সাংবাদিকের নিরাপত্তা: একমাত্র যে টেক্সট
আমি যে একটি বিষয়ের কথা বলছি, যা প্রেস ফ্রিডম ডে'র আলোচ্য, তা হলো সাংবাদিক নির্যাতন। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অন্যতম হুমকি, কারণ এ যে একেবারে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার ব্যাপার। বাংলাদেশ অবশ্যই পৃথিবীর মধ্যে এ ক্ষেত্রে একটি ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত-নিহত হয়েছেন এ রকম একসারি নাম সাংবাদিকতা-জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে পড়বে: শামছুর রহমান, মানিক সাহা, টিপু সুলতান, হুমায়ুন কবীর বালু, প্রবীর শিকদার, গৌতম দাস প্রমুখ। আর এসব হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের বিপরীতে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও বিচারব্যবস্থার চেহারা আমরা সবাই দেখি।
তবে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি একেবারে নির্ভেজাল প্রপঞ্চ নয়। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছেন, শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এর অন্তত দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, তিনি একেবারে সাপের খোঁড়লে হাত দিয়েছেন, ফলে দংশনে নীল হতে হয়েছে। স্থানীয় দুর্নীতির পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে ক্ষমতাবহুলদের মুখোশ উন্মোচন করে ফেলছেন, ফলে সাপের ছোবল খেতে হয়েছে। দ্বিতীয় যে-ব্যাপারটি অনুমান করতে কষ্ট হয় না -- কিছু অসমর্থিত তথ্যও ইথারে ভেসে বেড়ায় -- যে সাংবাদিক নিজেই ওই সব অর্থকরী, অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন এবং সেসব অপরাধ সামাল দিতে যথেষ্ট দক্ষ না হওয়ায় প্রতিপক্ষের আক্রমণের শিকার হন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেহেতু সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে, তাই সেখানকার আন্ডারগ্রাউন্ডের সশস্ত্র রাজনীতির সঙ্গে এই দুই বিষয় মিলিয়ে নিলে আমাদের কাছে নির্যাতনের প্রপঞ্চটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপরন্তু, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, সাংবাদিক, অপরাধী, ক্ষমতাবান -- সবাই পরস্পরের কাছে পরিচিত হওয়ায়, হাতের নাগালের মধ্যে সবাই সবাইকে পেয়ে যায় বলে নির্যাতনের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বলা যায়, নির্যাতিত সব সাংবাদিকই যে সততার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ও রকম দুর্ঘটের মুখোমুখি হয়েছেন, তা নয়। দুঃখজনক ও ঘৃণ্য এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসহই বলছি যে, সাংবাদিক নির্যাতনের ইস্যুটি আলোচনার সময় আমরা হয়তো নির্মোহ ও নিরাবেগ থাকি না।
বাংলাদেশ সংবাদকর্মী নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি অন্যতম ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। কিন্তু পরিস্থিতি অবশ্যই দুর্নীতিতে শীর্ষে যাওয়ার মতো ভয়ংকর নয়। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের ওয়েবসাইট (htp://www.cpj.org/killed/) থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৯২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশের তালিকায় সাংবাদিককে হত্যার নিরিখে সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ হলো ইরাক; সে দেশে কয়েক বছর ধরে চলা একপক্ষীয় যুদ্ধই দেশটিকে শীর্ষে নিয়ে এসেছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ১৪১ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এরপর যথাক্রমে রয়েছে ফিলিপাইন (৬৮), আলজেরিয়া (৬০), রাশিয়া (৫২), কলম্বিয়া (৪২, সোমালিয়া (৩২), পাকিস্তান (২৮), ভারত (২৬)। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি দেশ শ্রীলঙ্কাও (১৮) বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আর সারা বিশ্বে নিহত সাংবাদিকদের বিট বিবেচনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো রাজনীতি (৩৮%)। এরপর রয়েছে যুদ্ধ (৩৫%) ও দুর্নীতি (২১%)।
আমি সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টিকে মোটেও খাটো করে দেখছি না, স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত। এই রচনাকে সেভাবে ভুল বুঝলে লেখাটির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। আমার অবস্থান হলো, স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ব্যাহত করে এ রকম সব কটি বিষয়কে এই দিবসে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নিচে তেমন কয়েকটি বিষয় আলোচনা করা হলো।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ: প্রচলিত টেক্সট
প্রেস ফ্রিডম ডে-তে আলোচিত না হোক, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ যে-বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ইতোমধ্যে আলোচিত তা হলো, প্রেসের ওপরে সরকারের বা ক্ষমতাসীনের নিয়ন্ত্রণ। ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। পাকিস্তান আমলে প্রেসের রাজনৈতিক ভূমিকার কথা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে বেতার, সংবাদপত্র, টেলিভিশনের সাহসিকতার কথাও আমরা জানি। স্বাধীনতা-পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে মাত্র চারটি পত্রিকা বাদে বাকি সব পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথাও খুব আলোচিত। আর সবচেয়ে বেশি আলোচিত স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের 'প্রেস অ্যাডভাইস'-এর কথা। বর্তমানের 'গণতান্ত্রিক' সময়েও মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন নয়। মুদ্রণ মাধ্যমকে ছাড় দিলেও সরকার ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। কলম্বীয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের 'পর্নোগ্রাফিক অবসেশন' রয়েছে। টেলিভিশনকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের, তা যে-সরকারই হোক, মনোভাব খানিকটা সে রকমই। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চলে আসার পর কেবল নিরুপায় দর্শকেরাই -- যাদের কেবল-সংযোগ নেই -- বিটিভি দেখে থাকেন। কিন্তু বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ দেখেও মনে হয়, তা যেন বিটিভিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। উপস্থাপনা ও আঙ্গিকের কুশলতা রয়েছে কিন্তু আধেয়তে সেই প্রধানমন্ত্রীর স্লট, কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে কেবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের বয়ান। মুদ্রণমাধ্যমে আমরা কেবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সংবাদ হতে দেখি না, কিন্তু ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তা রীতিমতো শিরোনাম আকারে হাজির হয়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে মন্ত্রীদের চেয়েও সরকারি দলের যুগ্ম মহাসচিবের সংবাদ বেশি বেশি দেখা যেত। সংবাদ হওয়ার ক্ষেত্রে তার অন্যতম যোগ্যতা সম্ভবত তিনি প্রধানমন্ত্রীর বড় সন্তান এবং সরকারি দলটির মূল ক্ষমতা ভবিষ্যতে তার হাতেই যাবে। বোঝাই যায়, বেসরকারি টিভি-চ্যানেলগুলোর ওপর, অন্তত সংবাদের ওপর কড়া রকমের নিয়ন্ত্রণ সরকারের রয়েছে। এর আগে বিটিভির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে লুকোচুরি ও ধাপ্পাবাজি আমরা দেখেছি।
তবে মুদ্রণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের কথাও আমরা ভালোভাবেই জানি। প্রতিটি সরকারের কিছু পছন্দের পত্রিকা থাকে, কিছু অপছন্দের পত্রিকা থাকে। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন তার পছন্দের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, অপছন্দের পত্রিকা বাদ পড়ে যায়। পত্রিকার সার্কুলেশনের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন বণ্টনের কথা থাকলেও তা কখনোই কোনো বিবেচ্য বিষয় হয় না। এতে মুশকিলে পড়ে মাঝারি ও ছোট সার্কুলেশনের পত্রিকাগুলো, বড় পত্রিকাগুলো অবশ্য আজকাল সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর একেবারেই নির্ভরশীল নয়, যদিও সরকারি বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তির আলোচনায় তারাও যথেষ্ট সোচ্চার। বিশ্বায়নের কারণে গত দেড় দশকে বাংলাদেশেও বেসরকারি খাতের একটা বিকাশ হয়েছে। বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতারাই বড় পত্রিকা ও চ্যানেলগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণের এই নানা দিককেও প্রেস ফ্রিডম ডে’র আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ: অপ্রচল কাহিনি
বাংলাদেশের সরকারি খাত যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়, তাহলে বিগত দুই দশকে বিশ্বায়নের কারণে যে বেসরকারি খাত বিকশিত হয়েছে তা হলো দুর্বৃত্ত। সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথা এ দেশে খুব আলোচিত ও চর্চিত বিষয় হলেও বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি একেবারেই আলোচিত নয়। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রায় সব কটিই ওই 'দুর্বৃত্ত' বেসরকারি খাতের মালিকানাধীন হওয়ার কারণে এগুলো নিয়ে তারা একেবারেই আলোচনা করে না; সেটাই স্বাভাবিক। এসব তখনই কেবল আলোচনায় আসে যখন এক পত্রিকার মালিকের সঙ্গে অন্য পত্রিকার মালিকের বিবাদ শুরু হয়। তাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ, যা সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, তা এমনকি প্রেস ফ্রিডম ডে-তে অনালোচিত থেকে যায়।
বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপের ভেতরে থেকে যে সাংবাদিকতা, তা কীভাবে মুক্ত হতে পারে? তাদের প্রত্যক্ষ চাপ, পণ্যের খবরাখবর দেওয়ার নানা আবদারের কথাটি না-ই বা ধরলাম, যে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিনিয়ত পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন দেয়, তার কোনো 'দুর্বৃত্তায়ন'-এর খবর একটি পত্রিকা কীভাবে ছাপবে? ছাপছেও না। কয়েক বছর আগের একটা উদাহরণ দিই। আমার বিভাগের ওপরের ক্লাসের এক ছাত্র, তার কাছ থেকেই গল্পটা শোনা। তবে এ কিন্তু 'গল্প' নয়, নির্জলা সত্য ঘটনা। ছাত্রটি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিকে কাজ করে। সে জানতে পারে, গভীর রাতে কারা যেন ট্রাকভর্তি মাটি এনে গুলশান লেকে ফেলছে। সে কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করে, আশপাশের দোকানদারের কাছ থেকে জানতে পারে একটি বিরাট কোম্পানি, যার মালিক ক্ষমতাসীন দলের এমপি, এই দখলের পেছনে রয়েছে। আবিষ্কারের উত্তেজনায় কম বয়সী, অনভিজ্ঞ সেই রিপোর্টার বেশ ধারালো একটি প্রতিবেদন লেখেন, অফিসে জমা দেন। কিন্তু তার চিফ রিপোর্টার/নিউজ এডিটর তাকে ধমকে দেন: 'ওই মিয়া, জানো, এই কোম্পানি প্রতিদিন আমাদের কত বিজ্ঞাপন দেয়? এই রিপোর্ট যাবে না।' চিফ রিপোর্টার না বললেও রিপোর্টার মেসেজ পেয়ে যান, এ ধরনের প্রতিবেদন আর রচনা করা যাবে না।
আমি সাংবাদিকতার চর্চায় নেই, এ ধরনের গল্প আমার চেয়ে ঢের বেশি জানেন ইন-হাউস রিপোর্টার ও সহ-সম্পাদকেরা। তবে মিডিয়ার চরিত্র-লক্ষণ দেখে আমাদের কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। 'বাজারে এসেছে নতুন পণ্য'জাতীয় সংবাদগুলো, যার অর্থমূল্য থাকলেও সংবাদমূল্য সামান্যও নেই, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপেই যে প্রকাশ করতে হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞাপন তো বিজ্ঞাপনই, কিন্তু সংবাদের ছদ্মবেশে সে হাজির হলে তা অনেক কার্যকর হয়। তো এ রকম একটি পরিস্থিতিতে মুক্ত সাংবাদিকতা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো প্রেস ফ্রিডম ডে-তে কেন উত্থাপিত হবে না?
সেলফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মিডিয়া হাউসগুলোর সম্পর্ক বা লেনদেন নিয়ে মহাকাব্য হতে পারে। আমি নিশ্চিত জানি, অনেক অনেক পাঠক একসময় চিঠিপত্রের পাতায় সেলফোন কোম্পানিগুলোর প্রতারণা, ভুল বিল, বিলের উচ্চহার, প্যাকেজ/অফারের নামে ধাপ্পাবাজি নিয়ে প্রচুর, সুপ্রচুর চিঠি লিখেছেন, তাদের চিঠিগুলো ছাপা হয়নি। এসব অন্যায় নিয়ে শক্ত কোনো রিপোর্ট, কোনো সম্পাদকীয় পত্রিকাগুলো লেখেনি, চ্যানেলগুলো কোনো আইটেম প্রচার করেনি। যদিও বা কোনো সংবাদ হয়, নিশ্চয়ই নিয়মিত হয়, তা প্রমোশনাল: কোন নতুন প্যাকেজ এল ইত্যাদি। যদি সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ স্লটের স্পন্সর হয়ে সংবাদের শিরোনামগুলোর শিরোনাম হয় 'সিটিসেল সংবাদ-শিরোনাম' কিংবা 'গ্রামীণফোন খেলার খবর', তাহলে চ্যানেলগুলোর আর উপায় থাকে না এদের ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল হওয়া। আজকাল ভোক্তারা লেখার মাধ্যমে সমস্যা জানানোর সুযোগই পাচ্ছে না, তাই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ-সমাবেশ করেছেন। মিডিয়াগুলো বাধ্য হয়ে ভেতরের পাতায় এক কলামে নিউজ করছে। মোবাইল ফোনের এই ভোক্তারা আবার পত্রিকার পাঠকও তো, তাদেরও হারালে চলে না।
বেসরকারি খাতের এই সব দুর্বৃত্তায়ন নিয়ে কোনো ক্রিটিক্যাল রিপোর্ট সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় না। যদি কখনো পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে, ওই পত্রিকার মালিকপক্ষের যাকে নিয়ে রিপোর্ট করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে। নইলে সংবাদমাধ্যগুলো বেসরকারি খাতের দ্রুত বিকাশের পক্ষেই কাজ করে থাকে। সরকারি খাতের দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা তুলে ধরা এবং বেসরকারি খাতকে গতিশীল, স্মার্ট প্রমাণ করা একটি অন্যতম এজেন্ডা।
সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-এজেন্ডা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই সব সীমাবদ্ধতা, পরাধীনতার কথা কি আমরা প্রেস ফ্রিডম ডে-তে আলোচনা করব না? এই বিজ্ঞাপনদাতা, বেসরকারি খাতের কবল থেকে মিডিয়াকে আরও স্বাধীন কীভাবে করে তোলা যায়, তার দিকনির্দেশনা কি আমরা প্রেস ফ্রিডম ডে-তে খোঁজার চেষ্ট করব না?
শ্রেণী/লিঙ্গ/গোত্র: 'অপর' উপেক্ষার খতিয়ান
স্বাধীন মিডিয়া বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? যে নির্ভয়ে সবকিছু বলতে পারে, কোনো শক্তি যাতে তাকে সত্য প্রকাশে বাধা দিতে না পারে। কিন্তু আমরা দেখছি, মিডিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে, বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছেও সে পরাধীন। তবে কি এই দুই খাতের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেই মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন হয়?
যখন মিডিয়া গ্রামকে উপেক্ষা করে, শহরকে বেশি গুরুত্ব দেয়, দিতে বাধ্য হয়, তখনো কি সে পুরোপুরি স্বাধীন থাকছে? নাগরিক জীবনের খবরাখবর, সমস্যা, অর্জন প্রথম পাতা ও চ্যানেলের শিরোনামজুড়ে থাকে। আর গ্রামীণ জীবন পড়ে থাকে 'মফস্বল পাতা'য় অথবা 'জনপদের খবর'-এ, অনাদরে। সংবাদ গ্রহণ-বর্জন কিংবা ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে গ্রাম-শহরকে নিয়ে মিডিয়ার মনোভাব কী, তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। আর মিডিয়া যেন বড়লোকদের জন্যই, গরিব লোকদের তাতে স্থান নেই; যদিও টেলিভিশন-দর্শকদের বিরাট অংশই হলো গরিব মানুষ। টেলিফিল্ম কিংবা মেগাসিরিয়ালে আমরা যে চোখ ধাঁধানো ড্রয়িংরুম, প্রাসাদোপম বাড়ি দেখি, তা সব শ্রেণীকে অনুমোদন করে না। নিঃসন্দেহে এগুলো গরিব কিংবা মধ্যবিত্তের গল্প নয়। কিংবা পত্রিকার ফিচার পাতায় যে ইন্টেরিয়রের ছবি ছাপা হয়, যে ফ্যাশন-আইটেমের, যে নতুন খাবারের দোকানের সন্ধান দেওয়া হয়, তার সবই তো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
তাহলে এই যে মিডিয়া গ্রামকে আনতে পারছে না, এ ক্ষেত্রেও মিডিয়াকে কি আমরা স্বাধীন বলতে পারি?
কিংবা ধরা যাক, আমাদের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর কী চিত্র মিডিয়ায় দেখছি? মিডিয়ায় নারীর রূপায়ণ যেমন অবমাননাকর, তেমনি এই প্রতিষ্ঠানে তার অংশগ্রহণও পুরুষের তুলনায় খুবই কম। সংবাদে নারীকে উপস্থাপন করা হয় অসহায়, দুর্বল হিসেবে। সংবাদে তাই প্রায়ই লক্ষ করা যায় 'নারী ও শিশুসহ ---জন নিহত'-ধরনের শিরোনাম। সংবাদপত্রে নারী প্রধানত ঘটনার শিকার হিসেবেই উপস্থাপিত হয়ে থাকে। সক্রিয় সংবাদ-উপাদান হিসেবে তাকে খুব একটা দেখা যায় না। নারী-নির্যাতনের সংবাদ, অপরাধবিষয়ক সংবাদ, গসিপ ফ্যাশন ইত্যাদি সংবাদ পত্রিকায় বেশি বেশি ছাপা হয় এবং নারীকে সেখানে যৌনবস্তু ও প্রদর্শনযোগ্য সৌন্দর্যের আধার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে নারীসংশ্লিষ্ট খবর, ফিচার প্রকাশের চেয়ে নারীর ছবি পত্রিকায় বেশি হয়ে থাকে। প্রদর্শনী, পাবলিক পরীক্ষা, মেলা ইত্যাদি আইটেমে অবধারিতভাবে নারীর ছবি ছাপা হয়ে থাকে। আর সংবাদমাধ্যমগুলোতে নারীর অংশগ্রহণও খুব কম। বাংলাদেশের অন্য অনেক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মিডিয়ায় সে হারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়েনি। মিডিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্তরে নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম। টেলিভিশন-সংবাদে অনেক নারীকে দেখা গেলেও তাদের বেশির ভাগের ভূমিকাই নিউজ প্রেজেন্টারের, রিপোর্টিংয়ে তাদের কমই দেখা যায়। আবার নিউজ প্রেজেন্টারদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখা অনেক বেশি হয়ে থাকে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগে নারীর সৌন্দর্যকে বেশি মূল্য দেওয়া হচ্ছে। মুদ্রণমাধ্যমের তুলনায় ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তাকে খানিকটা বেশি মাত্রায় দেখা যাওয়ার কারণ হলো, সে 'নারী'।
মিডিয়ায় যে নারীকে সৌন্দর্যসামগ্রী হিসেবে, দুর্বল হিসেবে, নির্যাতিত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে; এ ক্ষেত্রেও তো মিডিয়া স্বাধীনভাবে আচরণ করতে পারছে না। কারণ সমাজ নারীকে এই রূপে দেখে থাকে, আর মিডিয়া তার চরিত্রগত ও ব্যবসায়িক কারণে সমাজে বিদ্যমান শক্তিশালী বিশ্বাসগুলোর বিরুদ্ধাচরণ করে না।
আবার সমাজের সব গোত্রের প্রতি মিডিয়া সমান ও সংবেদনশীল আচরণ করে না। আদিবাসীদের নিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি 'স্টিরিওটিপিক্যাল' -- সংখ্যাগরিষ্ঠের চোখ দিয়ে 'অপর' আদিবাসীদের সে দেখে। একবার পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে লেখকও উপস্থিত ছিলেন, এক প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইস্যুতে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে তার মন্তব্য করেন। তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ছিল: 'ভালো না'। অনেক সংঘাতের ঘটনা ঠিকমতো যাচাই না করেই, ঘটনাস্থলে না গিয়ে, রাঙামাটি শহরে বসে, অনেক সময়ে প্রশাসন বা
সেনাবাহিনীর বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন রচনা করা হয়। স¤প্রতি বাঘাইছড়ির ঘটনায় দেখা গেল, পত্রিকাগুলো সংবাদের ট্রিটমেন্ট করেছে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হিসেবে, অথচ এটা প্রকৃত অর্থে যে পাহাড়িদের ওপর আগ্রাসন, তা সংবাদে উঠে আসেনি। সংঘাতের অকুস্থল যদি হয় গহিন অঞ্চল, তবে প্রায় সময়ই রিপোর্টগুলো এ রকমই হয়ে থাকে। আর আলোকচিত্রীরা ক্যামেরার চোখ দিয়ে আদিবাসীদের কেবল খণ্ডিত জীবন দেখেন। তাদের দৈহিক সৌন্দর্য, তাদের উৎসবকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, তাদের জীবনযাত্রার সহজলভ্য ও ধরাবাঁধা কিছু বিষয়ই আলোকচিত্রে ঘুরেফিরে আসে।
সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের নিয়ে মিডিয়ার এই যে খণ্ডিত চিত্রায়ণ, এ ক্ষেত্রেও কি মিডিয়া স্বাধীন থাকতে পারছে? কারণ তার মেকানিজমের মধ্যে সমস্যা আছে। তার প্রধান সমস্যা হলো সে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘুরা তার কাছে 'অপর'-ই থেকে যাচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে যে শ্রেণী, লিঙ্গ, গোত্র বিচারেও মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন নয়। তার অন্তর্নিহিত চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে একদিকে ব্যবসা করতে চায়, তাই এমন কিছু সে করতে পারে না, যাতে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিদ্যমান ধ্যান-ধ্যারণার বিপরীতে সে অনেক ক্ষেত্রে যেতে পারে না। অন্যদিকে ঐতিহাসিক কারণে তাকে সমাজের ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতে হয়, অন্তত মানুষ এখনো মিডিয়ার কাছ থেকে সে রকমই প্রত্যাশা করে। এই দুই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের দুই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে সে অনেক আপস করে, অনেক সময় তার অপভূমিকা প্রকট হয়ে ওঠে। সর্বোপরি সে প্রকাশ্যে বলে স্বাধীনভাবে সমাজের জন্য অবদান রাখতে চায়, কিন্তু পদে পদে সে থাকে পরাধীনতায় শৃঙ্খলাবদ্ধ।
শেষ কথা
আমার আলোচনায় আমি এটাই স্পষ্ট করতে চেয়েছি যে, বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে'র আলোচনায় সাংবাদিকের নিরাপত্তার দিকে বেশি আলোকপাত করা হয়, কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্র যেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা যে যে ক্ষেত্রে সে স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই বিষয়গুলোও আলোচনায় আসা উচিত। সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অন্য বিষয়গুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
[খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ'-এ (Click This Link) প্রকাশিত।]
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১০ সকাল ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



