somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজাকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা: মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে মৌলবির বিবর্তন, পর্ব ১

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জাতিরাষ্ট্র যদি, বেনেডিক্ট এন্ডারসনের ভাষায় একটি কল্পিত সমাজ (ইমাজিনড কমিউনিটি) অথবা গায়ত্রী স্পিভাকের ভাষায় কৃত্রিম নির্মাণ (আর্টিফিশিয়াল কনস্ট্রাক্ট) হয়ে থাকে, তবে তার কল্পিত ঐক্য ও সংহতির জন্য লাগাতারভাবে একটি আদর্শ জাতীয়তার অবয়ব বা বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে হয় এবং কিছু রেপ্রিজেন্টশন-পদ্ধতির (স্টুয়ার্ট হলের মতে) মাধ্যমে এ-নির্মাণের কাজটি করতে হয় সেই অবয়ব বা বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখার জন্যও। সংবাদপত্র, সাহিত্য বা শিক্ষা সেই রেপ্রিজেন্টশনের দায়িত্বটি বরাবর পালন করে এসেছে। অপেক্ষাকৃত অধুনা মাধ্যম চলচ্চিত্রও বিশ্বব্যাপী জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীন ও শিল্প-সম্মত চলচ্চিত্রের যে-ধারা, সে-ধারার পরিচালকেরাও উৎসাহের সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তা গঠন, সংরক্ষণ ও প্রচারণার কাজটি করে চলেছেন। যেমন এদেশের শিল্প-সম্মত চলচ্চিত্রের বিরাট অংশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত।

এ-নিবন্ধ এ-রকম একটি বিশ্লেষণে নিযুক্ত হতে চায় যে, মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্রসমূহের একটি অপরিহার্য চরিত্র রাজাকার, যাকে নির্দ্বিধায় একজন গোঁড়া মুসলিম বা মৌলবি চরিত্রে দেখানো হতো, সাম্প্রতিক সময়ের কিছু চলচ্চিত্রে সে-মৌলবির ভূমিকা পাল্টে গেছে, ভালোভাবে বললে বলতে হয় উল্টে গেছে এবং তাকে ইদানীং এমনকি মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রেও দেখা যাচ্ছে।

এ-মূল আলোচনায় যাবার পূর্বে আমাদের একটু আলোকপাত করার প্রয়োজন, বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের যে-ধারা, তার দিকে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করতে গেলে পাওয়া যাবে তিনটি ধা: বাঙালিত্ব, মুসলমানিত্ব ও লোকধর্ম। বাঙালিত্ব হলো এ-মানুষগুলোর ভাষিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, মুসলমানিত্ব হলো এ-জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় এবং লোকধর্ম হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চর্চিত গৌন ধর্মসমূহ। আমাদের আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্সকে ঘিরে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের বিতর্ককে নিয়ে বহু দিস্তা কাগজ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু লোকধর্মের বিষয়টিকে এ-আলোচনায় অনুপ্রবেশের অনুমোদন দেয়া হয়নি। হাজার বছর ধরে বাঙালিত্বের বিকাশ ঘটেছে ধীরে-ধীরে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরায়েজি-সহ অন্যান্য ইসলামি সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গে মুসলমানিত্বের উত্থান ঘটেছে। পাকিস্তান গঠিত হয়েছিলো মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে, আর বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিলো বাঙালিত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আত্মপরিচয়ের এ-দুই ধারাই চালু আছে। মোটা দাগে বড়ো দুটি দলের মাধ্যমে। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সময়ে এ-দুই ধারা বিবাদমান ও প্রায়শঃ দলীয় সহিংসতা পর্যন্ত গড়ায়। বলা বাহুল্য, বাঙালিত্বের ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুসলমানিত্বের অনুসারীরাই বেশিরভাগ সময় দেশ শাসন করেছে এবং বিগত জোট সরকারের আমলে তারা প্রভূত আস্কারা পেয়েছে ও শক্তি অর্জন করেছে।

আত্মপরিচয়ের এ-দুই ধারার উন্মেষের বহু আগে থেকেই বঙ্গে লোক-ধর্মের অস্তিত্ব ছিলো এবং বস্তুতঃ লোক-ধর্মই মূল আত্মপরিচয় ছিলো। প্রাচীন কালে বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, মধ্যযুগে সুফি ইসলাম ও ব্রিটিশ আমলে হিন্দু বৈষ্ণবধর্ম বঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিলো। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে যদি মূল রক্ষণশীল ধর্ম প্রাধান্যশীল থাকে, তবে বঙ্গে বরাবরই মূল ধর্মের এ-সব উদারনৈতিক ধারা বিকশিত হয়েছে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দিতে এ-তিন ধারার সম্মিলন ঘটে বাউল মতবাদের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দির ইসলামি সংস্কারের কারণে বাউল ও অন্যান্য লোক-ধর্ম প্রবল বাধার সম্মুখীন হয় এবং তারা সমাজের মূলস্রোত থেকে সরে গিয়ে উপধর্ম বা সাব-কালচার হিসেবে আত্মগোপন ও আত্মরক্ষা করে। তবে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে লোক-ধর্মসমূহের প্রভাব ঠিকই রয়ে গেছে, তা তারা বাঙালিত্ব বা মুসলমানিত্ব যারই অনুসারী হোক না কেনো। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের তুলনায় বাঙালি মুসলমানের অপেক্ষাকৃত উদার হবার কারণ আসলে এটিই।

যাহোক, অন্যান্য মাধ্যমের মতো চলচ্চিত্রে লোক-ধর্মকে উপেক্ষা করা হলেও বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের দ্বন্দ্বের বিষয়টি ভালোভাবেই এসেছে। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্রে এটা প্রকটিত হয়ে ওঠে। তানভীর মোকাম্মেলের ইতোমধ্যে নির্মিত ১৫টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৫টি, মোরশেদুল ইসলামের ১১টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৪টি এবং তারেক মাসুদের ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৩টি মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক। স্বাধীনধারার শীর্ষস্থানীয় এ-নির্মাতারা ছাড়াও মূলধারার চাষী নজরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের খ্যাতি রয়েছে। এ-সব চলচ্চিত্রে সাধারণত এরকম একটি রাজাকার চরিত্র থাকে, যেটি সাধারণত শান্তি-কমিটির সদস্য হয়ে থাকে এবং যার কাজ হলো আক্রমণকারী পাকিস্তানী মিলিটারিকে সহায়তা করা -- যা কি-না মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীকে নারীসরবরাহ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরা একটু বয়ষ্ক ও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী-টুপি পরিহিত, এদের মুখে দাড়ি থাকে -- অর্থাৎ রাজাকার ও মোল্লা এভাবে সমার্থক হয়ে ওঠে। এ-চরিত্রগুলোর চিত্রায়ণ এরকম ধারণা দেয় যে, কট্টর ইসলামপন্থী হবার পরেও এরা একেকজন সাক্ষাৎ শয়তান, এরা কেবল সেনাদের নারীসরবরাহই করে না, নিজেরাও যথেষ্ট নারী-লোলুপ। এরা সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়ি দখল করে মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে এবং স্ত্রী থাকার পরও হিন্দু নারীর দখল নেয়। এ-ধরনের মৌলবি-রাজাকার চরিত্র পাওয়া যাবে মোরশেদুল ইসলামের আগামী (১৯৮৪) ও তানভীর মোকাম্মেলের নদীর নাম মধুমতী (১৯৯৫) ছবিতে।

অবশ্য এ-স্টেরিওটাইপ কেবল চলচ্চিত্রে নয়, সাহিত্য, থিয়েটার সব শিল্প-মাধ্যমেই দেখা যায়। একথা ঠিক, ১৯৭১ সালের রাজাকাররা কোনো না কোনো ইসলামপন্থী দলের সদস্য ছিলো। কিন্তু তারা সবাই বয়ষ্ক টুপি-পরিহিত ছিলো না। তাদের অনেকেই বয়সে তরুণ ও আমাদের মতোই শার্ট-প্যান্ট পরিধান করতো। রাজাকারের মতো দেশ-বিরোধী ও দানবীয় চরিত্রের সঙ্গে মুসলমানিত্বের বেশবাস ও ম্যানারিজম যুক্ত করিয়ে দেয়াটাই সমস্যা-জনক।

প্রশ্ন হলো এ-সমস্যা কেনো দেখা দেয়?

বাকি অংশ: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৬
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×