মুরে সেইল
দি সানডে টাইমস্, ১ আগস্ট, ১৯৭১।
[মুরে সেইল এখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আবার একটি নতুন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবার এবং ভিয়েতনাম-স্টাইলের ধ্বংযজ্ঞের দিকে পরিচালিত করার ভ্রান্ত প্রচারণার ব্যাপারে তদন্ত করছেন।]
পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭০৭ বিমান ঢাকা এয়ারপোর্ট ছেড়ে করাচির উদ্দেশে ভারত ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার জন্য টেক-অফ করার কয়েক মিনিট আগে, প্রতিটি এয়ারক্রাফটের পেছনের দরোজাগুলো এম্বুলেন্স দ্বারা ঘিরে রাখা হয় এবং দ্রুততার সঙ্গে ও গোপনে বিমানের ভেতরে স্ট্রেচার চালান করা হয়। স্ট্রেচারের রোগীরা হলো সেনাসদস্য, পশ্চিম পাকিস্তানের নিজ বাড়িতে তারা ফিরে যাচ্ছে। কারণ ঢাকার মিলিটারি হাসপাতাল রোগীতে পূর্ণ। এই দুঃখজনক পরিবহণের কথা ঢাকার লোকজনের কাছ থেকে মোটামুটি লুকিয়ে রাখা হয়েছে; কোনো বাঙালি এখানে, বিমানবন্দরের আশেপাশে অনুপ্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত নয়। কিন্তু প্লেনটি যখন উড়তে থাকে তখন বেসামরিক লোকজন আহত সৈন্যদের দেখতে পান এবং তাদের ঘিরে থাকা ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
এসপ্তাহে আমি যে-ফ্লাইট ধরে আসলাম সেখানে ছয়জন আহত সৈন্য ছিল। এদের মধ্যে দু-জনের পা বোমায় উড়ে গেছে। চারজনের শরীরের ওপরের অংশে চোরাগোপ্তা হামলা থেকে আঘাত লেগেছে। জানা গেল পিআইএ-র বিমানগুলোর এক চতুর্থাংশই মাঝে মাঝে আহত সৈন্যে ভর্তি থাকে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে ভবিষদ্বাণী করার মতো সময় এটা নয়। বাংলার যুদ্ধ এখন পুরোদমেই চলছে, খুব তাড়াতাড়ি এটা শেষ হবে এমন কোনো নিশানা এখনও দেখা যাচ্ছে না। যা বাকি থাকছে তা হলো, এই যুদ্ধে জড়িত হবার মতো বোকা কে আছে? ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলার ঘটনার মিল আপনি খুঁজে পাবেন। পিআইএ-র বিমানগুলো এখন ইউনিফর্ম পরিহিত বা সাদা পোশাক পরা সৈন্যদের পরিবহণ করছে; পাশাপাশি বেসামরিক লোকদেরও পরিবহণ করছে। আর পিআই-এর স্টুয়ার্ডরা গম্ভীর মুখে পিস্তল বা রিভলবার সংগ্রহ করেন এবং ঢাকা এয়ারপোর্টে সেগুলো ফেরত দেন। এই অস্ত্রগুলোও 'বিশেষ যুদ্ধ'-এর নির্মম কমেডির নিদর্শন; মুক্তোখচিত হাতলওয়ালা রিভলবার, নিকেলড অটোমেটিক রাইফেল দেখে জেমস বন্ড এবং মাফিয়াদের কথা মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে যায় ভিয়েতনামের সিআইএ-'কনট্রাক্টর'-দের কথাও।
কিছু 'বেসামরিক' লোক বিমানবন্দর পাহারা দেয়; তারা সৈন্যদের সঙ্গে হাসি-তামাশা করে। তাদের উপস্থিতি ভিয়েতনাম-কায়দা-বহির্ভুত। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো পেটানো তাদের শরীর, কানে সোনার দুল। তাদের পাকানো গোঁফ, তাদের পায়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে তৈরী পাতলা সোলের চপ্পল। তারা তাদের অস্ত্র গ্রহণ করে, গুলিভর্তি কিনা পরখ করে এবং ঢিলেঢালা শার্টের ভেতর লুকিয়ে রাখে। এয়ারটার্মিনালের বাইরে বেসামরিক লোকের একটি ছোট দল তাদের গ্রহণ করে, তাদের ঘাড়ে সাবমেশিনগান। এরপর তারা আগে-ছিনতাই-করা গাড়িতে করে চলে যায়, গাড়িগুলোর নাম্বারপ্লেট কালো কালিতে ঢাকা।
এসবকিছুকে ভিতেনামের নিম্নমানের প্যারোডি মনে হবার ভালো কারণ রয়েছে। এইসব লোকগুলো পাকিস্তানি স্পেশাল ফোর্সের সদস্য। এরা নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ-এ মার্কিন সৈন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। তখন পাকিস্তান ছিল কমিউনিস্ট-বিরোধী 'মুক্ত বিশ্ব'-র মার্কিন মিত্র। পাকিস্তান স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা মার্কিন-কেতার, যেন জনওয়েনের ছবির সেইসব 'দশজনের ৫০টি দল' -- যারা চোরাগোপ্তা হামলা, ধ্বংস, গুপ্তহত্যা, জেরা এবং অন্যান্য মন্দ কাজের কাজী। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান-যুদ্ধের সময় প্যারাসুটে করে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে নেমে যুদ্ধ শুরু করেছিল, কিন্তু কাশ্মির-বিদ্রোহ নিয়ে অনুকূল ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়েছিল।
মাথায় সবুজ বেরেট পরা এইসব গর্বিত সেনারা কয়েক মাস আগেও সাক্ষাৎপ্রার্থীদের পেশওয়ারের কাছে চেরাট-এ তাদের ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যেতো এবং দেখাতো কীভাবে তারা দড়ি বেয়ে ওঠা এবং অন্যান্য অনেক কিছুতে পারদর্শিতা অর্জন করেছে। এখন চেরাট খালি হয়ে গেছে; তাদের সবাই এখন পূর্ব বাংলায় রয়েছে। সত্যি হলো এই যে, মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ভিয়েতনামে সাংঘাতিকভাবে ফ্লপ হয়েছিল এবং তারা কেবল টর্চার করা ও হাতের কাছে পেয়ে হত্যা করার মতো মন্দ কাজই করতে পেরেছিল। পরিশেষে গত বছরে তাদের সবাইকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এখানকার সেনাপ্রধানরা ব্যাপারটার খবর হয়তো এখনও পাননি। পাকিস্তান স্পেশাল ফোর্স পূর্ববঙ্গে থেকে কেবল অত্যাচারের মাত্রা বাড়াতে পারবে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিদের প্রতিরোধের মাত্রাও বাড়িয়ে তুলতে পারবে।
পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি 'নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে', জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এরকম দাবির পরও পাকিস্তান সেনাবাহিনী গেরিলাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি প্রতিদিনই বাড়িয়ে তুলছে। পশ্চিম পাকিস্তানে আরও দুইটি ডিভিশন দ্রুততার সঙ্গে গঠন করা হয়েছে এবং কোয়েটার স্টাফ অফিসার কোর্স দু-বছর থেকে কমিয়ে এক বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে জুনিয়র অফিসারদের কাছ থেকে দ্বিগুণ কর্মদক্ষতা আদায় করে নেবার জন্য। কিন্তু তাদের সমস্যার তুলনায় এই বাড়িয়ে তোলা যৎসামান্য। গেরিলা-যুদ্ধের জন্য আদর্শ সব উপকরণই বাংলায় বর্তমান; ভারতের সঙ্গে প্রায় ১,৫০০ মাইলের সীমান্ত, প্রায় সব স্থানেই রয়েছে নদী, জলাশয়, জঙ্গল অথবা ধানক্ষেত; সীমান্তের ওপাশে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ভারতীয় সৈন্যরা তাদের পাহারা দিচ্ছে; বেসামরিক লোকজন গেরিলাদের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন এবং পেশাদার সেনাদের সঙ্গে এদের সহজেই আলাদা করা যায়। কোনো গিয়াপ, গ্রিভাস বা গুয়েভারা এতো অনুকূল পরিমণ্ডল পাননি।
পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে: পুলিশস্টেশনে, মিলিটারিপোস্টে, সরকারী অফিসে এবং এমনকি যেখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করে সেখানেও। ব্রিজ, ফেরিক্রসিং, রেলওয়েজংশনে সেনারা দাঁড়িয়ে আছে অথবা রাস্তা বন্ধ করে অর্থহীন 'পরিচয়যাচাই' করছে (আমি এক সৈন্যকে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখালাম; সে আমাকে তা পড়ে শোনাতে বলল)। এই পাল্টা-বিদ্রোহ-নেটওয়ার্কে ৮০,০০০ লোককে নিয়োজিত করা হয়েছে, কিন্তু এই গেরো খুবই ফসকা। যদিও জেনারেল টিক্কা খান ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছেন (বলা হচ্ছে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও আক্রমণকারীদের হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষার জন্যই এটা করা হচ্ছে)। কিন্তু এটা পরিস্কার যে পূর্ব বাংলা গেরিলা তৎপরতা কমছে না এবং পূর্ব বাংলা ব্লটিং পেপারের মতো সৈন্যদের শুষে নেবে।
এখন পর্যন্ত গেরিলাদের অর্জনকে যেকোনো ভিয়েত কঙ কমান্ডার একটি দীর্ঘায়িত যুদ্ধের জন্য প্রতিশ্রুতিশীল শুরু বলে আখ্যা দেবেন। পূর্ব পাকিস্তানের চা-শিল্প থমকে গেছে; বেশিরভাগ হিন্দু চা-শ্রমিক পালিয়ে গেছে, ব্রিটিশ ও পশ্চিম পাকিস্তানি টি-এস্টেট-ম্যানেজারও চলে গেছেন; আর গেরিলারা চা প্রক্রিয়াজাতকরণ-যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা শুরু করার পর বাকি টি-এস্টেটও উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। পাওয়ারপ্লান্টে বিস্ফোরিত একটি জেলিগনাইটের কাঠিই ৫,০০০ একর এলাকা জুড়ে বি¯তৃত একটি চা-বাগানকে বন্ধ করে দেবার জন্য যথেষ্ট। এটা খুবই সহজ একটি কাজ।
স্থূল সহিংসতা ও আদিম প্রচারণা
চা-বাগানের পরিস্থিতির মতোই পরিস্থিতি বিরাজ করছে সারা দেশে: নদী থেকে বাজার পর্যন্ত। পুরো পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র নদীর-টাগবোট মেরামত-ইয়ার্ডের নাম ছিল ঢাকার নিকটবর্তী পাক বে কোম্পানি। কিন্তু তিন সপ্তাহ আগে সেখানে গেরিলারা আগুন ধরিয়ে দিলে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থনীতির অন্য চালিকাশক্তি পাট ও তৈলবীজ চা-এর সঙ্গে যোগ দিয়ে উৎপাদনঅক্ষম হয়ে পড়লে পুরো অর্থনীতির গলাই টিপে ধরা হয়েছে। ডজন ডজন সড়ক ও রেলের সেতু উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামত করা হলেও আবার সেগুলোকে উড়িয়ে দেয়া হবে; আর নৌকা, বার্জ, লঞ্চ ইত্যাদি উপায়ে যে-নদীপরিবহণব্যবস্থা ছিল, গেরিলা আক্রমণের ফলে তা আরও অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেনারেল টিক্কা খান এবং তার স্পেশাল ফোর্স এইসব তৎপরতার পেছনে কোনো সংগঠিত শক্তির অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াতে পারেন; কিন্তু এসবের পেছনে রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র কয়েকশ মাওবাদী। এখন তারা ভূস্বামী ও সুদখোরদের হত্যা করার সুযোগ খুঁজছে এবং কল-কারখানা চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে অচল করে দেবার চেষ্টা করছে; আর এই তৎপরতা দিনদিনই বেড়ে চলেছে। একপক্ষের সহিংসতার জবাব দিতেই অন্যপক্ষে সহিংস লোকজনের সৃষ্টি হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মাত্র ২,০০০ প্রকৃত প্রশিক্ষিত সেনাদলকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এরা সবাই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সদস্য যারা এখন ভারতে অবস্থান করছে। এদের সঙ্গে যদি কেউ আর যোগ নাও দেয়, তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ১০০ বনাম ১ -- এই অনুপাত প্রয়োজন। (সাইপ্রাসের কর্নেল গ্রিভাসের কখনই ৪০০ জনের বেশি লোক ছিল না যারা রাইফেল চালাতে পারে। তিনি জিতেছিলেন।) পাল্টা আঘাতের জন্য পাকিস্তানকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে; অন্য অনেকের মতোই তারা শুরুতে সব পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে কম কার্যকর পদ্ধতিতে এগিয়েছে। তারা স্থূল সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু যেক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সবচেয়ে বেশি বিদেশী মন্ত্রণাদাতাদের সাহায্য নিতে হবে, সেটি হলো প্রচারণার ক্ষেত্রে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোয়েবলস, ম্যাককার্থি এবং এমনকি হোরাশিও বোটোমলির আত্মাকে অবশ্যই দুঃখিত হয়ে মাথা নাড়তে হবে; তাদের ক্ষেত্রে অন্তঃত অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি ছিল, এবং তারা যে-খারাপ কাজটি করতে চাইতেন তা তারা করতে সক্ষম বলে মনে করতেন। এর বিপরীতে পাকিস্তানের প্রচারণার উদ্যোগ মোটামাথা এমেচারের কাজ বলে স্পষ্টতই বোঝা যায়।
এই দায়িত্বে ছিলেন আমানুল্লাহ সরদার, পাকিস্তানের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের প্রধানের (সেন্সর বোর্ডে, তার ভাষায়, "আমি এটা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করতাম যে ছবিগুলোতে কোনো চুমুর দৃশ্য বা ভারতীয় প্রচারণা নেই") পদ থেকে যাকে সরিয়ে ঢাকায় ভামমূর্তি-উন্নয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। তার বস্ হলেন পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক বিষয়াবলীর প্রধান লে. জেনারেল ফরমান আলী। তারা দু-জনেই ঘন ঘন সংবাদ-বিজ্ঞপ্তি আয়োজন করেন, ঘটনাবলীর পটভূমি ব্যাখ্যা করেন; কিন্তু এসব হলো এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাবা খেলার মতো যে দ্বিতীয় চালেই রাণীকে খুইয়েছে এবং দ্রুত তা কেড়ে নিয়ে ক্রুদ্ধভাবে আবার খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামে আমি যেমন অনেক আমেরিকানকে দেখেছি, তেমনি তাদেরও আমার মৌলিকভাবে ভদ্রলোক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এরা 'দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব পালন করছি' -- এই বোধে তাড়িত হয়ে পাগলাটে নীতি কবলে পড়েছেন।
প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা সরদারকে কঠিন আর্দ্র উইকেটে ক্রিকেট খেলতে হয়; বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে মুখোমুখি বসে এই পটভূমিতে তাকে কথা বলতে হয় যেন পাকিস্তান সরকারের লুকানোর মতো কিছু নেই; তার সঙ্গে কোনো জেনারেল-তারকা নেই, দেখে মনে হয় কোনো সামরিক প্রভাবও এখানে কাজ করছে না (তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে আমি যেকোনো কিছুর ছবি নিতে পারবো। কিন্তু আমি যখন ঢাকা ছাড়ি তখন কাস্টমসের লোকজন আমার ব্যাগ থেকে ৩১টি অমুদ্রিত ছবি জব্দ করে। তারা আমাকে বললো, "সাংবাদিকদের ছবি তুলে দেশের বাইরে নিয়ে যাবার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। মুদ্রিত ও অমুদ্রিত সব ছবির ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য।") বেচারা সরদারকে বিদেশী সাংবাদিকদের যে-কঠিন বিষয়ে প্রভাবিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে হয়েছে তা হলো -- সামরিক সরকার আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দলটিকে ধ্বংস করে নি, যারা বিগত একটি অবাধ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কোনো প্রামাণ্য দলিল হাতে না থাকলেও ব্যাপারটা চাপা দেওয়া মুশকিল; সরদার নিজেই অবশ্য 'পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচন' শীর্ষক পুস্তিকার লেখক যা তার বিভাগ থেকে গত ফেব্র“য়ারিতে করাচিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
ছয় মাসেরও কম সময় আগে উদ্যমী সরদার ও তার সহযোগীরা লিখেছিলেন, "নির্বাচনের অনেকগুলো ফলপ্রসু দিক রয়েছে, এর মধ্যে অবশ্যই একটা হলো সামরিক সরকার একটি বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা সমর্পণ করতে যাচ্ছে।" "সেনাবাহিনী সাধারণত যেখানে বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়, গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন হলো পাল্টা জবাব। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জনগণের ওপরে আস্থা রেখেছেন এবং অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বেসামরিক-গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে তার অফিস হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন ..."। আমি যখন এই উচ্ছ্বসিত অনুচ্ছেদ পড়ে শোনালাম, সরদার অস্বস্তির সঙ্গে তার একটি আঙ্গুল গলার কাছে ঘষতে থাকলেন, মুখে জোর করে হাসি টেনে আনলেন, তার একটি অব্যক্ত 'আমার-কাজ-আপনি-কীভাবে-পছন্দ-করবেন?'-গোছের আবেদন জানিয়ে আমাকে এই বুঝ দিলেন যেন তিনি সিগারেট-কোম্পানি কর্তৃক নিযুক্ত একজন ক্যান্সারগবেষক। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, "কিন্তু আপনি মনে রাখবেন যে আওয়ামী লীগ, তাদের বিরুদ্ধচারী লোকদের, ফ্যাসিস্ট কায়দায় সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দিয়েছে ...।" কিন্তু 'পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচন' বইয়ের পৃষ্ঠা ২-এ বলা হয়েছে, "যেকোনো বিবেচনায় ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল বৃহত্তর। রেজিস্টার্ড ভোটারদের শতকরা ৬০ ভাগ নির্বাচনে অংশ নেয় ...।" সরদার আন্তরিকভাবে বলার চেষ্টা করলেন, "জনগণ বিভ্রান্ত ছিল। তারা ভেবেছিল তারা সংস্কারের জন্য ভোট দিচ্ছে, বিচ্ছিন্নতা বা বিশ্বাসঘাতকতার জন্য নয়।" কিন্তু আপনি সেখানে লিখেছেন, "নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় বহন করছে, গড়পড়তা ভোটারের সাধারণ জ্ঞান ও ব্যবহারিক-বিবেচনা নির্দেশ করছে। ... আঞ্চলিকতাবাদ, আদিমতা, ধর্মীয় উন্মাদনা পুঁজি করে যেসব দল রাজনীতি করে তাদের সমুচিত জবাব দেয়া হয়েছে।" সরদার বললেন, "এসবই ছিল ভারতরচিত আখ্যানের অংশ।" "এমনকি আমিও প্রতারিত হয়েছিলাম। এটা যে এইসব হিন্দুদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে ...।" কিন্তু আপনি লিখেছিলেন আপনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে কোনো প্রচার চালাচ্ছেন না ...। "হিন্দুরা যখন নিজেদের মধ্যে আচরণ করে তখন তারা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু তারা যখন ভারতীয় প্রভুদের নির্দেশ অনুসারে আমাদের মাতৃভূমিকে ধ্বংস করতে চায় ...।"
এই দুঃখজনক পরিস্থিতিতে জনগণকে নির্যাতন করার অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। এটা বরং অপেক্ষাকৃত যৌক্তিক দেখাচ্ছে, যখন সরকার তার অতিনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রের মাধ্যমে সবসময়ই জনগণকে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছে। প্রত্যেকেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে; ব্রিটিশদের সঙ্গে ভারতীয়রা যোগসাজস করছে, বিবিসি ইহুদিদের সঙ্গে যোগসাজস করছে, রাশিয়া ইহুদিদের সঙ্গে যোগসাজসে মেতেছে (!), কেবল চীন ইসলামকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করছে (!!!)।
সরকার নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান টাইমসে গত রোববার জেড. এ. সুলেরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে 'সাহসী নিপীড়িত' বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিবিসি-ইহুদিদের যোগসাজসকে 'খ্রিস্টবাদ ও ইসলামের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুলেরির ব্যাখ্যা হলো: "ডি. ডে-র প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, এবং পুলিশ আওয়ামী লীগের ডাকে ও সর্বোপরি ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীসহ প্রায় দুই লাখ সশস্ত্র লোক হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠে ... এই বাহিনীর বিপুল সমাগমের বিপরীতে ১২ ব্যাটেলিয়ানের কয়েক হাজার সৈন্য কেবল প্রতিরোধে নেমেছিল ... জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে যারা প্রতিরোধ করেছিল।"
এই প্রেক্ষাপটে কোনো ধরনের সমাধান হবার কোনো সম্ভাবনাই আমি দেখতে পাচ্ছি না। পূর্ব বাংলা দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আর পশ্চিম পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যীয়। তাদের মধ্যে যেটুকু মিল ছিল তা হলো অবিভক্ত ভারতের সংখ্যলঘু মুসলিম হবার অভিজ্ঞতা; একটি প্রজন্মের জন্য যথেষ্ট সময় পার হয়েছে যারা স্মরণ করতে পারে না তারা কখনো ভারতীয় ছিল। পাকিস্তানের জন্য একত্রীকরণের শক্তি ছিল ইসলাম, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আরবদের মধ্যেও এটা যতোটা কাজ করে, পাকিস্তানে এখন আর তা কাজ করছে না।
স্ক্রুর শেষ অযৌক্তিক প্যাঁচ
তাই উভয় অংশই আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছে। পূর্ব বাংলা হিন্দু, মোগল, ব্রিটিশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা শাসিত হয়েছে; এখন যেটা চলছে সেটা সেই পুরনো এক প্রতিবাদই চলছে: 'বিদেশী শাসকদের হাত থেকে মুক্ত হও'। ভারতকে ঘৃণা করা এই অনুভবের কোনো অংশ নয়; সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক মাসগুলোর 'ভারত নাশ কর'-প্রচারাভিযান পূর্ব বাংলায় সফল হয় নি। পূর্ব বাংলার বিদেশী নিপীড়ক এখানে পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সংঘাত বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদ-প্রসূত। এর পেছনে কাজ করে কাশ্মির থেকে বল প্রয়োগ করে ভারতীয়দের হটানো।
আমার দৃষ্টিতে কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানীদের অবস্থান ঠিকই আছে, এর পেছনের কারণ লুকিয়ে আছে ১৯৪৮ সালের ঘটনাবলীতে। কাশ্মির ইস্যুর পেছনে এই বিস্মৃত গৌরব কাজ করে যে মুসলমানরা একসময় হিন্দুস্তানে শাসক ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের বিপুল আকারের সেনাবাহিনী ও আমলাতান্ত্রিক সংস্থাপনার পেছনে এই ভাবনা কাজ করে থাকে। আর এর খরচ যোগান দিতে পূর্ব বাংলার রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করা হয়। স্ক্রুর সর্বশেষ অযৌক্তিক প্যাঁচ হলো, পূর্ব বাংলার এই যোগান প্রয়োজন রয়েছে সেনাবাহিনীর দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য -- পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে রাখা, যাতে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষে টিকে থাকা যায়। পূর্ব বাংলায় আমি যতোজন পশ্চিম পাকিস্তানির সঙ্গে কথা বলেছি তাদের সবাইকে দেখেছি এই অসম্ভব প্রত্যাশার পাকচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর তাদের এই ভাবনাকে তারা দেশপ্রেমমূলক ভাবনা বলেই মনে করে।
ভারতের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট পৃথক। শেখের মতে, ভারতের সঙ্গে যদি এই সার্বক্ষণিক উত্তেজনার ব্যাপার না থাকতো তবে পাকিস্তানের এতো বড়ো সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হতো না; ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্কও থাকতো এবং এর ফলে অর্জিত সম্পদ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতো। আমার মনে হয় পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না এটা নিয়ে শেখ খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না (আমি তার সঙ্গে ১৮ মাস আগে যখন কথা বলি তখন তো অবশ্যই ব্যাপারটা তাই ছিল), তিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে ভাবিত ছিলেন, অথবা চিন্তিত ছিলেন স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব বাংলা নিয়ে। তিনি মনে করতেন বাঙালিদের কল্যাণের জন্য স্বায়ত্তশাসনই যথেষ্ট কার্যকর হবে।
বড়ো সেনাবাহিনী, ছোট সেনাবাহিনী; ভারতকে শেষ করো, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটাও; সেনাশক্তি বৃদ্ধি অথবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: এইসব মৌলিক ইস্যুর কোনোটিতেই আপস সম্ভব বলে আমি মনে করি না। সবচেয়ে অসম্ভব ব্যাপার হলো বাংলার যুদ্ধ, যা ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষে পাকিস্তানের শক্তিমত্তা টিকিয়ে রাখতে আয়োজন করা হয়েছে -- আপসের সম্ভাবনাকে শূন্যের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সুদীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সব আলামতই দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো, পশ্চিম পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত চার কোটি জনগোষ্ঠীর পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে, যারা ৬০ কোটির ভারতের সঙ্গে কাশ্মির নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত। এটা হলো সেইসব লোকের চশমা যারা একটি উদ্দেশ্যের জন্য যুদ্ধ করছে যা কখনোই অর্জিত হবে না। বিমানভর্তি আহত সৈন্য ভিয়েতনাম যুদ্ধকে ভুল বোঝার মারাত্মক পরিণতির অনুরণনের সাক্ষ্য বহন করছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


