাবে।
রহমান ভাই পুরো ঘটনাটা, অন্ধকার কক্ষে ক্লাস-এইটকে নিম্নস্বরে অথচ উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকেন। তবে ক্লাস-সেভেনও বিছানায় শুয়ে চুপচাপ শুনতে থাকে কাহিনী।
সাড়ে দশটায় লাইটস্ আউটের পরে নিয়মানুসারে টিভিরুম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ক্লাস টুয়েলভের লোকজন লাইটস আউটের পরেও জানালায় কম্বল ঝুলিয়ে টিভি দেখছিল। ক্লাস টুয়েলভের কাছে সাধারণত টিভিরুমের ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। রাত জেগে মাঝে মাঝে তারা টিভি দেখে, যদিও তা ঝুঁকিপূর্ণ। জানাজানি হলে মুশকিল আছে। তবে সেদিন ছিল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। এর আগে ক্যাডেটরা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছিল, বিশেষ বিবেচনায় ক্যাডেটদের জন্য যেন খেলাটি দেখার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু সেই অনুমতি মেলেনি। তাই টুয়েলভের লোকজন চুরি করে সেই মহাম্যাচটি দেখছিল। এরমধ্যে ক্লাস ইলেভেনের লোকজন টুয়েলভের কাছে দাবি জানাতে থাকে, তাদেরও খেলা দেখতে দিতে হবে। কিন্তু ক্লাস-টুয়েলভ কিছুতেই এই ঝুঁকিপূর্ণ ‘চুরি করে খেলা দেখা’র এডভেঞ্চারে ইলেভেনকে নেবে না। কারণ এই ম্যাচটা দেখার বিষয়টি এত আলোচিত যে, কর্তৃপক্ষ এমনিতেই নজর রাখবে কোথাও কেউ চুরি করে টিভি দেখছে কিনা।
খেলা দেখার এক পর্যায়ে কেউ একজন টিভিরুমের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। টুয়েলভের লোকজন স্পষ্ট বুঝতে পারে এ হলো ক্লাস-ইলেভেনের কাজ, এবং তারা ভেতরে আটকা পড়ে একইসঙ্গে ক্রুদ্ধ ও সন্ত্রস্ত্র হয়। ইলেভেনের লোকজন যদি কর্তৃপক্ষকে খবর দিয়ে দেয়, তবে তারা হাতেনাতে ধরা পড়বে। টুয়েলভের লোকজন তালাবদ্ধ দরজা সবাই মিলে ফাঁক করে, সেই ফাঁক গলে একজন কোনোমতে বের হয়। এরপর সে ইট বা অন্য কিছু দিয়ে দরজা ভাঙ্গে।
এরপর টুয়েলভের সবাই মিলে নিচতলায় ইলেভেনের দুইটি রুমে যায়, এবং তাদের পেটাতে থাকে। কৃতকর্মের কারণে মনোবল কমে যাওয়ায় হোক বা জুনিয়র হবার কারণে হোক, ইলেভেন মার খায়, এবং টুয়েলভ আশ মিটিয়ে তাদের মারধর করে। একপর্যায়ে সারা কলেজ খবর হয়ে যায়, এনসিও, এডজুটেন্ট, হাউস-মাস্টার, প্রিন্সিপাল সবাই চলে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়।
এই মুহূর্তে তদন্ত চলছে। আরও কিছু জানতে হলে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এবার সবাই ঘুমাও।
ক্লাস-এইটের সবাই শুয়ে পড়ে। কিন্তু শুয়ে শুয়ে ঘটনার ময়নাতদন্ত চলতে থাকে। রহমান ভাইসহ সবাই একমত যে এরকম ঘটনা কলেজের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি এবং সামনে ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে। জামিল পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভবত নিচে তদন্ত চলছিল এবং রুমের ভেতরে ঘটনার ব্যবচ্ছেদ হচ্ছিল।
এই ঘটনার পরে আসলেও কলেজে বিরাট পরিবর্তন আসলো। প্রধান পরিবর্তন হলো প্রিন্সিপাল স্যারকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হলো, বলা যায় তাকে বরখাস্ত করা হলো। হাউস মাস্টার স্যারের দায়িত্ব কেড়ে নেয়া হলো। আর শোনা গেল, কলেজে আসছেন নতুন প্রিন্সিপাল।
জামিলরা ক্লাস সেভেনের ক্যাডেট হয়েও সিনিয়রদের আলোচনা, বন্ধুদের সঙ্গে কানাঘুষা কিংবা কাসে কোনো কোনো শিক্ষকের দেয়া আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে এবং খানিকটা নিজচোখে দেখে বুঝতে পারছিল, কলেজে কী কী পরিবর্তন হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে। আগের প্রিন্সিপাল ছিলেন সিভিল, এবারে আসবেন সেনাবাহিনী থেকে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল।
ক্যাডেট কলেজগুলোতে প্রিন্সিপালরা দুই ধরনেরই হয়ে থাকেন। তবে ধারণা করা হয়, যে-কলেজে সামরিক প্রিন্সিপাল থাকেন, সে-কলেজের ডিসিপ্লিন ভালো থাকে এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে ক্যাডেটদের রেজাল্টও ভালো হয়। সা¤প্রতিক সময়ে কলেজের ডিসিপ্লিনের খুব অবনতি হয়েছিল, জাতীয় পরীক্ষার রেজাল্টও দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। বেশিরভাগ শিক্ষক কাসিম হাউসের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মিলিটারি প্রিন্সিপালের আগমনকে স্বাগত জানালেন। জামিলদের ক্লাসে প্রায় সব শিক্ষকই এই সামরিক প্রিন্সিপালের আগমনের বিষয়টিকে সমর্থন জানিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এনসিওরা তো মহা খুশি। হাবিলদার রুস্তমের মতে, ক্যাডেট কলেজ কখনোই বেসামরিক লোক দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। এমনকি ক্যাডেটদের মধ্যেও প্রায় সবাই এই পালাবদলকে একরকম স্বাগতম জানাচ্ছে। কাসিম হাউসের ঘটনাকে, খুব এডভেঞ্চারাস মনে হলেও, সাধারণ ক্যাডেটরা নিন্দার চোখেই দেখছে।
নয় নম্বর রুমে সামরিক প্রিন্সিপালের আগমনকে ঘিরে সিনিয়ররা এখন দুই ভাগে বিভক্ত, যদিও স্বাগত জানানোর পই দলে ভারী। রহমান ভাই মনে করেন, এর ফলে নিয়মের কড়াকড়ি এত বেড়ে যাবে যে, আমাদের সবাইকে এখন তার আওতায় চলে আসতে হবে। এতদিন কলেজের সব কড়া নিয়ম কেবল ক্লাস-সেভেনের জন্য প্রযোজ্য ছিল, এখন সবাইকে সব নিয়ম মানতে হবে, সিনিয়র বলে কারও বিশেষ সুবিধা থাকবে না। দেলোয়ার ভাই মনে করেন এইসব কড়াকড়ির মধ্যে এমন কিছু নিয়ম প্রবর্তিত হবে যাতে মানুষ হিসেবে ক্যাডেটদের আর কোনও অধিকারই অবশিষ্ট রইবে না। তবে সাকলায়েন ভাই, জাকির ভাই, হাবিব ভাই এই পরিবর্তনকে কলেজের জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন। তারা মনে করেন কলেজ ডিসিপ্লিনের অবস্থা এতটা নেমে গিয়েছিল যে বাইরের সাধারণ স্কুল-কলেজের সঙ্গে ক্যাডেট কলেজের পার্থক্য ছিলনা বললেই চলে।
মৃদুলের সঙ্গে এইসব বিষয় নিয়ে আলাপ হয় জামিলের। তার কাছ থেকে জানা যায় খালিদ হাউসের ক্যাডেটরাও, বিশেষত মৃদুলের রুমমেটরা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছে। তবে জামিল যখন রহমান ভাই এবং দেলোয়ার ভাইয়ের ব্যাখ্যা জানালো, তখন মৃদুলও একটু সন্দিগ্ধ হয়ে উঠে। তার মতে, পুরনো স্টাইলে যা চলছিল, ঠিকই তো ছিল। নতুন প্রিন্সিপাল আসলে সার্বিক পরিস্থিতি ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে লেঃ কর্নেল কায়সার হাবিব প্রিন্সিপাল হিসেবে কলেজে আসলেন। প্রথমে এডজুটেন্টের বিষয়ে কিছু না গেলেও দেখা গেল প্রিন্সিপাল স্যার নতুন এডজুটেন্টও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, মেজর ইউসুফ আহমেদ। পুরনো এডজুটেন্ট মেজর হাফিজ প্রিন্সিপালের মতোই বিদায় নিয়েছেন।
আগামী পর্বে সমাপ্য
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



