somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড়ের চূড়ায় একজন মহৎ মানুষ

১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১০:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে মানুষ বড়ো হয়ে যায়, অথবা মহৎ হয়ে যায়। আমি যখন প্রথম পাহাড়ে উঠি, তখন আমি বড়ো হয়ে যাই, অথবা মহৎ হয়ে যাই। আমি তখন মানুষের গড়া দূরের সভ্য পৃথিবীকে ক্ষুদ্র দেখি, তুচ্ছ দেখি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে, প্রথমবারের মতো দাঁড়ালে, পাহাড় আমাকে অতিক্রম করে যায়। আর আমি পাহাড়কে অতিক্রম করে যাই। এভাবে পাহাড় ও আমি পরস্পরকে অতিক্রম করে উভয়েই মহৎ হয়ে উঠি অথবা বড়ো হয়ে উঠি। তাৎক্ষণিকভাবে মহৎ হয়ে উঠলে, অথবা বড়ো হয়ে উঠলে ক্রমশ আমার মনটা অপার্থিব সত্তায় পরিণত হয়। আমার সবকিছু ভালো লাগে। এই যে ঘাসে আর লতাপাতায় ছাওয়া পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি, (আমার পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার অ্যাডভেঞ্চারটিকে আমি সীমিত মাত্রায় রেখেছি। পাহাড়-শ্রেণী থেকে আমি সেই পাহাড়টিকেই বেছে নিয়েছি যার গায়ে ঝোপ-জঙ্গল একেবারেই নেই। আমি ঝোপ-জঙ্গলের সাপকে খুব ভয় পাই। আমি প্রায়শই রাতে স্বপ্ন দেখি , রাশি রাশি কালো কুচকুচে সাপ আমার চারধারে কিলবিল করছে। আমি প্রতিদিনই সেসব সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোক্রমে বেঁচে থাকি।) আমার চোখ ছুঁয়ে যায় শীতল বাতাস। আমি প্রাণভরে তার সুধা নিই। এই যে আমার সামনে অসংখ্য পাহাড়, এক পাহাড়ের চূড়ায় বসে শত শত পাহাড়ের চুড়া দেখি। একটার আড়ালে আরেকটি উঁকি মারে। আমি আনন্দিত হই। এই যে আমি, যে পাহাড়টার চূড়ায় বসে আছি , তার সামনে, নিচে ছোট্ট ভ্যালি। সে ভ্যালিতে কৃষকেরা ধান বুনে গেছে। ধানী জমির সবুজাভতা আমাদের চোখকে আরাম দেয়। আমি অস্ফুটে 'আহ্' বলে উঠি। আর আমার বান্ধবীটি 'কীযে ভাল লাগছে' বলে। তার ভাল লাগা আমাকেও আবিষ্ট করে। আমি খুব আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ি এবং বান্ধবীটিকে চুম্বন করি। আমরা পেছনে ফেলে আসা সভ্যতাকে ইগনোর করি। দূর থেকে কেউ হয়তো আমাদের চুম্বনদৃশ্য দেখে অথবা দেখে না। দূর থেকে হয়তো আমাদের প্রকৃতির সন্তান-সন্ততি মনে হয়। আমরা পেছনে ফেলে আসা সভ্যতাকে ইগনোর করি। আমরা ঘনিষ্ট হই, নিবিড় হই। আমরা প্রেমের স্বাদ শুষে নিয়ে বিযুক্ত হই। এরপর আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠি 'হেই ... ই ...'। আমার তীব্র স্বর পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, কিন্তু ফিরে আসে না। কেবল ধীরে ধীরে '...ই...ই...ই...ই...' শব্দে দূরে মিলিয়ে যায়। শব্দটি কোথায় যায়? আমি স্থিরদৃষ্টিতে শব্দের মিলিয়ে যাওয়া দেখি। শব্দটি কোথায় যায়? শব্দের হারিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে অসীমতাকে অনুভব করে আনন্দিত হয়ে উঠি। আমার বান্ধবীও 'হেই...ই...' শব্দ তোলে। তার চিৎকারও '...ই...ই...ই...ই...' শব্দে দূরে মিলিয়ে যায়। সে আনন্দিত হয়। এরপর আমরা একসঙ্গে 'হেই...ই...ই...ই...' শব্দ তুলি। আমরা উভয়ে আনন্দিত হয়ে উঠি। এই আনন্দোৎসবের মধ্যে আমরা ভুলে যাই যে আমরা একটি মেট্রোপলিসের খাঁটি নাগরিক। আমরা ভুলে যাই যে নগরের দমবন্ধ ব্যস্ততা ফেলে অনেকটা পালিয়ে এসেছি স্বস্তির ঠিকানা খুঁজে পেতে। আমরা এও ভুলে যাই যে আমরা নগরের কাউকে না বলে চলে এসেছি এই দূর পাহাড়ে। আমাদের উভয়েরই মনে হয় যে আমরা এখানেই ছিলাম, এখানেই আছি, এখানেই থাকব। আমরা আমাদের অতীত ভুলে যাই। আমাদের ভবিষ্যতের কথাও মনে থাকে না। আমাদের বর্তমান শুধু পাহাড়ের সারি হয়ে ঝুলতে থাকে। আমাদের সময় স্থির হয়।

হঠাৎ কী হয়? আমার সিনেমায় দেখা এক দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। ভিলেন নায়ককে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিচ্ছে। আমি মন থেকে দৃশ্যটা তাড়াই। আমার হাতটা আশপাশে-ঘোরা-মাছি তাড়ানোর মতো করে হাওয়ায় চালনা করি, যেন মাছি নয় দৃশ্যটাকেই মন থেকে তাড়াই। আমরা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের সম্ভাব্য দূরত্ব অনুমানের চেষ্টা করি। পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যে কে বেশি মহান, তা নিয়ে তর্ক করি। কিছুক্ষণ পরে সিনেমার দৃশ্যটা আবার মনে পড়ে। আমি এবার বিব্রত হই। এত সুন্দর পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অপার্থিব অনুভূতি লাভ করতে করতে এসব কী মনে পড়ছে? কিন্তু দৃশ্যটা চলচ্চিত্রের মতো আমার চোখে ঝিলিক দিয়ে যায়। আমি এবার পাহাড়ের নিচে তাকাই। আমরা যে-স্থানে দাঁড়িয়ে আছি তার সামনে পাহাড়ের অংশটি খাড়া হয়ে নেমে গিয়ে ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে হারিয়ে গেছে। ঠিক সিনেমায় দেখা পাহাড়ের মতো। আমি এবার শংকিত হয়ে উঠি। আমি নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না। অবাক হয়ে লক্ষ করি আমি ক্রমশ ভিলেনে রূপান্তরিত হচ্ছি। আমার হাত নিশপিশ করে। আমার আঙ্গুলগুলোকে মুঠোয় আবদ্ধ রাখতে ব্যর্থ হই। আমার আঙ্গুলগুলো ভিলেনের আঙ্গুলে রূপান্তরিত হয়। আমি আমার বান্ধবীটির দিকে তাকাই। দেখি সে নায়কে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এরপর আমি নির্দ্বিধায় তাকে ধাক্কা দিয়ে পাহাড়ের নিচে ফেলে দিই।

'এ শহর আমার নয়' (ঢাকা: আগামী, ২০০৫) গ্রন্থভুক্ত।

চিত্র: আমেরিকান পেইন্টার এডমুন্ড ডার্চ লুইসের (১৮৩৫-১৮১০) পেইন্টিং: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১০:২১
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×