somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের ধ্বংসযজ্ঞের ওপরে ব্যাংক রিপোর্ট: বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ, পর্ব ৪৪

২৬ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দি টাইমস, ১৪ জুলাই, ১৯৭১।

[নিচের লেখাটি হলো পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সদস্য হেনড্রিক ভন ডার হেইডেন-এর পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের ওপরে গত মাসে তৈরী করা রিপোর্টের সারসংক্ষেপ। দি নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্টটি সংগ্রহ করে ছেপেছে।]

পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের এই সফর করা হয়েছিল ৩ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে। সেই অঞ্চলের তিনটি মূল শহর যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়ায় আমি সফর করেছিলাম। এছাড়া আমি মংলা শহরের চালনা নোঙর-এলাকায় ভ্রমণ করি। যশোরের দিকে পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশ থেকে পরিস্কার বুঝলাম এই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর আক্রমণ খুবই ভয়াবহ হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামগুলো দেখা যাচ্ছিল। একটি ভবনে তখনও আগুন জ্বলছিল। রানওয়ের পূর্বাংশে অনেক বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

৫ এপ্রিল যখন সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে তখন পথে খুব অল্প পরিমাণেই প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়েছে (২৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত যশোর ‘দু®কৃতিকারী’-দের দখলে ছিল। যশোরে ২০,০০০ লোক নিহত হয়েছিল। শহরের কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে; ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যশোর এখন পুরুষদের শহর, বেশিরভাগ মহিলা ও শিশুদের গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যশোর শহরের ঘরবাড়ি এমনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে যে ২৫ লক্ষ জনগোষ্ঠীর ৪৫০,০০০ জন লোক এই ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫ লাখ মানুষ ভারতে পালিয়ে গেছে।

যশোর এলাকা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। সরকারী কর্মকর্তারা গ্রামগুলোতে সহজে প্রবেশ করতে পারছেন না, কারণ ‘দু®কৃতিকারী’-দের হাতে তাদের গুলিবিদ্ধ হবার সম্ভাবনা আছে। আমি পৌঁছার কয়েক সপ্তাহ আগে এধরনের ঘটনা ঘটেছে। আর এধরনের ঘটনা মোকাবেলা করার জন্য সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। সেনাবাহিনী নিরীহ জনগণকে সন্ত্রস্ত করে এবং হিন্দু ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালাচ্ছে।

খুলনা শহরের কেন্দ্রীয় অংশ ও আশপাশের এলাকাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস হবার কারণে ও জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তার কারণে শহরবাসীর একটা বিরাট অংশ ভারতে চলে গেছে; সত্যি হলো, বৃহত্তর খুলনার জনসমষ্টি ৪০০,০০০ থেকে কমে এখন ১৫০,০০০-এ দাঁড়িয়েছে। এশহরও যশোরের মতো পুরুষদের শহর। রাত হয়ে গেলে লোকজন বাইরে বের হয় না।

চালনায় মোট পাঁচটি জাহাজ নোঙর করা ছিল। কোনো কোনোটি দুই সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করছে পণ্য নেবার জন্য। জলযানের আনোগোনা স্বাভাবিকের চাইতে কমে মাত্র ৫-১০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। চালনায় একটি স্থায়ী বন্দর নির্মাণের প্রকল্প স্থগিত হয়ে আছে; কর্মচারীরা পালিয়েছে, যুগোস্লাভ কনসাল্টেন্টরাও চলে গেছে। চালনা নোঙর-এলাকার শ্রমিকদের আবাসস্থল মংলা শহর প্রায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে নৌবাহিনীর বোমানিক্ষেপের মাধ্যমে। এরফলে এখানকার জনসমষ্টি ২২,০০০ থেকে ১,০০০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে ধ্বংসের মাত্রা খুবই মারাত্মক; বাড়িঘর, বাজার, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, বিদ্যুৎ-লাইন, ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বন্দর-কর্মকর্তাদের অনেকে পালিয়ে গেছেন, একটি জাহাজটানার পোত হারিয়ে গেছে এবং চারজন পাইলটের দু-জন নিখোঁজ রয়েছেন।

খুলনার ফুলতলা থানায় গিয়ে সবচেয়ে অবাক হলাম। এই থানার পঞ্চাশ ভাগ লোক (৪২,০০০-এর মধ্যে ২০,০০০) নিজ ঘরবাড়িসম্পদ ফেলে পালিয়ে গেছে, যাদের বেশিরভাগই হিন্দু। এখানে পুরো জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে; পশুসম্পদ-কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, পুরো প্রশাসনই হট্টগোলের মধ্যে নিমজ্জিত। লোকজন হতভম্ব হয়ে পড়েছে। নিকট ভবিষ্যতে কোনো সরকার এই লোকদের নিয়ে কাজ করতে পারবে কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সেদিন ছিল এপ্রিলের ১৫ তারিখ (ঢাকায় সেনাবাহিনীর আক্রমণের ২০ দিন পরের সময়), সেনাবাহিনী ঝিনাইদহ থেকে উত্তরে কুষ্টিয়ায় অনুপ্রবেশ করেছে। পথে নিশ্চয়ই শক্ত প্রতিরোধের মুখোমুখি তারা হয়েছে। প্রতিরোধকারীরা পশ্চাদপদসারণ করলে সেনাবাহিনী নিষ্ঠুর আক্রমণ শুরু করে। তারা কুষ্টিয়ায় ১২ দিন ব্যাপী অভিযান চালায় এবং সবকিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস করে তারা ক্ষান্ত হয়। জনসংখ্যার পরিমাণ ৪০,০০০ থেকে ৫,০০০-এ এসে দাঁড়ায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যাংক এবং অন্যান্য ভবনের শতকরা নব্বই ভাগ সম্পূর্ণ ধুলিস্যাৎ হয়। শহরটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বিমান হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো জার্মান শহর বলে মনে হচ্ছিল। এখানে ওখানে হতবিহ্বল লোকজন বসে আছে । আমি তাদের একটি দোকান দেখাতে বললাম যেখানে খাবার কেনা যাবে: পরের ৯০ মিনিটেও আমি তা খুঁজে পাই নি। একজন আমাকে বলেছিল কুষ্টিয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মাই লাই।

কৃষকেরা শহরে আসছে না, কেউ শহর থেকে বাইরেও যাচ্ছে না। হাজার হাজার কৃষক পালিয়ে গেছে। সেখানে সব অর্থেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল এবং সেটা ছিল মর্মান্তিক এক অভিজ্ঞতা।

৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×