somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজাকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা: মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে মৌলবির বিবর্তন, শেষ পর্ব

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব: Click This Link

এ-সব নির্মাতা-স্রষ্টারা মূলত চিন্তাভাবনায় আধুনিক ও বাম-ঘেঁষা হলেও ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্য দিয়েই পশ্চিমা আধুনিকতা ও বাম-ভাবনার স্থানীকীকরণ ঘটে। ফলে বাঙালি মুসলমানের বাঙালিত্বের অংশটুকুই তারা একমাত্র আত্মপরিচয় বলে ভাবতে চান। এজন্য মুসলমানিত্বের অংশটুকুকে তারা বাতিল করতে চান। ইসলামের অনুসারীরা তাদের কাছে 'অপর'। কেবল রাজাকার-মৌলবি নয়, 'লালসালু'র (তানভীর মোকাম্মেল, ২০০১) মজিদ বা 'বৃষ্টি'র (মোরশেদুল ইসলাম, ২০০০) হাজী সাহেব চরিত্রের নির্মাণেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। নির্মাতা যে-ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছেন এবং তার চলচ্চিত্রের সম্ভাব্য দর্শক-যে মধ্যবিত্ত, এ-শ্রেণী-বলয়ের কাছে একজন মৌলবি পশ্চাৎপদ, প্রাচীন ও প্রগতি-বিরোধী। আর তাকে যদি রাজাকার চরিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা যায়, তবে তো অপরায়নের ষোলকলা পূর্ণ হয়।

বাংলাদেশে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের আত্মপরিচয়-জনিত যে-বিবাদ ও বিতর্ক, এ-চলচ্চিত্রগুলো তা কমিয়ে আনার পরিবর্তে বাড়িয়ে তোলে। মুসলমানিত্বের অনুসারী যে-নিরীহ নাগরিক, তিনি এ-সব ছবির সঙ্গে দূরত্ব অনুভব করেন। মন্দের সঙ্গে মৌলবির মিশেল তার জন্য অস্বিস্তিকর হয়ে ওঠে। কারণ তিনি নিজে মৌলবী হলেও হয়তো ওরকম মন্দ নন। বা একাত্তরে তিনি বা তার পিতা-চাচা মৌলবি ছিলেন বা এখনও মৌলবিই আছেন, কিন্তু রাজাকারী করেননি। এ-সব চলচ্চিত্র তার কাছে তাই বৈদেশিক-কিছু মনে হয়।

মাটির ময়নার (তারেক মাসুদ, ২০০২) কাজী চরিত্রটি এদিক থেকে ব্যতিক্রম। সে-মৌলবি কিন্তু রাজাকার নয়। সব মৌলবিই কিন্তু একাত্তরে রাজাকার হয়নি, বরং তাদের বেশিরভাগই হয়তো কাজীর মতোই ছিলো, যারা এক-সময় পাকিস্তান-আন্দোলন করেছে, কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না। ঘটনার দ্রুতবেগ তাদের দ্বিধান্বিত করে তোলে এবং সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান-ভঙ্গ তার কাছে হৃদয়-ভঙ্গের মতোই ব্যাপার। তার মানে এ-নয় যে, সে রাজাকারীতে নেমে পড়ে। জাতীয়তাবাদী-আন্দোলনে যুক্ত মার্ক্সিস্ট মিলনেরও সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে যায় লোক-ধর্মের অনুসারী করিম মাঝির কাছে, যাকে মিলন মৌলবাদী গালি দেয়ায় মাঝি বলে, "প্রকৃত কোনো ধর্মই মানুষকে অন্ধ করে না, বরং চোখ খুলে দেয়।" হয়তো সেই প্রকৃত ধর্ম বড়ো হুজুরের রাজনৈতিক ইসলাম বা কাজীর শাস্ত্রীয় ইসলাম নয়, ইব্রাহিম হুজুরের সুফি ইসলামই মানবমুক্তির প্রকৃত পন্থা; অন্তত পরিচালক সে-রকমই মনে করেছেন।

'মাটির ময়না' ২০০২ সালে নির্মিত হলেও তার চিত্রনাট্য ও নির্মাণ-পর্ব শুরু হয়েছিলো ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের আগেই। নাইন-ইলেভেনের আগে মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্রে রাজাকার ও মৌলবি সমার্থক। নাইন-ইলেভেন পর্বে আমরা পাচ্ছি ব্যতিক্রমী এক মৌলবি কাজীকে, যার প্রতি পরিচালক মনোযোগী ও সংবেদনশীল ছিলেন। কিন্তু নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী সময়ের মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্রে আমরা দেখছি মৌলবির ভূমিকা বদলে গেছে। যে আগে ছিলো রাজাকার, সে এখন মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বা খোদ মুক্তিযোদ্ধা।

এ-পর্বের চলচ্চিত্র হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের 'শ্যামল ছায়া' (২০০৪) ও তৌকীর আহমেদের 'জয়যাত্রা'র (২০০৪) কথা বলা যায়। দু-টি ছবিই একই বছরে নির্মিত এবং ছবি দু-টির কাহিনীও প্রায় একই। শ্যামল ছায়া বাংলাদেশের ছবি হিসেবে অস্কারে যায় এবং জয়যাত্রা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার ও ২০০৪ সালের শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে জাতীয় পুরস্কারও পায়। দু-টি ছবিতেই গ্রামের কিছু লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে একটি নৌকায় সমবেত হয়েছে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, দু-টি ছবিতেই রাজাকার হিসেবে দু-টি চরিত্র ছিলো, কিন্তু চরিত্রগুলো ছোট। এবং 'জয়যাত্রা'র রাজাকারকে দেখা গেছে একটি মাত্র দৃশ্যে। সে-বয়সে তরুণ ছিলো ও তার মাথায় টুপি থাকলেও দাড়ি ছিল না। অর্থাৎ মৌলবিপনা খানিকটা কমে এসেছে। 'শ্যামল ছায়া'র রাজাকার তো রীতিমতো খাকির শার্ট-প্যান্ট পরা বখাটে চেহারার, যাকে এক-পর্যায়ে নৌকার অভিযাত্রীরা আটকে ফেলে এবং বস্তায় বেঁধে পানিতে ফেলে দেয়। তবে নৌকার যুবা মৌলবি তাকে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে দেয়। সে-একই রাজাকারের মানবিক গুণাবলীও পরে দৃষ্ট হয়, নদী-পথে রাজাকার বাহিনীর টহলের হাত থেকে নৌকাবাসীদের বাঁচিয়ে দেয় সে।

এই দু-ছবিতে রাজাকারের মৌলবিপনার এক-রকম মুক্তি ঘটেছে। কিন্তু দু-ছবিতেই অন্য মৌলবি চরিত্র আছে। 'জয়যাত্রা'য় দেখা যায়, যখন পাক-সেনারা গ্রামে ঢুকে, তখন তাদের জেরার মুখে পড়েন মসজিদের ইমাম। তিনি পাক-সেনার নৃশংসতার প্রতিবাদ করেন এবং পাক-সেনার হাতে শহিদ হন। এভাবে একজন মৌলবি হন চলচ্চিত্রের প্রথম প্রতিবাদকারী ও শহিদ। আর শ্যামল ছায়ায় যুবা মৌলভী বলতে গেলে মূল-চরিত্র। তিনি নৌকা আরোহীদের মধ্যে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। তিনি রাজাকারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। তার গুণাবলির চরম নিদর্শন দেখি অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি তার উদারতায়। নৌকায় আরোহীদের মধ্যে কয়েকজন ছিলো হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাদের অন্য আরোহীরা প্রথমে নৌকায় নিতেই চায়নি, কারণ হিন্দু সংখ্যালঘুরা ছিলো পাক-সেনাদের প্রথম টার্গেট। নৌকায় হিন্দু আছে এটা পাক-বাহিনী বা রাজাকার-বাহিনী জানতে পারলে সবারই ঘোর বিপদ। কিন্তু যুবা মৌলভীর উদ্যোগেই মূলত তারা নৌকায় ঠাঁই পায়। আবার এ-চরম প্রতিকূল পরিবেশেও হিন্দু চরিত্রগুলো অস্বাভাবিকভাবে অর্চনা-প্রিয়। বিপজ্জনক অভিযাত্রায়ও তারা পূজায় পরম আগ্রহী। বিপদ ডেকে আনার বন্দোবস্ত করায় মুসলমানরা হিন্দুদের ধমক দেয় ও বকাঝকা করে, কিন্তু যুবা মৌলবি বলে ওঠেন, আল্লাহ পাক বলেছেন, লাকুম দ্বিনীকুম ওয়ালিয়া দ্বীন ... ইত্যাদি। একাত্তরের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে যুবা মৌলবির এ-অতি-উদার ভূমিকা বাস্তবতার নিরিখে অস্বাভাবিক। এক মৌলবির মধ্যেই যাবতীয় গুণাবলীর সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এটা আশ্চর্যের।

চলচ্চিত্রে মৌলবির ভূমিকার এ-বিবর্তনের ব্যাখ্যা আমাদের করতে হবে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। নির্মাতা ও তার চলচ্চিত্রের দর্শকের জন্য যে-মৌলবি একসময় 'অপর' ছিলো, সেই মৌলবির প্রতিই এখন তিনি একাত্মতা বোধ করছেন। কারণ আধুনিক ও পশ্চিমা মতাদর্শী হবার পরও পশ্চিম আর তাকে নিজের ভাবছে না। মুসলমান নামধারী সবাই এখন পশ্চিমের কাছে অপর, শত্রু ও টেররিস্ট। পশ্চিমের অপরায়নের পাল্লায় পড়ে ধর্ম-নিরপেক্ষ মুসলিম আর শাস্ত্রীয় বা রাজনৈতিক মুসলিম একাকার হয়ে যাচ্ছে। মৌলবিকে আর তাই রাজাকারের মতো ভয়ঙ্কর চরিত্রে বসানো চলে না। বরং তার প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। এ-পরিস্থিতি এমনকি তাকে মুক্তিযোদ্ধা বা পাক-সেনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী দেখানোও চলে। কারণ সম্ভাব্য দর্শকও মৌলবিকে আগের মতো দানবীয় চরিত্রের চাইতে মানবিক চরিত্রে দেখতে চাইবে।

[সমাপ্ত]

কৃতজ্ঞতা: এ-নিবন্ধটির মূল থিম চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সঙ্গে আলাপ-কালে প্রাপ্ত।
প্রথম প্রকাশ: ইউকেবেঙ্গলি ডট কম-এর বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যা, ২০০৮ (http://www.ukbengali.com/)

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:১০
১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×