বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের তিনটি সংখ্যা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে আমি আলোচনা করতে চাই ১ম ও ৩য় সংখ্যা নিয়ে। ৩য় সংখ্যাটি খুব সম্প্রতি জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছে। এই সর্বশেষ সংখ্যাটি নিয়ে আলোচনা করলেই চলতো, কিন্তু জার্নালটির চরিত্র বোঝার জন্য একাধিক সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আর ১ম সংখ্যায় জার্নালটি কী উদ্দেশে প্রকাশিত হয়েছে, সম্পাদকীয়তে সেসম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ঐ জার্নালের ১ম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, অনুশীলন ও অধ্যয়নের মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নতুন প্রবাহ ও প্রণোদনা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রে পরিণত হতে চায়। আর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর পূর্তির শুভলগ্নে জার্নাল প্রকাশনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্পাদকীয়তে অবশ্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যে সম্পাদকীয় পরিষদকে চলচ্চিত্র বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার অপর্যাপ্ততার সঙ্কটে ভুগতে হয়েছে। সেই সঙ্কট অবশ্য ৩য় সংখ্যাতেও লক্ষ্যণীয়, তবে জার্নালটির ক্রমোত্তরণ প্রশংসনীয়।
সরকারী প্রতিষ্ঠান হবার পরও আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে যে ফিল্ম আর্কাইভ চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্রে পরিণত হতে চায়, এই ইচ্ছাটাই প্রাণশক্তি হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সক্রিয় করে তুলেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে সত্তরের দশকের শেষদিকে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের দাবি ও আন্দোলনের মাধ্যমে ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আর্কাইভের প্রথম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সেই মানজারে হাসীন মুরাদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম ও তারেক মাসুদরা প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন যারা এখন পর্যন্ত শিল্পপ্রয়াসী স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণেই যে সম্পাদক কয়েকটি প্রবন্ধ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ করতে সমর্থ হননি তাও স্বীকার করেছেন। আর চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষণাধর্মী ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার লেখক-স্বল্পতার উদ্বেগও কমে আসবে আশা করা যায়। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে এই জার্নাল ও প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ফেলোশিপের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু লেখক-গবেষকও তৈরী হয়ে উঠছেন।
এবার প্রথম সংখ্যার প্রবন্ধসমূহের দিকে চোখ ফেরানো যাক। জাতীয় স্মৃতি রক্ষায় ফিল্ম আর্কাইভের ভূমিকা নিয়ে প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছেন আর্কাইভের বর্তমান মহাপরিচালক ও জার্নালের সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। প্রথম সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে এটি লাগসই হয়েছে। প্রবন্ধে ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি, আর্কাইভের কার্যক্রম এবং আর্কাইভকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন-বিতর্কের দিকে প্রবন্ধকার আলোকপাত করেছেন। একটি বিতর্ককে এখানে উল্লেখ করতে চাই। প্রবন্ধকার বলছেন ধাতব ক্যান নাকি প্লাস্টিক ক্যান -- কোন ক্যানে ফিল্ম সংরক্ষণ ভালো হয় এটা নিয়ে নাকি বাংলাদেশে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছেনা। এজন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া দরকার বলে উল্লেখ করেছেন প্রবন্ধকার। আমার মতে এটা নিয়ে খুব বেশি গবেষণার দরকার আছে বলে মনে হয়না। প্রতিষ্ঠিত কোনো আর্কাইভ বা আমাদের মতো আবহাওয়ার কোনো দেশের আর্কাইভ সফর করলেই এর উত্তর জানা যাবে।
সত্যজিতের রাজনৈতিক ছবি, বিশেষত কলকাতা-ত্রয়ী (প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ ও জনঅরণ্য) নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রবন্ধ লিখেছেন নাদির জুনাইদ। তিনি লক্ষ করেছেন জাঁ লুক গদার বা গ্লবার রোশার মতো পরিচালক যেরকম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে পরিচিত, সত্যজিতের সেরকম পরিচিতি নেই। বরং ‘অরাজনৈতিক’ অভিযোগে অভিযুক্ত সত্যজিৎ। প্রবন্ধকার এই তিনটি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণে প্রয়াসী হয়েছেন যে উচ্চকিতভাবে না হলেও সত্যজিৎ, বিশেষত পরের দিককার চলচ্চিত্রসমূহের বদৌলতে একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার। তিনি এজন্য অনেক গবেষকের বরাতে বেশ কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। সেই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গবেষণা প্রণালীতে শুদ্ধ থাকার পরও প্রবন্ধকারের নিজস্ব যুক্তি-বিশ্লেষণের স্বল্পতা প্রবন্ধটিকে খানিক দুর্বল করে রেখেছে।
তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীতকার সৈয়দ সাবাব আলী আরজু তার অভিজ্ঞতা প্রসূত একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ‘প্রসঙ্গ: চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত’ শিরোনামে। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে যেভাবে তিনি সঙ্গীত শৈলী প্রয়োগ করেছেন তা উদাহরণসহ আলোচনা করায় প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের ওপর একটি পর্যালোাচনামূলক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন সোমেশ্বর ভৌমিক। সেখানে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল থেকে শুরু করে হালের ঋতুপর্ণ পর্যন্ত বিভিন্ন পরিচালকের হাতে বাংলাভাষার শিল্পসম্মত ছবি যেভাবে ঋদ্ধ হয়ে দেশকাল ছাপিয়ে উঠেছে তার প্রেক্ষাপট সমেত বর্ণনা প্রবন্ধকার হাজির করেছেন।
১ম সংখ্যায় দু’টি চলচ্চিত্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে -- একটি হলো তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬) ও আরেকটি হলো আবু সাইয়ীদের ‘নিরন্তর’ (২০০৬)। চিত্রসমালোচনা হিসেবে ‘নিরন্তর’ ছবির ওপরে শাহীন কবীরের আলোচনা অনেকটা সংগতিপূর্ণ হলেও, ‘অন্তর্যাত্রা’ ছবিটি নিয়ে খন্দকার সাখাওয়াত আলীর আলোচনাটি চলচ্চিত্রের বাইরের কিছু বিষয় (যেমন পরিচালকদের সঙ্গে তার পরিচয়-বন্ধুত্ব ইত্যাদি) অযাচিতভাবে চলে আসায়, দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সাজেদুল আউয়ালকৃত ঋত্বিক ঘটকের দুইটি চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক এবং তানহা (১৯৬৪) ও চরিত্রহীন (১৯৭৪) ছবির পরিচালক বেবী ইসলামের সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ। বেবী ইসলাম স¤প্রতি পরলোকগত হয়েছেন, মৃত্যুর পূর্বে ঐ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ একটি দায়িত্বশীলতার প্রকাশরূপে বিবেচনা করা যেতে পারে। জার্নালের প্রথম সংখ্যাটি স্বাধীনধারায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘হুলিয়া’র (১৯৮৪) চিত্রনাট্য ছেপে একটি উল্লেখ্যযোগ্য আরেকটি দায়িত্ব পালন করেছে। সঙ্গে পরিচালক তানভীর মোকাম্মেলের ভূমিকাটিও সুপ্রযোজ্য হয়েছে।
চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে দুইটি। পথিকৃৎ-চলচ্চিত্রকর্মী মুহাম্মদ খসরু সম্পাদিত ‘ধ্র“পদী’ পত্রিকার ওপর আলোচনা করেছেন শৈবাল চৌধুরী। আর গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি’ শীর্ষক বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন শাহাদুজ্জামান। এই গ্রন্থটির সঙ্গে এই লেখক সরাসরি যুক্ত থাকায় সমালোচনাটির ভালোমন্দ নিয়ে কিছু বলছি না। তবে সমালোচক শাহাদুজ্জামানকে ধন্যবাদ দেবার পাশাপাশি একটি বিষয় শুধরে দেবার প্রয়োজন বোধ করছি। সমালোচক এক জায়গায় বলেছেন যে, গীতি আরা এবং ফাহমিদুল প্রচলিত ইতিহাসচর্চা নিয়ে যেমন বিতর্ক তুলেছেন তেমনি ইতিহাসের নতুন দিকে আলোকপাতও করেছেন। আরেক জায়গায় বলছেন, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিকল্পপাঠ উপস্থাপন করেছেন গীতি আরা এবং ফাহমিদুল। আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ঐ বিকল্পপাঠটি চলচ্চিত্র-গবেষক জাকির হোসেন রাজুর। তার পিএইচডি গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল, ঐ বিকল্পপাঠ। ঐ গ্রন্থে লেখকদ্বয় যথাযথভাবে রাজুকে রেফারেন্সসহ উল্লেখ করার পরও সমালোচকরা (যেমন ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায়, ১১ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে, ফারুক ওয়াসিফের সমালোচনাতেও এটি দেখা গেছে) মনে করছেন যে ঐ বিকল্পপাঠ, বইয়ের লেখকদ্বয়ের। পাঠকের উপলব্ধির সুবিধার্থে বিষয়টা এখানে খোলাসা করা হলো। অপ্রাসঙ্গিক শোনাক, তবুও বলি, জাকির হোসেন রাজুর পিএইচডি গবেষণাটি অচিরেই বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-সংস্থা রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-সংস্থা থেকে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত হবে।
এপর্যন্ত প্রকাশিত তিনটি সংখ্যার প্রত্যেকটিতেই দেখা গেছে প্রথম প্রবন্ধটি চলচ্চিত্র সংরক্ষণ বিষয়ক, ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের যা সঙ্গতিপূর্ণও। ৩য় সংখ্যায় অবশ্য প্রথম দু’টি প্রবন্ধই এই সংক্রান্ত। প্রথমটি লিখেছেন ড. মোঃ ছাবের আলী, শিরোনাম ‘ক্ষতিগ্রস্ত চলচ্চিত্র পুনরুদ্ধারে একটি ফিল্ম হাসপাতালের রূপরেখা’। তিনি ফিল্মের রোগগুলো সনাক্ত করে প্রতিটি ফিল্ম আর্কাইভে, রূপকার্থে, একটি ফিল্ম হাসপাতাল থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন যেখানে ফিল্মের ঐসব রোগ সারানো যাবে। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি লিখেছেন অপরেশ কুমার ব্যানার্জী যিনি চলচ্চিত্র সংরক্ষণে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন।
৩য় সংখ্যায় বিচিত্র সব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর বিস্তার ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র থেকে সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি পর্যন্ত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচনা-গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল গঙ্গাযাত্রা, চন্দ্রগ্রহণ, সাজশিল্পী এবং মাটির ময়না। এছাড়া রয়েছে চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থালোচনা, প্রবীণ অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকার, ২০১০ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবের রিপোর্ট, ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের পূর্ববর্তী সংখ্যার রিভিউয়ের পুনর্মুদ্রণ, বাংলাদেশী সিনেমার প্রথম যুগের কিছু লেখার পুনর্মুদ্রণ এবং ২০০৯-১০ সালে ফিল্ম আর্কাইভের কার্যক্রমের রিপোর্ট।
যাত্রা ও লোকমাধ্যমের গবেষক ড. তপন বাগচী ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজীবনের উপস্থাপনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে জহির রায়হানের বেহুলা (১৯৬৬), সালাহউদ্দিনের রূপবান (১৯৬৫), দীলিপ সোমের সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮) ও তোজাম্মেল হক বকুলের বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯) -- এই চারটি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করে ঐসব ছবিতে লোকজীবনের উপস্থাপনা অনুসন্ধান করেছেন। তিনি চলচ্চিত্রগুলোর লোকসাহিত্য-উৎস, লোকাচার-লোকানুষ্ঠান, লোকশিল্প বা শিল্পগত ফোকলোর, লোকবিজ্ঞান ও কারিগরি ইত্যাদি থিমের আলোকে চলচ্চিত্রগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রবন্ধশেষে তিনি বলছেন, আমাদের লোকজীবনের অনুষঙ্গ চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে চলচ্চিত্রের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা যায় -- যা পর্যবেক্ষণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। চারটি চলচ্চিত্রের মধ্যে বেদের মেয়ে জোসনা নিয়ে বিশ্লেষণের পরিধি কমই দেখা গিয়েছে, যেক্ষেত্রে ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ ও ফরহাদ মজহারের মতো পণ্ডিতেরা ছবিটির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ইতোমধ্যে করেছেন। চারটি ছবিই লোকসাহিত্য থেকে অ্যাডাপশন করা হয়েছে, আর সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যকে চলচ্চিত্রে পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে ছবিগুলো কতটা সফল বা বিফল হয়েছে, তা গবেষকের বিশ্লেষণে উঠে আসেনি। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রগুলোর আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে আলোচনা করলে প্রবন্ধটি পূর্ণাঙ্গ হতো।
এই অপূর্ণাঙ্গতা দেখা যাবে অহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের গঙ্গাযাত্রা ও মুরাদ পারভেজের চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে যে চলচ্চিত্র-সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে তাতেও। গঙ্গাযাত্রা নিয়ে লিখেছেন শারফুদ্দিন আনাম এবং চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেছেন মনি হায়দার। আলোচনা দুটো মনোগ্রাহী হলেও অপূর্ণাঙ্গ। কারণ এই আলোচনা দুটোতে কেবল কাহিনী ও চরিত্রবিশ্লেষণ করা হয়েছে। সাহিত্যের জন্য সবসময় জরুরি না হলেও, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা জরুরি। অবশ্য কোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চকে মিলিয়ে অধ্যয়ন ভিন্ন কথা, কিন্তু যখন কেবলই একক চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করা হচ্ছে তখন ফিল্ম টেকনিক নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য। সমালোচক মনি হায়দার অবশ্য স্বীকার করেছেন, “আমি জানি চলচ্চিত্রের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা অনুধাবন করার জন্য ব্যাপক পঠন পাঠন দরকার। যা আমার নেই।” একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক জার্নালে যে সমালোচনা প্রকাশিত হবে তাতে চলচ্চিত্র-ভাষার পঠন-পাঠনযুক্ত রচনাই কাম্য।
৩য় সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন ড. কাবেরী গায়েন। কোরীয় চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক কিম সোইয়ং-এর উইমেন’স হিস্ট্রি ট্রিলজি নিয়ে সেমিনার হয়েছিল ২০০৯ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সেমিনারের আলোচক ড. গায়েন পরে প্রবন্ধ লিখেছেন ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের জন্য। সোইংয়ের তিনটি প্রামাণ্যচিত্রে কোরীয় নারীর একটি ভিন্ন ইতিহাস রচিত হয়েছে। চলচ্চিত্র তিনটি ছিল কোরিয়ু: সাউদার্ন উইমেন এন্ড সাউথ কোরিয়া (২০০৩), আই’ল বি সিয়িং হার (২০০৩) এবং নিউ উইমেন: হার ফার্স্ট সঙ (২০০৪)। গবেষকের বিশ্লেষণমতে, তিন প্রজন্মের তিন ধরনের কোরীয় নারীকে আমরা ট্রিলজিতে দেখতে পাই। সেখানে ‘ওনমুনজায়েমুন’ (মৃতব্যক্তির জন্য বিলাপরচয়িতা) নারী যেমন আছেন, তেমনি আছেন আজকের আধুনিক কোরীয় নারী -- নিউ উইমেন। আর এই নারীদের মধ্যে একটি সাধারণ ডায়াস্পোরিক অস্তিত্ব বহমান। প্রথম নারী তার মাতাপিতার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে অভিবাসী হয়েছেন, মধ্যম পর্বের নারীদের একজন বিদেশে স্বামীর সঙ্গে অভিবাসী হয়েছেন আর তৃতীয়জন কারও কাছে বা কারও সঙ্গে নয়, নিজেই অন্য শহরে যাচ্ছেন স্বাধীকার ও জীবিকার জন্য। কিম সোইয়ং-এর প্রামাণ্যচিত্র তাত্ত্বিক, সেখানে কোনো ধরনের বিনোদনের আশা করা বৃথা। তবে ছবিতে তীক্ষ্ণধী ও দৃঢ়চেতা এক ন্যারেটরকে পাওয়া যায়। ড. কাবেরী গায়েনের প্রবন্ধেও সেই সুর অক্ষুণœ আছে।
ফাহমিদুল হক ও শান্তি বলরাজ লিখেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মাটির ময়না নিয়ে। ছবিটি কীভাবে বাঙালি-মুসলমানের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরেছেন সেইদিকে আলোকপাত করা হয়েছে প্রবন্ধে। প্রবন্ধের শিরোনাম ‘দি ক্লে বার্ড: আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন অব বেঙ্গলি মুসলিমস অন দ্য স্ক্রিন’। প্রবন্ধকারদ্বয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে বাঙালি-মুসলমানের আত্মপরিচয়ের তিনটি এ্যাপ্রোচের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো বাঙালিত্ব (বাঙালি জাতীয়তাবাদ), মুসলমানিত্ব (ইসলামপ্রভাবিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ) এবং লোকধর্ম (বৌদ্ধিক তান্ত্রিকতা, বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদ প্রভাবিত গৌণধর্মসমূহ)। বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে মাটির ময়না ছবিতে এই তিন ধরনের আত্মপরিচয়কেই চিত্রিত করা হয়েছে কিন্তু লোকধর্মের প্রতি চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পক্ষপাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কলকাতার গবেষকের জটিল শিরোনামের প্রবন্ধ ‘ত্রয়ী চলচ্চিত্রকারের প্রাক-পটভূমির উৎসমুখের সন্ধানে’। শিরোনাম কোনোকিছু স্পষ্ট না করলেও, প্রবন্ধ পড়ে বোঝা গেল, কলকাতার ত্রয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-এর আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা সিনেমার উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর ওপর প্রবন্ধটি রচিত যাতে হীরালাল সেনের প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু করে নিমাই ঘোষের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ছিন্নমূল’ পর্যন্ত আলোচনা বিস্তৃত হয়েছে। প্রমথেস বড়–য়ার বাণিজ্যিক সফলতা, গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-এর অবদান, ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ের ওপরে প্রবন্ধকার আলোকপাত করেছেন।
এই কয়েকটি বৃহৎ প্রবন্ধ ছাড়াও আরও কয়েকটি ছোট আকারের গবেষণা-প্রবন্ধ ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। মোঃ নজরুল ইসলাম লিখেছেন ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্রের ওপর। সৈয়দা নিগার বানুর প্রামাণ্যচিত্র সাজশিল্পীর ওপরে কাজ করেছেন আশরাফী বিন্তে আকরাম। মান্দি নারীরা ঢাকার বিউটি পার্লারে কাজ করে থাকেন; সংখ্যালঘু পরিচয়, দারিদ্র্য ও কর্মহীনতার কারণে তাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বা ইন্টারনাল মাইগ্রেশন ঘটেছে -- এই দিকটায় আলোকপাত করেছেন গবেষক। ভারতীয় গবেষক পূজা দাস সরকার লিখেছেন সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি (সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিট: অন দ্যা ডেথ অব দ্য ডিজায়ারিং ওম্যান) নিয়ে। নিবন্ধটি আলোচনা হিসেবে ভালো, কিছু ছবির উদাহরণও দিয়েছেন লেখক, কিন্তু কোনো ছবি নিয়ে গভীরতাধর্মী গবেষণায় প্রবন্ধকার যাননি। শৈবাল চৌধুরী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রনির্ভর পত্র-পত্রিকার একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়েছেন তার প্রবন্ধে। সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর নিবন্ধ ‘জার্নাল-চিন্তা থেকে ফিল্ম ইনস্টিটিউট-ভাবনা’ সুখপাঠ্য, কিন্তু তাতে গবেষণাধর্মিতার লেশমাত্র নেই। এটি যেকোনো চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকপত্রের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু জার্নালের জন্য খাপ খায় না।
স¤প্রতি প্রকাশিত চলচ্চিত্রবিষয়ক গ্রন্থ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: আর্থামাজিক পটভূমি (আহমেদ আমিনুল ইসলাম)-এর ওপরে আলোচনা করেছেন ফারজানা ইয়াসমিন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের (তপতী বর্মণ ও ইমরান ফিরদাউসের বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্র: একটি সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা, অদিতি ফাল্গুনী গায়েন ও হুমায়রা বিলকিসের বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্র ও সিনে সাংবাদিকতার আন্তঃপ্রভাব এবং বিকাশ চন্দ্র ভৌমিকের ওমেন অন স্ক্রিন: রেপ্রিজেন্টিং ওমেন বাই ওমেন ইন বাংলাদেশ) ওপর আলোচনা করেছেন হাবিবা রহমান এবং তিন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জীবনগ্রন্থের (সুহৃদ জাহাঙ্গীরের উদয়ন চৌধুরী, হারুনর রশীদের চলচ্চিত্রকার সালাহ্উদ্দিন এবং অব্যয় রহমানের সুমিতা দেবী) ওপরে আলোচনা করেছেন মনিস রফিক। অন্যান্য সংখ্যার মতো ৩য় সংখ্যাতেও একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. সাজেদুল আউয়াল।
জার্নালটির সার্বিক কিছু দিকে আলোকপাত করে আলোচনা শেষ করবো। জার্নালটি দ্বিভাষিক, কিন্তু ইংরেজি প্রবন্ধের সংখ্যা খুবই কম। তৃতীয় সংখ্যায় মাত্র দুইটি ইংরেজি ভাষায় লিখিত প্রবন্ধ আছে। যদি সব প্রবন্ধই বাংলা হতো, কোনো সমস্যা ছিলনা। কিন্তু দ্বিভাষিক জার্নাল হতে হলে এখানে অবশ্যই শতকরা ৩০-৪০ ভাগ প্রবন্ধ ইংরেজি ভাষায় লিখিত হওয়া উচিত। ইংরেজি ঘাটতি পূরণ করতে হলে আরেকটা উপায় হতে পারে, প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট বা প্রবন্ধসংক্ষেপ ইংরেজিতে দেয়া, প্রবন্ধটি বাংলায় লিখিত হলেও। সম্পাদকীয় দায়িত্ব এতে বাড়বে, কিন্তু জার্নালটি যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে চায় এছাড়া গত্যন্তর নেই।
জার্নালটির রেফারেন্স স্টাইলে কোনো সাধারণীকরণ বা ইউনিফর্মিটি নেই। একেক প্রবন্ধে একেক ভাবে রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে যা সম্পাদকীয় দুর্বলতা প্রকাশ করে। এমনকি কোনো প্রবন্ধে রেফারেন্স-এর বাংলা লেখা হয়েছে গ্রন্থপঞ্জি, কোথাও বা তথ্যনির্দেশ। ১ম সংখ্যার প্রচ্ছদ ডিজাইন খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু ৩য় সংখ্যার প্রচ্ছদটি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। ড. সাজেদুল আউয়াল এবারের প্রচ্ছদটি করেছেন সুভাষ দত্ত চিত্রিত মাটির পাহাড় চলচ্চিত্রের গানের বই-এর প্রচ্ছদের ভিত্তিতে।
প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশের ছবির ওপরে লিখিত হওয়াই ভালো। বিদেশী চলচ্চিত্র বলতে ভারতীয় বাংলা বা দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। ২য় সংখ্যায় পোলিশ চলচ্চিত্রকার কিসলোভস্কির থ্রি কালারস ট্রিলজির ওপরে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল, ইংরেজিতে। কিসলোভস্কির ওপরে অসংখ্য প্রবন্ধ ইংরেজিভাষায় ছাপা হয়েছে, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালে এধরনের প্রবন্ধ ছাপার কোনো অর্থ নেই। ৩য় সংখ্যায় পূজা দাস সরকারের ইংরেজি নিবন্ধটিও কেবল ভারতীয় ছবির ওপরে আলোকপাত করলে ভালো হতো।
তবে জার্নালটির ক্রমোত্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন এবং নির্বাহী সম্পাদক ড. সাজেদুল আউয়াল অবশ্যই ধন্যবাদার্হ হবেন। ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বর্তমানের বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরকারী আদেশে বদলী হয়েছেন। জার্নালটি তার উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল, আশা করি বর্তমান ও ভবিষ্যতের মহাপরিচালকেরা জার্নালটি নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাবেন এবং এভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে জার্নালটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সমর্থ হবে।
২৬ জুলাই, ২০১০।
প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ', ২৬ জুলাই (বর্ষ ১, সংখ্যা ৩৫)।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০১০ রাত ১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



