somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজ্ঞাপন ও নারী

০৮ ই মে, ২০০৮ রাত ৯:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিজ্ঞাপনে পুরুষের তুলনায় নারীকে দুর্বল, অধস্তন হিসেবে তুলে ধরে, বিজ্ঞাপনগুলোয় নারীর চিত্রায়ণ তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে এবং বিজ্ঞাপনে বিতরিত বার্তা নারীর জন্য অবমাননাকর। সার্বিকভাবে গণমাধ্যমগুলো সমাজে বিদ্যমান নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ না-করে, বিদ্যমান অবস্থা জিইয়ে রাখার জন্যই কাজ করে থাকে; কিন্তু বিজ্ঞাপন সমাজে বিদ্যমান নারীর মর্যাদাকে আরও হীনভাবে উপস্থাপন করে। যে-অপরূপা মডেল টয়লেট-কিনার হাতে নিয়ে কমোডে ফ্লাশ-ব্রাশ করেন, ঘোরতর সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ আছে যে তিনি বাস্তবে আদৌ টয়লেট-ক্লিনার হাতে নেন কিনা।

বিজ্ঞাপনের কাজ হচ্ছে কোনো সমস্যার ইতিবাচক এবং যুক্তিসঙ্গত সমাধান না-দিয়ে পণ্যভিত্তিক সমাধানের কথা বলা। কর্মজীবী নারীর কাজগুলো শেষ করার দায়িত্ব যেমন কোনো গুঁড়োমশলা নিয়ে নেয়। অন্যদিকে প্রায়ই পণ্যের সমার্থক করে বিজ্ঞাপনে নারীকে উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞাপনের পণ্যের মতো নারীও এখানে পণ্য। জিঙ্গেলের বাণীতে যেমন বোঝা মুশকিল পুরুষটি কাকে ছাড়া বাঁচতে পারছে না, সেকি 'কোলা'টি নাকি নারীটি? আর 'ডাবল কোলা'র বিজ্ঞাপনে হাজির করা হয় এক পুরুষের জন্য 'ডাবল' নারী।

এছাড়া বিজ্ঞাপনে নারীর উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী হলেও তার ভূমিকা কিন্তু প্রধান নয়। বিজ্ঞাপনের নেপথ্য কণ্ঠে পণ্য কেনার নির্দেশনা দেয়া থেকে শুরু করে পণ্যসম্পর্কিত মূল তথ্যটি পুরুষটিই দিয়ে থাকে। বিজ্ঞাপনে নারীকে যথেষ্ট স্মার্ট-আধুনিকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং ধারণা জন্মাতে পারে যে, বিজ্ঞাপন নারীদের উদার দৃষ্টিতে দেখে; প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞাপনের নারী যথেষ্টই রণশীল, পুরুষতান্ত্রিকতার নিগড়ে বন্দি (শ্বশুরকে পরিবেশিত চায়ের স্বাদের ফলাফল নিয়ে বৌমার উদ্বেগের কথা স্মর্তব্য) এবং সিদ্ধান্ত নিতে পুরুষের ওপরে নির্ভরশীল। বিক্রয়মুখী বিজ্ঞাপন পশ্চাৎপদ ধারণা ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের প্রসার ঘটাতেও পিছপা হয়না এবং এধরনের পণ্যের টার্গেট প্রায়ই নারীকে করা হয়। ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমকে সব সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করে নারীকে বর্ণবাদের শিকার করা হয় এবং তার ত্বকের জন্য ক্ষতিকর একটি পণ্য ব্যবহার করতে তাকে প্রলুব্ধ করা হয়। তবে নারীকে সৌন্দর্য ও যৌনবস্তু হিসেবে উপস্থাপন করাই হলো নারীকে ঘিরে বিজ্ঞাপনের অন্যতম লক্ষ্য।

এই রূপায়ণের কারণ
বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য হলো পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনার মাধ্যমে পণ্যটি সম্পর্কে অডিয়েন্সকে আকৃষ্ট করা। বিজ্ঞাপন-শাস্ত্রে বলা আছে সফল বিজ্ঞাপন নির্মাণ করতে হলে মানুষের মৌল প্রবৃত্তি ও বাসনাকে নাড়া দিতে হবে। অর্থলাভ ও স্বচ্ছলতা অর্জন মানুষের অন্যতম বাসনা এবং যৌনতা মানুষের অন্যতম প্রবৃত্তি। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব বাসনা ও প্রবৃত্তিকে নাড়া দেবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। একারণে নারীমুখও নারীশরীরকে ব্যবহার করা হয়, পুরুষ-অডিয়েন্সকে আকৃষ্ট করার জন্য। (লক্ষ্ রাখতে হবে বিজ্ঞাপনে নারীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও এবং নারীকে পণ্যের ভোক্তা হিসেবে টার্গেট করা হলেও, সমাজে অর্থকড়ির মালিক পুরুষ।) ফলে বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থান হয় সমাজে বিদ্যমান ধ্যান-ধারণার চাইতে আরও বেশি অধস্তন, সে হয়ে দাঁড়ায় যৌনতার প্রতীকে। আর গণমাধ্যমগুলো এসব অনুমোদন করে ও প্রশ্রয় দেয় কারণ এই বিজ্ঞাপনের ওপরেই তাদের মুনাফা নির্ভর করে থাকে।

সুপারিশ
সরকার পর্যায় থেকে বিজ্ঞাপনবিষয়ক জেন্ডার-সংবেদনশীল নীতিমালা ও আচরণবিধি আবশ্যিকভাবে প্রণয়ন করা যেতে পারে, যাকে অনুসরণ করে বিজ্ঞাপনগুলোতে অপরূপায়ণগুলো কমিয়ে আনা যেতে পারে।
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মতো সরকারী সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন-সংস্থায় কর্মরত কর্মী ও কর্মকর্তা পর্যায়ে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার মতো বিভাগগুলোতে কেবল বিজ্ঞাপন তৈরির কলাকৌশল না-শিখিয়ে জেন্ডার-সংবেদনশীলতার তত্ত্বীয় বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া যেতে পারে।
মুদ্রণ ও সম্প্রচার মাধ্যমগুলো অভ্যন্তরীণভাবে নিজ নিজ হাউসে বিজ্ঞাপন প্রকাশ/প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সব মহলের অংশগ্রহণে বিজ্ঞাপনে জেন্ডার-সংবেদনশীলতার দাবিকে জোরদার করতে হবে এবং নিয়মিত মনিটর করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিজ্ঞাপনের নেপথ্য-কণ্ঠ ও অন্যান্য সিদ্ধান্তমূলক অংশে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সমভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।


সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০০৮ রাত ৯:১৯
২৫টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×