তবে এর কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। মোগল ইসলাম খানরা একে বঙ্গের রাজধানী বানালেও, শেষ পর্যন্ত তা আর থাকেনি, মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর ব্রিটিশরা কলকাতা নগরীর পত্তনের পর থেকে শুধু বঙ্গ কেন, সর্বভারতীয় যাবতীয় কার্যক্রম কলাকাতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফলে রাজনৈতিক পালাবদল, নাগরিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়েছে কলকাতা।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে তো বাঙালি মুসলমানরা পুনরায় ঢাকামুখী হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবেও তো ঢাকার নবজন্ম হয়েছে আজ ৩৭ বছর। এক কোটিরও বেশি লোকের বাস, কিন্তু আমরা কী কী বৈশিষ্ট্যের কারণে ঢাকাকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারি? ঢাকা কি এই কোটিলোকের আপন শহর হয়ে উঠতে পেরেছে? কী অধুনা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এই মেগাসিটিকে ঘিরে?
যেমন একটি শহরের স্থাপত্যরীতি তাকে বিশিষ্ট করে তুলতে পারে। কিন্তু আমরা এখনও সেই লালাবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ছোট ও বড়ো কাটরাকে কুমীরছানার মতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাই। আর আছে ব্রিটিশ রীতির কার্জন হল আর আধুনিক রীতির লুই কানের ভবনটি। আবার মোগল বা ব্রিটিশ ধাঁচের যা যা কিছু ছিল, তা নির্বিচারে নষ্ট করেছি আমরা। কিন্তু সার্বিকভাবে একটি শহরের সাধারণ যে স্থাপত্যরীতি, তার কি কোনো বিশিষ্টতা রয়েছে ঢাকার ভবনগুলোতে? মতিঝিলের জনতা ব্যাংক ভবন একরকম, পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি আরেকরকম। কংক্রিট ও কাঁচ দিয়ে যে যার মতো দালান খাড়া করছে, পরিকল্পনা সামঞ্জস্যহীন এরকম ‘ভবনের জঙ্গল’ আর কোনো বড়ো শহরে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ঢাকা আসলে শেষ পর্যন্ত কীসের শহর? শপিং মলের? মসজিদের? রিকশার? জ্যাম-ঠেঙ্গানো লক্ষ-কোটি জীবনসৈনিকের? দুর্নীতির মাধ্যমে রাতারাতি বড়োলোক হওয়া ঠগের? নাকি গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য নাভিশ্বাস-ওঠা অগণিত জনতার?
একটি বড়ো শহরের একেকটি আইকন নির্মিত হয় যাকে দিয়ে ঐ শহরটিকে শনাক্ত করা হয়। লন্ডনের যেমন লন্ডন ব্রিজ, সিডনির অপেরা হাউস, কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টাওয়ার, কলকাতার হাওড়া ব্রিজ ইত্যাদি; আমরা আজ পর্যন্ত সেরকম কোনো আইকন নির্মাণ করতে পারলাম না। বা যাও আছে তাকে প্রজেক্ট করতে পারলামনা বহির্বিশ্বে। এক্ষেত্রে শহিদ নিমার বা সংসদ ভবনকে আমরা প্রজেক্ট করতে পারতাম।
একটি শহরের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয় সাহিত্যিকদের লেখায়, শিল্পীদের গানে বা নির্মাতাদের চলচ্চিত্রে। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের চলচ্চিত্রে, সুমন-নচিকেতা-চন্দ্রবিন্দুর গানে, সুনীল-শংকরদের সাহিত্যে কলকাতা কিছু সুনির্দিষ্ট ইমেজ নিয়ে অক্ষত থেকে গেল। মান্না দের এক কফি হাউস গানটি ঐ স্থানটিকে অমর করে রেখেছে। এক্ষেত্রে আমাদের কবি-সাহিত্যিক-গীতিকার-চলচ্চিত্রকারদের ব্যর্থতাও আছে বলে আমার মনে হয়। যে তারা যে শহরে থাকেন সে শহরের চিত্র-বৈশিষ্ট্য তাদের কর্মে সচেতনভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখছেন না।
আজ যখন ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি হতে চলেছে, তখন আসুন আমরা এর বিশিষ্টতাকে খুঁজে বের করি।
স্থিরচিত্র: Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

