somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গেরিলাদের গোপন তৎপরতা: বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ, পর্ব ৪৬

০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লি লেসকেজ
দি গার্ডিয়ান, ২৩ জুলাই, ১৯৭১।

ঢাকা। দু-জন বিদেশী সাংবাদিক গেরিলা নেতার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দশ মিনিট পরে একটি বাড়ির পেছন থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন। তার সঙ্গে কোনো অস্ত্র না-থাকলেও তার পেছন পেছন যে-তরুণ আসল তার হাতে একটি রাইফেল ছিল। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে এই শর্তে কথা বলতে রাজি হলেন যে তার নাম প্রকাশ করা যাবে না এবং যে-গ্রামে তিনি এই মুহূর্তে অবস্থান করছেন তার নামও প্রকাশ করা যাবে না। তিনি নিরাপত্তার ব্যাপারে এতোই পেশাদারী যে, যে-রাস্তা দিয়ে সাংবাদিকরা এসেছেন সেই কর্দমাক্ত রাস্তায় তার নিরাপত্তা-প্রহরী টহল দেয়া শুরু করলো।

পাকিস্তান সরকারের মতে মুক্তি ফৌজের কিছু গেরিলা কেবল ভারতীয় সীমান্তের শিবিরগুলো থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে তারা কেবল ‘আঘাত করো এবং দৌড়াও’ নীতিতে স্বল্প মাত্রায় হামলা করেছে। ৩৭ জন গেরিলার নেতা স্বীকার করলেন যে তাদের প্রায় সব অস্ত্রশস্ত্রই ভারতের কাছ থেকে পাওয়া এবং তিনি তার ইউনিট নিয়ে দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর ওপরে সফল চোরাগোপ্তা হামলা করেই আবার ভারতে অবস্থিত একটি পয়েন্টে ফিরে যান। সেনাবাহিনীর পাল্টা জবাব এড়ানোর জন্যই তারা ফিরে যান বলে তিনি বললেন। এরপরও ২৯ জুন ভারত থেকে আসার পর তার দল নিয়ে তিনি মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামটিতেই আছেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে আরও ভালভাবে থাকতে চান। তার দলের লোকেরা, দিনের বেলায়, ঘাঁটি থেকে পাঁচ মাইল দূরের সদর রাস্তা এড়িয়ে চলে। এছাড়া তারা স্বাধীনভাবেই চলাফেরা করে। রাতটা তাদের দখলেই থাকে। আর দিনের বেলায়ও তারা সেনাবাহিনীর আক্রমণের ভয় করে না। কারণ তারা পানিতে ডোবা ধান ও পাটক্ষেতে ঘেরা এমন এক নিচু এলাকায় থাকে যে সেরকম আক্রমণ হবার সম্ভাবনা নেই।

তারা কোনো ভাতা পায় না কিন্তু সীমান্তের ওপার থেকে কিছু টাকা আসে যা তারা খাবার কেনার জন্য ব্যয় করে। কখনো কখনো খাবারের জন্য অর্থব্যয় করতে হয় না। একজন গেরিলা জানালো, "আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে খাবার সংগ্রহ করি।" সে জানালো স্থানীয় কৃষকরা তাদের নিজেদের লোকেদের সাহায্য করতে কোনো প্রকার কুণ্ঠাবোধ করে না এবং তারা যে তাদের গ্রামে অবস্থান করছে এজন্য তারা খুশি। আশপাশের গ্রামের লোকজন পরে জানিয়েছে দুষ্প্রাপ্য খাবার দিয়ে দিতে তারা প্রস্তুত নয়, কিন্তু সেনাদের দেবার চাইতে তারা গেরিলাদের দিতেই সেক্ষেত্রে পছন্দ করে। প্লাটুন-নেতারা সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের নামজাদা অফিসার। ডেপুটি নেতা গত বছর সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেবার পূর্বে ২১ বছর সেখানে নন-কমিশনড্ অফিসার হিসেবে চাকরি করেছে। তিনি জানালেন সাতটি প্লাটুনের সদস্যরা সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য ছিল এবং ৩০টি প্লাটুনের সদস্য হলো ছাত্ররা, যাদের ২৫ মার্চের আক্রমণের পর নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এই প্লাটুনটি পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে অবস্থিত আরেকটি সমশক্তির প্লাটুনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। তারা উচ্চতর সামরিক কর্তৃপক্ষের কোনো আদেশ পেয়ে থাকে না তবে দূতের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অবস্থিত গেরিলা ক্যাম্পে অভিযানসমূহের লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়। গেরিলা নেতা জানালেন, তাদের সংগ্রহে যথেষ্ট পরিমাণে লি এনফিল্ড রাইফেল, স্টেনগান, হালকা মেশিনগান, ডিনামাইট, মাইন আছে। তিনি আরও জানালেন তাদের ওষুধপত্রেরও কোনো ঘাটতি নেই। এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বাস করেন ভারতে বহু সংখ্যায় গেরিলা এখন নিযুক্ত হচ্ছে এবং এদের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আসবে। তিনি জানালেন যে ২০০,০০০ গেরিলা খুব দ্রুতই সীমান্ত অতিক্রম করবে এবং সেনাবাহিনীর ওপরে আক্রমণ চালাবে। অবশ্য এই সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে বলা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি আগন্তুকদের ব্যাপারে খুব সন্দেহপ্রবণ এবং মনে করেন যদি এই গ্রামে ঢুকে কেউ তাদের সঙ্গে যোগদান করতে চায় তবে তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চর হিসেবে গুলি করে মারা হবে। তিনি আরও বলেন কোনো সেনাসদস্যকে বন্দি হিসেবে ধরে আনা হলে হত্যা করা হবে কিন্তু এখন পর্যন্তকাউকেই জীবন্ত অবস্থায় ধরা পড়ে নি।

তার ইউনিট সবচেয়ে বড়ো যে-অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল তা হলো, গত এপ্রিলে একটি চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে ২০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে তারা হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিল। একবার গোলাগুলিতে পশ্চাদপদসারণ করতে বাধ্য হয়ে তিনি ভারতে চলে যান এবং সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে আশ্রয় দেয়। এরপরই ঐ অভিযান তিনি পরিচালনা করেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি ভারতীয় সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্টিলারি ও মর্টার গেরিলাদের আক্রমণের সমর্থনে সীমান্ত এলাকায় বিস্ফোরিত হচ্ছে -- পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই অভিযোগ তিনি স্বীকার করলেন। পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসার পর অরক্ষিত গ্রাম-এলাকায় তাদের চলাফেরার সীমাবদ্ধতার বিবেচনায় প্লাটুনটি অপেক্ষাকৃত নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তারা একটি আর্মি-ট্রাকের ওপরে হামলা করেছিলেন এবং তাদের ধারণা একজন পাকিস্তানী সৈন্য আহত হয়েছে। খুব সম্প্রতি তারা একটি পুলিশ স্টেশনে হামলা করেছেন। স্টেশনের সেন্ট্রি পালিয়ে গেছে এবং কোনো সংঘর্ষ ও রক্তপাত ছাড়াই তারা ১৩টি বন্দুক কব্জা করেছেন।

ডেপুটি প্লাটুন নেতা আরও জানালেন যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে তার ইউনিটের কেউ হতাহত হয় নি এবং তার আদেশ কেউ উপক্ষো করে নি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যাপারে তিনি স্বল্পভাষী, কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবেই বললেন যে তার লোকেরা ডিনামাইট ও মাইন ব্যবহার করে রাস্তাঘাটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে এবং এভাবে সেনাবাহিনীর চলাচল সীমিত করে রাখবে। সেনাবাহিনী ও পুলিশকে হেনস্থা করার পাশাপাশি তারা শান্তি কমিটির লোকজনকে হত্যা করতে চায়। শান্তি কমিটি হলো স্থানীয় গ্রামবাসী যারা সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করে থাকে। শান্তি কমিটির লোকজনকে হত্যা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সাধারণ খবরে পরিণত হয়েছে। ডেপুটি প্লাটুন নেতার লোকজন একজনকে ধরেছে এবং হত্যা করেছে। এই লোকটি দু-জন নাগরিককে হত্যার আদেশ দিয়েছিল এবং গেরিলা-নেতার হাতে পড়ে তার জন্য উচিত শিক্ষা বরাদ্দ হয়। তাকে তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য এক ঘণ্টা সময় দেয়া হয় এবং এই সময় অতিবাহিত হলে তাকে একটি 'গণআদালত'-এর সামনে নিয়ে আসা হয়। গেরিলারা চটজলদি বেশ কিছু গ্রামবাসীকে সে-আদালতে ডেকে এনে হাজির করে।

আদালতের রায়ে নিশ্চিতভাবে সে অপরাধী প্রমাণিত হয় এবং তাকে প্রধান সড়ক থেকে মাইলখানেক দূরে নিয়ে গিয়ে গেরিলারা গুলি করে হত্যা করে এবং তার মৃতদেহ সড়কের পাশে ফেলে রাখে। গেরিলারা নিজেদের মধ্যে জীবন ও মৃত্যুর শক্তি সঞ্চার করেছে। গেরিলা নেতা ২৫ মার্চ থেকে ধীরে সুস্থে, অপেক্ষাকৃত বেদনাবিহীন, আন্ডারগ্রাউন্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এখানকার বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক গেরিলা নেতার মতো মনে করেন না যে গৃহযুদ্ধ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে। আর তার প্লাটুন এই লক্ষ্য অর্জনের পূর্বে আরও অনেক বেশি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে।

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:১০
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×