পরিহাস হলো, এই কীর্তিমতীরা হেঁশেল থেকে বেরিয়ে এসে সমাজে নিজপরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠার পুরস্কারস্বরূপ পেলেন রাঁধুনীর এই পুরস্কার। বড়োই আমোদের কথা। রাঁধুনী হলো স্কয়ার-উৎপাদিত মসলাজাতীয় দ্রব্যের ব্রান্ড।
নারীদিবস এলেই প্রতিবছর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠাগুলো নানা ধরনের পরিহাসের জন্ম দেয়। এবছরের পরিহাস হলো হেঁশেলছাড়া কীর্তিমতীর জন্য রাঁধুনী-পুরস্কার। এর আগে আমরা দেখেছে খোদ নারী-দিবসকে ‘পন্ডস নারী দিবস’ হিসেবে প্রচার করতে। এরকমও দেখা গেছে যে ফেয়ার এন্ড লাভলী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে কম্পিউটার ইত্যাদি উপহার দিতে। ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় কালো মেয়ে চাকরি পাচ্ছেনা, ক্রিম মেখে ফর্সা হওয়ামাত্রই চাকরি জুটে যাচ্ছে। যে পণ্য নারীকে এরকম বর্ণবাদী দৃষ্টিতে দেখে, তারাই আবার নারীর উন্নয়নের জন্য ফাউন্ডেশন বানায়, তাতে উপদেষ্টা হন নারীনেত্রী। পরিহাসের পরাকাষ্ঠা যাকে বলে!
কীর্তিমতীরা নিশ্চয়ই এখনও নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে হেঁশেলে ঢোকেন, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে তারা কীর্তিমতী হয়েছেন নারীর রাঁধুনী-ইমেজকে অতিক্রম করেই। কিন্তু হেঁশেল থেকে এতদূরের রাস্তা পাড়ি দেবার পরেও তারা সানন্দে রাঁধুনীর সম্মাননা নিচ্ছেন, সমস্যাটা এই জায়গায়। এই সমস্যাকে ধরে আগালে আমরা মিডিয়া-নাগরিক/সুশীল সমাজ-কর্পোরেটের মিথোজীবী (symbiotic) সম্পর্ককে আরেকবার স্পষ্টভাবে ধরে ফেলতে পারবো। কীর্তিমতীদের কীর্তি নিয়ে আমাদের সন্দেহ নাই, আমাদের মনে খচখচ করে, এত কীর্তির পরে তারা কিনা নিলেন রাঁধুনীর পুরস্কার!
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কীর্তিমতীরা ছাড়াও স্কয়ারের অঞ্জন চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, চ্যানেল আই-এর প্রধান নির্বাহী ফরিদুর রেজা সাগর, তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ট রোকেয়া আফজাল রহমান, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও নারী প্রতিনিধিরা।
সংবাদে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে মতিউর রহমান তিন গুণী নারীকেই প্রথম আলো পরিবারের অংশ বলে উল্লেখ করেন। মজাটা এইখানে। সুমনা শারমিন প্রথম আলো পরিবারের সদস্য বটেন। কিন্তু বাকী দুইজন কীভাবে? মতিউর রহমান না বললেও বোঝা যায় বাকী দুইজন পত্রিকাটির সহযোগী সদস্যের মতো। বিউটিশিয়ান কানিজ আলমাস প্রথম আলোর নকশা পাতার এক্সপার্ট, নারীর রূপ-ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তার কারবার। তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, নারীনেত্রী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি (যাকে সমাজসেবা ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয়া হয়েছে) সুলতানা কামাল প্রথম আলোর মধ্য বা প্রথম পাতার একজন এক্সপার্ট। প্রথম আলো পরিবারের এই সদস্যদের পুরস্কার দিচ্ছে শীর্ষ কর্পোরেট-কোম্পানি। এই কোম্পানিও প্রথম আলো পরিবারের বাইরের কেউ না, নিয়মিত বিজ্ঞাপন তো তারা দিচ্ছেই, আরও নানা কর্মসূচিতে তারা প্রথম আলোর সঙ্গে তারা যুক্ত (যেমন প্রথম আলো-মেরিল পুরস্কার)। অনুষ্ঠানে ফরিদুর রেজা সাগরের ভূমিকা কী ছিল তা অস্পষ্ট নয়, মুদ্রণ মাধ্যম প্রথম আলোর সঙ্গে সুশীল-কর্পোরেটের যে সৌহার্দ্য, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম চ্যানেল আই-এর সঙ্গেও তাদের সেরকমই সুসম্পর্ক। তাই প্রথম আলো-চ্যানেল আই-এর যূথবদ্ধতাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। নারী দিবসে নারীদের (সুলতানা, সুমনা, কানিজ) সম্মাননা জানানো তাই মিডিয়া(মতি-সাগর)-সুশীল(রোকেয়া-সুলতানা)-কর্পোরেটের(অঞ্জন) মিথোজীবী সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখা ও অন্যদের জানিয়ে রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই চক্র একইরকম ভাবে, কীরকম বাংলাদেশ তারা দেখতে চায় সেবিষয়ে তাদের ঐক্য আছে। সব প্রতিষ্ঠানের বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে নির্বিবাদী ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারার একটা পরিবেশ চায় এই চক্র। তাদের এই ঐক্য বাংলাদেশের জন্য যে সম্পূর্ণ সুখকর হবেনা, তা বোঝা যাচ্ছে কীর্তিমতীকে রাঁধুনীর পুরস্কার দেবার মতো তামাশা দেখে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

