somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাসঙ্গিকতা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ (প্রথম অংশ)

১৪ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[চলচ্চিত্রকার ও লেখক তারেক মাসুদ-এর এই নিবন্ধটি ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন সম্পাদিত যোগাযোগ পত্রিকার সংখ্যা ৮ (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)-এ প্রকাশিত হয়।]

চলচ্চিত্রের একাডেমিক অঙ্গনে সিনেমা শব্দের পরিবর্তে 'মুভিং ইমেজ' শব্দটি প্রবর্তনের জোরালো তাত্ত্বিক আওয়াজ তোলা হচ্ছে আজকাল। চলচ্চিত্রের বৃহত্তর সংজ্ঞা কি খুবই দরকার হয়ে পড়েছে? লক্ষ করার বিষয়, মুভিং ইমেজ শব্দটি বাংলা ‘চলচ্চিত্র’ শব্দের আরিক অর্থের অনেক কাছাকাছি।

চলচ্চিত্র কোন দ্রব্য বা পদার্থের নাম নয়, এটি একটি শিল্প-মাধ্যম। দৃশ্যকে সেলুলয়েডে ধারণ করলেই তা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না -- যেমন টেলিভিশনে কোনো ধ্র“পদী ছবি স¤প্রচার করলেই তা টেলিফিল্ম বা নাটক হয়ে যায় না। কারিগরি অর্থে সিনেমার সংজ্ঞা বার বার বদলেছে। মাধ্যমটির আকার-প্রকারের সামান্য পরিবর্তন-পরিবর্ধনে ‘গেল গেল’ রব উঠেছে। কিন্তু বোদ্ধাজনের আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে -- সিনেমার মৃত্যু ঘটেনি।

সিনেমা প্রযুক্তির ফসল। নিত্যনতুন উদ্ভাবনের সাথে সাথে এর বিবৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি দু’ই হয়েছে। এটা সত্য, নির্বাক যুগের বাক্সময় ছবিতে আমরা ‘শিশিরের শব্দ’ শুনতে পেতাম, আর আজকের ছবি সারাণ বকবক করে। তাই বলে এতকাল পরে মাধ্যমটির কণ্ঠরোধ করা বোধ হয় ঠিক হবে না। বহুকাল সাদা-কালোর আলোছায়া ছিল চলচ্চিত্রের মূল বিশেষত্ব। তাতে রঙ লাগলে ‘সর্বনাশ’ হয়ে যাবে বলে তখনকার ডাকসাইটে নির্মাতারাও আশঙ্কা করেছিলেন। অশনি সংকেত (১৯৭৩) দেখে আমরা এখন অবশ্য মেনে নিয়েছি -- দুর্ভিক্ষেরও রং আছে। ৩৫ মি.মি.-এর সাথে ১৬ মি.মি.-এর পার্থক্য মূলত মাত্র ১৯ মি.মি. -- একথা মানতে অনেক চলচ্চিত্র পণ্ডিতই প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো ষাট-সত্তর, এমনকি আশির দশকের প্রথম সারির অনেক নির্মাতাই তাদের মাস্টারপিস তৈরি করেছেন ১৬ মি.মি. ফরম্যাটে। বাংলাদেশেও তার উদাহরণ রয়েছে -- তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯) ও মোরশেদুল ইসলামের চাকা (১৯৯৩)।

কেউ কেউ ধর্মাচারের সাথে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মিল খুঁজে পান। ধর্মের দুটো দিক আছে -- এক. অনুশাসন, দুই. সংস্কৃতি। তেমনি চলচ্চিত্র মাধ্যমেরও রয়েছে আকার-আকৃতি ও প্রকার-প্রকৃতির দিক। অর্থাৎ কারিগরি ও সংস্কৃতির দিক। সিনেমার সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি ‘তুলনামূলকভাবে একটি বড় আকারের অন্ধকার ঘরে অনেকে একত্রে অথচ নিঃশব্দ একাকীত্বের সাথে বড় পর্দার কাছে আত্মসমর্পণ করা’। রিমোট আর মোবাইল টেপার ফাঁকে, লোডশেডিং আর বিজ্ঞাপন বিরতির আগে-পরে, ফোন আর বাচ্চা সামলানোসহ যাবতীয় গার্হস্থ্য কাণ্ডকারখানার মাঝে মাঝে ক্যাবল ও ডিভিডির কল্যাণে আমরা টিভির মিনি পর্দায় যা দেখি তা দেখা নয় -- তাকানো; চলচ্চিত্র নয় -- চলমান চিত্র মাত্র।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডিজিটাল চলচ্চিত্র এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। ভবিষ্যতের ব্যাপারও নয়। এটি ইতোমধ্যে একটি বাস্তবতা। বিখ্যাত-অখ্যাত, প্রবীন-নবীন, বড় বাজেট - ছোট বাজেট, উন্নত দেশ - অনুন্নত দেশ, কাহিনীচিত্র-প্রামাণ্যচিত্র নির্বিশেষে নির্মিত হচ্ছে ডিজিটাল ফিল্ম। বিচিত্র কারণে নির্মাতারা ঝুঁকছেন এই ফরম্যাটটির দিকে। অভিন্ন কয়েকটি কারণ অবশ্য ধারণা করা যায়, যা ফরম্যাটটিকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নির্মাতার স্বাধীনতা, কারিগরি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সাশ্রয় ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ তাদের অন্যতম। তবে সৃজনশীলতার সুবিধার দিকটিই হয়তো প্রধান কারণ, যা ভিম ভেন্ডারস, কিয়েরোস্তামি, ‘ডগমা’ ধারার নির্মাতা থেকে শুরু করে মাইকেল মুর, হলিউড ব্লকবাস্টার ওপেন ওয়াটার-এর (২০০৩) পরিচালক -- সবাইকে একত্র করেছে।

২০০০ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিজিটাল চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনেক বিখ্যাত নির্মাতার সাথে আব্বাস কিয়েরোস্তামি ও সামিরা মাখমালবাফ অংশগ্রহণ করেন। ঐ সেমিনারের জন্য সামিরার লেখা নিবন্ধের কিছু অংশের অনুবাদ এখানে তুলে ধরছি --

ঐতিহাসিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও কারিগরি -- এই তিনটি নিয়ামক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। . . . চাকাকে যদি বলা যায় মানুষের পায়ের গতি সঞ্চালন, তাহলে নির্মাতার জন্য ক্যামেরা তার চোখের স¤প্রসারণ। গত শতাব্দীতে ব্যবহৃত ক্যামেরার অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি, জটিলতার কারণে এটি চালাতে যে পরিমাণ যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন জনবল দরকার হতো, তাতে করে চলচ্চিত্র-নির্মাতার আবেগ ও চিন্তার জন্য এই চোখ আসলে একটা বোঝা ছিল। কিন্তু আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা ক্যামেরাকে কল্পনা করতে পারি একজোড়া সরু কাঁচের চশমা কিংবা একজোড়া লেন্সের সঙ্গে, যা চোখের কর্নিয়ায় সংযোজিত হবে অথচ বোঝাই যাবে না . . .

ডিজিটাল বিপ্লবকে আমি কারিগরি জ্ঞানের সর্বশেষ অর্জন হিসেবে দেখি। তবে এই বিপ্লব সিনেমার বিরুদ্ধে নয়। বরং সিনেমা-ইন্ডাস্ট্রির কিছু পেশাদারী কাঠামো ও চরিত্রের বিরুদ্ধে। ডিজিটাল সিনেমার কারণে আমরা চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু -- চিত্রনাট্য, দৃশ্যায়ন, সৃজনশীল সম্পাদনা, অভিনয়সহ কোনো কিছুই হারাবো না। ডিজিটাল ছবি যা বদলে দেবে, তা হলো চিত্রগ্রহণের ধরন, আলোর আয়োজন, পোস্ট-প্রোডাকশন ল্যাবের কাজ ইত্যাদি। চলচ্চিত্র উৎপাদন যন্ত্রের এই কারিগরি বিপ্লরের ফলে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে হয়তো চলচ্চিত্রের মৃত্যু হবে, তবে এই বিপ্লবই চলচ্চিত্রকে সৃজনশীল শিল্প হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল ফরম্যাটের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে। প্রথমত, আমাদের দেশে ৩৫ ও ১৬ মি.মি.-এ চিত্র নির্মাণের কারিগরি অবকাঠামোর প্রধান সীমাবদ্ধতা কী কী তা আলোচনা দরকার:

বিভিন্ন স্পিডের ফিল্ম স্টক বেছে নেয়ার সুযোগ থাকাতো দূরের কথা, অনেক সময় তারিখ পার হয়ে যাওয়া স্টক ব্যবহার করতে বাধ্য হন স্থানীয় নির্মাতারা। দরকারি লেন্স, ভিডিও এসিস্টসহ একটি ভালো ক্যামেরাও নেই এদেশে। শব্দ ট্রান্সফারসহ ল্যাবের যাবতীয় কাজ এতই নিম্নমানের যে ‘চলচ্চিত্র অবনয়ন সংস্থায়’ বাকি ও ফাঁকিতে নির্মিত বস্তাপচা কিছু ফপ ‘বাণিজ্যিক’ ছবি ছাড়া সব ছবিরই সম্পাদনাসহ পোস্ট-প্রোডাকশন হয় ভারতে। ব্যবসাসফল মনের মাঝে তুমি () ছবির কেবল পোস্ট প্রোডাকশন নয়, প্রোডাকশনও ভারতেই হয়েছে। আর এজন্য নির্মাতাদের মাসের পর মাস মাদ্রাজ, বোম্বে, কলকাতায় কাটাতে হয়।
বিদেশে রাশ প্রিন্টের অন্য নাম ‘ডেইলিস’ (Dailies)। কেননা দিনের শুটিংয়ের ফল দিন শেষেই দেখে কোনো ত্র“টি থাকলে তা পরের দিন শুধরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু আমরা রাশ প্রিন্টকে ‘মান্থলি’ (monthly) নামেও ডাকতে পারি না, কারণ আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার গিট খুলে দেশের বাইরে ফুটেজ নিতে নিতে তিন মাস পেরিয়ে যায়। ততোদিনে বসে থেকে থেকে এক্সপোজড ফুটেজ তার রং, রূপ, রস সব হারাতে বসে। এরকম ব্যাপক কারিগরি বিপত্তির মুখে অসহায় নির্মাতার সৃজনশীলতা হার মানে। তার স্বপ্নের চলচ্চিত্রটি প্রায় পুরোপুরি থেকে যায় তার মনের কোণে, অনেকটা থেকে যায় তার চিত্রনাট্যে, কিছুটা রয়ে যায় চিত্রায়নের সময় আর সম্পাদনার টেবিলে। যা অবশিষ্ট থাকে তা মেরামত করাই হয়ে দাঁড়ায় সম্পাদকের কাজ। এই কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারাগারে থেকে কেবল ছবির শৈল্পিক দিকটাই বিসর্জিত হয় না, রাজনৈতিক বিসর্জনও হয় বিস্তর। নানাবিধ সরকারি অনুমতি, অনুমোদন, অনাপত্তির ঘেরাটোপে সেলফ সেন্সরশীপ এসে পড়ে নির্মাতার অজান্তে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে ডিজিটাল ফিল্ম।

আগামী পর্বে সমাপ্য

ছবির ক্যাপশন: বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল কাহিনীচিত্র, তারেক মাসুদ পরিচালিত 'অন্তর্যাত্রা' (২০০৬) ছবির একটি দৃশ্যে সারা যাকের।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১২:০৯
৯টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×