somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাইবারকমিউনিটি: একটি তাত্ত্বিক আলোচনা

২৮ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাইবারকমিউনিটির বিরুদ্ধে একটা পুরনো অভিযোগ হলো এটা প্রকৃত সমাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখে এবং এভাবে প্রকৃত সমাজের ধ্বংসসাধন করে। অর্থাৎ প্রথাগত সমাজে মানুষে মানুষে যে সামাজিক সম্পর্ক সেটা নষ্ট করে ফেলে। কথাটা অনেকখানি সত্যি হলেও কালক্রমে এটা প্রকৃত সমাজের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশ হিসেবে হাজির হয়েছে; হাওয়ার্ড রেইনগোল্ড যেমন বলেছেন, ‘ভার্চুয়ালিটি হলো প্রথাগত সমাজের প্রাযুক্তিক সংস্করণ’ (রেইনগোল্ড, ১৯৯৩)।

প্রকৃত সমাজে মানুষের মিথস্ক্রিয়া, ইন্টারনেটের কারণে, কমে আসলেও সাইবারপরিসরে নতুন নতুন কমিউনিটর সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ হলো প্রকৃত সমাজের মতো সাইবার সমাজ ‘খাঁটি’ নয়। এর সদস্যরা হলো বুদ্ধিবৃত্তিহীন, নৈতিকতার প্রতি দায়হীন, আসল পরিচয় লুকিয়ে ছদ্মনামে ছদ্মসমাজে ছদ্মমিথস্ক্রিয়া হয় এখানে। কিন্তু জেরার্ড দেলান্তি মনে করেন, প্রযুক্তি ঘিরে বেড়ে ওঠা কমিউনিটি মানেই তাতে নৈতিকতার বালাই থাকবে না এমন নয় (দেলান্তি, ২০০৩: ১৭১)। ছদ্মপরিচয়ই ভার্চুয়ালিটির মূলকথা নয়, বরং প্রকৃত সমাজের নানা ইস্যুকে ঘিরে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-কর্মসূচি নির্ধারণ প্রভৃতিতে সাইবারসমাজ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। আবার সাইবারসমাজ যেহেতু ভৌগোলিক সীমা সহজেই ডিঙোতে পারে তাই সাইবারকমিউনিটিকে আশ্রয় করার কারণে এধরনের কর্মসূচির শক্তি ও বিস্তৃতি বেড়ে যায়। সাইবারসমাজের আরেকটি শক্তির দিক হলো বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে এর অবিসংবাদিত ভূমিকা -- মালিকানা, বিজ্ঞাপন, সরকার প্রভৃতি চাপে যখন মূলধারার মিডিয়া প্রকৃত সংবাদ প্রায়ই দিতে পারেনা, সাইবারপরিসরে সেই অজানা সংবাদ বা কাহিনী সহজেই উঠে আসে। অনেক পণ্ডিত ও এ্যাক্টিভিস্টের লেখা মূলধারার মিডিয়ায় ঠাঁই পায়না, কিন্তু সাইবারপরিসরের মাধ্যমে তাদের মতাদর্শ ও জ্ঞান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী।

আবার প্রকৃত সমাজ কতটা ‘প্রকৃত’ তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, বেনেডিক্ট এন্ডারসন (১৯৯১) সেই প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, প্রাচীন কালের গ্রাম ছাড়া (যেখানে মানুষে মানুষে মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়া হতো) সব কমিউনিটিই কল্পিত। তিনি এমনকি প্রাচীন গ্রামগুলোও কতটুকু প্রকৃত সমাজ ছিল তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার কাছে তাই জাতিরাষ্ট্র একটি ‘কল্পিত সমাজ’। কারণ একটি দেশের বেশিরভাগ মানুষই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করেনা এবং হয়তো কোনোদিন পরস্পরের দেখাও হবেনা। দেখা যাচ্ছে প্রকৃত সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি, তা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত নয়, কল্পিত। ক্রেইগ কলহাউন তাই কমিউনিটিকে বোঝার ক্ষেত্রে স্থানিক পরিচয়ের পরিবর্তে সামাজিক সম্পর্ককে বিবেচনায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। রাষ্ট্রের স্থানিক সীমা আছে, পরিচয় আছে, কিন্তু তাও কল্পিত; সাইবারসমাজের স্থানিক পরিচয় নাই, তা কল্পিতও বটে, কিন্তু একে উপেক্ষা করার উপায় নাই। কারণ সাইবারসমাজের সদস্যদের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করা অসম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক উদ্দেশ্যহীন, কমিটমেন্টবিহীন মনে হলেও, তা সর্বাংশে সত্যি নয়, বরং এই সমাজের অনন্য কিছু শক্তির দিক আছে যা প্রথাগত সমাজেরও নেই।

আর সাইবারকমিউনিটিতে এত এত মানুষ যুক্ত হওয়ার পেছনে প্রথাগত সমাজের ব্যর্থতাও একটা কারণ। রেইনগোল্ড একে বলেছেন ‘কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা’। নগরায়ণ ও আধুনিকতার কারণে প্রথাগত সমাজ এমনিতেই ভেঙ্গে পড়েছে। পশ্চিমা ও উন্নত দেশগুলোতে এটা খুব বেশি প্রযোজ্য। রেইনগোল্ড বলছেন, আমাদের জন্য বরাদ্দ আছে অটোমোবাইল, হাইরাইজ, উপশহর, ফাস্টফুড, শপিং মল-এর এক জীবন যা হলো বিচ্ছিন্ন, একাকী ও শূন্য (রেইনগোল্ড, ১৯৯৯)। কমিউনিটি হারিয়ে গেছে। সাইবারকমিউনিটি হলো হারিয়ে যাওয়া সমাজকে পুনর্নির্মাণের প্রয়াস।

ম্যাকমিলান ও চ্যাভিস (১৯৮৬) কমিউনিটির ধারণার যেসব পূর্বশর্তের কথা বলেছেন, তা সাইবারকমিউনিটি পূরণ করে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। তাদের মতে কমিউনিটির ধারণায় নিম্নলিখিত এর সদস্যদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বোধ করতে হবে:

প্রথমত, কমিউনিটির সদস্য হওয়া এবং কমিউনিটির সদস্য হিসেবে একাত্ম বোধ করা;
দ্বিতীয়ত, কমিউনিটিকে প্রভাবিত করা এবং কমিউনিটি দ্বারা প্রভাবিত হবার অনুভূতি বোধ করা;
তৃতীয়ত, অন্য সদস্যদের নানা সমর্থন দেয়া এবং অন্য সদস্য কর্তৃক সহায়তাপ্রাপ্ত হওয়া;
চতুর্থত, পরস্পরকে অনুভব করা, কমিউনিটির ‘স্পিরিট’কে ধারণ করা।

সাইবারকমিউনিটির সদস্যরা, অন্তঃত বাংলা ব্লগ কমিউনিটির ব্লগাররা এই চারটি পূর্বশর্ত পূরণ করেই ব্লগিং করে থাকেন।
১৪টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×