somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তত্ত্বকথা ১: রোলাঁ বার্থের পদ্ধতিতে রেপ্রিজেন্টেশন বিশ্লেষণ

১৯ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রেপ্রিজেন্টশন
রেপ্রিজেন্টেশন হলো ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাছে দুনিয়াকে অর্থপূর্ণভাবে বলা বা উপস্থাপন করা। এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পেইন্টিং ইত্যাদি। রেপ্রিজেন্টেশনের ধারণা সেই ভাষাকে এবং এর অর্থকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অর্থবহনকারী শব্দ, ধ্বনি ও ইমেজকে আমরা চিহ্ন (সাইন) নামক সাধারণ পরিভাষায় বর্ণনা করে থাকি। আমরা আমাদের মাথায় যেসব-ধারণা ও সেগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে ঘুরি-ফিরি, চিহ্ন সেগুলোকে রেপ্রিজেন্ট করে অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এবং এগুলো একত্রে আমাদের সংস্কৃতির অর্থ-পদ্ধতি তৈরি করে। ট্রাফিক লাইটের যে লাল রঙ কিংবা হলুদ কিংবা সবুজ, সেই লাল-হলুদ-সবুজের নিজস্ব কোনো অর্থ নেই: লাল মানে যেমন 'থামো' এবং সবুজ মানে 'যাও'। আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে লালের মানে 'থামা' এবং সবুজের মানে 'যাও'-কে সঙ্কেতাবদ্ধ (এনকোড) করে নিয়েছি। যেকোনো রেপ্রিজেন্টেশন তাই সাংস্কৃতিক। একটি বিজ্ঞাপনের চিত্র বা পোস্টারের তাই ওপরের নির্দেশিত অর্থ (ডিনোটেটিভ মিনিং) থাকে, আমরা যদি তার সঙ্গে লেপ্টে থাকা সাংস্কৃতিক সঙ্কেতলিপি বা কোডগুলোক আলাদা করতে পারি সঙ্কেতোদ্ঘাটনের (ডিকোড) মাধ্যমে, তবে সেই চিত্রের গূঢ়ার্থও (কনোটেটিভ মিনিং) বের করা সম্ভব। ফরাসি তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্থ (Roland Barthes) প্রবর্তিত পদ্ধতিতে আমরা এই কাজটি করতে পারি।

'প্যারিস ম্যাচ'-এর প্রচ্ছদ
'মিথোলজিস' গ্রন্থের 'মিথ টুডে' প্রবন্ধে রোলাঁ বার্থ একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যা সাংস্কৃতিক স্তরে রেপ্রিজেন্টেশন সত্যিকার অর্থে কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে আমাদের সহায়ক হয়। একদিন সেলুনে গিয়ে তিনি ফরাসি ম্যাগাজিন 'প্যারিস ম্যাচ'-এর প্রচ্ছদে দেখতে পান একজন তরুণ নিগ্রো ফরাসি ইউনিফর্ম পরে ওপরের দিকে তাকিয়ে স্যালুট ঠুকছে, সম্ভবত সে তিনরঙা ফরাসি পতাকার দিকে তাকিয়ে ছিল। কোনো অর্থ পেতে চাইলে প্রথম স্তরে আমাদের ইমেজটির প্রতিটি দ্যোতককে (সিগনিফায়ার) যথাযথ ধারণায় সঙ্কেতোদ্ঘাটিত (ডিকোড) করতে হবে। এখানে দ্যোতকগুলো হলো সৈন্য, ইউনিফর্ম, স্যালুট-ঠোকা হাত, ওপরে-তোলা চোখ, ফরাসী পতাকা। এই একপ্রস্থ দ্যোতক এখানে সাধারণ যে-অর্থটি বর্ণনা করছে তা হলো, "একজন কালো সৈনিক ফরাসি পতাকাকে স্যালুট করছে" (নির্দেশিত অর্থ বা ডিনোটেটিভ মিনিং)। কিন্তু বার্থ বলছেন এই ইমেজের একটা বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অর্থও রয়েছে। যদি আমরা প্রশ্ন করি, "কালো সৈন্য ফরাসি পতাকাকে স্যালুট করছে, এই ছবির মাধ্যমে 'প্যারিস ম্যাচ' কী বোঝাতে চাচ্ছে?" বার্থ মনে করছেন এর উত্তরে আমরা এই বার্তা পেতে পারি যে: ''ফ্রান্স একটা বৃহৎ সাম্রাজ্য, এবং তার প্রতিটি নাগরিক, বর্ণনির্বিশেষে, তার পতাকার নিচে থেকে, বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাকে সেবা করে থাকে (নির্দেশিত অর্থ) এবং ফ্রান্সকে উপনিবেশবাদের দায়ে অভিযুক্ত করে থাকে যে-নিন্দুকেরা তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো উত্তর হয় না, যেখানে একজন নিগ্রো তার তথাকথিত নিপীড়কের প্রতি সম্মান দেখাতে কতোখানি উদ্যমী তা দেখা যাচ্ছে (গূঢ়ার্থ বা কনোটেটিভ মিনিং)।"

বার্থের এই প্রকৃত বার্তা খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি যাই ভাবুন না কেন, যথাযথ সেমিওটিক বিশ্লেষণের জন্য আপনাকে অবশ্যই বিভিন্ন স্তরের সূক্ষ্ম সীমারেখা বের করতে পারতে হবে, যে-পদ্ধতিতে এই বৃহত্তর অর্থ উৎপাদনের বিষয়টি বের হয়ে আসবে। বার্থ বলছেন এখানে রেপ্রিজেন্টেশন ঘটছে দুইটি ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায়। প্রথমত, দ্যোতক (ইমেজের উপাদান) ও দ্যোতিত (ধারণাসমূহ -- যেমন সৈন্য, পতাকা এবং অন্যান্য) মিলে একটা চিহ্ন গঠন করছে যার একটা নির্দেশিত অর্থ রয়েছে: 'কালো সৈন্য ফরাসী পতাকাকে স্যালুট ঠুকছে'। দ্বিতীয় স্তরে এই সমাপ্ত বার্তা বা চিহ্ন আরেকপ্রস্থ দ্যোতকের সঙ্গে সম্পর্কিত হচ্ছে -- সেটি হলো ফরাসি উপনিবেশবাদ সম্পর্কিত একটা বৃহত্তর, আদর্শগত থিম। প্রথম সমাপ্ত অর্থটি রেপ্রিজেন্টেশন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্তরের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এবং যখন একজন পাঠক এই দ্যেতককে বৃহত্তর থিমের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ছেন তখন মুহূর্তের মধ্যে অধিক বিস্তৃত ও আদর্শগতভাবে কাঠামোবদ্ধ বার্তা বা অর্থ পাচ্ছেন। বার্থ এই দ্বিতীয় ধারণা বা থিমের একটা নাম দিচ্ছেন -- তিনি একে বলছেন "'ফরাসি উপনিবেশবাদ' ও 'সামরিকায়ন'-এর উদ্দেশ্যমূলক মিশ্রণ।" তিনি বলছেন এই মিশ্রণ ফরাসি উপনিবেশ ও তার বিশ্বাসী নিগ্রো সেনা-জোয়ানের জন্য দেয় বার্তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ করে। বার্থ এই দ্বিতীয় স্তরের দ্যোতনায়নকে বলছেন মিথ-এর স্তর। এই প্রসঙ্গে তিনি যোগ করছেন, "মিথটির পিছনে ফরাসি উপনিবেশবাদই তাড়না হিসেবে কাজ করছে। ধারণাটি একসারি কার্যকারণ ও ফলাফল, অভিসন্ধি ও ইচ্ছাকে পুননির্মাণ করে ...। এই ধারণার মাধ্যমে ... একটা সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাস ... মিথটির মধ্যে রোপিত হয় ... ফরাসি উপনিবেশবাদের ধারণা ... বিশ্বের সমগ্রতার সঙ্গে আবার জুড়ে দেওয়া হচ্ছে; ফ্রান্সের সাধারণ ইতিহাসকে এর ঔপনিবেশিক অভিযানের সঙ্গে, এর বর্তমান সঙ্কটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।"

আমরাও পারি
রোলাঁ বার্থ নির্দেশিত পথে আমরা যেকোনো ধরনের রেপ্রিজেন্টেশনের দ্যোতক ও দ্যোতিতের সাহায্য নিয়ে নির্দেশিত অর্থের পাশাপাশি গূঢ়ার্থ বের করতে পারি। একটি বিজ্ঞাপনের চিত্রে পণ্যের সঙ্গে নারী-মডেলের সম্পর্কের যে-মিথ কিংবা পর্যটনের প্রচারপত্র/পোস্টারে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক রেপ্রিজেন্টেশনের যে-মিথ, হংকং-সাংহাই ব্যাংকের বাংলা ভাষার প্রতি দরদের যে-মিথ, এসবকিছুকে বুঝতে এর পেছনের রাজনীতিকে বোঝা প্রয়োজন। বার্থের পদ্ধতি আমাদের সেই উপলব্ধিতে পৌঁছতে সাহায্য করে।

তথ্যসূত্র: স্টুয়ার্ট হলের গ্রন্থ 'রেপ্রিজেন্টশন: কালচারাল রেপ্রিজেন্টশন এন্ড সিগনিফাইং প্র্যাকটিসেস' (লন্ডন: দি ওপেন ইউনিভার্সিটি, ১৯৯৭)।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৪৭
১৫টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×