somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজ সকালে এক বিজ্ঞাপনপত্র পড়লাম

০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০২ সালের ডিসেম্বরের কোনো এক দিন ছিল সেটা। আমরা কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সেমিনার আয়োজন করেছিলাম, শিরোনাম ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাজারমুখিনতা ও ভিন্ন ভাবনার প্রস্তাবনা’। নীতিহীনভাবে হেথায়-হোথায় (নেমপ্লেট সরিয়ে, বিজ্ঞাপনের মাপে খবরকে ঝুলিয়ে-ঘুরিয়ে ইত্যাদি) বিজ্ঞাপন ছাপানো, খবরের ছদ্মবেশে বিজ্ঞাপনদাতার প্রমোশনাল বার্তা সর্বোপরি বাংলাদেশের কর্পোরেট মিডিয়ার কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা ছিল সেই প্রবন্ধে। সেই সেমিনারে প্রথম আলোর একজন সহকারী সম্পাদক হাজির ছিলেন আলোচক হিসেবে। তিনি ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন কী কী কারণে (পত্রিকার উৎপাদনমূল্যের তুলনায় ক্রয়মূল্য অনেক কম ইত্যাদি) তারা বিজ্ঞাপনের বা সর্বোপরি মুক্তবাজারীয় কর্পোরেট সংস্কৃতিকে মেনে নিচ্ছেন ইত্যাদি। তখন বিভাগীয় এক সহকর্মী-অধ্যাপক প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আমার টাকা আছে, আমি আপনার পত্রিকার প্রথম পাতাজুড়ে আমার ছেলের বিয়ের সংবাদ-চিত্র ইত্যাদি ছাপতে চাই। আপনি ছাপবেন কিনা? সেই প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাকমতো দিতে পারেননি সেই সহকারী সম্পাদক। প্রশ্নটা যে জিনিসটাকে সামনে এনেছিল, তা হলো পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন যেনযেতনভাবে ছাপা যায়না। সাংবাদিকতায় এরও একটা ন্যূনতম এথিকাল দিক আছে।

আজ প্রথম আলো দেখে আমার ৭ বছর আগের অধ্যাপকের উত্থাপিত প্রশ্নটি মনে পড়ে গেল। কারণ আজকের প্রথম আলোর সামনের-পেছনের অর্থাৎ প্রথম চার পাতার পুরোটা জুড়ে বিজ্ঞাপন ছিল। ওপরে নেমপ্লেট আছে, বামে-ওপরে লেখা আছে, রোববার, “মলাট-বিজ্ঞাপন খুললেই মূল পত্রিকা”, নগর সংসকরণ এবং প্রিন্টার্স লাইনের অন্যান্য তথ্য। অর্থাৎ ভেতরে মূল সংবাদপত্র আছে, কিন্তু মলাটময় বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনটি দিয়েছে সিটি ব্যাংক, বিষয়বস্ত: দি সিটি ব্যাংক নিয়ে সগৌরবে বাংলাদেশে নিয়ে এলো আমেরিকান এক্সপ্রেস (ক্রেডিট কার্ড)। পরে জানলাম এবং দেখলাম সহোদর পত্রিকা দি ডেইলি স্টারেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলোর তিনের পাতায় (সারা দেশ) সবচেয়ে বড় খবর এটাই। ভাবুন, সারা দেশের সবচেয়ে বড়ো খবর হলো সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড!

দৈনিকের ‘মলাট’ ধারণাটি এদেশের সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে নতুন। কিছুকাল আগে প্রথম আলো মলাটে করেছিল সেতু সংখ্যা (সেতু নির্মাণের নামে অনিয়ম-দুর্নীতি) আর দি ডেইলি স্টার করেছিল ‘মৃত/মৃতপ্রায় নদী’ (মানুষ যেভাবে নদী মারছে) সংখ্যা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনমালার এই দুটি উদ্যোগ প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু আজ সেই নবআবিষ্কৃত মলাট যখন বিজ্ঞাপনগায়ে হাজির হলো তখন সন্দেহ হলো, ওই দুই উদ্যোগের মাধ্যমে আজকের ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ‘মলাট’ ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, এখন মাঝে মাঝেই এই মলাটকে বিজ্ঞাপনজুড়ে পেশ করা হবে।

প্রথম আলোর একজন ঊর্ধ্বতন সাংবাদিকের কাছে এটা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর তিনি জানালেন স্বনামধন্য ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনও এটা করে। আরও অনেকেই করে। উল্টো আমাকে তিনি জানালেন সারাদেশের সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন এমনি এমনি দেয়া যায়না, এজন্য এসব করতে হয়।

আমার প্রশ্ন হলো যে পত্রিকা খবরের চাইতে আদর্শ বেশি করে বিক্রি করতে চায় (‘বদলে দাও, বদলে যাও’সহ অন্যান্য কর্মসূচি স্মর্তব্য), সেই পত্রিকা কেন সাংবাদিকতার ন্যূনতম আদর্শ লঙ্ঘন করবে? অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ও অনলাইন সাংবাদিকতার প্রসারের কারণে পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব তেমন পড়েনি এবং নতুন নতুন পত্রিকা-চ্যানেল বের হচ্ছে। অর্থাৎ পশ্চিমে সংবাদপত্র ক্ষয়িষ্ণু আর এদেশে বর্ধিষ্ণু। তাই হেরাল্ড ট্রিবিউনের উদাহরণ এক্ষেত্রে পুরোপুরি খাটেনা। আর পশ্চিমা মিডিয়া বলেই কর্পোরেট মিডিয়ার যেকোনো কার্যক্রম ছাড় পেয়ে যায়না, বা জায়েজ হয়ে যায়না। অন্তঃত আমরা অত দুর্বলমনা পর্যবেক্ষক নই। আর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকা। তাদের এই ‘টিকে থাকার কৌশল’ অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলনা। মুশকিল হলো তাদের মতো প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা এটা করার পর বাকিরাও একই কাজ করবে অনেক কম টাকার বিনিময়ে।

সংবাদপত্র আজ সত্যি সত্যি বিজ্ঞাপনপত্রে পরিণত হলো।

জয় সাংবাদিকতা!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:২৫
২৩টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×