somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাউলের মূর্তি সরানোয় মুসলমানি সাফল্য: আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের পুনর্পাঠ, পর্ব ২

১৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পর্ব ১: Click This Link

আর্যরা যখন এদেশে সত্যিকারের প্রভাব ফেলতে পারলো ততদিনে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তা খানিকটা বদলে যায়, অনার্য সংস্কৃতির মিশেলে তা বঙ্গীয় আর্য বা ব্রাহ্মণ্যরূপ লাভ করে। বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। বৌদ্ধ ধর্মের হীনযান ও মহাযান এই দুই যে ধারা, তার মধ্যে বঙ্গে মহাযান ধারাটি এখানে গৃহীত হয়, যা আবার বৌদ্ধ ধর্মের সহনশীল ও উদারপন্থী ধারা। মহাযান ধারাটি সহজযানে রূপান্তরিত হয়ে বৌদ্ধিক তান্ত্রিকতায় এসে স্থির হয়, যা পরবর্তী কিছু লোকধর্ম যেমন নাথপন্থা এবং বাউলমতে ব্যাপক প্রভাব রাখতে সমর্থ হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত 'চর্যাপদ' আসলে কিছু তান্ত্রিকমতের কবিতা। আর ইসলামের সুফিবাদের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। এই তিন উদারপন্থী ধারা এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে একটা উদারবাদী ধর্মীয় ও দার্শনিক ভিত্তি গড়ে দেয়। আজ যে মুসলমান একসময় বৌদ্ধ ছিল, পরে সে হিন্দু হয়েছে এবং আরও পরে মুসলমান হয়েছে। তাই আজকের যে মুসলমান, তারমধ্যে মুসলমানভাব প্রবল হবার পরও, উত্তরাধিকারসূত্রে তিন ধর্মেরই নানা মৌলিক বৈশিষ্ট্য তার অগোচরেই সে বয়ে বেড়াচ্ছে। বাঙালিত্ব বিকাশ লাভ করেছে এই তিনধর্মের সহনশীলতার মধ্য দিয়েই। এবং তাতে হিন্দু কবিলেখকদের তুলনায় মুসলমান কবিদের অবদান কোনো অংশে কম নয়।

রিচার্ড এম ইটনের (১৯৯৩) গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে ষোড়শ শতকের কবি হাজী মুহাম্মদ আল্লাহ ও গোঁসাইকে একইরূপে দেখেছেন, সৈয়দ মুর্তজা রসুলকন্যা ফাতিমাকে ডাকছেন জগতজননী, সৈয়দ সুলতান খোদাকে ডাকছেন নিরঞ্জন বলে। বিখ্যাত সত্যপীর-এর 'সত্য' অংশটি হিন্দু ভগবান বিষ্ণুর আরেক নাম সত্যনারায়ণ থেকে এসেছে। একজন পীরের কাছে এসে হিন্দুত্ব ও মুসলমানিত্ব লীন হয়ে যাচ্ছে। এই মিশ্র সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের আগ দিয়ে বাঙালিত্ব ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। আজও দক্ষিণবঙ্গের মুসলমান বাওয়ালীরা বনবিবির পূজা করে এজন্য যে বনের দেবী তাদের অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করবে। একসময় ওলাবিবির পূজা দিত মুসলমান হিন্দু সকলেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিতে সেই রীতির বিলোপ ঘটেছে।

তবে ব্রিটিশ আমলে এটা একটা ঘটনা যে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। তার নানা কারণ রয়েছে। সেই ব্যাখ্যায় আপাতত না গিয়ে বলছি যে ঊনবিংশ শতাব্দিতে কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে হিন্দু মধ্যবিত্ত বিকাশ লাভ করলে এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিতে তারাই এগিয়ে গেলে বাঙালিত্বের বিকাশের প্রক্রিয়াটি প্রায় পুরোপুরি হিন্দুদের হাতে চলে যায়। বাঙালিত্ব ও হিন্দুত্ব প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠে। শ্রীকান্ত উপন্যাসে শরৎচন্দ্র তাই এরকম একটি ফুটবল ম্যাচের কথা উল্লেখ করেছিলেন যেখানে 'বাঙালি' ও 'মুসলমান'রা প্রতিপক্ষ হিসেবে অংশ নেয়। এইভাবে ব্রিটিশদের ইন্ধন ও নানা বাস্তব ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে দুই জাতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বাড়তে থাকে।

মুসলমানরা ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ দিক থেকে আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে এরকম ভাবা হয়েছিল। কিন্তু হিন্দু নেতা-কর্মীরা এর প্রবল বিরোধিতা করে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী সহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের নেতৃত্বে বাঙালিয়ানা রক্ষার দাবি তুঙ্গে ওঠে। এই বাঙালিয়ানার মধ্যে তারা মুসলমানদেরও রাখতে চাইলো, ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বাঙালিদের বিভক্ত করে দুর্বল করে দিতে চায়, এই ছিল তাদের মত। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়।

এই পর্যায়ে বাঙালিত্বের আলোচনাটি স্থগিত রেখে মুসলমানিত্বের আলোচনাটি শুরু করা দরকার।

[চলবে]
১৮টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×