somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহবিপর্যয়ের মুখোমুখি এক নগরপতি

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নগরপতি যখন মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন নাগরিকেরা তখন নগর ছেড়ে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন। নগরপতি ভেবেছিলেন তিনি তার শেষ প্রতিরোধক-ব্যবস্থার কথা জানিয়ে নগরবাসীদের আশ্বস্ত করতে পারবেন। বিদেশ থেকে বাঘা-বাঘা বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ আসছেন। তাদের মহাসম্মেলনে সম্ভাব্য প্রতিকার নিশ্চয়ই একটা কিছু স্থির হবে। তারা আলোচনা করবেন, নগরের এই মহাবিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন। ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ সম্প্রতি এরকম মহাসম্মেলন করে তাদের নগরের মহাবিপর্যয় রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এ-নগরে বিপর্যয় একটু বেশি মাত্রায়ই পরিলক্ষিত হচ্ছে তবুও তা দূর করা দুঃসাধ্য কিছু নয়। পৃথিবীতে যেমন বিপর্যয় আছে, তা থেকে রক্ষা পাবার উপায়ও থাকে। যেসব বিজ্ঞানী ঐসব দেশের মহাবিপর্যয় রোধ করতে নিযুক্ত হয়েছিলেন তারা এ-নগরের মহাসম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। দেশীয় বিজ্ঞানীরা তাদের কাজে সহায়তা করবেন। গরিব রাষ্ট্র হবার কারণে বিশ্বব্যংক বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। এসবকিছু জানাতেই নগরপতি মুক্তমঞ্চে মাইক্রোফেনের সামনে এসে দাঁড়ান।

কিন্তু জনসভায় নাগরিকদের নগণ্য উপস্থিতি দেখে তিনি দমে যান। একটু অপমানিত বোধও করেন। সংবাদপত্রে, সরকারী-বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের বিজ্ঞাপনে বলা হলো মুক্তমঞ্চের জনসভার কথা, অভয় দেয়া হলো। তবু নাগরিকেরা আসলো না। সামান্য অভিমানও হলো নগরপতির। যে-নগরবাসীর জন্য তার রাতের ঘুম অন্তর্হিত হয়েছে, উদয়াস্ত যাদের জন্য পরিশ্রম করে, যাদের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি নিজেও প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তারা তার ডাকে সাড়া দিলো না। তিনি এই ভেবে একটু অবাক হলেন যে, গত বছরেই তো তিনি নাগরিকদের বিপুল ভোটে নগরপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার ছিল নগরের আশু মহাবিপর্যয় রোধ করা। তার সেসময়কার জনসভায় জনতার ঢল নামতো। তার জনসভার বিশালত্বের কারণে পুরো নগরে যানজট বেধে যেতো। পুরো নগর যেন থমকে দাঁড়াত, কেউ রিকশা-গাড়ি নিয়ে নড়াচড়া করতে পারেতো না। তিনি সেই স্থির নগরকে দেখে মনে মনে পুলক বোধ করতেন। তার একার জন্য পুরো একটা নগর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে― এটা ভেবে তিনি আনন্দিত হতেন। অথচ এক বছর যেতে না যেতেই তার জনসভা প্রায় শূন্য!! কেবল জনাকয়েক ব্যক্তি ইতঃস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তো তিনি মহাবিপর্যয় রোধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পোস্টারের মাধ্যমে পাবলিসিটি করেছেন। কিন্তু মহাবিপর্যয় যেন ধেয়ে আসছিল।

নগরপতি দরদী কণ্ঠে শুরু করেন: ভাইসব, একবছর আগে আপনারা ভোটের মাধ্যমে আমাকে নির্বাচিত করেছেন। এজন্য আমি আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞা। আপনাদের এ-ভালবাসার কথা আমি কখনোই ভুলবো না। কিন্তু একটি বিশেষ মহল আপনাদের এই গণরায়কে সহচজভাবে মেনে নিতে পারে নি। তারা আজ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ...

মঞ্চের সামনাসামনি একজন বসেছিল। লোকটি হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, মহাবিপর্যয়ের কথা বলেন।

হ্যাঁ ভাইসব, আপনারা জানেন, আমরা আজ এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি। আমাদের প্রিয় নগরে এক বিপর্যয় এসেছে। এ-বিপর্যয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু সেই পরাজিত মহলটি নহগরবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের প্ররোজনায় কেউ কেউ নগর থেকে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু জনগণ আমাদের পক্ষে আছেন। ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবেই।

নোটবুক হাতে লোকটি সাংবাদিক হবে হয়তো। মঞ্চের পাশ থেকে লোকটি বলে ওঠে, মহাবিপর্যয় রোধ করতে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?

নগরপতি বিব্রত বোধ করেন। একেকজন প্রশ্ন করছে আর তিনি উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। এটা কি পাবলিক মিটিং না প্রেস কনফারেন্স? অসহিষ্ণুতা দমন করে তিনি বলেন, হ্যাঁ ভাইসব আমি সব বলবো। আমি বলবার জন্যই এসেছি। তবে অনুরোধ করছি কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে আমার বক্তৃতার পরে জিজ্ঞেস করবেন। বক্তৃতার মাঝে দয়া করে কথা বলবেন না। ... আপনাদের মঙ্গলের জন্য আমি সার্বক্ষণিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি আপনাদের বিশুদ্ধ পানি পানির জন্য নামমাত্র মূল্যে জলছাঁকনি বিতরণ করেছি।

কিন্তু সেসব তো নগরভবন আর সচিবলায়ের লোকজনই নিয়ে গেছে। সাধারণ জনগণের হাতে পৌঁছে নি। কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। কেউ একজন বলে ওঠে। নগরপতির অনুরোধ রক্ষিত হয় না।

আমি আপনাদের প্রিয় শহরের বায়ু নির্মল রাখার জন্য মার্কিন মুলুক থেকে বায়ুশোধক আমদানি করেছি। নগরের বায়ু এখন বিশুদ্ধ, নির্মল।

কিন্তু সেসব তো কেবল মন্ত্রিপাড়া আর উত্তরপাড়ায় ছিটানো হয়েছে। সাধারণ লোকজন তো সে-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আরেকজন বলে।

আমি আপনাদের সুবিধার্থে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে জরুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালূ করেছি।

সেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। কিন্তু নগরবাসীর রোগ জটিল ও দুরারোগ্য।

আমি আপনাদের জন্য বিজ্ঞানীদের মহাসম্মেলন ডেকেছি। তারা এ-শহরে আসবেন, আলোচনা করবেন, ল্যাবরেটরিতে কাজ করবেন এবং বিপর্যয় রোধ করবেন।

সে-মহাসম্মেলনের কথা তো আমরা অনেক দিন থেকেই শুনছি। নাগরিকেরা মৃত্যুবরণ করে নগর ফাঁকা হলেই কি তবে তারা আসবেন? সাংবাদিকটি জিজ্ঞেস করে।

হ্যাঁ ভাইসব, আমি আপনাদের সে-সুসংবাদ দিকেই এসেছি। আগামী রবিবার সে-মহাসম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে। পঞ্চশজন বিদেশী ও দশজন দেশী বিজ্ঞানী একত্রে কাজ করবেন। এ-মহাসম্মেলনে বিশ্বব্যাংক বিশেষ অনুদান দিচ্ছে। বর্তমান সমস্যার একটা সমাধান হবেই। কী, আপনারা খুশি?

মহাবিপর্যয় রোধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা খুশি হতে পারছি না। সবাই বিক্ষিপ্তভাবে কিন্তু একযোগে বলে। জনগণ তাদের কথা জানিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করলে নগরপতি বক্তৃতা শোনানোর মতো কাউকে খুঁজে পান না।

রবিবারে বিজ্ঞানীরা এলেন, আলোচনায় বসলেন, ল্যাবরেটরিতে নগরীর পানি, বায়ু, মৃত্তিকা পরীক্ষা করে চোখ কপালে তুললেন এবং ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থ বিজ্ঞানীরা মহাবিপর্যয় রোধের কোনো ব্যবস্থা না করেই যে যার দেশে ফিরে গেলেন।

নগরের বাকি লোকজন গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে বাক্স-পেঁটরা বাঁধেন। অনেক বছর পর গ্রামের জন্য তাদের প্রাণ কেঁদে ওঠে। আর সংশয়বাদীরা ক্রমশ অধিক ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে মানুষ ঈশ্বরকে স্মরণ করে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:০০
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×