ইন্টারনেটের বাংলা ব্লগভূবনে প্রথম আলো ব্লগ আসার সম্ভাবনার কথা কমিউনিটি ব্লগগুলোতে অনেক দিন ধরেই আলোচিত হচ্ছিল। একজন ব্লগার হিসেবে এই আলোচনা আমারও দৃষ্টি কাড়ে এবং অল্প-আধটু অংশও নিয়েছি তাতে। সামহোয়ার ইন...ব্লগ-এর নিয়মিত একজন ব্লগার এই নতুন ব্লগের মডারেটর, কিন্তু তিনি নানাভাবে জিজ্ঞাসিত হলেও প্রথম আলো ব্লগের সম্ভাব্য রূপরেখা সম্পর্কে মুখ খোলেননি, ঐসব আলোচনায়। তাই প্রথম আলো ব্লগ সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে উন্মুক্ত করে দেবার পরে এর চেহারা দেখে আমি খানিকটা আশ্চর্য হয়েছি। কারণ প্রথম আলো ব্লগ সম্পর্কে আমার মনে যেরকম একটা চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, তা থেকে এটা দেখা গেল অনেকটাই আলাদা।
শীর্ষস্থানীয় দৈনিক হিসেবে আমি ভেবেছিলাম প্রথম আলো আর যাই হোক স্বয়ংসর্ম্পূণ ও পৃথক একটা ব্লগ খুলে বসবে না; যদিও বেশিরভাগ ব্লগারই একে সামহোয়ার-এর মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্লগ ধরেই আলোচনা করছিলেন। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত ভাবছিলাম, পৃথিবীর অন্যান্য দৈনিক পত্রিকা যেমনভাবে মূল পত্রিকার সঙ্গে ব্লগিংয়ের বা সংবাদশেষে মন্তব্যের অপশন চালু করেছে, ঠিক সেরকম কিছুই হবে এটা।
পৃথিবীর বেশিরভাগ বড়ো পত্রিকাই এখন অনলাইন সংস্করণকে গুরুত্ব দেয়। মুদ্রণমাধ্যমে যা যা অসম্ভব ছিল, একই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের ব্লগিংয়ের অপশন উন্মুক্ত করায় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণ এখন ভিন্ন মাত্রার এক সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি সংবাদ বা অন্যান্য আইটেমশেষে পাঠকরা মন্তব্য করবেন এবং এভাবে পাঠকদের অংশগ্রহণে একেকটি সংবাদ পূর্ণাঙ্গ একটি রূপ পাবে। একেকটি সংবাদকে ঘিরে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে, মুদ্রণমাধ্যমে কেবল চিঠিপত্রের কলামেই পাঠকদের এই অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। কিন্তু অনলাইন সংস্করণে প্রতিটি সংবাদেই পাঠকরা ঐ ঘটনায় তাদের মতামত জানাতে পারবেন। দৈনিক পত্রিকা, এতদিন যা একরৈখিক যোগাযোগের মতো ছিল, এখন অনলাইন সংস্করণের মাধ্যমে তা মিথস্ক্রিয়ামূলক একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। অনলাইন সংস্করণের আরেকটি সংযোজন হলো সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ক্লিপ যুক্ত করা, যা মুদ্রণ মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বনেদী দুই পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ইন্টারনেট সংস্করণে পাঠকদের ব্লগিং বা মন্তব্য করার কোনো অপশন নেই। কিন্তু দি বোস্টন গ্লোব, শিকাগো ট্রিবিউনসহ আরও অনেক পত্রিকারই ব্লগিংয়ের সুযোগ আছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের নামীদামী সব পত্রিকাতেই ব্লগিংয়ের সুযোগ আছে Ñ দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দি সানসহ অনেক পত্রিকাই এভাবে পাঠকের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছে। তবে দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সেই সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকাতেও সেই সুযোগ নেই। ভারতের সর্ববৃহৎ টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকায় সে সুযোগ ভালোমতোই আছে, যদিও পাকিস্তানের দি ডন পত্রিকায় সেসবের অপশন নেই। বাংলাদেশের কেবলমাত্র আমার দেশ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ব্লগিংয়ের অপশন আছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর নানা দেশের দৈনিকের বেশিরভাগই পাঠকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। উল্টোভাবে বলা যায়, প্রযুক্তি যে-সুযোগের সৃষ্টি করেছে, পত্রিকাগুলো তা গ্রহণ করে যুগোপযোগী থাকার চেষ্টা করছে। যদি অনলাইন সংস্করণে ভিডিও ক্লিপ দেয়া যায়, তবে তো ইলেক্ট্রনিক সংবাদমাধ্যমের দিক থেকে আসা যে চ্যালেঞ্জ, দৈনিক পত্রিকা তা একভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। এছাড়া কোনও কোনও পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণে দেখা যায় কোনো একটি প্রসঙ্গ সংবাদে উল্লেখ করা হলে, তা লিঙ্ক আকারে দৃশ্যমান হয়, ঐ লিঙ্কে ক্লিক করলেই যথাযথ স্থানে চলে গিয়ে বিষয়টির আদ্যন্ত জানা যায়। এভাবে সংবাদ পাঠের অভিজ্ঞতাটিও সর্বাঙ্গীন হয়ে ওঠে। ব্লগিং, ভিডিও ও হাইপারলিঙ্ক -- এই তিনটি অপশন দৈনিকের অনলাইন সংস্করণকে একটি পৃথক ও অনন্য মিডিয়া হিসেবে হাজির করেছে। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণে এই তিনটি অপশনের কোনোটিই দেখা যায়না। অথচ এই বিষয়গুলো চালু করা খুব কঠিন কিছু নয়।
মূল পত্রিকার সঙ্গে ব্লগিং চালু না করে প্রথম আলোর স্বয়সম্পূর্ণ একটি কমিউনিটি ব্লগ চালুর বিষয়টিকে তাই একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অবকাশ আছে, যেক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যান্য পত্রিকাগুলোর এরকম স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্লগ চালুর রীতি আছে বলে শোনা যায়না। ব্লগ মিডিয়াটির অনেকটা অপ্রাতিষ্ঠানিক চেহারা রয়েছে। এখানে পাঠকরাই লেখক বা মন্তব্যকারী, আবার লেখকরাও নিরুপায় পাঠক। মুদ্রণমাধ্যমে লেখক-সাংবাদিকদের যে এলিট অবস্থান, ব্লগে তা বলবৎ থাকেনা। মুদ্রণমাধ্যমে লেখকরা লিখেই খালাস, নিরুপায় পাঠকরা তা একরকম বাধ্য হয়েই পড়েন। আর ব্লগে ব্লগাররা বা পাঠকরা লেখার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, ভালো না লাগলে সরাসরি বলেন, আপত্তিকর কিছু থাকলে তার ব্যাখ্যা দিতে লেখককে বাধ্য করেন, তর্কবিতর্কের মাধ্যমে একেকটি পোস্ট দারুণভাবে জমে ওঠে। লেখক বা সাংবাদিকের সঙ্গে পাঠকের যে অবস্থানগত এলিটত্বের ফারাক, ব্লগে তা থাকেনা। ব্লগ অনেক লাগামছাড়া, অনিয়ন্ত্রিত, অসম্পাদিত -- সেই অর্থে অরিজিনাল, কোনো ফিনিশড প্রোডাক্ট নয় একেকটি পোস্ট। এখানে যিনি লেখক তিনিই সম্পাদক-প্রকাশক। একটি মূলধারার সংবাদপত্র যেক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা, সরকার, আইনের চাপে অনেক সময় সবকিছু ঠিকঠাকমতো প্রকাশ করতে পারেনা, ব্লগ সেক্ষেত্রে বিকল্প মিডিয়া -- সে চাপমুক্ত ও স্বাধীন। প্রথম আলোর মতো সতর্ক, নীতিমালা অনুসারী, বড়ো মিডিয়া-প্রতিষ্ঠান কেন তাহলে একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম চালু করছে?
এটা কি নীতিনির্ধারকদের দিক থেকে প্রথম আলো ব্র্যান্ডটিকে আরও বেশি পরিচিত করিয়ে তোলার প্রয়াস নয় -- গণিত উৎসব, ভাষা প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কর্মসূচি যেভূমিকা পালন করে থাকে? আগামী প্রজন্ম মুদ্রণ মাধ্যমের চাইতে সাইবারমাধ্যমসমূহে বেশি সময় কাটাবে এতো বলাই বাহুল্য, বর্তমান প্রজন্মেই তার লক্ষণ সুস্পষ্ট। ব্লগ চালুর মাধ্যমে প্রথম আলো হয়তো সেই জনগোষ্ঠীকেই ধরতে চাইছে, সবার আগে। সামহোয়ার ব্লগে বিজ্ঞাপন চালু করা ঠিক হবে কি হবেনা, তা নিয়ে খানিক বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু প্রথম আলো ব্লগে প্রথম থেকেই বিজ্ঞাপনের অপশন আছে। তাই আর্থিকভাবেও প্রথম আলো ব্লগকে লাভজনক মাধ্যম হিসেবে প্রথম থেকেই ভাবা হচ্ছে।
কিন্তু একটি ফরমাল মিডিয়া কীভাবে এরকম ইনফরমাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করবে? বাংলা ভাষায় প্রথম আলোর ব্লগ ছাড়াও সামহোয়ার ইন...ব্লগ, আমার ব্লগ, সচলায়তন এরকম কয়েকটি কমিউনিটি ব্লগ আছে। এসব ব্লগে সরকারকে নগ্নভাবে সমালোচনা করা, সেনাবাহিনীর প্রতি কটাক্ষ করা, দেশে সংঘটিত যেকোনো অন্যায় ঘটনার বিরুদ্ধে লাগামহীন ভাষায় আক্রমণ করা ও জনমত গঠন করা খুব স্বাভাবিক প্রপঞ্চ। খুব সম্প্রতি বাউলের ভাস্কর্য অপসারণ ইস্যুকে ঘিরে কমিউনিটি ব্লগগুলোতে ঝড় বইয়ে গিয়েছে। ব্লগেই প্রতিবাদ-কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, ব্লগাররা সেসব কর্মসূচিতে গিয়ে অংশও নিয়েছেন। অনেক ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি গালিগালাজ করা, কাউকে কোনো পশুর নামে নামকরণ করা, অযথা ট্যাগিং করা, সংঘবদ্ধভাবে কাউকে আক্রমণ করা খুব পরিচিত বিষয় ব্লগে। ব্লগ কর্তৃপক্ষ নীতিমালার মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু পুরোপুরি বাদ দিতে পারেননা। এইসব বিশৃঙ্খলা ব্লগকে প্রাণবন্তও রাখে। প্রথম আলোর মতো সুশীল ইমেজের পত্রিকার নাম যেখানে আছে, সেখানেও কি এসব চলবে?
সম্ভবত না। কারণ তারা একটা নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যা ব্লগের মতো মাধ্যমের জন্য খুবই কঠোর হয়েছে। সেই নীতিমালাগুলোয় কী কী করা যাবে বলা না থাকলেও কী কী করা যাবেনা তার বিস্তর ফিরিস্তি রয়েছে। সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতমূলক বা দেশের প্রচলিত আইনবিরুদ্ধ কিছু বলা যাবে না -- এরকম কিছু চেনা বিধি যেমন আছে, তেমনি অভিনব ও কৌতুকাবহ কিছু বিধিও আছে। যেমন ব্লগে লিখিত কোনো কিছুর জন্য আইনী ফ্যাসাদে প্রথম আলো জড়িয়ে পড়লে, সেই লড়াইয়ের খরচাপাতি সংশ্লিষ্ট ব্লগারকে দিতে হবে। আরেকটি অভিনব বিধি হলো কোনো নামী ব্র্যান্ডের (বিজ্ঞাপনদাতা!) বিরুদ্ধে অবমাননাকর কিছু বলা যাবেনা। ব্লগের মতো মাধ্যমের জন্য নীতিমালার এই কড়াকড়ি দেখে মনে হচ্ছে, হয় এই নীতিমালা পুরোপুরি পালিত হবেনা, অথবা প্রথম আলোর নাম দেখে অনেক ব্লগারের সমাগম হলেও তা এক পর্যায়ে নিস্প্রাণ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

